• ঢাকা
  • সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ৫ ফাল্গুন ১৪২৬

জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর ক্ষণগণনা

মুজিববর্ষ
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৯, ২০১৯, ০৫:৫৪ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : ডিসেম্বর ৯, ২০১৯, ০৫:৫৯ পিএম

এ সপ্তাহের গল্প

বংশীবাদক 

লাবণ্য সায়মা রহমান
বংশীবাদক 

আরজু শাহী প্রধানত একজন বংশীবাদক, বাংলাদেশ বেতার সিলেটে কতো কতো বছর ধরে তিনি বংশী এবং দোতারা বাজান। আয় তার অত্যন্ত কম, যা আয় করেন তাতে বাড়ি ভাড়া জোটাতেই হিমশিম খেতে হয়। অন্য কোনো কাজ যে করবেন সে উপায় নেই কারন তিনি আর কিছুই জানেন না। মাঝে মধ্যে কিছু উপরি হয় কালচারাল শোতে ডাক পড়লে সাথে দুই তিনটা টিউশনি জুটিয়ে কোনমতে সংসার চালিয়ে নেন আরজু শাহী।

বংশীবাদন আর দোতারার টান আরজুশাহীর জীবনের সুখের নাম। হতদরিদ্র জীবন সে সুখটুকু কখনোই গ্রাস করতে পারে না। কি গভীর এক মগ্নতায় আচ্ছন্ন থাকেন আরজু শাহী যখন বংশীতে সুর তোলেন কিংবা দোতারার ছন্দ যখন তার রক্তে দোলা লাগায় তখন নেশা নেশা সুখের অনুভূতি তাকে অদ্ভুত একটা সাম্রাজ্যের সম্রাট করে তোলে। সে রাজ্যে অভাব অভিযোগ আর ক্ষুধাও মলিন হয়ে যায় আরজু শাহীর জন্য। বংশীবাদক আরজু শাহী তার টানাপোডেনের জীবন নিয়েও আদ্যোপান্ত সুখী একজন মানুষ। অতি শীর্নকায় শ্যামবর্নের ছোটখাট গড়নের কাঁধ অব্দি ছডানো কোঁকড়া চুলের আরজু শাহীকে কারো নজরেও তেমন পড়ে না তবু নিজেকে নিজের কাছে নায়কের মতোই মনে হয় তার। নিজের সাধনার পথ থেকে কখনো বিচ্যুত হন না তিনি। সেই যে সুনামগঞ্জের অজানা এক গায়ে তার ওস্তাদ হাতে তুলে দিয়েছিলেন সেই সে বংশী আরজু শাহী চিরকাল শিথানের কাছে রাখে।

পর্ব ২

সকাল সাতটার বিচিত্রা অনুষ্ঠানের প্রযোজক আশীষ কুমার সরকারের প্রিয় যন্ত্র বংশী আর বিচিত্রায় প্রতিদিন নতুন নতুন সুরের মূর্ছনায় শ্রোতাদের আনন্দ দেবার জন্য আরজু শাহীকে ওনার পছন্দ। সে জন্য সকাল সাড়ে ছটায় শিফট্ শুরু করে আরজু শাহী প্রতিদিন। সিলেট বেতার ভবন থেকে অনেকটুকু দূরে থাকে বলে কিছুটা হেঁটে বাকীটা রিকশায় আসতে হয় তাকে। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠতে হয় আরজু শাহীকে ঘরে অন্য সবাই তখন ঘুমন্ত। সূর্য যখন উঠি উঠি করে সে সময় যাত্রা শুরু করে আরজু শাহী। ভোরের মিষ্টি বাতাসের স্নিগ্ধতা গায়ে জড়িয়ে চেনা অচেনা কতো না ভোরের পাখিদের কলতানে বিভোর হতে হতে গন্তব্যে পৌঁছে যায় আরজু শাহী। তার বাড়ীর কাছেই একটা বিশাল দীঘি পার হতে হয় এবং সে পথ পেরোতে গেলেই তার শরীরে একটা শিরশিরে অনুভূতি কাজ করে। মনের ভুল ভেবে আরজু শাহী অনুভূতিটাকে পাত্তা না দিয়ে পার হয় পথটা। সিলেট বেতারে পৌঁছে একটা রং চা আর দুটো টোষ্ট বিস্কুট খেয়ে দিন শুরু করে আরজু শাহী। মাঝে মাঝে হোটেলে বসে রুটি আর সব্জি খেতে ইচ্ছে হয় কিন্তু সেটা সামর্থের বাইরে বলে ইচ্ছেটাকে দমন করতে জানে আরজু শাহী। ওই যে বংশীতে সুর তুলতেই সে সব ভুলে যায়, বিচিত্রায় তার দুই মিনিটের পরিবেশনা তাকে ফের মনে করিয়ে দেয় তার ভেতরকার রাজত্বের কথা।

