• ঢাকা
  • বুধবার, ০৬ জুলাই, ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৬, ২০২২, ০১:১৮ এএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ১৬, ২০২২, ০১:২৩ এএম

জন্মজয়ন্তী

আবেদ খানের স্বপ্নযাত্রা

আবেদ খানের স্বপ্নযাত্রা
ছবি- সাংবাদিক আবেদ খান।

কিছু কিছু মানুষ সমাজে থাকেন যাঁরা সারাজীবন সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ। তাঁদের এই দায়বদ্ধতা তাঁদের জীবনাচারকে যেন এক ব্রত সাধনায় পরিণত করে। কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে না থেকেও তাঁরা প্রতিষ্ঠান। তাঁদের দৈহিক উচ্চতাকে ছাড়িয়ে যায় মানবিক উচ্চতা। সমাজের প্রতি, দেশের প্রতি ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই ক্যলাণমন্ত্রে তাঁদের দীক্ষা। এসব মানুষের চিন্তা ও চেতনার জগৎজুড়ে কেবলই মানুষের ক্যলাণভাবনা। মানবকল্যাণের বাইরে কোনো চিন্তা কখনো তাঁদের স্পর্শ করে না। বানিজ্যিক জনপ্রিয়তা নয়, সামষ্টির মঙ্গলচিন্তায় যিনি নিজেকে নিমজ্জিত রাখতে পারেন, তিনি আবেদ খান। আমার ও অনেকেরই প্রিয় আবেদ খান। তিনি একজন সাংবাদিক -এই পরিচয়টিই যথেষ্ট তাঁর জন্য।

সৃষ্টিশীল আবেদ খান আজ পা দিচ্ছেন ৭৮-এ। সাতক্ষীরার খাঁ পরিবার শুধু বাংলাদেশেই নয়, এই উপমহাদেশের শিক্ষিত ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সুপরিচিত। এই সাতক্ষীরা জেলার রসুলপুরেই আবেদ খানের জন্ম। অবিভক্ত ভারতের ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকার সম্পাদক মাওলানা আকরম খাঁ সম্পর্কে তাঁর নানা। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৯৬২ সালে আবেদ খানেরও সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি ঘটে দৈনিক জেহাদ পত্রিকার মাধ্যমে। এই দৈনিকে সহ-সম্পাদক হিসেবে বছরখানেক কাজ করার পর ১৯৬৩ সালে তিনি যোগ দেন দৈনিক সংবাদে। ১৯৬৪ সালে যোগ দেন দৈনিক ইত্তেফাকে। এখানে তিনি পর্যায়ক্রমে শিফট-ইনচার্জ, প্রধান প্রতিবেদক, সহকারী সম্পাদক ও কলামিস্ট হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সাল থেকে তিনি ‘দৈনিক কালের কণ্ঠ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালের ৩০ জুন কালের কণ্ঠ থেকে পদত্যাগের পর তিনি এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রধান সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। ২০১৩ সালের এপ্রিলে তিনি এটিএন নিউজ থেকে পদত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি ‘দৈনিক জাগরণ’ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক।
  
আবেদ খান আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ তিনি পুরনো ঢাকার নারিন্দা-ওয়ারী অঞ্চলে স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদ কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রস্তুতি-পর্বের দৃঢ় সূচনা করেন। ২৯ মার্চ তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। জুন মাসে সংবাদ, ডেইলি পিপল, ইত্তেফাক ভবন এবং সারা ঢাকার ওপর বয়ে চলা বিশ্ব-ইতিহাসের সেই অতি-ভয়াল ধ্বংসলীলার চাক্ষুষ সাক্ষী হিসেবে তিনি কলকাতার আকাশবাণী বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ৮ নম্বর সেক্টরে আবেদ খানের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী। পরবর্তী সময়ে মেজর মঞ্জুর এ সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আবেদ খানের সাব-সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন সফিকউল্লাহ। এ ছাড়াও জুন মাসে ১২টি বাম দলের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় পরিষদ -এর পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম আহ্বায়ক ছিলেন আবেদ খান।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের আগস্টে ইত্তেফাকে তাঁর ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘ওপেন সিক্রেট’ প্রকাশিত হতে থাকে। ‘ওপেন সিক্রেট’কে বলা যেতে পারে বাংলাদেশের তদন্তমূলক বা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এ সংক্রান্ত পড়াশোনায় ‘রেফারেন্স’ হিসেবে ‘ওপেন সিক্রেট’ এখনো অতুলনীয়। ইত্তেফাকের সম্পাদকীয় বিভাগে সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের সময় তিনি অভাজন ছদ্মনামে ‘নিবেদন ইতি’ শিরোনামে কলাম লেখায় হাত দেন। এই ‘নিবেদন ইতি’ ও সে সময় অভাবিত পাঠকপ্রিয়তা পায়।

