• ঢাকা
  • সোমবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২১, ৫ মাঘ ১৪২৭
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২, ২০২১, ০৬:১৫ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জানুয়ারি ২, ২০২১, ০৬:৪২ পিএম

দাফন

মোহিত কামাল
দাফন

কথাসাহিত্যিক মোহিত কামালের জন্ম ২ জানুয়ারি ১৯৬০ সালে। জন্মদিনে লেখকের অপ্রকাশিত ছোটগল্পটি প্রকাশের মধ্য দিয়ে শুভেচ্ছা জানায় জাগরণ অনলাইন


বাঁ হাত প্যারালাইজড, বাঁ পা-টাও অচল। 
অচল হাত-পা নিয়ে হুইলচেয়ারে বসে আছেন একাত্তরের সাহসী মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শমসের আলি। 
হেমন্তের শুরু হয়েছে মাত্র। এখনই ঘন কুয়াশা থাকার কথা না। অথচ ভোরের আলো মনে হচ্ছে আটকা পড়ে আছে কুয়াশার চাদরে। 
কুয়াশা এত ঘন কেন? মনে প্রশ্ন এলো। প্রশ্ন ভরা মন নিয়ে ডান হাতের উল্টো পিঠে একবার চোখ মুছে নিলেন তিনি। 
চোখ ঝাপসা লাগছে কেন? চোখের জ্যোতিও কি কমে গেছে? অসহায় মন নিয়ে ডানে তাকালেন তিনি। 
রাহেলা বেগম ঘুমোচ্ছেন, বেডকভার দিয়ে শরীর মুড়ে রেখেছেন তিনি। স্ত্রীর অগাধ ভালোবাসা পেয়েছেন শমসের আলি। দুঃসময়েও পাচ্ছেন প্রাণ উজাড় করা সেবা।
সারা রাত ঘুমাতে পারেননি রাহেলা। তাকে জাগাতে ইচ্ছা হলো না। ডান হাত দিয়ে হুইলচেয়ারের চাকায় চাপ দিলেন নিজে। সামনে এগোনোর পরিবর্তে ডানে ঘুরে গেল চেয়ার। খোলা জানালার দিকে মুখ ঘুরে যাওয়ায় সরাসরি এবার বাইরে তাকালেন শমসের আলি। বাথরুমে যাওয়া দরকার, অথচ এক হাতে হুইলচেয়ারের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন না তিনি। ব্লাডার-নিয়ন্ত্রণক্ষমতাও কমে গেছে। তলপেটে ব্যথা হচ্ছে। মনে হচ্ছে ব্লাডারের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েই ফেলবেন। মনে হচ্ছে, পরনের লুঙ্গি নষ্ট করে ফেলবেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকালেন স্ত্রীর দিকে। 
শরীর মোচড় দিয়ে চোখ খোলেন রাহেলা বেগম। চোখ খুলেই চট করে উঠে বসেন। স্বামীর দৈহিক ভঙ্গি ও মুখের ভাষা দেখে বুঝে গেলেন পরিস্থিতি। দ্রুত উঠে হুইলচেয়ার ঠেলে বাথরুমের ভেতর নিয়ে এলেন। দুহাতে জড়িয়ে ধরে স্বামীকে ব্লাডার খালি করার সুযোগ করে দিলেন। টেনশনমুক্ত শমসের আলির চোখে পানি চলে এলো। স্ত্রীর মমতার কাছে তুচ্ছ হয়ে গেল জীবনের সব অপ্রাপ্তি। তবু জেদ কাজ করে মনে। জিদ্দি মনের ভেতর থেকে হেমন্তের কুয়াশার মতো কল্পনার কুয়াশা ভেসে ওঠে। কল্পিত কুয়াশার ভেতর দেখতে পাচ্ছেন নিজের মরদেহ―একজন মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় দাফনের সম্মান জানানোর দৃশ্য দেখতে পাচ্ছেন। দেখতে পাচ্ছেন জাতীয় পতাকায় ঢাকা কফিন। কফিনে শুয়ে আছে নিজের লাশ। বিউগলের করুণ আর বিয়োগাত্মক সুরও শুনতে পাচ্ছেন। সুরের সঙ্গে সঙ্গে সশস্ত্র সালামের দৃশ্যও এড়াল না চোখ।
আচমকা চিৎকার করে ওঠেন, ‘না, না।’
চিৎকার শুনে ভড়কে গেলেন রাহেলা বেগম। উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকালেন স্বামীর চোখের দিকে। চোখ বন্ধ করে আছেন শমসের আলি। চোখ থেকে দরদর করে বেরিয়ে আসছে নোনা জল-চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে, ভিজে যাচ্ছে গায়ের গেঞ্জি।
দৃশ্যটা প্রায়ই দেখতে হয়, কখনো প্রশ্ন করেন না তিনি। প্রশ্ন করলেন এখন-‘কাঁদছেন কেন?’
