• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯, ১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: অক্টোবর ২৩, ২০১৯, ০৪:৪৪ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : অক্টোবর ২৬, ২০১৯, ১২:১২ পিএম

ষড়যন্ত্রের জালে বিপন্ন রাজনীতি (১৫)

মিডিয়ার রহস্যময় ভূমিকা ও অবিরল মিথ্যাচার

আবেদ খান
মিডিয়ার রহস্যময় ভূমিকা ও অবিরল মিথ্যাচার

বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রায় পুরোটা সময়েই ছিল সরকারবিরোধী মিথ্যাচার ও গুজবের আধিপত্য। পাক-মার্কিন চক্র, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী, উগ্র বাম ও ডানপন্থী রাজনৈতিক দল এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত গণমাধ্যমগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচারের মাধ্যমে ওই সময়  দেশের সার্বিক পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা তখন আজগুবি সব গল্প প্রকাশ করে বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি নষ্টের চেষ্টায় লিপ্ত ছিল।

এসব মিথ্যা কাহিনি প্রচারের পেছনে কুচক্রীদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকে জনগণের কাছে থেকে বিচ্ছিন্ন করা এবং তাঁকে হত্যার পটভূমি তৈরি করা। এ ধরনের অপকৌশল ও অপচেষ্টা একসময় আমরা ইন্দোনেশিয়া, ঘানা, কঙ্গো ও চিলিতে লক্ষ করেছি। কেননা তখন ওইসব দেশের রাষ্ট্রনায়কেরা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদার হতে রাজি হননি। এ জন্যই তাদেরকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা হয় এবং কয়েকজনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পাক-মার্কিন চক্র এবং তাদের দেশি এজেন্টরা আমাদের দেশেও সেই একই কৌশল গ্রহণ করেছিল। বঙ্গবন্ধু নিজেও এটা জানতেন এবং তিনি বেশ ভালোভাবেই বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তখন অনেকের কাছেই বলতেন, “একটা অদৃশ্য ‘বুলেট’ সব সময় আমাকে তাড়া করছে।”

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদ

বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে ১৭টি দৈনিক ও প্রায় ৬০টি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ হতো। কয়েকটি পত্রিকা সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হলেও সেগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখল করে ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধীরা। এদের মধ্যে কেউ কেউ সরাসরি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতাও করেছে। সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অপরিসীম মমতা ও দুর্বলতার কারণে তাদের কাউকে চাকরি খোয়াতে হয়নি। অথচ ঝোপ বুঝে কোপ মারতে তারা ছিল পাকা ওস্তাদ। সরকারি সংবাদের ফাঁকে ফাঁকে তারা এমন সব কথা ঢুকিয়ে দিত, যাতে বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।

অন্যান্য দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকার অধিকাংশেরই মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশে-বিদেশে বঙ্গবন্ধুবিরোধী প্রচারণা চালানো। সংবাদের নামে তারা এমন সব গল্প লিখত, যেগুলোকে কোনো বিচারেই সংবাদ বলা যায় না। সেগুলো ছিল সরকারবিরোধী বানোয়াট কিচ্ছা-কাহিনি। আর এ কাজে তখন সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল জাসদের মুখপত্র ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’, মওলানা ভাসানীর ‘হক কথা’, অলি আহাদের ‘ইত্তেহাদ’ এবং ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর ‘দেশবাংলা’। বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু বিরোধী রাষ্ট্রসমূহ এ ধরনের পত্রিকা পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ অর্থের জোগান দিত। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের যেসব নেতা বঙ্গবন্ধু হত্যার নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদের অন্যতম তাহের উদ্দিন ঠাকুর। তখন সে বাংলাদেশ সরকারের তথ্য প্রতিমন্ত্রী ছিল। ফলে তাহের উদ্দিন ঠাকুর তাদের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে ওইসব পত্রপত্রিকার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, উল্টো নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। তাহের উদ্দিন ঠাকুর, আনোয়ার জাহিদ, খন্দকার আবদুল হামিদসহ আরো যেসব সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুবিরোধী চক্রান্ত ও মিথ্যাচারের সঙ্গে যুক্ত ছিল তাদের বিষয়ে আমরা অন্য কোনো পর্বে বিস্তারিত বলব।    

