• ঢাকা
  • বুধবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬
প্রকাশিত: অক্টোবর ৯, ২০১৯, ১০:০২ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : অক্টোবর ৯, ২০১৯, ১০:০২ পিএম

ফাহাদ হত্যার বিচার হবেই 

‘ভুলে গেলে চলবে না, ৩৮ বছর পর আমি বিচার পেয়েছি’

জাগরণ প্রতিবেদক
‘ভুলে গেলে চলবে না, ৩৮ বছর পর আমি বিচার পেয়েছি’
গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা - ছবি : পিএমও

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকারীদের বিচার করা হবেই- জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কতই না নৃশংসভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে। আমি আমার বাবা-মা-ভাইবোনকে হারিয়েছি। নৃশংসভাবে তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। দেশবাসীকে ভুলে গেলে চলবে না- ৩৮ বছর পর আমি এর বিচার পাই। বিচার ঠেকাতে ইনডেমিনিটি করা হয়েছিল। 

প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে এবং স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার কোনো চিন্তা তার সরকারের নেই। নষ্ট রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে সুষ্ঠু ধারার রাজনীতি প্রবর্তন করতেই তার সরকার কাজ করে যাচ্ছে। গ্যাস রফতানির বিষয়ে বলেছেন, ভারতকে দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস নয়, বরং আমদানি করা এলপি গ্যাস দেয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে ফেনী নদীর পানি ভারতে দেয়া হচ্ছে মানবিক বিবেচনায় এবং তা পরিমাণে খুব সামান্য। গ্যাস ও ফেনী নদীর পানি নিয়ে বিএনপির সমালোচনাকে তিনি মিথ্যাচার বলে আখ্যা দেন।

বুধবার (৯ অক্টোবর) বিকালে গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এসব মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্প্রতি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সফর সম্পর্কে দেশবাসীকে জানাতে এই সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়। জাতিসংঘের ৭৪তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী ২২ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক সফর করেন। সেখান থেকে ফিরে ৩ থেকে ৬ অক্টোবর তিনি দিল্লি সফর করেন।

 

‘ত্রিপুরায় দেয়া হচ্ছে আমদানিকৃত এলপি গ্যাস’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, প্রকৃতিক গ্যাস নয়, আমদানী করা এলপি গ্যাস ভারতে রফতানি করা হবে। এতে বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ২০০১ সালে দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রি করার মুচলেকা দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছিল। আমার পক্ষে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে কোনো কিছু করা সম্ভব না। 

সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল- ভারতের সঙ্গে এলপি গ্যাস ও ফেনী নদীর পানি নিয়ে যে চুক্তি হয়েছে, তা নিয়ে অনেক সমালোচনা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনি কী মনে করেন- এতে দেশের স্বার্থ কতটুকু সংরক্ষিত হয়েছে?

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ত্রিপুরায় আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাস দেয়া হচ্ছে না। এসব আমদানিকৃত এলপি গ্যাস। আমরা আমদানি করছি, সেটা দিচ্ছি। এতে আমাদের রফতানির আরেকটি দরজা খুলে গেল।

মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরার অবদানের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সেসময় ত্রিপুরাবাসী আমাদের সহযোগিতা করেছিল। সেখানে আমাদের একটা ঘাঁটি ছিল। তাদের কারণে আমরা একটা শক্তি পেয়েছিলাম, মনোবল পেয়েছিলাম।


‘মানবিক দিক বিবেচনায় ফেনী নদী থেকে পানি দেয়া হয়েছে’

সাংবাদিকদের প্রশ্নে বাংলাদেশের ফেনী নদী থেকে ভারতকে ‘অত্যন্ত নগণ্য’ পরিমাণ পানি দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ওই পানি ভারতের ত্রিপুরার রামগড়ের সাবরুম এলাকার খাবার পানি হিসেবে দেয়া হচ্ছে। আমরা যে পানি দিচ্ছি, তার পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। এটা নিয়ে কেন এত চিৎকার, আমি জানি না। 

