• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮
প্রকাশিত: এপ্রিল ৭, ২০২১, ০৫:৪০ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ৮, ২০২১, ০২:৫৫ পিএম

আহমদ শরীফ: মুক্তবুদ্ধির উত্তরাধিকার

আহমদ শরীফ: মুক্তবুদ্ধির উত্তরাধিকার

আহমদ শরীফ (১০ ফেব্রুয়ারি ১৯২১ - ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১) জন্মেছিলেন পটিয়ার সুচক্রদণ্ডী গ্রামে ব্রিটিশ আমলে, সেই ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে। ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দ আরও একটি কারণে বাঙালি মুসলমানের কাছে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে, সেটা হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। ব্রিটিশ আমল থেকে তাঁর জন্মভূমি পটিয়া শিক্ষা-দীক্ষায় চট্টগ্রামের অন্যান্য এলাকা থেকে অগ্রবর্তী ছিল। পারিবারিক পরিবেশ ছিল শিক্ষার অনুকূল। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ছিলেন তাঁর শিক্ষাগুরু ও নিকট-আত্মীয় পিতৃব্য। তাঁর শৈশবকালে তিনি সাহিত্যবিশারদের স্নেহচ্ছায়ায় প্রতিপালিত। গ্রামে ছিল হিন্দু, মুসলমান ও বৌদ্ধ, এই তিন সম্প্রদায়ের বসবাস। শিক্ষাক্ষেত্রে বর্ণহিন্দুরা অগ্রগামী ছিল। রাজনৈতিক চেতনায়ও ছিল অগ্রগামী। এই এলাকায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অনেক বিখ্যাত নেতার আবির্ভাব ঘটেছিল। পটিয়ায় দুটো উচ্চবিদ্যালয় ছিল। একটি পটিয়া হাইস্কুল, অপরটি রাহাত আলী হাইস্কুল। দুই স্কুলের মধ্যে ছিল প্রতিযোগী মনোভাব। আহমদ শরীফ পটিয়া হাইস্কুলের ছাত্র। প্রবেশিকা পরীক্ষা দেন ১৯৩৮ এবং প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এ প্রতিযোগী অবস্থায় কৈশোর উত্তীর্ণ হন।

শৈশবে তাঁর চরিত্রের একটি গুণ বা দোষ কেউ কেউ লক্ষ করেছেন। সেটা হচ্ছে তিনি ছিলেন একগুঁয়ে, চট্টগ্রামের কথায় ‘নাঠা’। এই গুণটি শৈশবে দোষ হিসেবে বিবেচিত হলেও পরবর্তীকালে সেটা দৃঢ় ও নিরাপোষ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হিসেবে তাঁকে পরিচিতি দান করে। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে বিএ পাস করে আহমদ শরীফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে এমএ পড়েন এবং বাংলা বিভাগে গবেষক হিসেবে যোগদান করার পর, তাঁর গবেষকজীবন শুরু হয়। তিনি প্রাচীন হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, যা তিনি আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের কাছ থেকে শিখেছিলেন, তা শিক্ষার্থীদের পাঠ করতে শেখাতেন। হস্তলিপি ও পাণ্ডুলিপি পাঠ শ্রম ও মনোযোগসাধ্য কাজ ছিল। দুষ্প্রাপ্য হস্তলিপি পাঠ করার মধ্যে একটি আনন্দ আছে, আবিষ্কারের আনন্দ–সেটা যারা বুঝতে পেরেছেন তাঁরা মধ্যযুগের সমাজজীবন, লোকবিশ্বাস ও স্বরূপতা সন্ধানের একটা দিগন্তের নির্দেশনা লাভ করতেন।