ওই সময় পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদের ধরন সংক্ষেপে একটু বলি, প্রয়াত ফণীভূষণ মজুমদার তখন বাংলাদেশের খাদ্যমন্ত্রী। সে সময় কয়েকটি পত্রিকায় বেশ ফলাও করে একটি সংবাদ প্রকাশিত হলো। তাতে বলা হলো, খাদ্যবোঝাই কয়েকটি বিদেশি জাহাজ বাংলাদেশে আসছিল, খাদ্যমন্ত্রীর নির্দেশে সেগুলো পথ পরিবর্তন করে ভারতের বন্দরে গিয়ে উঠেছে। অথচ বাস্তব সত্য এই যে, এ ধরনের কোনো ঘটনাই তখন ঘটেনি। তবে খাদ্যমন্ত্রী শ্রী ফণীভূষণ মজুমদার যেহেতু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক, তাই পাকিস্তানপন্থীরা ওই ‘বানোয়াট গল্প’কেই সত্য বলে গ্রহণ করে এ‌বং গোয়েবলসীয় কায়দায় সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা বিস্তৃত পরিসরে এবং সুশৃঙ্খলভাবে প্রপাগান্ডাকে ব্যবহার করে। এডলফ হিটলার প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের পরাজয়ের জন্য ব্রিটিশদের প্রপাগান্ডাকে দায়ী করেছিলেন। পরবর্তীকালে হিটলার তার শাসনামলে ব্রিটিশদের এই কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি গঠন করেন ‘মিনিস্ট্রি অব পাবলিক এনলাইটেনমেন্ট অ্যান্ড প্রপাগান্ডা’। সেই সময় নাৎসি বাহিনীর পক্ষে প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন এই মন্ত্রণালয়ের প্রধান পল জোসেফ গোয়েবলস। ‘দ্য লিটল ডক্টর’ নামে পরিচিত এই ব্যক্তির মাধ্যমে প্রপাগান্ডা শব্দটি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। এখনো বিশ্বের দেশে দেশে প্রপাগান্ডা ছড়ানোর ক্ষেত্রে ব্যাপক জনপ্রিয় বিশেষণ ‘গোয়েবলসীয় তত্ত্ব’।

হিটলার, গোয়েবলস নেই বটে, তবে তার অনুসারীরা তো আজও জীবিত। গোয়েবলসের তত্ত্ব আজও সক্রিয় আছে, যুগ-যুগান্তরের সীমা পেরিয়ে আজও সেই তত্ত্ব পৃথিবীর নানা প্রান্তে গোয়েবলসের অস্তিত্বকে জানান দিচ্ছে।

হিটলার ও গোয়েবলস

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর পরাজিত চক্রান্তকারীরা গোয়েবলসীয় কায়দায় যেভাবে বঙ্গবন্ধুর সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করেছিল, সেই ধারা তারা আজও অব্যাহত রেখেছে। এসবের পাশাপাশি সময়ের প্রয়োজনে তারা নতুন নতুন সব উপসর্গ হাজির করেছে। নিকট অতীতে (২০১৩ সালে) একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে খুন ও ধর্ষণের দায়ে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা হওয়ার পর তাকে চাঁদে দেখা যাওয়ার গুজব যেভাবে ছড়ানো হয়েছিল, তাতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, গোয়েবলসরা মরে কিন্তু তাদের অপপ্রচারের কুৎসিত রূপ কোনো দিন মরে না। ইদানিং ‘ফেসবুক’ তত্ত্ব দিয়ে দেশে বেশ কয়েকবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়ে সংখ্যালঘু ও নিরীহ মুক্তমনা মানুষদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনার মানুষকে নিরন্তর লড়াই করতে হচ্ছে।

গোয়েবলসের কথা

গোয়েবলসের জন্ম ১৮৯৭ সালের ২৯ অক্টোবর জার্মানির রিদত শহরে। ১৯২১ সালে তিনি হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। ১৯২৬ সালে গোয়েবলস নাৎসি পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৩৩ সালে পার্টির নেতা এডলফ হিটলার চ্যান্সেলর নির্বাচিত হন। হিটলার মনে করেন, পুরো জার্মানিতে তার দলের একচ্ছত্র আধিপত্যের জন্য প্রয়োজন তার আদর্শকে অতিরঞ্জিত করে জার্মানদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া। আর এ জন্য তিনি গঠন করেন ‘মিনিস্ট্রি অব পাবলিক এনলাইটেনমেন্ট অ্যান্ড প্রপাগান্ডা’ আর এ মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান গোয়েবলস।

