• ঢাকা
  • শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: আগস্ট ৫, ২০১৯, ০৭:৫৭ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : আগস্ট ৫, ২০১৯, ০৭:৫৯ পিএম

রবীন্দ্রনাথের কবিতায় রাজনীতি,রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে রাজনীতি

দীপংকর গৌতম
রবীন্দ্রনাথের কবিতায় রাজনীতি,রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে রাজনীতি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাংলার কবি, বাঙালির কবি। তাকে নিয়ে আলোচনা সমালোচনার অন্ত নেই। যারা সাহিত্য রসিক নন, সাহিত্য বিষয়ে আগ্রহীও নন বা নিরক্ষর তারাও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যাপারে আগ্রহী এবং বিরোধীও। ১৯৪৭ সালে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশ ভাগহলো। হিন্দু-মুসলমানের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠনের মধ্য দিয়ে যে দাঙ্গা শুরু হলো তার রেশ রয়ে গেল অনেক দিন অবধি। যাই হোক আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ কোন কালেই সাম্প্রদায়িক ছিলো না। তবে রবীন্দ্রনাথ প্রশ্নে পাকিস্তান আমল থেকে যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিলো
সেটা ছিলো এক ধরনের বিদ্বেষ মাত্র। কারণ একটাই। তাহলো রবীন্দ্রনাথ হিন্দু পরিবারের। এছাড়া পাকিস্তানের রবীন্দ্রবিরোধিতার আর কী থাকতে পারে? এবং পাকিস্তানি শাসকদের মেধাশুন্যতা সবচেয়ে বেশি টের পেতে খুব বেশি দূরে যেতে হয় 

 যখন তারা রবীন্দ্র সঙ্গীতকে নিষিদ্ধ করে, মালাউন রবীন্দ্রনাথের গান লিখতে বলে তখন বোঝা যায়, পাকিস্তান শাসনের অন্তঃসারশূন্যতা।ষাটের দশকে পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের মূল হয়ে ওঠে রবীন্দ্রবিরোধিতা, রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধ ইত্যাদি। এখনও যেমন আমরা পথে -ঘাটেই শুনি, রবীন্দ্রনাথ মুসলমানদের কথা ভাবেনি, লিখেননি বা রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধী ছিলো। শুধু কি তাই? এখনমানুষ বিশ্বাস করে, রবীন্দ্রনাথ বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামকে দাবিয়ে রাখতে নিজের মেয়েকে তার কাছে বিয়ে দিয়েছিলেন। পরে তাকে ওষুধ খাইয়ে বোবা করে ফেলেন । এমন বহু কথা আমাদের গাঁও-গ্রাম থেকে আসা মুটে-মজদুর রিকশাওয়ালার কাছেও শুনতে পাই। সম্প্রতিআমার সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে আলোচনাকালে টিকাটুলী শহীদ নবী উচ্চবিদ্যালয়ের এক শিক্ষক আমাকে বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন অত্যাচারী জমিদার। তিনি হরিনাথ নামের এক সাহিত্যিককে নিঃস্ব করেছিলেন বলে তার নাম হয় কাঙাল হরিনাথ। 

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, এটা কোথায় লেখা আছে? তিনি বলেছিলেন কোথাও লেখা নেই। আমার বাড়ি কুষ্টিয়া, আমরা জানি এসব। অর্থাৎ আমরা এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে দেখতে পাই পাকিস্তানবিরোধী শক্তি  সমাজে এখনও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। যে কারণে সাম্প্রদায়িকতার ধুয়ো তুলে  মাঝে - মধ্যেই রবীন্দ্র সঙ্গীত বলে ‘জাতীয় সঙ্গীত’ পরিবর্তনের কথা এসেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবার পরিজনসহ হত্যার পরে মোশতাক সরকার রবীন্দ্র সঙ্গীত পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি কাজী নজরুল বা ফররুখ আহমেদের কবিতা থেকে গান করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত হয়নি।

 জিয়াউর রহমানের শাসনামলে রাজাকার শাহ আজিজ আবার মুসলিম উম্মার শান্তির জন্য রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন। প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশকে জাতীয় সঙ্গীত করার চেষ্টা করেছিলেন জিয়া সরকার। সর্বশেষ বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের দুই রাজাকার মন্ত্রী নিজামী ও মুজাহিদ ২০০২ সালে এ অপচেষ্টা করেছিলেন, কাজ হয়নি। রবীন্দ্রনাথ টিকে আছে নিজের লেখা তার দার্শনিক চেতনার জোরে। তবে আসল কথাটা হলো, রবীন্দ্রনাথ আমাদের জন্য কতটা জরুরি সেটা তার লেখা দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন।

 রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ছিন্নপত্রে যে কথাটি লিখেছিলেন সেটা দিয়ে তাকে আরো ভালো করে বোঝা যায় ‘আমার জন্মগত পেশা জমিদারি, কিন্তু আমার স্বভাবগত পেশা আসমানদারি’। জমিদারির চেয়ে অবশ্য অনেক অনেক বড় ছিল তার আসমানদারি। তার চিঠিতে আছে, ‘আমার স্বীকার করতে লজ্জা করে এবং ভেবে দেখতে দুঃখ হয়- সাধারণ মানুষের সংসর্গ আমাকে বড় বেশি উদভ্রান্ত করে দেয়- আমার চারদিকেই এমন একটা গণ্ডি আছে, আমি কিছুতেই ভাঙতে পারিনে- অথচ মানুষের সংসর্গ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকাও আমার পক্ষে স্বাভাবিক নয়-থেকে থেকে মানুষের মাঝখানে গিয়ে গড়তে ইচ্ছা করে- মানুষের সঙ্গে যে জীবনোত্তাপ তাও যেন প্রাণ ধারণের পক্ষে আবশ্যক।’
(‘ছিন্নপত্র’, ২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯১৪)।

‘ রবীন্দ্রনাথ আমাদের জন্য জরুরি, এবং জরুরি থাকবেন। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করব। তার পরিচয়ে নিজেদের পরিচয় দেয়া অব্যাহত রাখব। রবীন্দ্রনাথ অনেক বিষয়ে আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, বহু ক্ষেত্রে। শান্তিনিকেতনে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে ছাত্র ও অধ্যাপক এসেছে পৃথিবীর অনেক দেশ থেকে, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নিজেই একটি বিশ্ববিদ্যালয়। যে-বহুমুখিনতাকে আধুনিক ইউরোপ তার জন্মকালে অত্যন্ত প্রশংসা করত, রবীন্দ্রনাথের মধ্যে সেই গুণ ছিল, তার আগে অন্য কোনো বাঙালির মধ্যে এটা দেখা যায়নি, পরেও দেখা যাবে বলে আশা করা যায় না। কেননা ইতিমধ্যে যুগ এসে গেছে বিশেষজ্ঞ হওয়ার। রবীন্দ্রনাথ কেবল বৃহৎ নন, বৃহৎ তো তিনি অবশ্যই, তিনি মহৎও। তার সেই মহত্ত্বের নানা মাত্রা রয়েছে।’ (রবীন্দ্রনাথ কেন জরুরি,সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, পৃষ্ঠা-১৬৫,রচনাবলী-৮)

রবীন্দ্রনাথে সামাজিক দায়, রাজনৈতিক বিশ্বাস অবিশ্বাসের জায়গাগুলোকে ব্যাখা করে পরিষ্কার করেছেন আমাদের বরেণ্য শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তাই তার একই লেখার আরেকটি জায়গায় তিনি লিখেছেন,

‘সমাজে বিচ্ছিন্নতার দৌরাত্ম্য যে বৃদ্ধি পাচ্ছিল তা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ উদ্বিগ্ন ছিলেন, জানতেন যে এর প্রধান কারণ হচ্ছে বৈষম্য, পুঁজিবাদ যে-বৈষম্যকে পুষ্ট করেছে, কিন্তু তাই বলে এই মত তিনি প্রচার করেননি যে, যন্ত্রকে পরিত্যাগ করে চলে যেতে হবে কুটিরশিল্প ও ব্যক্তিগত উৎপাদনের যুগে। ‘রক্ত করবী’তে পুঁজিবাদের প্রাণবিনাশী বস্তুতান্ত্রিকতার ভয়াবহতাকে তিনি আমাদের সামনে নিয়ে এসেছেন। কমিউনিস্টদের তিনি বলপ্রয়োগকারী হিসেবেই জানেন, কিন্তু ‘অমৃত’ নামের কবিতায় অমিয়া যে জেলগেটে রায় বাহাদুর নন্দন কমিউনিস্ট
মহীভূষণকে বরণ করে নিচ্ছে সেটা এই ভরসাতেই যে, মহীভূষণ তাকে মুক্তি দেবে অন্য এক কারাগার থেকে। সে-কারাগার উপকরণের, সে-কারাগার বস্তুতান্ত্রিকতার।

