• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৪, ২০২০, ১০:৪০ এএম
সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২১, ০২:২৪ পিএম

সাম্রাজ্যবাদ কি জিনিশ? 

সাম্রাজ্যবাদ কি জিনিশ? 

‘সাম্রাজ্যবাদ’ শব্দটি বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাহিত্য হইতে এক প্রকার বিদায় লইয়াছে। দুই চারিজন বামপন্থী বুদ্ধিজীবীর কথা ছাড়িয়া দিলে দেখা যাইবে আমাদের রাজনৈতিক রচনাবলীতেও শব্দটি বিলুপ্ত হইতে চলিয়াছে। ইহার অর্থ কি এই যে সাম্রাজ্যবাদ জিনিশটিই এই পৃথিবী হইতে বিলুপ্ত হইয়াছে? যদি তাহাই হইত তো ইহার চেয়ে ভালো খবর আর কিছুই থাকিত না।

আসলে যাহা ঘটিয়াছে তাহা শুদ্ধ নামাবলী পরিবর্তন। ইহাতে সাম্রাজ্যবাদেরই জয় ঘোষিত হইয়াছে ধরিয়া লইতে হইবে। বর্তমানে জনপ্রিয় একজোড়া শব্দ—‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’ আর ‘বিশ্বায়ন’—প্রকৃত প্রস্তাবে একশ বছর আগে যে পদার্থকে সাম্রাজ্যবাদ বলা হইত তাহারই একদফা নতুন মুদ্রণ—সম্পূর্ণ নতুন সংস্করণ নয়। একদা—ধরুন ইংরেজি উনিশ শতকের শেষ কদমে কি বিশ শতকের প্রথম পাদে—‘ সাম্রাজ্যবাদ’ বলিতে যে পরিস্থিতি বোঝান হইত এখনও সেই পরিস্থিতি বহাল আছে—তাহার স্বভাবের বা চরিত্রের কোন পরিবর্তন হয় নাই। পরিবর্তনের মধ্যে আছে পাত্রপাত্রীর পরিচয় আর প্রযুক্তির প্রগতি। এক্ষণে বলা হইতেছে, সাম্রাজ্যবাদ সারা দুনিয়ায় ধনতন্ত্রের পাইওনিয়র বা অভিযাত্রী।

১৮৯৮ সালে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার কয়েকটি উপনিবেশ লইয়া পুরানা ঔপনিবেশিক স্পেনের সহিত নব্য সাম্রাজ্যাভিলাষী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বাধে। আর ১৮৯৯ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকায় ইংরেজ সরকারের সহিত ওলন্দাজ বংশোদ্ভূত বুয়র বা কৃষকদের যুদ্ধ চলে। সেই যুদ্ধ চলে ১৯০২ সাল পর্যন্ত। সেই সময় হইতে এয়ুরোপ-আমেরিকার সংবাদপত্রে ও সাহিত্যে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ কথাটি বড়ই জনপ্রিয় হইয়াছিল।

১৯০২ সালে ইংরেজ অর্থশাস্ত্র-ব্যবসায়ী জন অ্যাটকিনসন হবসন (১৮৫৮-১৯৪০) ‘সাম্রাজ্যবাদ পর্যালোচনা’ নামে একটি—আর ১৯১০ সালে অস্ট্রিয়ার রাজনীতি-ব্যবসায়ী পণ্ডিত রুডলফ হিলফারডিঙ্গ (১৮৭৭-১৯৪১) ‘লগ্নিপুঁজি: ধনতন্ত্রের সর্বশেষ পর্যায়’ নামে আরেকটি—গ্রন্থ প্রকাশ করেন। প্রধানত এই দুই গ্রন্থের তথ্যপ্রমাণ অবলম্বন করিয়াই রুশ বিপ্লবের মহান নেতা ভ্লাদিমির লেনিন (১৮৭০-১৯২৪) ১৯১৭ সালের মধ্যভাগে ‘সাম্রাজ্যবাদ: ধনতন্ত্রের সর্বোচ্চ পর্যায়’ নামে বিখ্যাত ইশতেহারখানি প্রকাশ করেন। ইশতেহারটি তিনি লিখিয়াছিলেন আগের বছর বসন্তকালে—তখন তিনি সুইৎসারদেশের জুরিখ শহরে নির্বাসিত ছিলেন।

