• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: নভেম্বর ১৪, ২০১৯, ০৯:৫৭ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ১৫, ২০১৯, ০৮:১০ এএম

মন্ত্রী অস্ট্রেলিয়ায় সচিব আয়েশে 

পেঁয়াজে নিষ্ক্রিয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়

মেহ্দী আজাদ মাসুম
পেঁয়াজে নিষ্ক্রিয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়
পেঁয়াজ

 সচিব কথা বললেন না গণমাধ্যমে 

সাক্ষাৎ পেতে অপেক্ষায় থাকতে হলো না নায়িকার 

‘পোঁয়াজের বাজার এখন নিয়ন্ত্রণে’ জাতীয় সংসদে শিল্পমন্ত্রীর দেয়া এমন বক্তব্যের ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে বৃহস্পতিবার (১৪ নভেম্বর) পেঁয়াজের দাম ২০০ টাকা ছাড়িয়েছে। তবে এ নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কোন মাথা ব্যথা নেই। নেই কোনো তৎপরতাও। মন্ত্রী টিপু মুনশি সেমিনারে অংশ নিতে অষ্ট্রেলিয়াতে। আর সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীনের এ বিষয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই। 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে পেঁয়াজের বিষয়টি সেই প্রবাদের মত... ‘রোম যখন পুড়ছিলো, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলো। ভারত রফতানি বন্ধ করে দেয়ার পর বাংলাদেশে ৩৮ টাকার পেঁয়াজ লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে ৮০ থেকে ৯০ টাকায় পৌঁছায়। পেঁয়াজের বাজার ঠিক রাখতে সরকারের নানা উদ্যেগের মাঝেই দাম বাড়তে থাকে। মিয়ানমারসহ কয়েকটি দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির মধ্যেই ৮০ এবং ৯০ টাকার পেঁয়াজ পৌঁছায় ১২০ টাকায়। এর পর আরো এক ধাপে তা ১৫০ টাকায় পৌঁছায়। আর সর্ব শেষ ১৫০ টাকা থেকে বুধবার রাতে বেড়ে খুচরা মূল্য ২০০ থেকে ২২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। 

এর এক দিন আগে (১২ নভেম্বর) বাণিজ্য মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহামুদ হুমায়ূন জানান, পেয়াঁজের বাজার এখন নিয়ন্ত্রণে আছে। অথচ সাধারণ মানুষের নিত্যপণ্যের অন্যতম পেঁয়াজের দাম এখন পৃথিবীর অন্য যে কোন দেশের চেয়ে বেশি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী শ্রীলঙ্কায় ১৬০ টাকা, পাকিস্তানে ১৪০ টাকা আর ভারতে ৬০-৬৫ টাকায় প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। যা বাংলাদেশে এখন খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ২২০ টাকা। অবশ্য পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দাম এর চেয়ে একটু কম। পেঁয়াজের বাজার যে সময় বিশ্বের অন্য দেশের তুলনায় সবচেয়ে ঊর্ধ্বগতি, ঠিক সেই সময়ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চলছে চরম স্থবিরতা। কারো কাছে নেই মন্ত্রণালয়ের কোন পদক্ষেপের তথ্য। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলরা কেউ কেউ এর দায় চাপাতে চাইছেন সিন্ডিকেটের ওপর। 