পরাধীন ভারতে ভারতবাসী যে দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল তার প্রধান কারণ এই নয় যে, দেশ অন্যরা দখল করে নিয়েছিল; প্রধান কারণ এটা যে, সেবা ও ত্যাগের দ্বারা দেশকে ভারতবাসী নিজেদের আত্মীয় করে নিতে পারেনি। কারণ অবশ্য আরও একটি ছিল। সেটি ধনবৈষম্য। ‘মোটকথা হচ্ছে, দেশের যে অতিক্ষুদ্র অংশে বিদ্যাবুদ্ধি, ধনমান, সেই শতকরা পাঁচ পরিমাণ লোকের সঙ্গে পঁচানব্বই পরিমাণ লোকের ব্যবধান মহাসমুদ্রের ব্যবধানের চেয়ে বেশি।’ ‘আমরা এক দেশে আছি, অথচ আমাদের এক দেশ নয়।’ (‘পল্লী সমাজ’) তিনি
জেনেছেন, ‘রাশীকৃত বিচ্ছিন্নতাকে কেবলমাত্র স্তূপাকার করিতে থাকিলেই তারা এক হয় না।’ (‘স্বদেশী সমাজ’) এবং এ-উপলব্ধিও অত্যন্ত প্রখর ছিল তার কাছে যে, ‘বিচ্ছিন্নতা যেখানে প্রবল সেখানে বিপ্লব না এলে তার সমন্বয় হয় না, কিন্তু রাষ্ট্রতন্ত্রে, কি সমাজতন্ত্রে, কি ধর্মতন্ত্রে’।(‘সামঞ্জস্য’, ‘শান্তিনিকেতন’)।

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে আমরা একটা বিষয় পরিষ্কার দেখি, শুধু ভাবজগতের চিন্তা বা আধ্যাত্মিকতা নিয়ে যারা রবীন্দ্রনাথ কে বিচার করেন,তারা রবীন্দ্রনাথের প্রতি অবিচার করেন। মানবমুক্তির কথা রয়েছে তার সাহিত্যের পরতে পরতে। যেমন ‘দুই বিঘা’ কবিতার বাস্তবতায় আমরা দেখি এক সর্বগ্রাসী ভুমি দস্যুকে। যাকে আজও আমরা অতিক্রম করতে পারিনি। তাঁর ‘বাঁশী’ কবিতায় তিনি যে শিক্ষকের কথা বলেছেন আজও কি সেই শিক্ষকের কথাটির পরিবর্তন এসেছে কোন?

‘ আমি ছাড়া ঘরে থাকে আরেকটা জীব/এক ভাড়াতেই, সেটা টিকটিকি/তফাত আমার সঙ্গে এই শুধু, নেই তার অন্নের অভাব/বেতন পঁচিশ টাকা,সদাগরি আপিসের কনিষ্ঠ কেরানি/খেতে পাই দত্তদের বাড়ি ছেলেকে পড়িয়ে/শেয়ালদা ইস্টিশনে যাই, সন্ধেটা কাটিয়ে আসি, আলো জ্বালাবার দায় বাঁচে।’

 শিক্ষকের যে সামাজিক মুক্তির লড়াই তা শিক্ষকের অন্তরের একটা আঁকুতি থেকে পরিষ্কার হয়। ‘ঘরেতে এলোনা সেতো/ মনে তার নিত্য আসা যাওয়া। আজও এ জায়গাটাকে আমরা অতিক্রম করতে পারি নি। একই সঙ্গে দেখি রবীন্দ্রনাথ দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবেও নিপীড়িত মানুষের মুক্তির সংগ্রামে অনন্য। তার আফ্রিকা কবিতায় তার প্রতিধ্বনি শুনি। জাপানি সমরবাদ বা আফ্রিকান ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তার  কণ্ঠ সোচ্চার।  সাম্রাজ্যবাদ-ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের চরম নিষ্ঠুরতা থেকে গণমানুষের মুক্তির আকুতি তার কণ্ঠে ধ্বণিত হয়:
‘এল ওরা লোহার হাতকড়া নিয়ে/নখ যাদের তীক্ষ তোমার নেকড়ের চেয়ে,/এল মানুষ ধরার দল/গর্বে যারা অন্ধ তোমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে/সভ্যের বর্বর লোভেনগ্ন করল আপন নির্লজ্জ অমানুষতা।/(‘আফ্রিকা’)