পর্ব ৩

আরজু শাহী বিচিত্রায় তার পরিবেশনার পর প্রস্তুতি নিতে থাকে পরের অনুষ্ঠানগুলোর জন্য তা হতে পারে বাউলগানের, তখন সে দোতারায় ছন্দ তোলে মাটির গন্ধ মাখা সুরে কিংবা আধুনিক গান হলে বংশীতে দোলায় সুরের খেয়া, আহা এই যে বিভোর হয়ে থাকা সুরে সুরে সে তো স্বর্গীয় বিষয়! বোঝে আরজু শাহী বিধাতা এ আনন্দ সবার ভাগ্যে বরাদ্দ করেন না। সকাল দশটায় টি ব্রেক নেয় সকলেই, রেকর্ডিং ষ্টুডিও থেকে বাইরে টি ষ্টলে একত্রিত হতে থাকে দেবু, নুরুল ইসলাম, কুতুব, মধুদা, স্বপন, আরজু শাহী সহ আরো অনেকে। চা কেনার টাকাটাই থাকে কেবল আরজু শাহীর একটু সাহস করে একটা সিংগারা বা সমুচা কিনবে সে কি আর হয়? মধুদা কিংবা নুরুল ইসলাম বা অন্য কেউ না কেউ প্রতিদিন আরজুর হাতে গুঁজে দেয় কোনো না কোনো খাবার। শরম লাগে আরজু শাহীর তবু প্রিয় মানুষদের এ ভালোবাসা উপেক্ষা করবেই বা কি করে? খুব ভোরে শিফট্ শুরু করে বলে দুপুর পেরোতেই বাড়ির পথে রওনা হয় বংশীবাদক আরজু শাহী, দুপুরের খাবারটা নিয়ে তাই কোনো প্রশ্ন থাকেনা সে তো বাড়ি ফিরেই খাবে। নিঝুম দুপুরে ওই দীঘিটা পেরোতে গেলেও এক অলৌকিক বিষয় টের পায় আরজু শাহী তবু বোঝে না কি বিষয়। কখনো কি কেউ গোঙায়? নাকি হাসে ? নাকি বাতাসে ফিস ফিস শব্দ তোলে কোনো অশরীরি আত্মা?

পর্ব ৪

আরজু শাহী নিঃসন্তান, তার স্ত্রী করিমন বাজা নাকি সে বাজা প্রশ্নটা উহ্য থেকে গেছে তাদের গত কুড়ি বছরের বিবাহিত জীবনে। খোদার কাছে দুহাত তুলে আর্জি, তাবিজ কবচ, কবিরাজের কাছ থেকে পাওয়া উপদেশের সকল চেষ্টাই যখন বৃথা হয়েছে তখন এ জীবন তারা মেনে নিয়েছে। আর বড় কোনো ডাক্তারের কাছে যাবে সে সামর্থ্য কি তাদের ছিলো কখনও? ছিলো না তো। আরজু শাহীর পরিবার থেকে চাপ থাকা সত্ত্বেও করিমনকে ছেড়ে থাকার কথা কখনো ভাবতে পারেনি। তার ওস্তাদ নিজ হাতে কণ্যা করিমনকে তুলে দিয়েছিলেন বড় বিশ্বাসে সেটা ভঙ্গ করবেই বা কি করে বংশীবাদক আরজু শাহী? শেষমেষ দুটো বেড়াল পুষতে শুরু করে তারা মিনি আর চুনি তাদের দুই আদরের দুলালী। মিনি, চুনি কদিন পর পর নাতি নাতনী উপহার দেয় আর তাদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে করিমন। একটু বড় হলে অবশ্য বাচ্চাগুলোকে দূরে কোথাও রেখে আসে আরজু শাহী, কি করবে উপায়ও নেই। তাদের ছোট্ট বেড়ার ডেরায় এতোগুলো প্রানের জায়গা কি আর মেলে? মিনি চুনিকে নিয়ে যতই ব্যস্ত থাকুক করিমন দিন শেষে একটা দীর্ঘশ্বাস তার বেরিয়ে আসে, মনের ভেতরে সন্তান পাবার বাসনাটা কখনও ম্লান হয়না ওদের দুজনেরই। তবু বংশীর সুর আর দোতারার ঝংকার এ দুক্ষ ভুলিয়ে রাখে দিনের বেশিটা সময়। দুপুরে বাড়ি ফিরে খেয়ে দেয়ে দুটো যন্ত্রই নিয়ে বসে আরজু শাহী, সুর তোলে বাহারী ঢংয়ে, করিমন তখন হয়ে যায় মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতা। করিমনের বাবা জমির মন্ডলের বিশ্বাস ছিলো অনেক নামজাদা শিল্পী হবে আরজু শাহী কিন্তু বাস্তবতা ওদের শিখিয়ে দিয়েছে লক্ষ্যে পৌছানো কতো কঠিন। তবু একে অন্যকে ভালোবেসে ওরা আঁকড়ে থাকে জীবন।