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী সবার কাছে জানতে চান, ফেনী নদীর উৎপত্তিস্থল কোথায়? এসময় কেউ সঠিকভাবে বলতে না পারায় তিনি নিজেই জানান, ‘ফেনী নদীর উৎপত্তিস্থল খাগড়াছড়ি। এটা খাগড়াছড়ি থেকে মাটিরাঙ্গা হয়ে ভারতের সীমান্তবর্তী নদী। ওখানকার ৪০ কিলোমিটার বাংলাদেশের অংশে, একটি অংশ সোনাগাজী হয়ে সাগরে চলে গেছে। এর বড় অংশ বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তে। সীমান্তবর্তী নদীতে দুই দেশের সমান অধিকার থাকে। পদ্মা, মাতামুহুরীসহ এমন ৭টি সীমান্তবর্তী নদী আছে। আমরা আলোচনা করেছি, যৌথভাবে এসব নদী ড্রেজিং করব। আমরা এই নদী নিয়ে কাজ করছি।’

ফেনী নদীর পানি ভারতকে দেয়া প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারতের রামগড়ের সাবরুম এলাকায় খাবার পানির খুব অভাব। তারা আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে পানি তোলে। ভারতের সঙ্গে খাবার পানির চুক্তি হয়েছে। পাহাড়টার নাম ভগবান টিলা। এটি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে অবস্থিত। আমরা যে পানি দিচ্ছি, তার পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। আমরা ভারতের ওই এলাকার খাবার জন্য এই পানি দিচ্ছি। এটা নিয়ে কেন এত চিৎকার, আমি জানি না। কেউ যদি পানি পান করতে চায়, আমরা যদি তা না দিই, সেটা কেমন হবে— প্রশ্ন রাখেন প্রধানমন্ত্রী।


‘কে ছাত্রলীগ বা কী, জানি না। অপরাধী অপরাধীই’

সাংবাদিকদের প্রশ্নে বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ঘটনা শোনার পর আমি তো দেখিনি- কে ছাত্রলীগ, কে কী। পুলিশকে ফোন করে বলেছি ঘটনাস্থলে যেতে, আলামত জব্দ করতে, সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে। কিন্তু তাদেরকে আটকে দিল শিক্ষার্থীরা। কেন? কেউ যদি কোনো অপরাধ করে, সে কোন দল করে, কী করে তা আমি দেখি না, অপরাধী অপরাধীই। কে ছাত্রলীগ বা কী, জানি না। অন্যায়কারীর বিচার হবে। 

ফাহাদ হত্যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ এবং ঘটনার আরও আলামতসহ পুলিশের টিমকে কেন ৩ ঘণ্টা বুয়েট ক্যাম্পাসে আটকে রাখা হয়েছিল তা-ও তিনি জানতে চান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি তো বলেছি, ঘটনা সঙ্গে জড়িত কোথায় কে ছিল, সব কয়টাকে গ্রেফতার করতে। তবে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করার পর শিক্ষার্থীরা সেটা আনতে দেবে না। আমার মনে প্রশ্ন দেখা দিল, এটা কেন? হত্যাকারীদের কেউ কি এর মধ্যে আছে যে ফুটেজ প্রকাশিত হলে তাদের পরিচয় বের হয়ে যাবে কি না। পরে তারা ফুটেজ নিয়ে এলো এবং কর্তৃপক্ষকে একটা কপি দিয়ে এলো।