 

বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ফ্যাসিবাদের ক্রমাগত ঔদ্ধত্যের রবীন্দ্রমানস যন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়েছে ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রবীন্দ্রনাথ আগ্রাসী জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে বলেন, সমস্ত ইউরোপে আজ এক মহাযুদ্ধের ঝড় উঠেছে-কতদিন ধরে গোপনে গোপনে এই ঝড়ের আয়োজন চলছিল। অনেকদিন থেকে আপনার মধ্যে আপনাকে যে মানুষ কঠিন করে বন্ধ করেছে, আপনার জাতীয় অহমিকাকে প্রচন্ড করে তুলেছে, তার সেই অবরুদ্ধতা আপনাকেই আপনি একদিন বিদীর্ণ করবেই করবে।...
আজ মানুষ মানুষকে পীড়ন করবার জন্য নিজের এই অমোঘ ব্রহ্মাস্ত্রকে ব্যবহার করছে। তাই সেই ব্রহ্মাস্ত্র আজ তারই বুকে বেজেছে।...(প্রতিরোধ প্রতিদিন’, সম্পাদনা: দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, পৃ: ৩২২)

স্পেনে ফ্যাসিবাদী উথান ফ্রাঙ্কোর গণবিরোধী শাসনে তিনি মর্মাহত হয়ছেন। স্পেন প্রজাতন্ত্র রক্ষার সংগ্রামে পপুলার ফ্রন্টের সঙ্গে ফ্যাসিস্ট শক্তির যুদ্ধের পটভূমিতে তিনি লিখেছেন, যুদ্ধ লাগল স্পেনে/চলছে দারুণ ভ্রাতৃহত্যা শতঘ্নীবাণ হেনে।/সংবাদ তার মুখর হল দেশ-মহাদেশজুড়ে,/সংবাদ তার বেড়ায় উড়ে উড়ে/দিকে দিকে যন্ত্র গরুড় রথে/উদয় রবির পথ পেরিয়ে অস্তরবির পথে।/(‘যুদ্ধ’)

১৯১৭ সালে মহামতি লেনিনের নেতৃত্বে সংগঠিত হয়েছিল মহান রুশ বিপ্লব। তা গোটা পৃথিবীর সাধারণ মানুষ বিশেষ করে মেহনতি মানুষকে নতুন প্রেরণায় উজ্জীবিত করেছিলো। পাশাপাশি ইতালিতে স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট মুসোলিনির নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদের উত্থানপর্বও শুরু হয়ে যায়। ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ইতালি পরিভ্রমণ করেন। সেখানে রবীন্দ্রনাথকে রাজকীয় ভোজসভায় আমন্ত্রণ জানান মুসোলিনি। জনকল্যাণের মুখোশধারী মুসোলিনির আতিথেয়তায় মুগ্ধ হন রবীন্দ্রনাথ। সেদিন রবীন্দ্রনাথ সপ্রশংস বক্তব্যও রেখেছিলেন।

 কিন্তু তাঁর এ ভুল ভাঙতে বেশি সময় লাগেনি। রমাঁ রোলাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পরই তিনি ফ্যাসিবাদের অন্দরমহল সম্পর্কে ধারণা পান। তিনি ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে বলেন,ইতালির বর্তমান সমৃদ্ধিকে মানিয়া লইয়াও যদি দেখা যায় উহা অর্জনের জন্য যে-পন্থা ও প্রক্রিয়া অনুসৃত হইয়াছে তা নীতিবিবর্জিত এবং ধরিত্রীর অবশিষ্টাংশের পক্ষে বিপদস্বরূপ, তবে তাহাকে বিচার করিবার অধিকার আমাদের অবশ্যই আছে। গভর্নমেন্টের বাক-স্বাধীনতা অপহরণের কুৎসিত অপরাধ এবং বিশ্বশান্তির পক্ষে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী উচ্চাকাঙ্ক্ষায় আমি উহারই প্রকাশ উপলব্ধি করিয়াছি। (দ্য স্টার’, লন্ডন, ৫ আগস্ট ১৯২৬ এবং ‘প্রতিরোধ প্রতিদিন’, পৃ: ৩২২-৩২৩)

