• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: নভেম্বর ১৫, ২০১৯, ০৮:৩৩ এএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ১৫, ২০১৯, ০৮:৩৩ এএম

ট্রেন চালক ও পয়েন্টম্যানের ভুলে ঘটছে দুর্ঘটনা 

হালিম মোহাম্মদ 
ট্রেন চালক ও পয়েন্টম্যানের ভুলে ঘটছে দুর্ঘটনা 
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুই ট্রেনের সংঘর্ষ

ট্রেন চালক ও পয়েন্টম্যানের সিগন্যালে ভুল পথে যাওয়ার কারণে এভাবে প্রাণ দিতে হচ্ছে মানুষকে। একের পর এক রেল দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। এ সকল রেল দুর্ঘটনার সিংহভাগই সিগন্যাল ভুল অথবা লাইনের সংস্কার না হওয়ায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ছোট বড় রেল দুর্ঘটনা ঘটছে। পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে আছেন অগণিত মানুষ। এর শেষ কোথায় ? এর সুনিদ্দিষ্ট উত্তর কেউ দিচ্ছেন না। 

ট্রেন নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রেন দুর্ঘটনা এড়াতে তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে অন্যতম হলো ডাবল লাইন নির্মাণ, ঝুঁকিপূর্ণ লেবেল ক্রসিংগুলোতে লোকবল নিয়োগ দেয়া ও ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে যুক্তদের সচেতন হয়ে কাজ করা। মূলত এই তিন কারণেই রেলপথে বড় বড় সব দুর্ঘটনা ঘটছে। 

এবিষয়ে বেসরকারি সংগঠন নৌ সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির পর্যবেক্ষণে এসব দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির পেছনে ছয়টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে, মোবাইল ফোনে আলাপরত অবস্থায় রেলপথ পারাপার রেলপথ সংলগ্ন এলাকায় চলাচলের ক্ষেত্রে পথচারীদের সচেতনতার অভাব, রেলওয়ের অনুমতি ছাড়াই অপরিকল্পিত ও অবৈধ লেবেল ক্রসিং (রেলক্রসিং) নির্মাণ, রেলপথ ক্রসিংগুলোর (সড়ক ও রেলপথের সংযোগ স্থল) কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে গাফিলতি, কিছুসংখ্যক রেলসেতুসহ অনেক স্থানে রেলপথ দীর্ঘদিন সংস্কার না করা এবং দূরপাল্লার ট্রেনগুলোর চালকদের অসতর্কতা। 

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে রংপুর এক্সপ্রেস উল্লাপাড়া রেলস্টেশনে দুই নম্বর লাইন দিয়ে স্টেশনে ঢোকার কথা ছিল। কিন্তু দায়িত্বরত স্টেশন পয়েন্ট ম্যান এক নম্বর লাইনে সিগন্যাল দিয়ে দেন। এতে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়। এসময় তেলের ট্যাংকি ফেটে বগিতে আগুন লেগে যায়। তিনি বলেন, ট্রেনকে এক লাইন থেকে অন্য লাইনে নেওয়ার জন্য যিনি দায়িত্বে থাকেন তাকে পয়েন্ট ম্যান বলে। তিনি হয়তো ঠিকমতো তার দায়িত্ব পালন করেননি। ফলে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। 

এবিষয়ে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেছেন, রেল বিভাগের অবহেলা ও দীর্ঘদিনের পুরনো লাইনের সংস্কারের অভাবে এ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দ্রুত সময়ে জীর্ণ রেল লাইন ও ব্রিজগুলো সংস্কারের ব্যবস্থার উদ্যেগ নেয়া হবে। 

একই ভাবে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী তূর্ণা নিশীথা ও সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেসের দুর্ঘটনার জন্য সাধারণত দুটি কারণকে দায়ী করছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। 

তারা মনে করছেন, দুর্ঘটনার পেছনে বড় যে দুটি কারণ থাকতে পারে তার একটি হচ্ছে তূর্ণা নিশীথা এক্সপ্রেসকে সিগন্যাল দেয়া হয়নি বা পরে দেয়া হয়েছে। অন্যটি হচ্ছে তূর্ণা নিশীথা এক্সপ্রেস ট্রেনের চালক হয়তো ঘুমিয়ে ছিলেন তাই সিগন্যাল দেখেননি। এই দুটির কোন একটির কারণেই মন্দবাগ স্টেশনের কাছে উদয়নকে ধাক্কা দেয় তূর্ণা নিশীথা। এঘটনায় ১৬ জন প্রান হারিয়েছেন। আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন অর্ধশতাধিক ব্যক্তি। 