ফাহাদ হত্যা নিয়ে তিনি বলেন, একটা বাচ্চা ছেলে, ২১ বছর বয়স। কী অমানবিক। পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা দেখেছি। সব ইনজুরি ভেতরে। একটা কথা আমার মাথায় এলো। ২০০১ সালে আমাদের ছেলেদের মারা হতো হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে। বাইরে থেকে কিছু বোঝা যেত না। সব ইনজুরি হতো দেহের ভেতরে। মারা যেত।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাবে তারা আমার পার্টির এটা আমি কখনই মেনে নেব না। আমি সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগকে ডেকেছি। তাদের বহিষ্কার করতে বলেছি, পুলিশকে বলেছি অ্যারেস্ট করতে। ছাত্র রাজনীতিতে, এই বুয়েটে আমাদের অনেক নেতাকর্মীকেও তো হত্যা করা হয়েছে। কেউ কোনোদিন বলেছে, কেউ অ্যারেস্ট হয়েছে? এটা করা হয়নি। আমি ক্ষমতায় আসার পর চেষ্টা করেছি সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ স্বাভাবিক করতে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফাহাদ হত্যাকারীদের বিচার করা হবেই। কতই না নৃশংসভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে। আমি আমার বাবা-মা-ভাইবোনকে হারিয়েছি। নৃশংসভাবে তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। দেশবাসীকে ভুলে গেলে চলবে না- ৩৮ বছর পর আমি এর বিচার পাই। বিচার ঠেকাতে ইনডেমিনিটি করা হয়েছিল। একথা বলার সময় আবেগে প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠরোধ হয়ে আসে।

ফাহাদ হত্যার ধরনে প্রধানমন্ত্রীর সন্দেহ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ওই হত্যায় বাইরে কোনো ইনজুরি নেই, সব ইনজুরি ভেতরে। তখন আমরা সন্দেহ হলো, ২০০১ সালে ওই সময় আমাদের বহু নেতা-কর্মীকে এমনভাবে পেটানো হতো, হাতুড়ি দিয়ে কিংবা এমনভাবে পেটানো হতো, তাতে বাইরে কোনো ইনজুরি নেই। ভেতরে ইনজুরি হতো, তারা মারা যেত।

তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবেই একটা সন্দেহের ব্যাপার, যে এরা কারা? এ সময় তিনি আরও বলেন, হ্যাঁ ক্ষমতায় থাকলে অনেকেই দল করতে চলে আসে। আর কিছু তো লোক তো থাকেই, যারা হচ্ছে পার্মানেন্ট গভর্নমেন্ট পার্টি।

শেখ হাসিনা বলেন, একজন সংসদ সদস্য ছিলেন খালেক সাহেব, তিনি বলতেন, আমি তো সবসময় গভর্নমেন্ট পার্টি করি, এখন গভর্নমেন্ট বদলালে আমি কী করবো? পার্লামেন্টেই এ কথা বলেছিলেন। এমন কিছু তো থাকেই। তিনি আরও বলেন, এমন ঘটনা যারা ঘটাবে তারা আমার পার্টির- আমি কখনও এটা মেনে নেব না।

ছাত্র রাজনীতিতে ছাত্রলীগের কর্মীদের হত্যার ঘটনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রাখেন, বুয়েটে তো আমাদেরও অনেক নেতা-কর্মী হত্যা হয়েছে। কোনো দিন কি কেউ বিচার পেয়েছে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়সহ সারা বাংলাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন বোমাবাজি, গুলি হতো।

 

‘ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার কোনো চিন্তা নেই’

সাংবাদিকদের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে এবং স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার কোনো চিন্তা তার সরকারের নেই। ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ এবং নষ্ট রাজনীতি প্রবর্তন করে সামরিক স্বৈরাচারীরা। এরা ক্ষমতা দখল করে মানুষের চরিত্রহরণ করেছে। ছাত্রদের লোভী করেছে, তাদেরকে ভোগ-বিলাসের পথ দেখিয়ে গেছে। এটাই হলো নষ্ট রাজনীতি। এই নষ্ট রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে সুষ্ঠু ধারার রাজনীতি প্রবর্তন করতেই তার সরকার কাজ করে যাচ্ছে। তবে বুয়েট কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান যদি ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে তবে এতে তিনি কোনো হস্তক্ষেপ করবেন না। 