সহজ হয়ে শমসের আলি জবাব দিলেন, ‘রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন চাই না আমি। মরার আগে চিকিৎসা চাই রাষ্ট্রীয় সহায়তায়।’
এই ইস্যুতে রাহেলা বেগম মহাবিরক্ত। তিনি দেখে এসেছেন শমসের আলির জীবনের সাফল্য। সুদিনে সবাই এসেছে, নানা তদবির নিয়ে এসেছে এলাকার নেতারাও। দোয়া নিতে এসেছে সবাই। দুঃসময়ে কেউ নেই। একজন মুক্তিযোদ্ধা তিলে তিলে এগিয়ে যাচ্ছেন কবরের দিকে। প্রশাসন অপেক্ষা করছে মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানোর জন্য। অথচ বেঁচে থাকতে চোখে পড়ার মতো সহযোগিতা করছে না কেউ। চিকিৎসার খোঁজখবর নিচ্ছে না। অসম্মান করে সম্মান জানানোর রীতির ঘোরতর বিরোধী রাহেলা বেগম জবাব দিলেন, ‘এসব নিয়ে ভাবতে হবে না। মনে জেদ রাখলে, কষ্ট রাখলে, আবার স্ট্রোক হতে পারে, বলে দিয়েছিলেন আপনার ডাক্তার, মনে নেই? ডাক্তারের কথা মনে রাখুন, জেদ-রাগ উড়িয়ে দিন।’
‘কীভাবে উড়িয়ে দেব? কখন মরব, সেই খোঁজ নিচ্ছে সবাই। উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে না কেউ। সব কষ্ট কি উড়িয়ে দেওয়া যায়?’
‘উড়িয়ে দিতে হবে। দিতে পারলে আরো বেশি দিন বাঁচবেন। আর আপনার সরকার কিছু না কিছু তো করছেই।’
‘এত কষ্ট নিয়ে বেশি দিন বাঁচতে চাই না।’
‘দেশের জন্য তো অনেক করেছেন। এখন আমাদের কথা ভাবুন। নিজের মেয়েটির কথা ভাবুন। বাবা বেঁচে থাকা মানে বটগাছের ছায়া থাকা। নইলে মেয়ের বিয়ে দিতেও ঝামেলা হবে। দেশের কাছে বেশি আশা করবেন না। শান্ত মনে সুস্থ থাকুন। এটাই আমার চাওয়া।’
‘দেশের কাছে আশা করব না কেন? এখন ক্ষমতায় আমার সরকার। অবশ্যই উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার হকদার, দাবিদার আমি।’ 
‘নিজের স্বার্থের জন্য যুদ্ধ করেছিলেন? কেন চাইবেন নিজের জন্য কিছু? আপনার সরকারই খোঁজ নেবে। দায়িত্ব নেবে। না নিলেও ক্ষতি নেই। কারো কাছে হাত পাততে চাই না। একটা স্বাধীন দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন আপনি। এটাই আমাদের সান্ত্বনা, মহান প্রাপ্তি―এটা আপনার সন্তানদেরও গৌরব। ভুলবেন না কথাটি।’ 
গৌরব তো আমারও ছিল। স্বাধীন দেশের পতাকা উড়িয়েছিলাম আমরা। সহযোদ্ধাদের সঙ্গে প্রতিজ্ঞা ছিল, দেহের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়ব, লড়েছিও। স্বাধীন হয়েছে দেশ। সেই স্বাধীন দেশের প্রশাসন অপেক্ষা করছে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করার জন্য। গৌরব কি আর জিইয়ে থাকে?