আহমদ শরীফের এ গবেষণা ক্ষেত্রে যাঁরা দক্ষতা অর্জন করেছিলেন, তাঁরা হচ্ছেন আলী আহমদ, ড. আবদুল কাইয়ুম, ড. মোহাম্মদ শাজাহান মিয়া, ড. রাজিয়া সুলতানা, ড. কল্পনা ভৌমিক। এ ক্ষেত্রে গবেষণামূলক কাজ করাটা রাষ্ট্র গঠন ও ঐতিহ্য উপলব্ধির জন্য একান্ত প্রয়োজন। আবুল কালাম মোহাম্মদ জাকারিয়া, নিজে আমলা হয়েও অসাধারণ পরিশ্রম করে ‘গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাস’ সম্পাদনা করেছেন। আহমদ শরীফের গবেষণার ক্ষেত্র ছিল ষোড়শ শতাব্দীর চট্টগ্রামের স্বরূপতা আত্মানুসন্ধানের প্রয়াসজাত মুসলিম সৃজনশীল পুথিসাহিত্যের উদ্ভবের সামাজিক সাম্প্রদায়িক কারণ অনুসন্ধান। সৈয়দ সুলতান ও তাঁর গ্রন্থাবলি ও তাঁর যুগ অনুসন্ধান তাঁকে পিএইচডি গবেষণার প্রণোদনা দেয়। এ ধরনের অনুসন্ধান একটি শ্রমসাধ্য গবেষণাকর্ম। বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক মাজহারুল ইসলাম আহমদ শরীফের এই গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন–‘এই গ্রন্থ সৈয়দ সুলতানের কবিকৃতির মূল্যায়নের সঙ্গে সঙ্গে সমসাময়িক সমগ্র যুগটিকে তথ্য প্রমাণাদির মাধ্যমে যুক্তনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করা হয়েছে।’ উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য, ষোড়শ শতাব্দীর গবেষক হলেও মানসিক গঠনে তিনি ছিলেন মুক্তবুদ্ধির ঐতিহ্যের অনুসারী আধুনিক চিন্তার মানুষ।

আহমদ শরীফের জ্ঞান-অন্বেষা ছিল বহুমুখী, ইতিহাস, সমাজ, সাহিত্য, যুক্তিবিদ্যা ও প্রগতিশীলতা ছিল তাঁর বিচরণ ক্ষেত্র। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের সংগৃহীত পুথির জীবন-ভাবনার সঙ্গে আহমদ শরীফের অবস্থান ছিল বিপ্রতীপ। বিজ্ঞানমনস্ক বিংশ শতাব্দীর প্রগতিশীলতার প্রতি ছিল তাঁর ছিল অকুণ্ঠ আনুগত্য। ফলে প্রগতিশীল মুক্তচিন্তা তাঁকে নঞর্থক দর্শনের দিকে পরিচালিত করে। তিনি ষোড়শ শতাব্দীর কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসা “সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই” তত্ত্বে আস্থা স্থাপন করেছিলেন। ফলে ইহলৌকিকতা ও মানবতন্ত্র তাঁর চিন্তার পরিধিকে করেছিল প্রোজ্জ্বল।

বাংলা সাহিত্য পড়ার ফলে তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অমিততেজ ও অজয় পৌরুষের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। ডিরোজিওর জীবন থেকে সংগ্রহ করেছেন নিরাপোষ মনোভঙ্গি। পরিশেষে ঢাকাকেন্দ্রিক ‘শিখা গোষ্ঠী’র চিন্তাচেতনার ঐতিহ্যকে তিনি মুক্তচিন্তার বাতায়ন হিসেবে গ্রহণ করেছেন। মুসলিম সাহিত্য সমাজ (১৯২৭-১৯৩১) যখন ‘শিখা’ পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেছেন, তখন তাঁর শৈশবকাল। তখন তাঁর লেখার বয়স হয়নি। তবে ১৯৩১ সালে ‘শিখা’ পত্রিকায় ‘নাস্তিকের ধর্ম’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। সে লেখায় কাজী মোতাহার হোসেন লিখেছিলেন–“আপন চেষ্টার দ্বারা, চিন্তার দ্বারা, সাধনার দ্বারা, আয়ত্ত না করলে কোন জিনিসই নিজস্ব হয় না, কিন্তু সংসারে অধিকাংশ লোকেই অন্যের চোখে দেখে, অন্যের বুদ্ধিতে ভাবে, অন্যের অনুভূতির স্পন্দন নিজের অনুভূতি বলে ভুল করে।” আহমদ শরীফ মধ্যযুগীয় মুসলিম জীবন ভাবনার বৃত্ত অনুধাবন করেছেন এবং সেই বৃত্তকে ছেদ করে বেরিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম করেছেন। এই সংগ্রাম একদিকে পারিবারিক, অন্যদিকে প্রশাসনিক; একদিকে রাষ্ট্রীয়, অন্যদিকে ধর্মীয়। আহমদ শরীফের জীবন-ভাবনায় এই সংগ্রামের রূপরেখা দুটি পাওয়া যায়।