তিনি বলেন, আমাদের দেশের নেতৃত্ব উঠে এসেছে ছাত্র রাজনীতি থেকেই। রাজনীতি একটি শিক্ষার ব্যাপার, ট্রেনিংয়ের ব্যাপার, জানার ব্যাপার। ছাত্র রাজনীতি থেকেই ধীরে ধীরে দেশসেবার মানসিকতা গড়ে ওঠে।  আমি নিজেই ছাত্র রাজনীতি করে এসেছি, ছাত্র রাজনীতি করেছি বলেই এ পর্যায়ে এসেছি। দেশের ভালো-মন্দের চিন্তা সেই ছাত্র রাজনীতির সময় থেকে আমার মাথায় আছে বলে দেশের জন্য কাজ করতে পারছি। আমি ছাত্র রাজনীতি ব্যান্ড করবো কেন! কিন্তু যারা উড়ে এসে ক্ষমতায় বসে, তারা আসে ক্ষমতাকে উপভোগ করতে। তাদের মাথায় তো দেশ নিয়ে কোনো চিন্তা-ভাবনা থাকে না। আমাদের দেশের সমস্যা হলো- বার বার এখানে ‘মিলিটারি রুলার’রা এসেছে, আর তারা এসেই মানুষের চরিত্রহরণ করে গেছে। ছাত্রদের লোভী করে গেছে, তাদেরকে ভোগ-বিলাসের পথ দেখিয়ে গেছে। এটাই হলো নষ্ট রাজনীতি। সেখান থেকে আমরা ধীরে ধীরে সুষ্ঠু ধারায় ফিরিয়ে আনছি। 


 
তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে ছাত্ররা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। এখন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটা ঘটনা ঘটেছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ আছে। বুয়েট যদি মনে করে তারা ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করবে এটা তাদের ব্যাপার। কিন্তু ছাত্র রাজনীতি একেবারে ব্যান্ড করে দিতে হবে এটা তো মিলিটারি ডিক্টেটরদের কথা। মিলিটারি ডিক্টেটররা সব সময় ছাত্র রাজনীতিসহ সব ধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে। এই যে ছেলেটাকে (আবরার ফাহাদ) হত্যা করল, এটা তো কোনো রাজনীতি না। বসুনিয়াকে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র রাউফুন বসুনিয়া) যে হত্যা করেছিল সেটা রাজনৈতিকভাবে। এ ঘটনায় (ফাহাদ হত্যায়) রাজনীতিটা কোথায়? এর কারণটা কোথায়? এটা খুঁজে খুঁজে বের করতে হবে। শুধু ঢাকা নয়, সারা বাংলাদেশের প্রত্যেকটা হল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সার্চ করা দরকার বলেও এসময় জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ছাত্রলীগের জন্ম আওয়ামী লীগের আগে। জাতির পিতা যখন ভাষা আন্দোলন শুরু করেন, তখন তিনি ছাত্র সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। ছাত্রলীগ গঠনের পর ’৪৯ সালে আওয়ামী লীগ গঠিত হয়। ছাত্রলীগ সব সময়ই একটা স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সংগঠন হিসেবে কাজ করত। 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের গঠনতন্ত্রে খুব স্পষ্ট করে লেখা আছে কোনো কোনো দল আমাদের সহযোগী সংগঠন। কিন্তু অঙ্গসংগঠন বলে কিছু নেই। ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন না।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ১২ জন ছাত্রলীগের ছেলে, তাদের হত্যা করলো। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির ৮ জনকে গুলি করে হত্যা করল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে, রংপুরে ছাত্রলীগের ছেলের কবজি কেটে নিয়ে গেল শিবির। এসময় সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কত জন মারা গেছে, সেটা বের করেন, ছাপান।