গোয়েবলসের স্ত্রী, ছয় সন্তান ও সৎপুত্র

গোয়েবলসের মতে, ‘একটা মিথ্যাকে দশ বার বলো, একশ বার বলো, সেটা সত্যের মতো শোনাবে।’ এই কাজে হিটলার-গোয়েবলস জুটি বেশ সফলও হয়েছিলেন শুরুতে। অনেক জার্মান নাগরিকই এটা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে, ইহুদিরা হচ্ছে এই পৃথিবীর জন্যে জঞ্জালস্বরূপ, তাদের খুন করায় কোনো পাপ নেই। আর একমাত্র জার্মানদেরই অধিকার আছে পৃথিবীকে শাসন করার, দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ জাতি তারাই। ‘পাবলিক এনলাইটেনমেন্ট অ্যান্ড প্রপাগান্ডা’ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পরই গোয়েবলস মিডিয়ার ওপর প্রাধান্য বিস্তার করেন। মিডিয়াকে ব্যবহার করে তিনি ব্যাপকহারে তার দলের পক্ষে প্রপাগান্ডা শুরু করেন। এ ক্ষেত্রে তার প্রিয় মাধ্যম ছিল রেডিও। কেননা ওই সময় রেডিও ছিল সর্বাধিক জনপ্রিয় গণমাধ্যম। ফলে সারা জার্মানিতে বিনা মূল্যে রেডিও বিতরণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন গোয়েবলস। কিন্তু এত কিছুর পরও শেষ রক্ষা হয়নি, সেই ইতিহাস আমরা জানি। হিটলারের পতনের পর জোসেফ গোয়েবলস তার ছয় সন্তানকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেন। এরপর স্ত্রীকে গুলি করে হত্যার পর নিজের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে আত্মহত্যা করেন গোয়েবলস।

মিথ্যাচারের রাজনীতি

আমরা আবার ফিরে আসি বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময়ে গণমাধ্যমের মিথ্যাচার প্রসঙ্গে। ১৯৭২ সালে গৃহীত শাসনতন্ত্রে উল্লেখিত মৌলিক অধিকারসমূহের অবাধ সুযোগ নিয়ে পাক-মার্কিন চক্র মিথ্যাচার ও গুজবের রাজনীতি শুরু করে। এখানে একটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, পাকিস্তান আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ানো হয়েছিল, জনগণের একাংশের মনে তার প্রতিক্রিয়া স্বাধীনতার পরও বিদ্যমান ছিল। এই সুযোগে ভারত সম্পর্কে একটা অহেতুক ভীতি ও হিন্দু বিদ্বেষ উসকে দিয়ে গণ-অসন্তোষকে তীব্রতর করা এবং তা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে প্রয়োগের জন্য পাক-মার্কিন চক্র ঘৃণ্য কৌশল গ্রহণ করেছিল। বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময় চক্রান্তকারীরা যেসব মিথ্যাচার প্রচার করেছিল এসবের মধ্যে ছিল :
এক. ভারত বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংস করার মতলবে গোপনে বিপুল অঙ্কের জাল নোট বাজারে ছেড়েছে।
দুই. বাংলাদেশের শিল্পকারখানা, কলকবজা ভারতে পাচার করা হয়েছে।
তিন. বাংলাদেশের সব গাড়িকে পাচার করা হয়েছে।
চার. বাংলাদেশ হতে ৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ ভারতে স্থানান্তর করা হয়েছে।
পাঁচ. ভারতের সঙ্গে একটি গোপন চুক্তি স্বাক্ষর করে বঙ্গবন্ধু সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়েছে।
ছয়. বঙ্গবন্ধু ভারতের পুতুল সরকার এবং বাংলাদেশ ভারতের তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

প্রসঙ্গ ডাবল নোট

প্রথমেই আসা যাক ডাবল নোট প্রসঙ্গে। এ ব্যাপারটা একটু বিস্তারিত বলা প্রয়োজন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার ভারত থেকে টাকার নোট ছাপিয়ে নিয়েছিল। সে সময় দুটি ১০ টাকার নোটে রহস্যজনকভাবে একই নম্বর দেখা যায়। ঢাকার এক বিশেষ মহলে চতুর চক্রান্তের কারণে একশ্রেণির সংবাদপত্র ছবিসহ সেই সংবাদ প্রকাশ করে। আর যায় কোথায়! সংবাদপত্রে ওই খবর বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে একটা গুজব রটে গেল যে, ভারত ‘ডাবল নোট’ ছাপিয়ে বাংলাদেশের সব সম্পদ টেনে নিচ্ছে। বাংলাদেশ নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। এ দেশের যে অভাব-অভিযোগ, তা ওই ‘ডাবল নোট’-এর জন্যই। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে আওয়ামী লীগেরও একশ্রেণির সদস্য ওই প্রচারণায় ভুলে কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ওই কুৎসার আগুনে হাওয়া দিয়ে তা আরো উসকে দেয়।