আহমদ শরীফের জীবনযাত্রায় সামন্তযুগীয় দুটো ধারা লক্ষ করা যায়। তিনি মোগল যুগের সামন্তপ্রধানদের মতো একসময় হুক্কা টানতেন, আবার ব্রিটিশ যুগের বুর্জোয়ার পোশাক অর্থাৎ সুট, বুট আর টাই পরতেন। ধুতি পাঞ্জাবি আর পাজামার প্রতি তাঁর কোনো আকর্ষণ ছিল না। আমি কখনো তাঁকে লুঙ্গি পরা অবস্থায় দেখিনি। ‍তিনি রুচিসম্মত স্লিপিং গাউন ব্যবহার করতেন শীতকালে। বাংলা বিভাগের শিক্ষকদের মধ্যে পাঞ্জাবি-পাজামা পরার রেওয়াজ ছিল; তবে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও কাজী দীন মোহাম্মদের মাথায় পাঞ্জাবি-পাজামার ওপর টুপিও ছিল। তাঁরা ছিলেন নামাজি। অন্যদের মধ্যে প্রথম দুটো ছিল কিন্তু তৃতীয়টি ছিল না। মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে দেখেছি, তিনি একটি শক্ত লাঠি সঙ্গে রাখতেন। বাংলা একডেমির গেটে রিকশা থেকে নেমে লাঠি হাতে নিজ কক্ষে গবেষণার কাজের জন্য প্রবেশ করতেন। কিন্তু সেই লাঠি কারও মাথায় কিংবা পিঠে কখনো পড়েছিল কি না, তা জানা যায়নি।

এই রকম পরিবেশে বাংলা বিভাগের আহমদ শরীফের ব্যবহার ছিল অনন্য। তিনি শিক্ষার্থীদের ভুলত্রুটি সংশোধন করতেন কড়া ভাষায় (সালেহা চৌধুরীর লেখা দেখুন) কিন্তু বিশ্ব সৃজন করার সম্বন্ধে তাঁর মন্তব্য ছিল নেতিবাচক। এ ক্ষেত্রে চার্বাক দর্শনের প্রতি ছিল তাঁর বিশ্বাস। আহমদ শরীফ স্পষ্টভাষী ছিলেন। তাঁর বোধবিবেচনা অনুযায়ী তিনি ব্যক্তি সম্পর্কে উক্তি করতেন। সম্পর্কের সমতা সর্বসময়ে এক রকম থাকত না। আহমদ ছফা “ড. আহমদ শরীফের সর্বশেষ জন্মদিন” শীর্ষক যে স্মৃতিকথাটি লিখেছেন, তাতে ছফার সঙ্গে আহমদ শরীফের সম্পর্কের উষ্ণতা ও শীতলতার কথা বলা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বিপ্রতীপ আবেগের মানুষ হলেও কী গভীর স্নেহ ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক তাঁদের মধ্যে ছিল, তা লেখাটিতে উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে তিনি যে গভীর সখ্য অর্জন করেছিলেন, তাঁর সমমনা পণ্ডিত বিশেষ করে আহমদ হাসান দানী, আবু মুহাম্মদ হবিবুল্লাহ, মমতাজুর রহমান তরফদার, অজয় রায়সহ আরও অনেকেই। ফুলার রোডের গুড়ি নামের আড্ডায় ওই পাড়ায় অনেক শিক্ষক ও বহিরাগত কেউ কেউ আসতেন। সেই আড্ডাটি ছিল মূলত রাজা-উজির মারার আড্ডা। প্রতিদিনের কোনো ঘটনা তা বিশ্ববিদ্যালয়ের হোক কিংবা রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক হোক, প্রসঙ্গ উঠে এলে একেকজন একেক মন্তব্য করতেন। ঘণ্টা দেড় ঘণ্টার এই আড্ডায় বিপরীত চিন্তার মানুষও আসতেন। আলোচনার সারমর্ম তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের গোচরীভূত করতেন বলে মনে করা হতো। সমালোচনা, নিন্দা ও বৈষম্য নিয়ে কথা উঠে আসত। এসব কিছুর মধ্যমণি ছিলেন আহমদ শরীফ।