ফ্যাসিবাদের উত্থানে উদ্বিগ্ন হয়ে বন্ধু চার্লস ফ্রীয়ার য়্যান্ড্রুজকে তিনি এক চিঠিতে লিখেছেন-
ফ্যাসিবাদের কর্মপদ্ধতি ও নীতি সমগ্র মানবজাতির উদ্বেগের বিষয়। যে আন্দোলন নিষ্ঠুরভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করে, বিবেকবিরোধী কাজ করতে মানুষকে বাধ্য করে এবং হিংস্র রক্তাক্ত পথে চলে বা গোপনে অপরাধ সংঘটিত করে-সে আন্দোলনকে আমি সমর্থন করতে পারি এমন উদ্ভট চিন্তা আসার কোনো কারণ নেই। আমি বারবারই বলেছি, পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলো সযত্নে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও  সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব লালন করে সারা পৃথিবীর সামনে ভয়াবহ বিপদের সৃষ্টি করেছে। (ম্যাঞ্চেস্টার গার্ডিয়ান’, লন্ডন, ৫ আগস্ট ১৯২৬ এবং প্রতিরোধ প্রতিদিন’, পৃ: ৩২৩)(সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ-বিরোধী রবীন্দ্রনাথ/এম এ আজিজ মিয়া, সাপ্তাহিত একতা/৪ আগস্ট, ২০১৯)

সংস্কৃতির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ আমাদের বড় একটি উত্তরাধিকার তুলে দিয়ে গেছেন, সেটা রুচির। দুর্বলের রবীন্দ্রানুরাগ কখনও কখনওকৃত্রিমতার রূপ নেয় এটা সত্য, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নিজে সব সময়েই সহজ এবং অত্যন্ত স্বাভাবিক। রুচি শিক্ষায় আসে না, যদিও শিক্ষা রুচির জন্য অত্যাবশ্যকীয়। এ কেবল শিল্পকলার চর্চার ভেতর দিয়েও প্রবেশ করবে না। রুচির অভ্যন্তরে রয়েছে, যেমন সব উন্নত রুচিতেই থাকে, একটি নৈতিকবোধ। ন্যায়-অন্যায়ের চেতনা না-থাকলে মানুষ মহৎ হয় না, তা যতই সে বৃহৎ হোক না কেন, কিম্বা উঁচু।

নৈতিকতাকে রবীন্দ্রনাথ রুচিতে পরিণত করেছিলেন। তার অবিরল ও বহুমুখী সৃষ্টিশীলতার ধারার মধ্যে অবিচলিত ছিল ভালো-মন্দের একটি প্রখর জ্ঞান। নৈতিকতার নানাবিধ শিক্ষার আয়োজন সমাজে বিদ্যমান রয়েছে, কিন্তু ব্যক্তিগত নৈতিকতা তখনই নির্ভরযোগ্য ও ধারাবাহিক বিকাশ বজায় রাখতে সক্ষম হয় যখন সে রুচিতে পরিণত হয়। মানবদেহে জিহ্বার যে স্থান, নৈতিকতায় রুচির স্থান যদি সে রকম হয় তাহলে অনেক বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার আশা থাকে। বুদ্ধির তেমন দরকার হবে না, স্বাদই বলে দেবে কোনটা বাসি, কোনটা তাজা, কোনটা গ্রহণযোগ্য, কোনটা বর্জনীয়। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন তার সংস্কৃতিচর্চা এই ব্যাপারে সাহায্য করুক তার দেশবাসীকে। এই উত্তরাধিকারকে আরও দৃঢ় ও প্রসারিত করার জন্যও রবীন্দ্রনাথ আমাদের সহায় বটে।( রবীন্দ্রনাথ কেন জরুরী- সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী,পৃষ্ঠা -১৬৬,রচনাবলী ,৮ম খন্ড)

 


রবীন্দ্রনাথের রাজনীতিক চিন্তার বাইরে যে মানবিক সত্তা তা আমাদের মানসিক অবলম্বনের জায়গা করে দেয়। বিশেষত আমরা যখন
অসহায়ত্বে ভুগি তখন আমাদের আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায় রবীন্দ্রনাথ। আমাদের জীবনে দুঃসময় যতই আসুক শুধু চিন্তায় - কর্মে রবীন্দ্রনাথ থাকলে
তাকে আর পথ খুঁজতে হবে না। রবীন্দ্রনাথের দর্শন হতে পারে আমাদের পাথেয়।