এই ইশতেহারে আইনসঙ্গত প্রকাশনার আড়ালে যতটুকু বলা যায় তাহার ভিতর দিয়া লেনিন প্রমাণ করিতে চাহিয়াছিলেন যে ১৯১৪-১৯১৮ সালের যুদ্ধ—যাহার একপক্ষের নেতৃত্বে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য (রুশ সাম্রাজ্যও ছিল এই পক্ষেই) আর দ্বিতীয় পক্ষে জার্মান সাম্রাজ্য—প্রকৃত প্রস্তাবে ছিল ‘সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ’ অর্থাৎ পরদেশ লুণ্ঠনের, পরদেশ দখল করিয়া শাসন করিবার যুদ্ধ। লেনিনের কথানুসারে, ‘এই যুদ্ধটা ছিল দুই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিজোটের মধ্যে পৃথিবীটা ভাগ-বাঁটোয়ারা করিয়া লওয়ার যুদ্ধ’ কিংবা আরো সহজ কথায়, এক সাম্রাজ্যের অধীনস্ত উপনিবেশ (বা দখলিস্বত্ত্ব) আর  প্রভাববলয় (বা মক্কেল রাষ্ট্র) অন্য সাম্রাজ্য কর্তৃক কাড়িয়া লইবার সংগ্রাম।

লেনিনের বিবেচনা বা বিচার যে কতখানি সত্য ছিল তাহার প্রমাণ নতুন করিয়া পাওয়া গেল রুশদেশে রাজতন্ত্রের পরাজয় আর রুশ বিপ্লবের বিজয় অর্জনের পর। অক্টোবর বিপ্লবের পাঁচ মাসের মাথায়—১৯১৮ সালের মার্চ মাসে—জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি জোট বিপ্লবী রাশিয়াকে বাধ্য করে পোলান্ড, বাল্টিক প্রদেশ ও বেলারুশের অংশবিশেষ উহাদের হাতে তুলিয়া দিতে। ইয়ুক্রেনও প্রকারান্তরে জার্মানির প্রভাববলয় ভুক্ত হয়। জার্মানির পরাজয়ের পর রুশদেশ—১৯১৮ সালের ১৮ নবেম্বর নাগাদ—এই চুক্তি নাকচ করে। যে শহরে চুক্তি লিখিত হয় তাহার নামে ইহার নাম দাঁড়াইয়াছিল ‘ব্রেস্ত-লিতোবস্ক শান্তিচুক্তি’।

দ্বিতীয় প্রমাণ মিলিল ১৯১৯ সালের জুন মাস নাগাদ সম্পাদিত ভার্সাই শান্তিচুক্তিতে। এই চুক্তিটি সম্পাদিত হয় বিজয়ী শক্তি ইংরেজ, ফরাশি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, জাপান ও তাহাদের অন্যান্য মিত্রের সহিত পরিশেষে বিজিত জার্মান পক্ষের মধ্যে। এই যুদ্ধ—যাহাকে এখন আমরা ‘প্রথম মহাযুদ্ধ’ বা ‘বিশ্বযুদ্ধ’ নামে জানি—ছিল সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বা পৃথিবীর সমস্ত উপনিবেশ ও প্রভাববলয় দুই সাম্রাজ্যবাদী জোটের মধ্যে ভাগাভাগি—বা নতুন করিয়া ভাগাভাগি—করিয়া লইবার যুদ্ধ। এই চুক্তির মধ্যস্থতায় ‘গণতান্ত্রিক’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ফরাশি মুলুক আর ‘স্বাধীনতা ব্যবসায়ী’ মহাব্রিটেন পৃথিবীর সকল উপনিবেশ আর প্রভাববলয় (বা আধা-উপনিবেশ) নিজ নিজ করতলে লইয়া লইল।