পর্ব ৫

কতো রকমের কষ্ট মনের গহীনে পুষে জীবন পার করতে হয় মানুষকে, আরজু শাহী তেমনি অপ্রাপ্তির বেদনাটুকু ধারন করেও নিজেকে খুব সুখী মনে করে কারন করিমনের মনের ভেতরে তার জন্য প্রবল ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা আছে যেটা অমূল্য। আজ বেতার ভবন থেকে আর বাড়ি যাওয়া হয় না কারন ভালো একটা বায়না এসেছে ওসমানী মেডিক্যালের নবীনবরণ অনুষ্ঠানের, দুপুরের খাবার ওখানেই খাওয়া হয় রিহার্সেলের জন্য ইশ্ কতোদিন বাদে ভুরভুর গন্ধে ভরা কাচ্চি খেতে পেলো আরজু শাহী।

 

সন্ধ্যা থেকে একে একে সব পরিবেশনায় মন দিয়ে বংশীতে সুর তুললো সে আবার বাউল একটা গানের সঙ্গে দোতারার ঝংকারে মুখরিত করলো অডিটোরিয়াম। আহা এই তো জীবন সুখে ভরা। অনেক রাত হয়ে গেলো অনুষ্ঠান শেষ হতে। আয়োজক যারা ছিলেন তারা হিসেব নিকেষ শেষ করতে সময় নিলেন আরো কিছুক্ষন। যেটুকু সম্মানী সেদিন জুটেছিলো ভাগ্যে খুব আনন্দ হয়েছিলো মনে বংশীবাদক আরজু শাহীর। এমন ডাক কেনো সে নিয়মিত পায়না? পেলেতো তার দারিদ্র কিছুটা ঘোচে। কত অনুষ্ঠানে ডেকে নিয়ে শুধু খাবার খাইয়ে বিদায় দিয়ে দেয়, লজ্জায় টাকা চাইতেও পারে না। বাড়ি ফেরার পথে যখন আরজু শাহী তখন প্রায় মধ্যরাত, করিমন জানে যে ফিরতে দেরি হবে তাই শংকা ছিলোনা মনে তবু কি ঘটে যায় জীবনে অকস্মাৎ বোঝা মুশকিল। সেই যে সে দীঘির পার ধরে হাঁটতে হাঁটতে গা টা আবার ছমছম করে ওঠে। আজ গোঙানী নয় আজ স্পষ্ট কান্নার শব্দ শুনতে পায় আরজু শাহী। একটা মেয়ের কান্না, ডুকরে ডুকরে কেঁদে ওঠে মেয়েটা কিন্তু কোথাওতো দেখা যায় না তাকে? মনে হতে থাকে তার পেছন দিক থেকে ডাকছে বাবা বাবাগো ও বাবা।

 