রাহেলা বেগম বললেন, ‘প্রশাসন তার কাজ করবে। নিয়ম মেনে চলবে। দেশ স্বাধীন করেছেন, ঠিক আছে, পরিবারটা কি দাঁড় করানোর জন্য বিশেষ কোনো যুদ্ধ করেছিলেন? কখনো ভেবেছিলেন নিজের পরিবারের কথা?’
শমসের আলি শূন্য চোখ তুলে তাকালেন রাহেলার দিকে। বুঝতে পারলেন, ঠিক জায়গায় টোকা দিয়েছে রাহেলা। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হিসেবে প্রতি নির্বাচনের সময় দলের নেতারা তাঁকে ব্যবহার করেছে। একসময় চারপাশে সুবিধাবাদীভোগী লোকের অভাব ছিল না। তাকে পুঁজি করে নানাজনে লুটেছে নানা রকম ফায়দা। বদলে নিয়েছে নিজেদের ভাগ্য। অথচ নিজের ভাগ্য বদলের জন্য কিছুই করেন নি। স্বাধীন দেশ গড়ার গৌরবগাথা নিয়ে বেঘোরে ডুবে ছিলেন কেবল। সময় পেরিয়ে গেছে কখন, টের পান নি। দেশের কোথাও নেই তাঁর নামে একখণ্ড জমি। নেই ব্যাংক-হিসাব, ব্যালান্স। দুঃসময়ে পার করছেন, মৃত্যুপথযাত্রী তিনি। চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে দিন গুনছেন। বুঝতে পারছেন, পরিবারের জন্য কিছু করা উচিত ছিল, টাকাপয়সা জমানো উচিত ছিল। কিছু নেই। বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া মেয়ে সানজানা টিউশনি করে খরচ চালায় ঢাকায়। মেয়েটা সংগ্রাম করছে নিরন্তর। ওর জন্য তিনি কিছু করতে পারেননি। 
সানজানার কথা মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার চোখ গড়িয়ে নেমে এলো লোনা জল। বুকে জমে থাকা লোনাব্যথার জমাট চাক ভেঙে গেল। হু হু করে আবারো কেঁদে উঠলেন তিনি।
রাহেলা বেগম বললেন, ‘কাঁদবেন না, কাঁদবেন কেন?’ কিছু একটা উপায় বের হবে। বিশ্বাস রাখুন, আত্মবিশ্বাস হারাবেন না। আমি তো বিশ্বাস হারাইনি। সানজানাও বিশ্বাস হরায়নি। আপনি দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। আপনার দায়িত্ব শেষ হয়েছে। এখন আমরা, আমি আর সানজানা যুদ্ধ করছি পরিবারের জন্য, যুদ্ধ করছি আপনার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য। আপনিই যদি ভেঙে পড়েন, কূল হারাব আমরা, হেরে যাব, হারতে চায় না আমাদের মেয়ে সানজানা। সে আজ ঢাকা থেকে আসবে। পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম কাজ নিয়েছে জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে। সেখানে কথা বলেছে চিকিৎসকদের সঙ্গে। সবাই আপনাকে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। উপায় একটা হবেই, ভাববেন না, দিশেহারা হবেন না। বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন রাহেলা বেগম নিজেও।
হেমন্তের সূর্য উঁকি দিচ্ছে পুব আকাশে। কোমল আলোয় ভরে উঠছে চারপাশ। জেগে উঠছে বাড়ির অন্য ঘরের লোকজন। পাশেই আছে ছোট ভাই সেকান্দরের পরিবার। সেকান্দরের পরিবারের অবস্থাও নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর মতো। তবু ভাইয়ের পাশ ছাড়েনি সে। হেমন্তে নবান্নের উৎসবের কোনো আয়োজন নেই তাদের বাড়িতে। দুর্দশার কুয়াশায় ঢেকে আছে পুরো বাড়ি। এই কুয়াশা ঠেলে আশার আলো দেখছেন শমসের আলি। জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার আশায় সানজানার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন মনে মনে...