ইত্তেফাক থেকে অব্যাহতি নিয়ে কলামিস্ট হিসেবে সমসাময়িক সময়ে দেশের শীর্ষ সংবাদপত্র ‘দৈনিক জনকণ্ঠ’, ‘ভোরের কাগজ’ ও ‘সংবাদ’ পত্রিকায় লিখতে থাকেন। ১৯৯৫ সাল থেকে জনকণ্ঠে সম্পাদকীয় পাতায় তাঁর ‘অভাজনের নিবেদন’ প্রকাশের পাশাপাশি প্রথম পাতায় ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ শিরোনামের মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশ হতে থাকে। ‘গৌড়ানন্দ কবি ভনে শুনে পুণ্যবান’ কলামটি জনকণ্ঠে প্রকাশিত তাঁর স্যাটায়ারধর্মী পাঠকপ্রিয় কলাম। ‘দৈনিক ভোরের কাগজ’ -এর প্রথম পাতায় তাঁর ‘টক অব দ্য টাউন’ শিরোনামের মন্তব্য প্রতিবেদনটি সে সময় তুমুল জনপ্রিয়তায় দেশবাসীর কাছে হয়ে উঠেছিল যেন ‘টক অব দ্যা কান্ট্রি’। একই কাগজে এ সময় তাঁর উপসম্পাদকীয় কলাম ‘প্রাঙ্গণে বহিরাঙ্গনে’  প্রকাশিত হতে থাকে। ‘দৈনিক সংবাদ’-এ তিনি ‘তৃতীয় নয়ন’ নামে একটি কলাম ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন। এ সময় ভারতের জনপ্রিয় বাংলা দৈনিক ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র প্রবাসী সংস্করণ ‘প্রবাসী আনন্দবাজার’ পত্রিকায়ও নিয়মিতভাবে তাঁর লেখা প্রকাশ হতে থাকে। প্রতিষ্ঠান ছেড়ে এ সময় আবেদ খান নিজেই যেন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে উঠতে থাকেন। ১৯৯৮ সালে নতুন পত্রিকা ‘দৈনিক প্রথম আলো’-তে ‘কালের কণ্ঠ’ শিরোনামে তাঁর উপসম্পাদকীয় কলাম প্রকাশ শুরু হয়। পরে ২০০৯ সালে আবেদ খানের নেতৃত্বে ‘কালের কণ্ঠ’ নামের একটি দৈনিক পত্রিকা বাজারে আসে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বেতারে একটি স্যাটায়ারধর্মী টক-শো’র পাণ্ডুলিপি লিখতেন তিনি। তাঁর সেই হিউমার-সমৃদ্ধ টক-শো শ্রোতাদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে। প্রিন্ট মিডিয়ার পাশাপাশি আবেদ খান এ সময় থেকে ইলেকট্রনিক-মিডিয়ায় জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে প্রবেশ করেন ১৯৭৮ সালে। আবেদ খান ও ড. সানজিদা আখতার দম্পতির গ্রন্থনা-উপস্থাপনায় দম্পতি-বিষয়ক ধারাবাহিক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘তুমি আর আমি’ প্রথম থেকেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। দম্পতি-শিল্পীদের নিয়ে সঙ্গীত বিষয়ক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘একই বৃন্তে’ সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৮৪, ১৯৮৬ ও ১৯৯০ সালে আবেদ খান-সানজিদা দম্পতি ঈদের ‘আনন্দমেলা’ অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা ও গ্রন্থনা করেন। যেসব গুণী মানুষের সংস্পর্শে ‘আনন্দমেলা’ ঈদ অনুষ্ঠানটি জনপ্রিয়তার চূড়া স্পর্শ করেছে তাঁদের মধ্যে এ দম্পতি অন্যতম। এ সময় থেকে টেলিভিশনের অসংখ্য টক-শো সঞ্চালনার মাধ্যমে তাঁরা জনপ্রিয় টেলিভিশন-ব্যক্তিত্বে পরিণত হন, যা এখনো সমানভাবে প্রবাহমান। কিছুকাল রেডিও-টেলিভিশন শিল্পী সংসদের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বও পালন করেন আবেদ খান।