প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ১৯৮০ সালে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কর্মীদের হত্যা করা হয়েছিল। শওকত, ওয়ালিদ, শিকদার এবং মহসিন। তাদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। আর একটি ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিই- শফিকুল আলম প্রধানের কথা। তিনি ৭টা খুন করলেন। বিচারে তাকে শাস্তি দেয়া হলো। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে সেই শফিকুল আলম প্রধানকে কারাগার থেকে বের করে এনে রাজনীতি করার সুযোগ দিল। সে কিন্তু খালেদা জিয়ার ২০ দলীয় জোটের শরিক ছিল।

তিনি বলেন, আমরা কিন্তু খুনীদের কখনও প্রশ্রয় দিইনি। শফিকুল আলম প্রধান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সেক্রেটারি ছিল। তাকে ৭ খুনের কারণে মামলা দেয়া হয়েছিল। ছাত্রলীগ করা সত্ত্বেও তাকে আমরা শাস্তি দিয়েছিলাম। কিন্তু তাকে ছেড়ে দিয়েছিল জিয়াউর রহমান।

তিনি বলেন, নষ্ট রাজনীতি শুরু করেছিল আইউব খান। আর স্বাধীন বাংলাদেশে শুরু করেছিল জিয়াউর রহমান। কারণ এই দুজনের ক্ষমতা দখলের চরিত্রটাও একই রকম।  

 

‘ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশ চালাই না’

‘আমি একটা দেশের সরকারপ্রধান, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশ চালাই না’ মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দেশের মানুষের ভালো-মন্দ সব সময় আমি খেয়াল রাখি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি বুঝেছি, কারণ আপনারা এর আগে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা দেখেছেন। অনেক রাষ্ট্রপ্রধান বেলা ১২টায় ঘুম থেকে উঠে ‘কী হয়েছে’ জানতে চেয়েছেন। আমি বুঝি না, কেন আপনারা এই প্রশ্নটা করেন। আমি একটা দেশের সরকারপ্রধান। কেউ আমাকে দায়িত্ব চাপিয়ে দেয় না, আমি নিজে থেকে সব খবর রাখি। কারণ আমি ঘুমিয়ে দেশ চালাই না। এ দেশ আমার, এ দেশের মানুষ আমার, আমি তাদের ভালো-মন্দ নজরদারিতে রাখি।


‘দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাঁড়াশি অভিযান’ 

রাজধানীসহ সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক হলে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দেয়া হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘নামমাত্র টাকা ভাড়া দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা ও আবাসিক হলে কারা থাকছে, কারা মাস্তানি করছে তা খতিয়ে দেখা হবে।’

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার পর বিভিন্ন পর্যায় থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের যে দাবি উঠেছে- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে প্রধানমন্ত্রী এক পর্যায়ে বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়েছে, খরচ কিন্তু আবার সরকারকেই বহন করতে হয়। একটা ছাত্রের জন্য বছরে কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়, সেই হিসাব কিন্তু কেউ রাখে না।

তিনি বলেন, তারা (বুয়েট শিক্ষার্থী) বলছে, অনেক কিছু স্লোগান দিচ্ছে, আমাদের বিরুদ্ধে অনেক কিছু তারা বলতে পারে, এটা ঠিক। তবে একটু হিসাব করে দেখুন একটা ছাত্রের পেছনে সরকার কত টাকা খরচ করে? একজন ডাক্তার বানাতে কত টাকা খরচ করে, একজন ইঞ্জিনিয়ার বানাতে কত টাকা খরচ করে, একজন গ্র্যাজুয়েট করতে কত টাকা খরচ করে। হিসাব করেন, বের হয়ে যাবে। একবার পার্লামেন্টের ভাষণে কিছুটা আভাস দিয়েছিলাম।

‘দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় বসেছিল বিএনপি’

ফেনী নদীর পানি ও গ্যাস নিয়ে বিএনপি মিথ্যাচার করে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০১ সালে তত্ত্বাধায়ক সরকার লতিফুর রহমানের বাসায় গ্যাস নিয়ে জিমি কার্টারের সঙ্গে বৈঠক হয়েছিল। সেখানে আমাকে ও খালেদা জিয়াকে ডাকা হয়েছিল। আমেরিকা আমাদের গ্যাস চেয়েছিল। কিন্তু আমি ‘না’ করে বৈঠক থেকে চলে আসি। খালেদা জিয়া ছিলেন। সেখানে তিনি দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়ে ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসেছিল। আজকে তারা আবার কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করবে, এটা হতেই পারে না।