লেনিন দাবি করিয়াছিলেন সাম্রাজ্যবাদ কি জিনিশ তাহা চেনা যাইবে কমপক্ষে চারিটি উপসর্গ বা লক্ষণের আক্রমণ দেখিয়া। প্রথম লক্ষণটি বিশেষ বিশেষ পুঁজির একত্র অবস্থান ও একটি মাত্র কেন্দ্র হইতে পুঁজি বিনিয়োগের প্রবণতার মধ্যে দেখা যাইবে। প্রচলিত ভাষায় এই শক্তির নাম ‘একচেটিয়া পুঁজি’। বিশেষ দেশে নথিবদ্ধ হইলেও ইহার প্রসার দুনিয়াব্যাপী। এই পুঁজির বিনিয়োগ সারা দুনিয়ায় কিন্তু তাহার চাবি বিশেষ বিশেষ জোটের হাতেই থাকিয়া যায়। সেই যুগে বাগদাদ রেলপথ প্রভৃতি এয়ুরোপ-এশিয়া আন্তমহাদেশীয় রেলপথ বসান হইতেছিল এই ধরনের লগ্নিপুঁজির মধ্যস্থতায়।

একচেটিয়া পুঁজির দ্বিতীয় লক্ষণের মধ্যে আছে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের উৎস নিজ নিজ দখলে বা তাঁবে ধরিয়া রাখার মতলব। উনিশ শতকের শেষভাগে—যে সকল তথ্যপ্রমাণ ভর করিয়া ভ্লাদিমির লেনিন লিখিতেছিলেন তাহার জোরে বলা যায়—লোহার আর কয়লার খনি ছিল সে দিনের শিল্পকারখানার প্রধান কাঁচামাল।

লেনিন যে তৃতীয় লক্ষণের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিলেন তাহার নাম লগ্নিপুঁজি—এককথায় বড় বড় ব্যাংকের মধ্যস্থতায় পরিচালিত শিল্প-পুঁজি। এই লক্ষণকে একচেটিয়া পুঁজির প্রধান বাহক বলা যাইতে পারে। হিলফারডিঙ্গের লেখায়ও এই লক্ষণটি বিশদ বর্ণিত হইয়াছিল। অল্প কয়েকটি ব্যাংক—যাহাদের মালিকানা আবার একই শিল্প-মালিকদের হাতেই—সারা পৃথিবীর অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করিতে তৎপর হইয়াছিল।

চতুর্থ এবং শেষ লক্ষণটি দাঁড়াইল—এই লক্ষণটি উপরের তিন লক্ষণেরই সম্মিলিত প্রকাশ—নতুন নতুন উপনিবেশ দখল বা পুরানা উপনিবেশ পুনর্দখলের লড়াই। একটু আগে যে দুইটি যুদ্ধের কথা ভাঙ্গাইয়াছিলাম—স্পেন-মার্কিন যুদ্ধ বা ইঙ্গ-বুয়র যুদ্ধ—তাহা ছিল এই ঘটনারই সীমাবদ্ধ প্রকাশ।

১৯১৪-১৯১৮ সালের মহাযুদ্ধটি বাধিয়াছিল প্রধানত এই চারি লক্ষণের সম্মিলিত বিশ্বজনীন বহিঃপ্রকাশ হিশাবে। এই যুদ্ধে রাষ্ট্র যে ভূমিকা পালন করিয়াছিল তাহা মাত্র কোটি কোটি মানুষকে প্রাণ দিতে উদ্বেল করার মধ্যে সীমিত ছিল না।

সেই সময় কোন কোন মহলে একটা তর্ক বাধিয়াছিল। ইহার প্রতিপাদ্যের মধ্যে এই প্রশ্নটিও ছিল: সাম্রাজ্যবাদ জিনিশটি কি ‘শান্তিপূর্ণ’ পথে বিজয়ী হইতে পারে না? অর্থাৎ যাহারা সাম্রাজ্যের সুফল ভোগ করিতে চাহেন তাহারা কি বিনাযুদ্ধে অল্পস্বল্প মেদিনী একে অপরকে ছাড়িয়া দিতে পারেন না? যাহারা বলিতেছিলেন ‘পারেন’ একসময় তাহাদেরই জয় হইল। তখন চীনদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম—যাহা এখন মশহুর ‘মুষ্টিযোদ্ধার যুদ্ধ’ বা বক্সার যুদ্ধ নামে—পরাজিত হইল। ১৮৯৯ সাল হইতে ১৯০১ পর্যন্ত এই যুদ্ধটি চলিয়াছিল। চীনের পরাভব স্বীকারের পর ১৯০১ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ সম্পাদিত এক চুক্তির অনুবলে ব্রিটেন, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, জার্মানি, ফরাশি দেশ, বেলজিয়াম, ইতালি, জাপান, রাশিয়া, ওলন্দাজ দেশ, স্পেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একজোট হইয়া চীনদেশকে আনুষ্ঠানিক কায়দায় আধা-উপনিবেশে পরিণত করে। কূটনীতি সাহিত্যে ইহার নাম দাঁড়াইয়াছে ‘শেষ শৃঙ্খলা’ বা ফাইনাল প্রটোকল।