১৯৯৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি একুশে টেলিভিশনের সংবাদ ও চলতি তথ্য বিষয়ের প্রধান হিসেবে কাজ করেন। একুশে টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকেই এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এবং প্রথম আন্তর্জাতিক মানের সংবাদ উপস্থাপনার উদাহরণ হিসেবে একুশে টেলিভিশনকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। টেরেস্ট্রিয়াল ও স্যাটেলাইট টেলিভিশন মিডিয়ায় আধুনিক সাংবাদিকতা এদেশে তাঁর হাত ধরেই স্পর্শ করেছে জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার বিরল শিখর। এর আগে ১৯৯৬-৯৯ সালে তাঁর অনুসন্ধানমূলক টেলিভিশন রিপোর্টিং সিরিজ ‘ঘটনার আড়ালে’ টেলিভিশন-সাংবাদিকতার আরেকটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান।

অনেক গ্রন্থের প্রণেতা আবেদ খান। প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: ষড়যন্ত্রের জালে বিপন্ন রাজনীতি, (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড) অভাজনের নিবেদন, গৌড়ানন্দ কবি ভনে শুনে পুণ্যবান, কালের কণ্ঠ, প্রসঙ্গ রাজনীতি, হারানো হিয়ার নিকুঞ্জপথে (গল্প সংকলন), আনলো বয়ে কোন বারতা, বলেই যাবো মনের কথা, গৌড়ানন্দ সমগ্র, অনেক কথা বলার আছে, দেশ কি জঙ্গিবাদের অভয়ারণ্য হবে, ও রাজকন্যে তোমার জন্য, স্বপ্ন এলো সোনার দেশে, আমাদের টুকুনবাবু ইত্যাদি।

অথচ তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা একেবারেই মসৃণ ছিল না; বরং তার বেশির ভাগটাই ছিল কণ্টকাকীর্ণ। সত্য ও আদর্শের পথে চলতে গেলে একজন আদর্শবান দেশপ্রেমিককে যে সমস্ত বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয় এবং তাদেরকে মোকাবেলা করতে হয়;  তাকেও করতে হয়েছে ঢের এবং পরাভূত করতে হয়েছে এমন অসংখ অশুভ শক্তিগুলোকে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক এই মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিকের ওপরে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে নেমে এসেছে অত্যাচারীর খড়গহস্ত। ১৯৮৭ সালে  স্বৈর শাসক এরশাদ তাঁকে বেতার-টেলিভিশনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল এবং নির্বাসিত করার চক্রান্ত করেছিলো বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনা ধারণ ও লালন করবার কারণে। ২০০১ সালে খালেদা-জামাত আমলে বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত্র করা হয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের এই সৈনিকের বিরুদ্ধে। ময়মনসিংহে সিনেমা হলে বোমা হামলায় তাঁকে আসামি করা সহ বিভিন্ন সময় নানা রকমের হামলা-মামলায় তাঁর সংগ্রামী জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। তাঁকে মিথ্যা মামলার শিকার করে হেনস্থা ও অপর্দস্ত করেছিলো তৎকালীন জামায়াত-বিএনপি নামক মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীশক্তিগুলো। তবু থামানো যায়নি এই অকুতোভয় সৈনিককে; বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্দীপ্ত এই মানুষটি বীর দর্পে নিজের দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি তাঁর দায়িত্ব ও ব্রত পালনে থেকেছেন অবিচল ও অকুণ্ঠিত। মানুষের কল্যাণের জন্যে হয়েছেন নীলকণ্ঠ। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসায় দেশে জঙ্গিবাদের মূলোৎপাটন ঘটালে তাঁর জীবনে কিছুটা স্বর্স্তি ঘটে।
     
আসলে কিছু কিছু মানুষ আছেন যাঁরা স্বপ্ন দেখতে জানেন, স্বপ্ন দেখাতে জানেন। কিছু মানুষ নিজেদের স্বপ্ন সঞ্চারিত করতে পারেন অন্যের ভেতর। আবেদ খান সেই বিরল প্রতিভার স্বাপ্নিক মানুষ, যাঁর চোখে স্বপ্ন দেখে আজকের তারুণ্য। আর আবেদ খান দেখেন এক সেক্যুলার ও সাম্যের বাংলাদেশের স্বপ্ন। আবেদ খানের সেই স্বপ্নযাত্রার সহযাত্রী আমরাও। শুভ জন্মদিন, আবেদ ভাই।
 
 

লেখক : সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়া প্রবাসী মানবাধিকারকর্মী, লেখক ও সাংবাদিক।