 পর্ব ৬

আরজু শাহীর ডান কাঁধটা একেবারে ভিজে গেছে মনে হলো তার, বৃষ্টি পড়ছে নাকি এই রাতে? না তো, তবে? বাবা, বাবা ও বাবা ডাকটা আরো কয়েকবার শুনতে পেলো সে, মনের ভুল নয়তো? মিনি কিংবা চুনিতো ডাকবে না তাকে। এক কণ্যা শিশু যেনো তার ডান কাঁধে মাথা রেখে অঝরে কাঁদছে মনে হলো তার। সেও বা কি করে সম্ভব?দৃশ্যমান নয় এমন কিছু কি সত্য হতে পারে? মানুষের জানার শক্তি দিয়ে সবকিছু কি ব্যাখ্যা করা যায়? অনুভবে যা প্রবল সত্য দৃশ্যত হয়তো তার কিছুই সত্য নয় এমনটা হতেই পারে। বাবা আমার মাত হুনবাইনি বাবা বলে কাঁদে খুকুমণিটা। সে কান্না যেনো ভৈরো রাগের করুন সুর তোলে ঠিক যেমন করে আরজু শাহী কোমল রেখাবে গমক তোলে তেমন করে। বলে আমার শরীলটা পচি গেছে বাবা এই দীঘির ফানিত, আট নয় বচ্ছর অইবো, জানোনি কিতা অইছিল? বাবাগো যে মায় আমারে প্যাটে ধরছে হে কেমনে করি আমারে ফানিত ফালায় দিয়া গেলো গি? আমি বুলে জারজ সন্তান, হের লাগি জন্মর লগে লগে আমার মুখো একদলা লবন ঢুকাইয়া মারিয়া ফালানির চেষ্টা খরে। পরে রাইতকুর আন্ধারে অউ দীঘির ফানিত আমারে ফালাইয়া যায় গি। আমার শরীলটা মরছে বাবাগো কিন্তু আমার রুহুডা যে মরছে না। আমি কান্দি আর কান্দি আর কই আমার কিতা দোষ আছিল রে বাবা? ক্যানে আপন মায় আমারে এমনে করি মারি লাইলো? বাবা গো বড় ব্যাদনা লাগে গো, আমার রুহু জানডা যেমনে শরীর থাকি বাইর অয়, হি সময় আমার যে কষ্ট লাগে বাবা, তুমি জানো না তো বাবা। মানুষ অতো নিষ্ঠুর কিতার লাগি বাবা?

 

পর্ব ৭

কঠিন সত্য কথাগুলো শুনতে শুনতে বংশীবাদক আরজু শাহীর মাথা ভার হয়ে আসছিলো, পা কাঁপছিলো, মনে হচ্ছিলো তার শরীরটা বরফের মতো ঠান্ডা। কোনো রকমে সামলে নেয় নিজেকে আর একটু গেলেই ওই তো তার ছোট্ট ঘর সেখানে করিমন বসে আছে তার পথ চেয়ে। কিন্তু এই কণ্যাটির জন্য তার হৃদপিন্ড খান খান হয়ে যেতে থাকে, সব সীমাবদ্ধতা নিয়েও যে সুখের একটা রাজ্য তার অন্তরে ছিলো তা যেনো ভস্মীভূত হয়ে গেলো এক লহমায়। টেনে হিঁচড়ে কোনোরকমে দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছে করি...ম...ন বলে ডাক দিয়েই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আরজু শাহী। তার মাথার ওপর দিয়ে বংশীর সুরের লহরী উড়ে উড়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে থাকে। দোতারার তারগুলো বিকট স্বরে ট্যাং ট্যা রেং রেং ট্যাং ট্যা রে রেং রেং করে বেজে ওঠে কোন এক অকৃত্রিম উপহাসে। হায় জীবন আহা জীবন একটা সন্তানের জন্য বংশীবাদক আরজু শাহীর মনে ছিলো শ্বাশত বেদনা আর অন্যদিকে একটা শিশুকে কি অনায়েসে খুন হয়ে যেতে হলো সমাজিক নিয়মের বাইরে তার আগমন ঘটেছিলো বলে। করিমন পড়ি মরি করে দৌড়ে এসে দ্যাখে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে তার স্বামী, কোনোরকমে তাকে বিছানায় তুলে মুখে জল ছিটালে কথা বলে ওঠে আরজু শাহী। বউ ও বউ বলতে বলতে আবার জ্ঞান হারায়, ভোরের দিকে প্রচন্ড গা কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে আরজু শাহীর, দিশেহারা করিমন শেষে প্রতিবেশিদের সহায়তায় হাসপাতালের দিকে ছোটে, আরজু শাহী জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকতে থাকে মা রে ও মা আমারে ক্ষমা করিস আমি অধমরে মা।

সমাপ্ত