• ঢাকা
  • বুধবার, ০৩ মার্চ, ২০২১, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১, ০১:৫১ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১, ০১:৫১ পিএম

কথাসাহিত্যের ভাষা নিয়ে

কথাসাহিত্যের ভাষা নিয়ে

কথাসাহিত্যের ভাষা কী হবে? জনসাধারণের মুখের ভাষা, নাকি কোনো বিশেষায়িত ভাষা? রায়টা আমার বিশেষায়িত ভাষার পক্ষেই। কারণ সাহিত্য মানেই তো একটা বিশেষ ব্যাপার, একটা নান্দনিক বা শৈল্পিক ব্যাপার। মুখের ভাষা কিন্তু বিশেষ নয়, সাধারণ। তার মানে বিশেষায়িত ভাষা এমন নয় যে, ‘হে মাতঃ! তব ক্ষুধার্ত পুত্র দ্বারে দাণ্ডায়মান। দ্বার উন্মুক্ত করো, আমি আহার করিব!’ বিশেষায়িত ভাষা বলতে এমন ভাষাকে বোঝানো হচ্ছে না। এমন ভাষায় এখন সাহিত্য হয় না, ভবিষ্যতেও হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সাহিত্য মুখের সাধারণ ভাষাতেই হবে। তবে মুখের সাধারণ ভাষা দিয়েই সাহিত্যের একটা বিশেষ ভাষা তৈরি করে নিতে হবে। তা কীভাবে? ম্যাক্সিম গোর্কির কাছ থেকে উদাহরণ ধার করা যাক। মানুষের মুখের ভাষাকে গোর্কি তুলনা করেছেন কাঁচামালের সঙ্গে, আর সাহিত্যের ভাষাকে তুলনা করেছেন সেই কাঁচামালকে দক্ষ রাঁধুনি দিয়ে প্রস্তুতকৃত মজাদার খাবারের সঙ্গে। গোর্কির উক্তিটা যথার্থ। কাঁচামাল দিয়েই কিন্তু সুস্বাদু খাবার রান্না করে খেতে হবে। মুখের ভাষাটা হচ্ছে কাঁচামাল, সাহিত্যের ভাষা হচ্ছে রান্না করা সুস্বাদু খাবার।

এখন কেউ যদি মনে করে, না, আমি রান্না করব না, কাঁচাই খাব। খাক। তাকে কে বাধা দেবে? আবার কেউ যদি মনে করে, সে রান্না করা মাংসের সঙ্গে কাঁচা মাংস মিশিয়ে খাবে। খাক। তাকে কেউ বাধা দেবে না। শুধু মনে রাখতে হবে ওই খাবারটা শুধুই তার জন্যই, সর্বসাধারণের জন্য নয়। মেজবান-জেয়াফতে সে এই খাবার পরিবেশন করতে পারবে না।

একইভাবে একটা দেশে একটা জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষা কিন্তু বহু রকমের। বাংলা ভাষার কত যে রূপ! বাঙালিমাত্রই বাংলা ভাষায় কথা বলে। কিন্তু সব বাঙালির বাংলা ভাষার রূপ কি এক? মোটেই না। পশ্চিমবঙ্গীয় বাংলা ভাষার রূপ আর ঢাকাইয়া বাংলা ভাষার রূপের ফারাক আছে। বাংলাদেশের রাজশাহীর বাঙালিরা যে ভাষায় কথা বলে চট্টগ্রামের বাঙালিরা সে ভাষায় বলে না। চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর দুজন মানুষকে যদি তাদের নিজ নিজ অঞ্চলের ভাষায় কথা বলার জন্য মুখোমুখি বসিয়ে দেওয়া হয়, কারও কথা কেউ বুঝবে না। সেখানে যদি ঢাকাইয়া কুট্টিভাষী কেউ থাকে, দুজনের কথোপকথন শুনে বিরক্তির সীমা থাকবে না তার। একইভাবে সিলেটের বাংলা ভাষার সঙ্গে বরিশালের, যশোরের সঙ্গে খুলনার, নোয়াখালীর সঙ্গে কুমিল্লার বা রংপুরের সঙ্গে ময়মনসিংহের বাংলা ভাষার মিল নেই। বিশাল বাংলার একেক অঞ্চলের মানুষ বাংলা ভাষার একেক রূপে কথা বলে। কিন্তু যখন লেখে তখন আর অমিল থাকে না। বাংলা ভাষার রূপ তখন অখণ্ড। অ-কে ঠিক ঠিক অ লেখে, ক-কে ক। অর্থাৎ কথ্যরূপের বহু রূপ থাকলেও লেখ্যরূপের রূপ একটাই। কেউ একটা বিশেষ অঞ্চলের ভাষায় উপন্যাস লিখতেই পারে, যেমন ‘আগুনপাখি’ লিখেছেন হাসান আজিজুল হক। কিন্তু বহু অঞ্চলের মুখের ভাষা দিয়ে উপন্যাসের বিশেষ ভাষা হয় না। কেউ হওয়াতে চাইলে সেটা হবে গুরুচণ্ডালি। এটাকে আমি জবরদস্তিই বলব। জবরদস্তিমূলক এই গুরুচণ্ডালি ভাষা দিয়ে কেউ উপন্যাস রচনা করতেই পারে। তবে সেই উপন্যাস শুধু তার জন্যই, সর্বসাধারণের জন্য নয়।