সাম্রাজ্যবাদী শক্তিপুঞ্জের মধ্যে চীনা সাম্রাজ্য তথা চীনদেশকে ভাগাভাগি করিয়া লইবার দৃষ্টান্তটি পুঁজি করিয়া অনেকে আশা প্রকাশ করিলেন সাম্রাজ্যবাদ জিনিশটা শান্তিপূর্ণ বা ‘গণতান্ত্রিক’ পথেও বৃদ্ধি পাইতে পারে। জার্মান রাজনীতি-ব্যবসায়ী—একদা মার্কসের অনুসারী বলিয়া খ্যাতিমান—পণ্ডিত কার্ল কাউটস্কি এই ঘটনার নাম রাখিয়াছিলেন ‘সুপার- বা আলট্রা-ইম্পিরিয়ালিজম’ অর্থাৎ ‘পরম কিংবা চরম সাম্রাজ্যবাদ’। তাঁহার আগে অবশ্য ইংরেজ অর্থশাস্ত্র-ব্যবসায়ী জন হবসন ইহার আখ্যাস্বরূপ ‘ইন্টার-ইম্পিরিয়ালিজম’ বা ‘আন্ত-সাম্রাজ্যবাদ’ কথাটি এস্তেমাল করিয়াছিলেন।

এই কল্পনাশক্তির অন্তঃসারশূন্যতা ধরা পড়িল ১৯১৪ সালের মধ্যভাগে পৌঁছিয়া। এই যুদ্ধ এড়াইবার পথ পাওয়া গেল না কোন কারণে? এক দেশ কর্তৃক আরেক দেশ দখলের ইতিহাস পৃথিবীর ইতিহাসের সমান দীর্ঘ। প্রাচীন রোমক সাম্রাজ্য টিকিয়া ছিল প্রধানত দাস-ব্যবসায় ও উপনিবেশ-ব্যবসায় অবলম্বন করিয়া। রোমক সাম্রাজ্যে দাস-বিদ্রোহ সাক্ষাৎ সফলতা অর্জন করিতে পারে নাই তবে উপনিবেশের বিদ্রোহ—যেমন জার্মানির ও ব্রিটেনের স্বাধীনতা—শেষ পর্যন্ত সফল হয় এই দাস-বিদ্রোহের উপজাত ভোগ করিয়া। হাজার বছরের রোমক সাম্রাজ্য ভাঙ্গিয়া পড়ে তথাকথিত ‘বর্বর’ জাতিপুঞ্জের আক্রমণে। মনে রাখিতে হইবে এই বর্বরেরাও একদা রোম সাম্রাজ্যের উপনিবেশে পর্যবসিত হইয়া বসিয়াছিল। এই উপনিবেশগুলির জয়যাত্রাকে এয়ুরোপ মহাদেশে ‘সামন্ততন্ত্রের বিপ্লব’ বলা যাইতে পারে। সমির আমিন একদা দুঃখ করিয়াছিলেন, লোকে বলে ‘বুর্জোয়া বিপ্লব’—কিন্তু কেহ ‘সামন্ত বিপ্লব’ কথাটি ব্যবহারই করেন না।

সেকালের ঔপনিবেশিক নীতির সহিত আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ যে ঔপনিবেশিক নীতির অনুসারী তাহার কিছু গুণগত পার্থক্যও আছে। এক্ষণে নতুন ঔপনিবেশিক নীতির হৃদপিণ্ডটা কাঁচামালের উৎস দখলে রাখার সংগ্রামেই পাওয়া যাইবে। তাহার সহিত নবোদ্যমে যুক্ত হইয়াছে নতুন নতুন পুঁজিপাট্টা বিনিয়োগের ক্ষেত্র, প্রভাববলয় রক্ষা প্রভৃতি হরেক রকম উপসর্গ। সোজাকথায় আধা-উপনিবেশের সৃষ্টিই এখনকার সাম্রাজ্যবাদের নতুন লক্ষ্য।