॥ দুই॥
গ্রামের পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে সানজানা। রাস্তা থেকে বাড়ি পর্যন্ত মেঠোপথটা বেশ চওড়া। ভ্যানগাড়ি চলে এ রাস্তায়। এখন ভ্যানগাড়ি দেখা যাচ্ছে না। হাঁটতে হচ্ছে। হাতের ছোট ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে হাঁটতে লাগল সামনে।
সম্রাট বলল, ‘তোর ব্যাগ আমার হাতে দে। কষ্ট হচ্ছে তোর।’ 
‘না, তুই মেহমান, মেহমানের মতো আয়।’
কিছুক্ষণ নীরব থেকে হেসে হেসে বলল, ‘আমার ব্যাগ নেওয়ার শখ হলো কেন? তুই না বলেছিস, আমার প্রতি কোনো ফিলিংস নেই―সে কারণে যাচ্ছিস না আমাদের বাড়িতে। বরং একজন মুক্তিযোদ্ধাকে দেখতে যাচ্ছিস। ভুলে গেছিস নিজের কথা?’ 
‘ভুলিনি। একজন অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাকে দেখতে যাচ্ছি, ঠিক আছে। তাই বলে কি কোনো মায়াও থাকতে পারবে না তোর জন্য? এতকাল একসঙ্গে পড়ছি। সেশনজট আর পরীক্ষা ড্রপ দেওয়ার কারণে দুজনেই পিছিয়ে পড়েছি পড়াশোনার যুদ্ধে। যুদ্ধের মাঠে তো সহযোদ্ধাদের জন্য টান থাকতেই হবে, তাই না?’
‘টান থাকুক। সেটা গোপন রাখ। এটা গাঁয়ের রাস্তা, দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটতে থাক। বেশি কথা বাড়াসনে আর। শেষে নানা কুৎসা রটে যাবে। গ্রামের লোকে বলে বেড়াবে, শমসের আলি কমান্ডারের মেয়ে বেগানা পুরুষ ধরে নিয়ে এসেছে! নষ্ট হয়ে গেছে!’
‘ওরে বাপ রে! এমন কঠিন কথা বলবে! বলতে পারে কেউ!’
‘তুই তো গ্রামে থাকিসনি, শহরে বড় হয়েছিস, গ্রামের মানুষের মন বুঝতে সময় লাগবে।’
‘কেন, গ্রামের মানুষ কি মানবজাতির জটিল সংস্করণ নাকি?’
‘জটিল না, বেশি সরল। বেশি সরলতার কারণে সরলরেখাকে বক্ররেখা বানিয়ে ছাড়ে। রেখা একবার বদলে গেলে, বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে, আর সোজা হয় না; দুর্নাম ছড়াতে থাকে। সেই বাঁকা পথ থেকে স্বাভাবিক জীবনে আবার ফিরে আসা দুর্বিষহ, কঠিন।’
‘তুই তো আর গ্রামে থাকবি না। দুর্নাম রটলে ক্ষতি কী? দুর্নামের বোঝা কি বইতে পারবি না?’
