• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬
প্রকাশিত: জুলাই ১১, ২০১৯, ০৯:৩১ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জুলাই ১১, ২০১৯, ০৯:৩১ পিএম

জাতীয় সংসদে সমাপনী বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী

দেশের সম্পদ বিক্রির মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় আসার রাজনীতি করি না

জাগরণ প্রতিবেদক
দেশের সম্পদ বিক্রির মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় আসার রাজনীতি করি না
জাতীয় সংসদে বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-ফাইল ছবি

সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘জিমি কার্টারকে বলেছিলাম, রাজনীতি করি দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য। দেশের সম্পদ বিক্রি করে মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় আসতে হবে, এই রাজনীতি করি না।

বৃহস্পতিবার (১১ ‍জুলাই) রাতে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে একাদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তৃতায় এসব কথা বলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০০-০১ সালে যখন আমি প্রধানমন্ত্রী ছিলাম তখন আমার ওপর প্রচণ্ড চাপ আসল, আমাদের গ্যাস রফতানি করতে হবে। তখন জিমি কার্টারকে বলেছিলাম, রাজনীতি করি দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য। দেশের সম্পদ বিক্রি করে মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় আসতে হবে, এই রাজনীতি করি না।

গ্যাসের দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা তুলে ধরে সংসদ নেতা বলেন, আমাদের খরচ পড়ছে প্রতি ঘণমিটার ৬১ দশমিক ১২ টাকা। আর ধরছি মাত্র প্রতি ঘণমিটার ৯ দশমিক ৮০ টাকা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু বাংলাদেশে নয়, আন্তর্জাতিক বিশ্বেও আজ প্রমাণিত উন্নয়নে বাংলাদেশ দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা এখন বিশাল বাজেট নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করছি। বাজেটের বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ মাত্র শূন্য দশমিক ৮ ভাগ। আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি মানুষের কল্যাণের জন্য। ভিক্ষা চেয়ে নয়, দেশের নিজস্ব সম্পদ নিয়ে আমরা এগিয়ে যাব। কারণ আমাদের দেশের সম্পদ জনগণ আর দেশের মাটি হচ্ছে উর্বর। আমরা দেশের যে উন্নতি করতে পারি তা আজ প্রমাণিত। আগামী এক বছরের দেশের মাথাপিছু আয় ২ হাজার মার্কিন ডলারে উন্নীত করতে পারবো বলে আমরা আশাবাদী।

দেশের উন্নয়ন ও সফলতার বিবরণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মূল্যস্ফীতি আমরা ৪ দশমিক ৯ ভাগে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছি। সবার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা আমরা নিশ্চিত করেছি, দেশ আজ খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ। দেশের মানুষের পুষ্টিও নিশ্চিত করেছি বলেই পুরুষের গড় আয়ু ৭২ দশমিক ৮ ভাগ এবং নারীদের গড় আয়ু ৭৩ বছরে উন্নীত হয়েছে। খাদ্য ভেজালের কথা বলা হয়, অথচ মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। রফতানি আয় অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এলএনজি আমদানি করছি গ্যাসের চাহিদা মেটাবার জন্য। দেশে শিল্পায়ন হচ্ছে, শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে গ্যাসের চাহিদাও বাড়ছে। কিন্তু সে পরিমাণ গ্যাস আমাদের দেশে নাই। আমরা গ্যাসের কুপ খনন করছি। গ্যাসের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে, যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে উত্তোলন করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিশাল সমুদ্র সীমা অর্জন করেছি। সেখানেও গ্যাস উত্তোলনের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি। গ্যাসের দাম নিয়ে যে কথাগুলো আসছে যে দাম না বাড়িয়েও করা যাবে। কিন্তু দাম বাড়ানোর প্রয়োজনটা কেন ছিল? গ্যাসের বর্ধিত ব্যয় নির্বাহের জন্য পেট্রোবাংলা ও বিভিন্ন কোম্পানি গ্যাসের দাম ১০২ শতাংশ দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছিলো।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এলএনজি গ্যাস আমদানি এটা খুব ব্যয় সাপেক্ষ। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন মূল্যায়ন করে দেখেছে বর্ধিত ব্যয় নির্বাহের জন্য কমপক্ষে ৭৫ শতাংশ দাম বৃদ্ধি করার প্রয়োজন ছিল। সেখানে আমরা কতটুক দাম বৃদ্ধি করেছি? গ্রাহকদের আর্থিক চাপ বিষয়টা বিবেচনা করে কমিশন মাত্র ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ দাম বৃদ্ধি করেছে। অর্থাৎ ভোক্তা পর্যায়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য হার বর্তমানে প্রতি ঘন মিটার ৯ দশমিক ৮০ টাকা। আর প্রতি ঘন মিটার নির্ধারণ করা হয়েছে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প গ্রাহকদের জন্য কোন দাম বৃদ্ধি করা হয়নি।