এরই মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রী টিপু মুনশি গত ১২ নভেম্বর রাতে একটি সেমিনারে অংশ নিতে পাড়ি জমিয়েছেন অষ্ট্রেলিয়াতে। সেখান থেকে তিনি যাবেন আর একটি সেমিনারে অংশ নিতে নিউজিল্যান্ডে। দেশে ফিরবেন ২১ নভেম্বর। অপরদিকে আজ (বৃহস্পতিবার) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীনকে সচিবালয়ে তার দফতরে দেখা গেছে আয়েশে সময় কাটাতে। পেঁয়াজের মূল্য ঊর্ধ্বগতি নিয়ে যত না তিনি ব্যস্ত ছিলেন, তার চেয়ে বেশি ব্যস্ত ছিলেন এক নায়িকাকে নিয়ে। সচিবালয় বিটের গণমাধ্যম কর্মীরা দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় থেকেও সাক্ষাৎ পাননি সচিবের। তবে এই নায়িকাকে সচিবের সাক্ষাৎ পেতে অপেক্ষায় থাকতে হয়নি ১ মিনিটও। অনেক চেষ্টা করেও গণমাধ্যম কর্মীরা জানতে পারেননি পেঁয়াজের মূল্য ঊর্ধ্বগতির বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে কোনো পদক্ষেপ আছে কি-না? তবে সচিবের একান্ত সচিব (পিএস) জানান, পেঁয়াজের বিষয়ে তার (সচিব) কাছে কোন আপডেট নেই। সে কারণেই তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন না। আপডেট জানতে হলে মন্ত্রী টিপু মুনশির জন্য অপেক্ষা করতে হবে, পরামর্শ পিএসের। দু’দিন আগে শিল্পমন্ত্রীর পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে আছে দাবি করার পর দাম বেড়ে ২২০ টাকায় ঠেকেছে বলে অনেকে মনে করছেন। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে স্বল্পআয়ের মানুষ। অবস্থা এমন যে, বাজার থেকে শুরু করে অফিস-আদালত সব জায়গায় এখন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘পেঁয়াজ’। যারা আগে বাজারে গিয়ে দুই কেজি পেঁয়াজ কিনতেন তারা এখন কিনছেন এক কেজি। 

দেশের ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, ভারতীয় পেঁয়াজ না আসা পর্যন্ত দাম বাড়বে। যদিও দেশটি থেকে পুরনো ও সংশোধিত ঋণপত্রের (এলসি) পেঁয়াজ ছাড়ের বিষয়ে আগামীকাল শুক্রবার সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে ব্যবসায়ী সূত্রে জানা গেছে। তবে এই ব্যবসায়ী পেঁয়াজ সিন্ডিকেটকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য সরকারকেই দায়ি করেন। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ে যত হাক-ঢাক, তা ছিলো ঘোষণা আর কাগজে-কলমে। সবাই ছিলো লোক দেখানো। পেঁয়াজের মূল্য ঊর্ধ্বগতির বিষয়ে সাবেক বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে তিনি এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনে লাফিয়ে লাফিয়ে পেঁয়াজের দাম বাড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সরকার দলীয় সিনিয়র সংসদ সদস্যরা। এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি তারা পেঁয়াজ আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। কেউ আবার এটিকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন।

সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিষয়টির অবতারণ করেন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম। এরপর আলোচনায় অংশ নেন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও বর্তমানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি তোফায়েল আহমেদ, সাবেক চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ ও বিরোধী দল জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

বাণিজ্য ও অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, এত সুদক্ষ একটি মন্ত্রিসভা, তার দু’জন মন্ত্রী এখানে আছেন। তাদের অনুরোধ করতে চাই। পেঁয়াজের ঝাঁজ বেশি হয়ে গেছে। জনগণের মধ্যে একটা রিঅ্যাকশন হচ্ছে। আজকে পর্যন্ত যে খবর আছে প্রায় ২০০ টাকা হয়ে গেছে পেঁয়াজের কেজি। আমরা এতো জনপ্রিয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে কাজ করে যাচ্ছি। কি কারণে প্রতিদিন বেড়ে যাচ্ছে পেঁয়াজের দাম? বাণিজ্যমন্ত্রী যখন সংসদে বলেন ১০০ টাকার নিচে নামবে না, তখন তো ব্যবসায়ীরা সুযোগ পেয়ে যায়। তাই অনুরোধ করব প্রয়োজনে বিদেশ থেকে আমদানি করছেন বলেছেন। তারপরেও কেন দাম বাড়ছে? ব্যাপারটা বোধগম্য না। এতে আমাদের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ভারতে গিয়ে বলেছিলেন পেঁয়াজের ঝাঁজ বেড়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ করেছিলেন পেঁয়াজের রফতানি বন্ধ করবেন না। পেঁয়াজের ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
 

এমএএম/বিএস