‘পারব না কেন? অবশ্যই পারব। তবে কমান্ডার শমসের আলির মেয়ে সানজানা আমি; এ গৌরব হারাতে চাই না। কোনো কালিমা যেন স্পর্শ করতে না পারে, মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে হিসেবে বিষয়টি নিয়ে খুব সেনসিটিভ, খুব গোঁড়া আমি।’
‘তোর এ অহংকারটা ভালো লাগে আমার। তোর এই অহংকারের টানে চলে এসেছি তোদের গ্রামে। তোর বাবাকে দেখার গৌরববোধ থেকে বঞ্চিত হতে চাই না। সে গৌরবের অংশীদার হতে চাই আমিও।’
সম্রাটের কথার জবাব না দিয়ে সানজানা টানা হাঁটতে লাগল সামনে। হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়া সানজানার মুখ দেখতে পাচ্ছে না সম্রাট। সে আছে পেছনে। তেজস্বী সানজানার হাঁটার মধ্যে আছে দৃঢ়তা। দৃঢ়তা নিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল সামনে। ওর প্রতিটি পদক্ষেপ থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে প্রত্যয়ী সানজানার অপরাজয়ী মনোভাব। সম্রাটও উপলব্ধি করল সেই তেজ। মনের মধ্যে জেগে উঠল বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের দীর্ঘ সময়ে শ্রেণিবন্ধু সানজানার প্রতি অন্য রকম অনুভূতি। এ অনুভবের অর্থ কী? জানে না সম্রাট।
বাড়ির কাছে গিয়ে শোরগোল শুনতে পেল ওরা।
সম্রাট প্রশ্ন করল, ‘বিষয়টা কী? মনে হচ্ছে কাঁদছে একদল মানুষ!’
সানজানাও শুনছে শোরগোল। মনোযোগ দিয়ে শুনে শোরগোলের ধরনটি বোঝার চেষ্টা করতে লাগল। 
হ্যাঁ, কান্নার আওয়াজই তো ভেসে আসছে! 
এবার আকাশের দিকে তাকাল সানজানা।
দুপুরের কড়া রোদের ছাঁট লাগল মুখে। চোখ কুঁচকে এবার তাকাল রাস্তার দিকে? মেঠোপথের দুপাশে জেগে আছে দূর্বাঘাস। মাঝখান দিয়ে সরু রেখা। পায়ে চলা পথ। দূর্বাঘাসের বুক চিরে বয়ে গেছে ভ্যানগাড়ির চাকার সরু ছাপ। বড়পথ এভাবে চিকন হয়ে যায়। ঘাসের সবুজ কার্পেটে এভাবে বসে যায় দাগ। জীবন চলবেই। দাগও বসবে। জানে সানজানা। জানা বাস্তবতা নিয়ে আবার তাকাল আকাশের দিকে, তাকিয়েই রইল। রৌদের ছাঁটে এবার চোখ কোঁচকাল না। বরং কঠিনভাবে তাকিয়ে রাইল আকাশের দিকে।
সম্রাট বলল, ‘থেমে গেলি কেন? এগোই, চল।’ 
সানজানা বলল, ‘এগোতে ইচ্ছা করছে না। সূর্যটাকে দেখতে ইচ্ছা করছে। মনে হচ্ছে, আমার গৌরবের সূর্যটা মিশে গেছে আকাশের সূর্যের সঙ্গে। বিউগলের ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় একজন মুক্তিযোদ্ধাকে কবরে শুইয়ে দেওয়ার আয়োজন দেখতে পাচ্ছি কল্পনায়। তুই কি কবরে নামবি? লাশটা কি শুইয়ে দিবি কবরের নরম মাটিতে?’
কথা শেষ হওয়ার আগেই পেছনে রাস্তায় শোরগোল শুনতে পেয়ে ওরা ঘুরে তাকাল। উপজেলা প্রশাসনের একদল লোক এগিয়ে আসছে। ওরা কি আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল? এত দ্রুত এলো কীভাবে? 
আবার আকাশের দিকে তাকাল সানজানা। আবারো কল্পনার চোখে দেখতে লাগল, একদল লোক বিউগল বাজিয়ে দাফন করছে বীর মুক্তিযোদ্ধা শমসের আলির লাশ। 
এটাই কি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন? 
প্রশ্নভরা শূন্য-চোখ ভরে উঠল আরো গভীর শূন্যতায়।
এই শূন্যতা কি আর পূরণ হবে এক জীবনে? শেষ প্রশ্নটা উদয় হলো সানজানার মাথায়। আর ক্রমশ তা মিলিয়ে যেতে লাগল আকাশের শূন্যতার মাঝে। আকাশের সূর্যও গ্রাস করে নিল পৃথিবীর সূর্যটা।