উপনিবেশ প্রথার গোড়ার কথা ছিল অতি স্বল্প মজুরি আর অধিক মুনাফার নিশ্চয়তা বিধান। সেই বিচারে নগদ সম্পত্তি আকারে উপনিবেশাদি বজায় রাখার তুলনায় আধা-উপনিবেশে পুঁজি বিনিয়োগ করাটাই বেশি লাভজনক, মোটেও কম লাভজনক নয়। সারা পৃথিবীতে একই পরিমাণ উৎপাদন ক্ষমতার অধিকারী সকল শ্রমিকেরই মজুরি যদি হারাহারি সমান হইত—যদি ধনী দেশের লোকজন অঙ্গুলিহেলনে চন্দ্র দ্বিখণ্ড করিতে না পারিতেন, তো সাম্রাজ্যবাদের তাগিদ অনেক কমিয়া যাইত। এখনও পৃথিবীতে দ্রব্যমূল্য যত দ্রুত একই স্তরের দিকে যাইতে থাকে—শ্রমশক্তির উৎপাদন ক্ষমতা যত দ্রুত একই স্তরের দিকে যাইতে থাকে—দেশে দেশে শ্রমশক্তির মূল্য তত সমান হয় না। একই পোশাক শিল্পে বাংলাদেশের শ্রমিক দৈনিক গড়ে যাহা পায় মার্কিন দেশে সামাজিক সুবিধাসহ তাহার ৫০ গুণ বেশি পায়।

উনিশ শতকের শেষ বিশ-পঁচিশ বছরে এই প্রতিযোগিতায় এয়ুরোপিয়া মহাশক্তিগুলির সহিত একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যদিকে জাপান যোগ দিয়াছিল। লেনিন দেখাইয়াছিলেন, ইংরেজি ১৮৭৬ সাল নাগাদ এয়ুরোপ মহাদেশের পরাশক্তিগুলি আফ্রিকা মহাদেশের ভূপৃষ্ঠে মোট ভূমির শতকরা ১০ ভাগ দখল করিয়া ফেলিয়াছিল। আর ১৯০০ সন নাগাদ তাহারা সেই মহাদেশের ভূমির শতকরা ৯০ ভাগই সরাসরি দখলে লইয়া আসে। এই দ্রুতগতির ঘটনাকেই সে যুগে বলা হইয়াছিল ‘স্ক্র্যাম্বল ফর আফ্রিকা’ বা ‘আফ্রিকা লইয়া কাড়াকাড়ি’। ইহাই ছিল ১৮৮৫ সালের বার্লিন সম্মেলনের মূল আলোচ্য।

শুদ্ধ আফ্রিকা কেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও একই কাড়াকাড়ি চলে। এই অঞ্চলে—যাহাকে ‘পলিনেশিয়া’ বলা হয় তাহাতে—১৮৭৬ নাগাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ এয়ুরোপিয়া শক্তিপুঞ্জ শতকরা প্রায় ৫৭ ভাগ জায়গাই দখল করিয়াছিল আর ১৯০০ সন নাগাদ তাহার পরিমাণ শতকরা প্রায় ৯৯ ভাগে পৌঁছে। এশিয়া মহাদেশে উপনিবেশভুক্ত ভূমির পরিমাণ ১৮৭৬ সালে ছিল শতকরা প্রায় ৫২ ভাগ, ১৯০০ নাগাদ তাহা শতকরা ৫৭ ভাগের কাছাকাছি পৌঁছায়।