তিনি বলেন, গণ রিবহনের বিষয়টি বিবেচনায় করে সিএনজিখাতে শুধু প্রতি ঘনমিটারে ৩ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকদের অভিযোগের ভিত্তিতে এখন থেকে মিনিমাম চার্জ প্রত্যাহার করা হয়েছে। সকল শিল্প গ্রাহকদের ইবিসি মিটার দেয়া হবে। যাতে করে গ্যাস কে কত ব্যবহার করে সেটা যেন নির্দিষ্ট থাকে। যাতে বিল পরিশোধ সহজ হয়। গ্রাহকদের আর্থিক চাপ যেন বেশি না পরে সেজন্য সরকার গ্যাসে প্রতি বছর ৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা বা ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল থেকে ২ হাজার ৪২০ কোটি টাকা প্রদান করা হবে। তিনি আমরা যদি সব খরচটা ধরি তাতে এলএনজি আমদানির খরচ পড়ে সম্পূরক শুল্কসহ প্রতি ঘণমিটার ৬১ দশমিক ১২ টাকা। আমরা নিচ্ছি মাত্র ৯ দশমিক ৮০ টাকা। অর্থাৎ এলএনজি আমদানিতে যেখানে ৬১.১২ টাকা দাম পড়ে, সেখানে নেয়া হচ্ছে ৯.৮০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি ঘনমিটারে সরকারকে ভতুর্কি দিতে হচ্ছে ৫১ দশমিক ৩২ টাকা। আর সম্পুরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের কারণে সরকারের ৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় বন্ধ হয়ে গেছে। এটি বন্ধ না হলে দেশের আরও উন্নতি করতে পারতাম।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ২০০০ ও ২০০১ সালে গ্যাস বিক্রির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপের ঘটনা তুলে ধরে বলেন, তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিল ক্লিনটন বাংলাদেশে এসে ভারতের কাছে গ্যাস বিক্রির জন্য চাপ দেয়। পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারও খালেদা জিয়া ও আমার সঙ্গে বিক্রি করে একই চাপ দেয়। আমি তাদের স্পষ্ট করে জানাই, আগে আমাদের কত পরিমাণ গ্যাস রয়েছে, দেশের চাহিদা মিটিয়ে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ৫০ বছরের গ্যাস রিজার্ভ রেখে যদি উদ্বৃত্ত থাকে তবেই আমি গ্যাস বিক্রি করতে রাজি।

তিনি বলেন, গ্যাস বিক্রিতে রাজি না হলেও খালেদা জিয়া গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় আসে। নির্বাচনে আমরা বেশি ভোট পেলেও ক্ষমতায় যেতে পারি নি। কারণ আমি রাজনীতি করি দেশ ও দেশের মানুষের জন্য। দেশের সম্পদ বিক্রি করে ক্ষমতায় যেতে হবে সেই রাজনীতি আমি করি না।

তিনি বলেন, এনার্জি ছাড়া দেশের উন্নয়ন হয় না। এখন দেশের ৯৩ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছেন। আমরা যদি গ্যাস সরবরাহ করতে না পারি তবে দেশের উৎপাদন বন্ধ হবে, রফতানি কমে যাবে, দেশে হাহাকারের সৃষ্টি হবে। যারা এ নিয়ে আন্দোলন বা সমালোচনা করে তারা কী দেশে এমন পরিস্থিতি হোক সেটাই চান?

তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের পুরোটা খরচই নেয়া উচিত। কিন্তু আমরা নিচ্ছি না। দেশের জনগণের স্বার্থে ও উন্নয়নে গ্যাস ও বিদ্যুত খাত দুটোতেই বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছি। ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে গ্যাসের মূল্য বেশি এমন অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে দু’দেশের তুলনামূলক মূল্যের চিত্র সংসদে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি জানান, ভারতসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের তুলনায় বাংলাদেশে গ্যাসের মূল্য কম। বাংলাদেশে গৃহস্থালি খাতে যেখানে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের মূল্য ১২ টাকা ৬০ পয়সা, সেখানে ভারতের মূল ৩০ থেকে ৩৭ রুপি। শিল্পে বাংলাদেশে ১০ টাকা ৭০ পয়সা, ভারতে ৪০ থেকে ৪২ রুপি, সিএনজি খাতে বাংলাদেশে ৪৩ টাকা, ভারতে ৪৪ থেকে ৫৩ রুপি এবং বাণিজ্যিক খাতে বাংলাদেশে ২৩ টাকা, সেখানে ভারতে ৫৮ থেকে ৬৫ রুপি। তবে ভারত থেকে আমাদের দেশে গ্যাসের দাম বেশি হলো কীভাবে?

সংসদ নেতা বলেন, আমাদের সরকার প্রতিটি গ্রামকে শহরে পরিণত করতে চাই। আকাশ, রেল, নৌ-পথ, সড়ক পথ সবক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে তা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। গত ১০ বছরে আমরা ১০ হাজার চিকিৎসককে নিয়োগ দিয়েছি। নার্সদের শিক্ষার মানও বৃদ্ধি করেছি।

সরকারি চাকরিতে বয়সের সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব কার্যত নাকচ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন আগের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্ত্রের ঝনঝনানি নেই। শিক্ষার কার্যকর পরিবেশ রয়েছে।

তিনটি বিসিএস পরীক্ষার ফলাফলের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ২৩ থেকে ২৫ বছর বয়সী পরীক্ষার্থীদের পাসের হার ৪০ দশমিক ৬০ ভাগ, ২৫-২৭ বছর বয়সীদের পাসের হার ৩০ দশমিক ২৯ ভাগ, ২৭-২৯ বছর বয়সীদের পাসের হার ১৩ দশমিক ১৭ ভাগ এবং ২৯ বছরের বেশি বয়সীদের পাসের হার মাত্র ৩ দশমিক ৪৫ ভাগ। এক্ষেত্রে চাকুরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ বছর করা হলে ঘর-সংসার সামলিয়ে আদৌ পরীক্ষায় পাস করতে পারবে কি-না, তাতে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আর নিয়মিত পড়াশোনা করলে এখন ২৩ বছরের মধ্যে মাস্টার্স পাস করা যায়। সেক্ষেত্রে ২৩ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত চাকুরিতে প্রবেশের সময় থাকে। তারা প্রতিটি বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে, যা বিশ্বের কোথাও এমন সুযোগ দেয়া হয় না।

সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়া প্রসঙ্গে সংসদ নেতা বলেন, ডেঙ্গু রোগটা বেড়ে গেছে। সমস্যা হচ্ছে ডেঙ্গু মশাটা অ্যারেসটোক্রেট হয়ে গেছে। পঁচা ডোবা-নর্দমায় নয়, একটু ভদ্র এলাকায় বাস করে। বাসা-বাড়ির স্বচ্ছ পানিতে এরা বংশবিস্তার করে। তাই এ ব্যাপারে দেশের মানুষকে সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে, বাসা-বাড়ির আশেপাশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। তবে ডেঙ্গুর চিকিৎসা আগের থেকে এখন অনেক সহজ হয়েছে, চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

এইচএস/এসএমএম

আরও পড়ুন

Islami Bank