আহমদ শরীফের সঙ্গে পথচলা আমাদের শুরু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এমএ ক্লাসের ছাত্র হিসেবে ভর্তি হওয়ার পর, বিশেষ করে বিএ অনার্স পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হওয়ার পর। এমএতে ভর্তি হওয়ার কিছুদিন পর পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হওয়ার পর একদিন তিনি ক্লাসে আসেন। ক্লাসের শুরুতেই তিনি জিজ্ঞাসা করে বসলেন পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে কে? এই ভয়ংকর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব পড়ল আমার ওপর। কারণ, সে বছর আবুল মনসুর মুহাম্মদ আবু মুসা নামের এই এক অজ্ঞাতকুলশীল শিক্ষার্থী বাংলা অনার্স পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিল। আমি শুধু যে দণ্ডায়মান হলাম, তা নয়। তারপর দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ এ রকম করে অনেককে দণ্ডায়মান হতে হলো। তারপর তিনি চুপ করলেন। যাদের দণ্ডায়মান হতে হলো তার মধ্যে তিনজন ছিল চট্টগ্রাম কলেজের অনার্স ছাত্র। তিনি ক্ষুব্ধ হলেন। কারণ, এই জন্য যে প্রথম দিকের তালিকায় ঢাকার বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী স্বল্প কয়েকজন। তিনি অভ্যন্তরীণ ছাত্রছাত্রীদের খুব করে বকলেন। তারা ভালো করে লেখাপড়া করে না, সে জন্য মফস্বলের শিক্ষার্থীরা ভালো করে। তিনি থামলেন। যথারীতি নাম ডাকার কাজ শেষ করলেন এবং বিশাল ক্লাসে উচ্চস্বরে, স্পষ্টভাবে কথাবার্তা বললেন। তাঁর এই কাণ্ডে অভ্যন্তরীণ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলো। এই প্রতিযোগিতা সৃষ্টির মধ্যে আমার মনে হয় পটিয়া স্কুলে তাঁর প্রথম হওয়ার আর রাহাত আলী স্কুলের ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা, তা প্রসারিত। বিষয়টা আমার অনুমান। কারণ, অন্য কোনো শিক্ষক এ ধরনের প্রশ্ন প্রকাশ্যে ক্লাসে করেননি। তিনি হাটে হাঁড়ি ভাঙার কাজ করেছিলেন।

দ্বিতীয় একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করছি, আহমদ শরীফের সঙ্গে কীভাবে আমার একাডেমিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়। তিনি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন ১৩৮০ সনে। প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে প্রকাশিত ভাষা ও সাহিত্যপত্রে। তাঁর প্রবন্ধটির নাম ‘ভাষাকথাক্রম’। একটি ব্যাকরণ বই। রচনাকার ছিলেন মেস্তর উইলিয়াম কেরী। প্রবন্ধটি আমি পড়েছিলাম, অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে। কারণ, ইতিপূর্বে ভূঁইয়া ইকবাল আমাকে একটি বই কলকাতা থেকে এনে উপহার দিয়েছিলেন। বইটি হলো মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের লেখা প্রথম বাংলা ব্যাকরণ। এটি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা গবেষক তারাপদ মুখোপাধ্যায় সম্পাদনা করেছিলেন। তিনি যে ব্যাকরণটিকে মৃত্যুঞ্জয়ের ব্যাকরণ ঠাউরেছিলেন, আমি পড়ে অবাক হলাম যে আহমদ শরীফের সম্পাদিত ‘ভাষাযথাক্রম’ আর মৃত্যুঞ্জয়ের ব্যাকরণ এই ভাষায় একই প্রক্রমে লিখিত। মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার ফোর্ট উইলিয়ামের শিক্ষক ছিলেন। তারাপদের অনুমান, এটা তিনি লিখেছিলেন। এদিকে আহমদ শরীফের লেখার নাম ‘ভাষাকথাক্রম’ আর লেখকের নাম মেস্তর উইলিয়াম কেরী। আমার প্রবন্ধটির মূল প্রতিপাদ্য রচনাটি কার? উইলিয়াম কেরীর নাকি মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের? আহমদ শরীফের পাণ্ডুলিপিতে প্রথম পৃষ্ঠা ছিল, আর মৃত্যুঞ্জয়ের পৃষ্ঠায় নাম ছিল না। প্রবন্ধটি দুই বাংলায় তোলপাড় তোলে।

আহমদ শরীফ বহিরঙ্গে ছিলেন কঠোর কিন্তু অন্তরঙ্গে ছিলেন কোমল। তিনি অনেক দুস্থ শিক্ষার্থীকে অর্থ সাহায্য দিতেন, ধার দিতেন। প্রথম জীবনের কথা জানি না, শেষ দিকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে বেতন নিতেন, তার সবটা তিনি পরিবার পরিচালনার জন্য তাঁর সহধর্মিণীর হাতে তুলে দিতেন। শর্ত ছিল, তাঁর বাসায় যাঁরা আসবেন, তাঁদের অবশ্যই খাবার জন্য সেমাই কিংবা মিষ্টি দিতে হবে। তিনি প্রতিদিন ইনসুলিন নিতেন। তার জন্য তিনি অর্থ সংগ্রহ করতেন বিভিন্ন পত্রিকায় কলাম লিখে কিংবা ছাত্রপাঠ্য পুস্তকাদি লিখে কিংবা সম্পাদনা করে।