বিএনপি নেতাদের কাছে প্রশ্ন রেখে শেখ হাসিনা বলেন, তারা কি গঙ্গা চুক্তি করতে পেরেছিল? খালেদা জিয়া যখন ভারত গিয়েছিলেন, তখন কি তারা গঙ্গা চুক্তি করতে পেরেছিলেন? ফিরে আসার পরে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করল, খালেদা জিয়া বলেছিলেন— ‍ভুলেই গিয়েছিলাম। যে দল দেশের স্বার্থের কথা ভুলে যায়, তারা এত বড় কথা বলে কীভাবে?

শেখ হাসিনা আরও বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন স্থলসীমান্ত চুক্তি করলেন, তখন পত্রিকা পড়লে দেখবেন— অনেকে বলেছে, দেশ বেঁচে দিল। কিন্তু তিনি আইন পাস করলেন। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর আমরা সীমানা নির্দিষ্ট করলাম। আমার প্রশ্ন— তারা (বিএনপি) কেন সীমানা নির্দিষ্ট করেনি? আমার স্বাধীন দেশ, আমার সীমানা নির্দিষ্ট থাকবে। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে আমার প্রক্রিয়া শুরু করি।


‘একপাশে রোহিঙ্গা, আরেকপাশে এই ক্যাসিনোর ব্যবস্থা করে দেব’

ক্যাসিনো বা জুয়ার জন্য দেশের একটি জায়গা নির্ধারণ করে দেয়ার কথা বলেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘যারা ক্যাসিনো ও জুয়া খেলে অভ্যস্ত হয়ে গেছে- তাদের কেউ কেউ হয়তো দেশ থেকে ভেগে গেছে। এখানে-সেখানে খেলার জায়গা খোঁজাখুঁজি করছে। আমি বলেছি, একটা দ্বীপ মতো জায়গা খুঁজে বের করো, সেই দ্বীপে আমরা সব ব্যবস্থা করে দেব। দরকার হলে, ভাসানচর বিশাল দ্বীপ, এর একপাশে রোহিঙ্গা, আরেকপাশে এই ক্যাসিনোর ব্যবস্থা করে দেব। সবাই ওখানে চলে যান।

তিনি বলেন, কারা কারা এসব করতে চান, লাইসেন্স নিতে হবে, ট্যাক্স দিতে হবে। তারপর সবাই করেন, আমার কোনো আপত্তি নাই। সেই ব্যবস্থাই করে দেব। 
   
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন যারা লুকিয়ে-চুরিয়ে এটা-সেটা করে, এটা তো সমাজের ও দেশের জন্য ক্ষতিকর। এক চরে পাঠিয়ে দিলাম সব। দেশ তো ঠিকই থাকলো। এ ছাড়া তো আর কোনো উপায় দেখছি না। এতে আমরা ট্যাক্স পাবো, তো টাকা পাবো।

প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যে সাংবাদিক সারির কয়েকজন হেসে উঠলে তিনি বলেন, আমি বাস্তবতাটাই বলছি। পরে প্রধানমন্ত্রী নিজেও হেসে ফেলেন।

তিনি বলেন, বাস্তবতার নিরিখে বলছি, অভ্যাস যদি বদভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়, এই বদভ্যাস যাবে না, বার বার খোঁজাখুঁজি করতে হবে। তাই বার বার খোঁজাখুঁজি না করে একটা জায়গা ঠিক করে দেব। ভাসানচর খুব বড় জায়গা। অসুবিধা নেই। ১০ লাখ লোকের বসতি দেয়া যাবে।  

আরএম/ এফসি

আরও পড়ুন

Islami Bank