এ পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর সরকার ভারতীয় নোট প্রত্যাহারের জন্য এক মাস সময় দেয়। এর ফলে নতুন করে রটানো হলো যে, ভারতীয় নোট প্রত্যাহারের জন্য দীর্ঘ সময় দেয়া হয়েছে। পাকিস্তানি নোট অচল ঘোষণায় মাত্র ৫ দিন সময় দেয়া হয়েছিল। আর ভারতীয় নোট প্রত্যাহারের জন্য প্রথমে ১ মাস ও পরে আরো ১৫ দিন সময় বাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল।

তাজউদ্দীন আহমদ


এই মিথ্যা অভিযোগের জবাবে অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বললেন, পাকিস্তানি নোটের ব্যাপারটা হলো ডিমনিটাইজেশন আর ভারতের টাকার ব্যাপারটা হলো উইথড্রয়াল। প্রথমটা হলো নির্দিষ্ট তারিখের পর অচল ঘোষণা আর পরেরটা হলো ভারতীয় সব টাকা প্রত্যাহার করে নেয়া। তিনি বললেন, ভারত থেকে মোট ৩৫০ কোটি টাকার নোট ছাপানো হয়েছে।
সত্যিই ভারত নির্দেশিত ৩৫০ কোটি টাকার নোট ছেপে বাজারে ছেড়েছে কি না, সেটা আমি জানতে চাই। লম্বা সময় দিলাম যাতে সব নোট জমা হতে পারে এবং আমরা প্রকৃত অবস্থায় বুঝতে পারি। ৩৫০ কোটি টাকার বেশি নোট হলেই আমরা ভারত সরকারকে দায়ী করে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারব।

১৯৭৩ সালের ৩১ মে ভারতে মুদ্রিত টাকা জমা দেয়ার তারিখ অতিবাহিত হলে দেখা গেল বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ইস্যুকৃত মোট অঙ্কের চাইতে ৫৩ লাখ ৬৪ হাজার ৪৮০ টাকা কম জমা পড়েছে। এতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, দ্বিগুণ ছাপা বা নোট ছাড়ার ব্যাপারটি সম্পূর্ণ গুজব। কিন্তু এ সত্ত্বেও এ নিয়ে কুৎসা রটাতে পাক-মার্কিন চক্রের উদ্যমে ভাটা পড়েনি। তখন তারা প্রচার শুরু করে, ‘সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে সত্য গোপন করছে। সহজ কথায় বললে বলতে হয়, সরকার কিল খেয়ে এখন কিল লুকোতে বাধ্য হচ্ছে।’ (তথ্যসূত্র : বাংলাদেশ ব্যাংক) 

মৈত্রী চুক্তি

১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় স্বাক্ষরিত হয় ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি। ইংরেজিতে এই চুক্তির শিরোনাম ‘The Indo-Bangla Treaty of Friendship, Cooperation and Peace’ অর্থাৎ ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী, সহযোগিতা ও শান্তিচুক্তি। বাংলাদেশের পক্ষে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তিতে ছিল ১২টি দফা। চুক্তিটি ২৫ বছর মেয়াদি হলেও নবায়নযোগ্য ছিল।

ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী, সহযোগিতা ও শান্তিচুক্তিতে  সই করছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধী 

এই চুক্তি নিয়ে উগ্র ডান ও বামপন্থী এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি অত্যন্ত জোরে প্রচার চালায় যে বঙ্গবন্ধুর সরকার ভারতের সঙ্গে একটি গোপন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বলে কিছু নেই, বাংলাদেশ ভারতের তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। বলা বাহুল্য, আন্তর্জাতিক বিশ্বে এমনি ধরনের প্রপাগান্ডা চালাচ্ছিল পাকিস্তান, সৌদি, চীন, মার্কিনসহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরও আজ পর্যন্ত খন্দকার মোশতাক, বিচারপতি সায়েম, জেনারেল জিয়া, আব্দুস সাত্তার, এইচ এম এরশাদ ও খালেদা জিয়া এসব বঙ্গবন্ধুবিরোধী শাসকেরা সেই কথিত গোপন চুক্তি জনসমক্ষে তুলে ধরতে পারেননি বা এমন কিছু তথ্য উপস্থাপন করতে পারেননি, যার ফলে জনগণ বুঝতে পারে সত্যিই এটা দেশবিরোধী চুক্তি ছিল। অথচ এই চুক্তিকে ‘গোলামি চুক্তি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বিএনপি-জামায়াত চক্র অতীতে যেমন অপরাজনীতি করেছে, তেমনি অদ্যাবধি সেই ধারাই অব্যাহত রেখেছে। ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সফরে এলে ২৫ বছরের বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধী

বলা বাহুল্য, এটা কোনো গোপন চুক্তি নয়, প্রকাশ্য চুক্তি, যা পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সহায়তা, সার্বভৌমত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অথচ এই প্রকাশ্য চুক্তিকেই গোপন চুক্তি বলে অপপ্রচার চালানো হয়েছিল। এই চুক্তি যদি দিল্লির নিকট দাসখত বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে বঙ্গবন্ধু পরবর্তী ‘দেশপ্রেমের ধ্বজাধারী শাসকেরা’ এই চুক্তি বাতিলে উদ্যোগ কেন নেননি? চুক্তিটি সম্পর্কে এখনো স্বাধীনতাবিরোধী চক্র অপপ্রচার করে থাকে।  বলা বাহুল্য, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও ভারতীয় সাধারণতন্ত্রের মধ্যে সম্পাদিত এই চুক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন-ভারতীয় চুক্তিরই অনুরূপ।

তিলকে তাল

বঙ্গবন্ধুর সময় ভারতের বিরুদ্ধে আরও একটি অভিযোগের কথা প্রচার করা হয়। এই অভিযোগ তখন মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে এবং ব্যাপকভাবে। তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কলকারখানাগুলো অচল করে ফেলার জন্য ভারতীয় সৈন্যরা সেগুলোর মূল্যবান সব যন্ত্রাংশ ভারতে নিয়ে যাচ্ছে। উদ্দেশ্য, বাংলাদেশের জিনিসপত্রের উৎপাদন বন্ধ করে সেখানে ভারতীয় দ্রব্যসামগ্রীর একটি বড় বাজার সৃষ্টি করা। এ ধরনের প্রচারণার আদৌ কোনো ভিত্তি নেই, বরং ষড়যন্ত্রকারীরা নিজেরাই এসব যন্ত্রাংশ সরিয়ে ভারতের ঘাড়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা করেছে। ষড়যন্ত্রকারীদের এ ধরনের কুকীর্তির একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন প্রয়াত সাংবাদিক জ্যোতি সেনগুপ্ত তাঁর ‘বাংলাদেশ : ইন ব্লাড অ্যান্ড টিয়ারস্’ বইয়ে। তিনি লিখেছেন, ‘খুলনা শহরের একটি মিলে স্থানীয় লোকজন ও কিছুসংখ্যক ভারতীয় সৈন্যের গোলমাল হচ্ছে। এ খবর পেয়ে আমার এবং আরও কয়েকজনের ঐ মিলে যাবার সুযোগ হয়। শেখ মুজিবের ছোট ভাই শেখ নাসেরের খুলনায় একটি ব্যবসা ছিল। তিনিই আমাদের মিলটি দেখিয়ে দেন। মিলের গেটে আমরা দেখলাম, ভারতীয় সৈন্যরা কজন স্থানীয় লোককে ধরেছে। তাদের (ওই স্থানীয় লোকদের রেশন ব্যাগে ওই মিলের কিছু কলকবজা, কিছু যন্ত্রাংশ। ভারতীয় সৈন্যদের অভিযোগ, ওইসব স্থানীয় লোক যখন মিলটির যন্ত্রাংশ চুরি করছিল, তখনই তাদের ধরা হয়। সে যা হোক, সর্বত্রই আমরা এই গল্পে শুনেছি যে ভারতীয় সৈন্যরা মিলের সব মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছে।’

কুচক্রীরা এইভাবেই ‘তিল’কেই ‘তাল’ বানিয়ে চারদিকে প্রচার করেছিল। আর বাংলাদেশের বহু মানুষ সেই মিথ্যার বেসাতিকেই সত্য বলে ধরে নিয়েছিল। তাদের মাথায় সেদিন এ কথাটা ঢোকেনি, সে দেশে একটি সরকার আছে। আছেন বঙ্গবন্ধুর মতো অসাধারণ জনপ্রিয় একজন নেতা। ভারতীয় সৈন্যদের লুটপাটের কাহিনি যদি সত্যি হতো, তাহলে কেউ চুপ করে বসে থাকতেন না।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রীর প্রতীক। তাই ভারত-বিরোধিতার মানেই পরোক্ষভাবে বঙ্গবন্ধুকে বিরোধিতা। সে জন্যই ষড়যন্ত্রকারীরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পটভূমি তৈরি করতে সুকৌশলে ভারতবিরোধী প্রচারণা শুরু করেছিল। 

লেখক : সম্পাদক, দৈনিক জাগরণ

[ বি.দ্র : পরবর্তী পর্ব প্রকাশ হবে আগামী ৩০ অক্টোবর, বুধবার। ] 

আরও পড়ুন