উপন্যাসের ভাষা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীনা নাট্যকার, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক জাও হিঞ্জিয়ানের মতে, ‘ভাষা হচ্ছে মানবসভ্যতার চূড়ান্ত স্ফটিকখণ্ড। এটি জটিল, তীক্ষ্ম এবং অধরা, অথচ এটি মানব-ইন্দ্রিয়ে উপলব্ধির গভীরে ব্যাপ্ত ও অনুসরণশীল। এটি তার নিজস্ব উপলব্ধির জগৎ দিয়ে ইন্দ্রিয়লব্ধ বিষয় ও মানুষে মানুষে সংযোগ ঘটায়। লেখ্য-ভাষা দুই সত্তার সংযোগের মাধ্যম হিসেবে জাদুর মতো কাজ করে; এমনকি যদি তারা দুই ভিন্ন জাতি এবং ভিন্ন সময়েরও হয়ে থাকে।...একজন লেখকের সৃজনশীলতার যথাযথ সূচনা ঘটে তাঁর ভাষার মধ্যে যে মহৎ উচ্চারণ রয়েছে তা থেকে এবং যেসব মহৎ উচ্চারণ পর্যাপ্তভাবে তাঁর ভাষায় উচ্চারিত হয়নি সে-সবের সন্ধানের মধ্য দিয়ে। ভাষাশিল্পের স্রষ্ট্রা হিসেবে কোনো লেখককে গড়পড়তা চালু জাতীয় কোনো লেবেলে, যাতে সহজেই তাঁকে চেনা যায়, পরিচিত করানোর কোনো দরকার পড়ে না।...মানবসভ্যতার সূচনালগ্নে জন্ম নেওয়া ভাষা জীবনের মতোই বিস্ময়ে ভরা এবং ভাষার প্রকাশক্ষমতাও অসীম। ভাষার ভেতরে লুকিয়ে থাকা গুপ্ত সহজাত সম্ভাবনাকে আবিষ্কার এবং তার বিকাশ সাধন করাই লেখকের কাজ।’