পেছনের রেকর্ড থেকে জানা যায়, দেশে সবচেয়ে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে ১৯৮৯ সালে টঙ্গীতে। ওই ঘটনায় প্রাণ হারান ১৭০ জন। আহত হয়েছিল চার শতাধিক মানুষ। ৩০ বছর আগে সেই দুর্ঘটনাও ছিল দুটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণে। এরপর চট্টগ্রাম লাইনে কয়েকটি মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনায় প্রাণ যায় শতাধিক যাত্রীর। যাত্রীকল্যাণ সমিতি ও রেল নিয়ে যারা গবেষণা করেন তারা বলছেন, সিগন্যালের দুর্বলতায় মুখোমুখি সংঘর্ষে ও লাইনচ্যুতির কারণে প্রাণ গেছে যে সহস্ত্রাধিক মানুষের। আর স্প্যান ভেঙ্গে পড়ে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাটি ঘটে ১৯৮৩ সালের ২২ মার্চ ঈশ্বরদীতে। সেতুর স্প্যান ভেঙ্গে কয়েকটি বগি নিচে শুকনা জায়গায় পড়ে যায়। এ দুর্ঘটনায় ৬০ জন যাত্রী নিহত হন। পেছনের হিসাব বলছে, চট্টগ্রাম রেললাইনে গত ৩০ বছরে কয়েকটি রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। ১৯৮৯ সালে ২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের কাছাকাছি রেল লাইনচ্যুত হয়ে ১৩ জন নিহত ও ২০০ জন আহত হন। এই একই লাইনে ২০১০ সালে চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর ট্রেন মহানগর গোধূলী ও ঢাকাগামী মেইল চট্টলা এক্সপ্রেসের মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। এ ঘটনায় চট্টলা রেলের একটি বগি মহানগর রেলের ইঞ্জিনের ওপরে উঠে যায়। সেই দুর্ঘটনায় চালকসহ মোট ১২ জন নিহত হয়েছিলেন। 

এছাড়া উত্তরবঙ্গেও বেশকিছু রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে হিলি ট্র্যাজেডি নামে পরিচিত ১৯৯৫ সালের ১৩ জানুয়ারি গোয়ালন্দ থেকে পার্বতীপুরগামী ৫১১ নম্বর লোকাল ট্রেন দুর্ঘটনা। এ ঘটনায় পার্বতীপুরগামী ট্রেনটি হিলি রেলস্টেশনের এক নম্বর লাইনে এসে দাঁড়ায়। এর কিছুক্ষণ পর সৈয়দপুর থেকে খুলনাগামী আরেকটি আন্তঃনগর সীমান্ত এক্সপ্রেস একই লাইনে ঢুকে পড়ে। এসময় মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটলে অর্ধশতাধিক যাত্রী নিহত হন। 

এবিষয়ে ২০১৮ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক জাতীয় সংসদে গত ৮ বছরে রেল দুর্ঘটনার একটি পরিসংখ্যান দিয়েছিলেন। তার দেয়া তথ্য মতে, ২০০৯-১০ থেকে ২০১৬-১৭ সাল পর্যন্ত ৮ অর্থবছরে ১ হাজার ৩৯১টি রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৫৮৬ জন । 

তৎকালীন রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক জানান, ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত মোট এক হাজার ৯৩টি রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৬ কোটি ৫৫ লাখ ৪৮ হাজার ৮৬৪ টাকা। দশম জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা জানান। সাবেক এই রেলপথমন্ত্রী জানান, সমগ্র বাংলাদেশে রেলওয়েতে লাইনচ্যুতিসহ মেইন লাইন ও শাখা লাইনে ২০০৯-১০ সালে ৩০৮টি, ২০১০-১১ সালে ২২৪টি, ২০১১-১২ সালে ১৮২টি, ২০১২-১৩ সালে ১৭৬টি এবং ২০১৩-১৪ সালে মোট ২০৩টি দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৫২ জন এবং আহত হয়েছেন ৩৮৬ জন। এসব দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাড়ায় প্রায় ১৬ কোটি ৫৫ লাখ ৪৮ হাজার ৮৬৪ টাকা। 

এইচ এম/বিএস