একটা মজার জিনিশ চোখে না পড়িয়া যাইবে না। এই কাড়াকাড়ি যাহারা করিয়াছিলেন তাহাদের মধ্যে রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় অনেকানেক পার্থক্য বিরাজমান ছিল। লেনিন দেখাইয়াছেন জাপান বা জার্মানি তখন ছিল রাজতন্ত্রের শাসনাধীন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা ছিল ‘প্রজাতান্ত্রিক’। মার্কিন দেশে মাত্র কয়েক বছর আগে যে মহা গৃহযুদ্ধ বাধিয়াছিল তাহাতে দাসতন্ত্রের অবশেষ পরাস্ত করিয়া প্রজাতন্ত্র-পন্থার বিজয় অর্জিত হইয়াছে কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক নীতির পরিবর্তন ঘটাইবার ক্ষেত্রে মার্কিন দেশের জাতীয় সমাজে বা রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই প্রভেদ কোন কাজে আসে নাই। ১৮৯০ নাগাদ মার্কিন শাসকশ্রেণী প্রশান্ত উপকুলে পৌঁছিয়া উত্তর আমেরিকা জয় সম্পূর্ণ করিয়াছিল। তাই ১৯০০ সন নাগাদ তাহাদের অভিযান চলে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত। মার্কিন দেশ তখনই হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ দখল করে। লেনিন পরিষ্কার করিয়া বলিয়াছিলেন, ইহার মানে এই নয় যে রাজতন্ত্রে আর প্রজাতন্ত্রে কোন প্রভেদ নাই—আসল কারণ উভয় ক্ষেত্রেই যাহারা দেশচালনা করেন তাহারা নিশ্চিত মুনাফা বা বাড়তি মুনাফার সন্ধানে আছেন।

ঔপনিবেশিক নীতির সারকথা ছিল শিল্পকারখানার জন্য অতি প্রয়োজনীয়—অপরিহার্য—জ্বালানির খনিগুলি দখলে রাখা বা তাহার সরবরাহ নিশ্চিত করা। দ্বিতীয় কথা ছিল এই সম্পদ সংগ্রহ করার খরচ যথাসম্ভব কম রাখার ব্যবস্থা। কয়লা কিংবা লোহা তো ইচ্ছা করিলেই বোতাম টিপিয়া আকাশ হইতে নামান যায় না। প্রয়োজন হইলে যুদ্ধ করিতে হয়। প্রথম মহাযুদ্ধের পরে এই সংগ্রামের ক্ষেত্রে অপরিশোধিত তেলের খনি প্রভৃতিও যুক্ত হয়। এখনও পশ্চিম এশিয়ায় ইঙ্গ-মার্কিন ঘাঁটি এই সত্যেরই অবশেষ মাত্র।

১৯১৪-১৯১৮ সালের যুদ্ধে জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া ও তুরস্কের পরাজয় ঘটিয়াছিল। তাহাদের উপনিবেশগুলি ব্রিটেন, ফরাশি দেশ ও উত্তর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের দখলভুক্ত কিংবা তাহাদের তাঁবেদার রাজ্য হইয়া পড়ে। এই যুদ্ধে রুশদেশ জার্মানির কাছে প্রথম পরাজিত হইলেও শেষ পর্যন্ত নিজের পায়ে উঠিয়া দাঁড়ায়। তখন এয়ুরোপ-আমেরিকা নতুন রাশিয়ার উত্থান সহ্য করিতে না পারিয়া পরাজিত জার্মানির শক্তিবৃদ্ধি ঘটাইতে ইন্ধন যোগায়। সত্য বটে, জার্মানিতে নাৎসি শক্তির বিজয় অর্জন এই পথেই সম্ভব হইয়াছিল। ১৯৩১ সাল হইতে জাপান এশিয়া মহাদেশে আর ১৯৩৯ হইতে জার্মানি এয়ুরোপ খণ্ডে যুদ্ধ বাঁধাইলে শক্তির ভারসাম্য খানিক বদলাইয়া যায়। জাপান আর  ইতালি—যাহারা প্রথম যুদ্ধে ইংরেজ ও মার্কিন পক্ষে ছিল তাহারা—দ্বিতীয় যুদ্ধে জার্মান পক্ষে চলিয়া যায়। তুরস্ক জার্মান পক্ষ ত্যাগ করিয়া নিরপেক্ষ থাকে। ১৯৪৫ নাগাদ জার্মানি ও জাপানের পরাভব ঘটে আর সোভিয়েত রুশদেশ কোনরকমে টিকিয়া যায়।