উপন্যাসের কাজ ভাষাকে নিয়েই। আবার উপন্যাস ভাষার ব্যায়ামও নয়। ভাষার শৈলীগত কারণেই উপন্যাস শিল্প হয়ে ওঠে। কেবল কাহিনি পড়ার জন্য তো এত কষ্ট করে, এত সময় ব্যয় করে উপন্যাস পড়ার দরকার নেই। কাহিনি জানার জন্য অনেক মাধ্যম রয়েছে। আর যে যত বড় ঔপন্যাসিক তার ভাষা তত সরল। সরল, কিন্তু তরল নয়। বঙ্গিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যেমন বলেন, ‘সকল অলঙ্কারের শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার সরলতা। যিনি সোজা কথায় আপনার মনের ভাব সহজেই পাঠককে বুঝাইতে পারেন, তিনিই শ্রেষ্ঠ লেখক। কেননা, লেখার উদ্দেশ্য পাঠককে বুঝান।’ দুর্বল ঔপন্যাসিকরাই ভাষাকে জটিল করে। তারা সহজ ভাষায় জটিল শিল্প রচনা করতে অক্ষম। এই অক্ষমদের নিয়ে জর্মান মনীষী আর্থার শোপেনহাওয়ার যা বলেছেন, মোহিতলাল মজুমদারের অনুবাদে তা হচ্ছে, ‘...প্রতিভাহীন লেখকদের পক্ষে এমন সঙ্কল্প করাই অসম্ভব যে―মনে যাহা আছে, তাহাকে ঠিক তেমনটি করিয়াই ব্যক্তি করিব; তাহারা মনে করে, লেখা যদি বড় সরল হয়, তবে তাহাদের গৌরবহানি হইবে। যদি কোনরূপ কুবুদ্ধি না করিয়া, যতই সাধারণ হউক―যে কয়টা কথা প্রকৃতই তাহার কথা, সেইগুলিকে বিনা আড়ম্বরে, অতিশয় সহজ ও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে প্রকাশ করিত, তবে তাহাই সুপাঠ্য হইত; এমন কি, বিষয়ের দিক দিয়া হয়ত শিক্ষাপ্রদও হইত। তাহা না করিয়া, তাহারা গভীর চিন্তাশীলতার পরিচয় দিবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে, ফলে ভাষাটাকে কৃত্রিম ও জটিল করিয়া তোলে; নূতন নূতন শব্দ তৈয়ারি করে, এবং বাক্যের স্তূপে বক্তব্যটাই চাপা পড়িয়া যায়। অনেকেই তাহাদের ভাষা খুব গুরু-গম্ভীর করিতে চায়, যাহাতে লেখা খুব পাণ্ডিত্যপূর্ণ ও গভীর বলিয়া মনে হইতে পারে;―লোকে তাহার অর্থ সহসা বুঝিতে না পারিয়া মনে করিবে, ভিতরে অনেক কিছু আছে। এইজন্যই তাহারা চিন্তাগুলিকে ভাঙ্গা-ভাঙ্গা করিয়া দেয়―খুব সংক্ষিপ্ত, দ্ব্যর্থপূর্ণ এবং অতিশয় বিরুদ্ধ ভাব-সমন্বিত বাক্যরাশি রচনা করে।’

তিনি আরো বলেছেন, ‘আমরা প্রায় দেখিতে পাই, লেখকগণ, অতি তুচ্ছ বিষয়কে উচ্চ ভাষা দিয়া ঢাকিবার চেষ্টা করেন; অতি সাধারণ চিন্তাকেই, অদ্ভুত, উদ্ভট, অতিশয় কৃত্রিম ও অনভ্যস্ত শব্দের দ্বারা ভূষিত করেন। যেসকল লেখক অকারণে অত্যধিক শব্দাড়ম্বর পছন্দ করে তাহাদের আচরণ অনেকটা সেই সকল ব্যক্তির মত যাহারা সমাজে নিম্নশ্রেণী বলিয়া পরিচিত হইবার ভয়ে সর্বদা দামী পোষাক পরিয়া থাকে। কিন্তু সত্যিকার অভিজাত ভদ্রলোক যিনি, তাঁহার এ ভয় নাই―অতিশয় দীন দরিদ্রবেশেও লোকে তাঁহাকে চিনিতে পারে।...ভাষার অস্পষ্টতা বা দুর্বোধ্যতা রচনার একটি অতিশয় কুলক্ষণ। ঐরূপ শতকরা নিরানব্বইটা রচনার একমাত্র কারণ―চিন্তার অস্পষ্টতা।’ 

ভাষা তো নদীর মতো। বয়ে চলেছে নিরবধি। নদীকে যেমন রক্ষা করতে হয়, তেমনি ভাষাকেও। ভাষাকে চর্চা আর লালনের মধ্যে না রাখলে তার বিলুপ্তি ঘটে। পৃথিবীর বহু ভাষা ও সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে, হয়ে যাচ্ছে। বাংলা ভাষাকে আমরা বিলুপ্ত হতে দেব না।

লেখক : কথাসাহিত্যিক