আহমদ শরীফ প্রকাশ্যে, মুক্তচিন্তার মানুষ ছিলেন, অপ্রকাশ্যে ছিলেন আত্মগোপনে থাকা সাম্যবাদী, সমাজতন্ত্রী, বিপ্লবী, বিপ্লববিরোধী, আওয়ামী লীগের যুবনেতৃত্ব, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা, এদের পৃষ্ঠপোষক। এভাবে তিনি আসহাবউদ্দিন আহমদ, আবদুল মতিন খান, মহসিন শস্ত্রপাণি, আবদুল আজিজ বাগমার, বদরুদ্দীন উমর, আবুল কাসেম ফজলুল হক, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো, আরও অসংখ্য তরুণ ও প্রবীণ রাজনৈতিক মানুষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।

আহমদ শরীফের একজন পৌত্র প্রতিবন্ধী ছিলেন। তিনি যখন অভ্যাগতদের সঙ্গে আলাপ করতেন, তখন তিনি পৌত্রকে কোলে নিয়ে বসে বসে আলাপ করতেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতাম। তিনি সীমান্ত অতিক্রম করবেন কি না, জানার জন্য বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর আমাকে পাঠিয়ে ছিলেন। তিনি সীমান্ত অতিক্রম করতে রাজি হননি। তবে আত্মগোপনে ছিলেন। আহমদ শরীফের শেষ দিনগুলোতে তাঁর প্রাক্তন ছাত্রী ড. প্রথমা রায় মণ্ডল তাঁর বিভিন্ন লেখার শ্রুতলিপি লিখে তাঁকে সাহায্য করতেন। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত লেখা বিন্যস্ত করার কাজ করতেন। প্রথমা তাঁকে কলকাতা নিয়ে যাওয়ার প্রণোদনা দিয়েছিলেন এবং সেখানে তাঁকে যথারীতি সম্মাননার সমস্ত ব্যবস্থা করেছিলেন।

তিনি বাংলাদেশ ভাষা সমিতির আজীবন সভাপতি ছিলেন এবং ভাষা সমিতির উদ্যোগে তাঁর বাংলা ভাষা সংস্কার আন্দোলন প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলাদেশ ভাষা সমিতির সঙ্গে শুধু নয়, তিনি আফজালুল বাসার ও তার সহযাত্রীদের নিয়ে স্বদেশ চিন্তা সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন এবং আজীবন তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। আবুল কাশেম ফজলুল হক এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আন্তরিকভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, এখনো আছেন।

বাংলাদেশ ভাষা সমিতি যে এরশাদ সরকারের সময় মজিদ খানের শিক্ষানীতিতে তিন ভাষার ফর্মুলা দিয়েছিলেন, তিনি তার বিরোধিতা করেছিলেন। দুই লাইনের বিবৃতি আমি মুখে মুখে বলেছিলাম আর আমাদের বাংলা বিভাগের ছাত্রী শাহীন আখতার তা লিখে নিয়েছিলেন। এ ক্ষুদ্র বিবৃতি আহমদ শরীফের উৎসাহে লিখিত হয়েছিল এবং বাংলাদেশ ভাষা সমিতির সভাপতি ও সম্পাদকের নামে পত্রপত্রিকায় নানাভাবে ছাপানো হয়েছিল। এক বছর পর গণ-আন্দোলনের চাপে সরকার এ ভাষা আরোপনের নীতি পরিহার করেন।

আহমদ শরীফ ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ সংকলনটি করে সম্পাদক আফজালুল বাশার একটি ঐতিহাসিক কাজ করেছেন। আহমদ শরীফের অবদান ঢাকা অথবা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনে সৌরোৎপাতের মতো। শরীফের কথাবার্তা ও কর্মকাণ্ড বাঙালির সমাজজীবনে যে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল, তা এখন থিতিয়ে পড়েছে। আজকে তাঁর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সভায় সৌরোৎপাতের পুনর্জাগরণ হবে এই প্রত্যাশা করা কি অসংগত?

বাংলা একাডেমিকে ধন্যবাদ জানিয়ে আহমদ শরীফের প্রতি শ্রদ্ধাবনত চিত্তে আমার যৎসামান্য আলোচনা শেষ করছি।

 

৩০ মার্চ, ২০২১

(প্রবন্ধটি ২০২১ সালের একুশে গ্রন্থমেলার সেমিনারে পাঠ করার জন্য লেখা হয়, কিন্তু করোনা মহামারির কারণে  অনুষ্ঠানটি আর হয়নি। পরে জাগরণ অনলাইনকে লেখক প্রবন্ধটি প্রকাশের অনুমতি দেন।)