ইহার দশ ফলের একটি হইল এশিয়া আর আফ্রিকা মহাদেশে উপনিবেশের সারি হইতে নতুন নতুন স্বাধীন দেশের জন্ম। দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশ উনিশ শতকেই ‘স্বাধীন’ হইয়াছিল। কিন্তু ‘আর্জেন্টিনা’ প্রভৃতি দেশের প্রকৃত মর্যাদা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ‘আধা-উপনিবেশ’ বা তাহারও অধম হইয়া দাঁড়ায়। ১৯৪৫ সালে পর একই ঘটনার হুবহু পুনরাবৃত্তি সম্ভব ছিল না। তবু বহু সদ্য স্বাধীন দেশ দেখা যায় স্বেচ্ছায় স্ব স্ব পুরানা সাম্রাজ্যের অংশীদার পরিচয়ে আনন্দিত হইতেছে। পাকিস্তান, ভারত—এমনকি আজিকার বাংলাদেশ পর্যন্ত—এখনও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধিভুক্ত মিত্র পরিচয়ে বিরাজ করিতেছে। পার্থক্যের মধ্যে—আমেরিকান এম্পায়ার বা মার্কিন সাম্রাজ্য আড়াল করিতেই যেন দক্ষিণ এশিয়ার ছাতাটিকে এখনও ‘ব্রিটিশ কমনওয়েলথ’ বা ব্রিটেনের সাধারণ সাম্রাজ্য বলা হইতেছে।

ইহা সম্ভব হইল যে সকল কারণে তাহার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বৃদ্ধি সর্বাগ্রে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭১ সালের যুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন প্রতিহত করিতে চাহিয়াছিল। তাই বলিয়া এখনকার বাংলাদেশ কি এখন পাকিস্তানের তুলনায় আমেরিকার ক্রোড়ে কম উঠিতে চাহিতেছে? ইহার মানে কি এই যে পাকিস্তানের সহিত ভাবাদর্শে বাংলাদেশের কোনই পার্থক্য নাই? ইহার মানে দুই দেশেই যাহারা দেশচালনা করিতেছেন তাহারা নিজেদের দেশকে আধা-উপনিবেশ রাখিতেই ঢের তৎপর। স্বাধীনতা বলিতে তাহারা মাত্র নিজ নিজ শ্রেণীস্বার্থসাধনই বুঝিয়া থাকেন।

‘বঙ্গোপসাগরে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন’ নামক এই এলোমেলো সংকলনের লেখকগণ যে নতুন ঘটনার প্রতিবাদে মুখর হইতেছেন তাহাই প্রমাণ করিতেছে দেশের জনগণ এই আগ্রাসন মানিয়া লইতেছেন না। গত একশ বছরে—ভ্লাদিমির লেনিনের ‘সাম্রাজ্যবাদ’ নামক বইটি প্রকাশের পরে এই পৃথিবীতে অনেক পরিবর্তনই ঘটিয়াছে। পুরনো ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছে—প্রযুক্তিতে যুগান্তকারী অনেক বিপ্লব ঘটিয়াছে—লোকে এখন চতুর্থ এমন কি পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের গল্পও করিতেছে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের স্বভাবে কোন পরিবর্তন ঘটিয়াছে কি? তাহার কাঁচামালের চাহিদাই কোন দিন মিটিবার নয়।

বাংলাদেশে এখন উন্নয়নের জোয়ার উঠিয়াছে। জোয়ারের কথা যদি বলেন তাহা হইলে ভাটার কথাটাও মনে রাখিতে হইবে। তেজকটালের দিনে লোকে মরাকটালের কথা ভুলিয়া যায়। গোটা দুনিয়া জুড়িয়া একদা ‘তৃতীয় বিশ্ব’ বলিয়া একটা কথা চালু হইয়াছিল। জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলন বলিয়া একটা উপকথাও শোনা গিয়াছিল। ১৯৭৫-৭৬ সালে ‘নয়া আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’ নামে একটি অতি বাস্তব, অতি যুক্তিসঙ্গত দাবি উঠিয়াছিল। সেই দাবিটি নস্যাৎ করিতে ধনী—অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদী—দেশগুলিকে খুব বেশি বেগ পাইতে হয় নাই। তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিকে দুই ভাগে ভাগ করিয়া শাসন করিবার নীতি তাহারা অঙ্গুলি হেলনেই সফল করিয়াছিলেন। একদা সাম্রাজ্যবাদের সংকট বলিয়া যাহা কথিত হইয়াছিল—১৯৭৩ সালে তেলের খনির মালিক কয়েকটি দেশ যখন তেলের দাম বাড়াইয়া দিল—তাহাও কি সুন্দর কায়দায় সমাধান করা হইল! পেট্রোলের টাকা দুই পা ঘুরিয়া ডলারে পরিণত হইল।

ইহার পর হইতে ‘বিশ্বায়ন’ কথাটি শোনা যাইতে লাগিল। সাম্রাজ্যবাদের জয় এই পথেই ঘটিল। এখন মনে হয় ‘সাম্রাজ্যবাদ’ নামক পদ অর্থাৎ অতিকায় ধারণাটি লুপ্ত হইয়াছে কিন্তু ‘সাম্রাজ্যবাদ’ নামক পদার্থ অর্থাৎ ক্ষুদে তেলাপোকা টিকিয়া আছে। শুদ্ধ টিকিয়াই নাই—ঝাড়েবংশে বৃদ্ধিও পাইতেছে সে। এখানে সে কথা লিখিবার আর জায়গা নাই।

বাংলাদেশ আয়তনে ক্ষুদ্র দেশ হইলেও জনসংখ্যায় ইহাকে বড় দেশই বলা চলিবে। কিন্তু যে জনসংখ্যা একটি সংখ্যা মাত্র—যাহা এখনও জনগণ হইয়া উঠিতে পারে নাই—তাহার পক্ষে স্বাধীন হওয়া বা স্বাধীনতার অধিকারী জাতির মত ব্যবহার করা কদাচ সম্ভব হয় না। ভুলিয়া গেলে স্মরণ করিবেন, ১৯৪৯ সালের আগে চীনদেশের জনসংখ্যা বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যার কত গুণ বাড়া ছিল। তারপরও আধা-উপনিবেশ জীবন তাহাকে যাপন করিতে হইয়াছিল অনেকদিন পর্যন্ত। এখন চীনের বাড়া এতটাই খাড়া হইয়াছে যে আরেকটি মহাযুদ্ধ বাধিবে কখন দুনিয়াকে সেই প্রহরই গুণিতে হইতেছে আজ ।

বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ, অর্থনীতি-ব্যবসায়ী আর রাজনীতি-ব্যবসায়ীরা, এখন সাম্রাজ্যবাদ শব্দটি উচ্চারণও করেন না। ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি’ নামে যে প্রতিষ্ঠানটি আছে তাহার বার্ষিক প্রতিবেদনগুলি পড়িয়া দেখুন—যদি সেখানে পড়িবার মত কোন বস্তু থাকে—দেখিবেন সাম্রাজ্যবাদ কোথাও নাই। এই দেশের তিরিশজন কবি বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙ্গার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাইতে বিলম্ব করেন না। না করিয়া ভালই করেন। কিন্তু যদি সাম্রাজ্যবাদ কি জিনিশ জিজ্ঞাসা করেন—তাঁহাদের অনেকেই বাংলা একাডেমির ইংরেজি-বাংলা অভিধান খুলিয়া বসিবেন বলিয়াই মনে হয়। মনে রাখিবেন, বঙ্গোপসাগর শুদ্ধ ভাসিবার জায়গা নয়, ডুবিয়াও মরিতে পারেন।

 

ঢাকা

১৩ ডিসেম্বর ২০২০

 

 

দোহাই

১. V. I. Lenin, ‘Imperialism, the Highest Stage of Capitalism (A Popular Outline),’ in Selected Works (Moscow: Progress Publishers, 1971), pp. 169-263.

২.  Samir Amin, Class and Nation, Historically and in the Current Crisis, trans., Susan Kaplow (New York and London: Monthly Review Press, 1980).

 

(লেখাটি ‘বঙ্গোপসাগরে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন’ নামের একটি সংকলনের জন্য রচিত। এখানে লেখকের বানানরীতি অপরিবর্তিত রাখা হলো।)