• ঢাকা
  • সোমবার, ০৯ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: নভেম্বর ১৯, ২০১৯, ০৯:৫০ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ১৯, ২০১৯, ১০:০১ পিএম

প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান অপরিবর্তিত

তবুও ‘কার্যত’ বন্ধ শুদ্ধি অভিযান!

হাসান শাফিঈ
তবুও ‘কার্যত’ বন্ধ শুদ্ধি অভিযান!
শেখ হাসিনা - ফাইল ছবি

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবস্থান না বদলালেও ‘কার্যত’ বন্ধ হয়ে গেছে বহুল আলোচিত ‘শুদ্ধি অভিযান’। গত ১৮ সেপ্টেম্বর যুবলীগ দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে যে অভিযানের শুরু, তা মাত্র দু’ মাসের ব্যবধানেই ঝিমিয়ে পড়েছে। গত ৩১ অক্টোবর কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জুকে গ্রেফতারের পর প্রায় তিন সপ্তাহ পার হতে চললেও নতুন কোনো অভিযান হয়নি। যদিও এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্তত ৬ বার অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনার পরও নতুন অভিযান না হওয়ায় চারদিকে চলছে এক ধরনের গুঞ্জন- অভিযুক্তরা এরইমধ্যে সব ‘ম্যানেজ’ করে ফেলেছে! আর এ কারণেই আত্মগোপনে থাকা রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রভাবশালীরা ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসছেন। যোগাযোগ বাড়িয়ে দিয়েছেন সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপি ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যদের সঙ্গে। সরব হচ্ছেন দলীয় কর্মকাণ্ডে। ফলে অভিযান নিয়ে আশাবাদী হয়ে ওঠা সাধারণ মানুষের আশাভঙ্গ ঘটছে। তাদের মধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে হতাশা। যদিও আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এই মুহূর্তে কাউন্সিলকেন্দ্রিক ব্যস্ততা থাকায় আপাতত বড় কোনো অভিযান হচ্ছে না। কাউন্সিলের পর ফের জোরদার হবে দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযান। আর তা শুরু হবে তৃণমূল থেকে।

শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর গত ২৫ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে প্রথমবারের মতো এ নিয়ে মুখ খোলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে থাকা প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, দোষীদের গ্রেফতারে কারও পারমিশন লাগবে না, শুদ্ধি অভিযান চলবে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার অন্তত দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী কথা বলেন। কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পুলিশের আইজিপি ড. জাভেদ পাটোয়ারী ও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গেও। এসব ফোনালাপে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিনা অভিযোগে কাউকে হয়রানি করা যাবে না। কিন্তু যার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকবে তিনি যেই হোন না কেন, তাকে গ্রেফতার করতে কারও পারমিশন লাগবে না। এ ব্যাপারে কেউ যদি তদবির করে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন তিনি।

২৯ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চলবে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে কেউ অখুশি হলেও কিছু করার নেই। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে দল ও সমাজে যেন ক্ষতিকর প্রভাব না পড়ে সেজন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান। এ অভিযান চলছে এবং চলবে।

প্রকল্প প্রস্তুতি থেকে শুরু করে প্রকল্পের কাজ পাওয়ার জন্য অর্থ বিতরণের সুযোগ নিয়ে কিছু লোক বিপুল সম্পদের মালিক বনে যাচ্ছে। এই অর্থ চটের বস্তাতেও লুকিয়ে রাখা হচ্ছে এবং ওয়ান ইলেভেনের পট পরিবর্তনের পর আমরা এটা দেখেছি। ওয়ান ইলেভেনের মতো ঘটনা আর পুনরাবৃত্তি হবে না।

শেখ হাসিনা বলেন, প্রকল্প প্রস্তুতি থেকে শুরু করে প্রকল্পের কাজ পাওয়ার জন্য অর্থ বিতরণের সুযোগ নিয়ে কিছু লোক বিপুল সম্পদের মালিক বনে যাচ্ছে। এই অর্থ চটের বস্তাতেও লুকিয়ে রাখা হচ্ছে এবং ওয়ান ইলেভেনের পট পরিবর্তনের পর আমরা এটা দেখেছি। ওয়ান ইলেভেনের মতো ঘটনা আর পুনরাবৃত্তি হবে না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যদি কোনো অনিয়ম থেকে থাকে, আমি ব্যবস্থা নেব এবং সে যেই হোক না কেন, এমনকী তারা আমার দলের হলেও। যদি আমি দুর্নীতিবাজদের শাস্তি দিতে চাই, আমার ঘর থেকেই তা আগে শুরু করতে হবে।

সাংবাদিকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা যে আরও কত দূর যাবে, সেটা আপনারা অপেক্ষা করেন এবং দেখেন। তবে এটা যখন ধরেছি, ভালোভাবেই ধরেছি। কাজেই এটা অব্যাহত থাকবে, এটুকু আশ্বস্ত করতে পারি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিছু লোক অভিযানের কারণে আমার ওপর অখুশি, কিন্তু, আমি এটার পরোয়া করি না কারণ আমার ক্ষমতা এবং সম্পদের প্রতি কোনো মোহ নেই।

২ অক্টোবর নিউ ইয়র্কে ভয়েস অব আমেরিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঝুঁকি আছে, তারপরও অভিযান চলবে। আমার দলের কে কী সেটা আমি দেখতে চাই না। অনিয়ম-দুর্নীতি যেখানে আছে আমাদের দেশকে ফাঁকি দিয়ে যারা কিছু করতে চাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

উন্নয়ন ধ্বংসের উইপোকাদের আটক করতে হবে। দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত সে যেই হোক না কেন, এখানে দল-মত আত্মীয়-পরিবার বলে কিছু নেই। যারাই এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। 

জাতিসংঘ থেকে দেশে ফিরে গত ৩ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার কার্যক্রম উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী। এ অনুষ্ঠানেও দুর্নীতিবিরোধী চলমান অভিযানে কোনো ছাড় দেয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন। শেখ হাসিনা বলেন, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদক, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছি। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। যারাই এর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। উন্নয়ন ধ্বংসের উইপোকাদের আটক করতে হবে। দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত সে যেই হোক না কেন, এখানে দল-মত আত্মীয়-পরিবার বলে কিছু নেই। যারাই এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জীবনকে বাজি রেখেই আমি কাজ করে যাচ্ছি। আমরা চলতি বাজেটে ১৭৩ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছি। দুর্নীতিবাজ উইপোকারা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকালে অর্থ লুটে নিচ্ছে। দেশের উন্নয়নের জন্য জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের প্রতিটি পয়সার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতের জন্য আমাদের ওইসব উইপোকাকে আটক করতে হবে।

২০ অক্টোবর সন্ত্রাস, দুর্নীতি, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কোনো ধরনের অন্যায় বরদাশত করা হবে না। যুবলীগের সপ্তম কংগ্রেস উপলক্ষে সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা গণভবনে সাক্ষাৎ করতে গেলে প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই অবস্থানের কথা জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, আমরা সন্ত্রাস-দুর্নীতি-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখব। অপরাধীর কোনো ক্ষমা নেই। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। কারণ আমরা যখন দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, তখন স্বাভাবিকভাবে কিছু মানুষের ভেতরে লোভের সৃষ্টি হয়। এতে সমাজটাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। সেজন্য অন্যায়-অবিচার কখনো বরদাশত করা হবে না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবাই ভালো থাকুক, স্বাবলম্বী হোক- এটা আমরা চাই। কিন্তু অন্যায়ভাবে কেউ যদি কিছু করে তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া একান্ত অপিরহার্য বলে মনে করি।

তিনি বলেন, যখন একটি পরিবর্তন আসে, কিছু মানুষ হঠাৎ করে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যায়। আর কিছু মানুষ গরীব থেকে যায়। এই আয় বৈষম্য যেন না থাকে সেদিকে দৃষ্টি রেখে এগোচ্ছে সরকার। গ্রামের তৃণমূলের একজন মানুষও যেন ভালো থাকে মানুষের সেই সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিই আমাদের লক্ষ্য।

শুদ্ধি অভিযান চলবে জানিয়ে ২৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি বিরোধী অভিযান আইওয়াশ নয়। অপরাধী যে দলেরই হোক, অন্যায় করলে শাস্তি নিশ্চিত পেতে হবে। আজারবাইজান সফর শেষে গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে দলেরই হোক না কেন, অপকর্মে জড়িত কেউই ছাড় পাবে না। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নিজ দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, না কি অন্যান্য খাতেও চলবে- এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সময় বলে দেবে। ক্রাইটেরিয়া ঠিক করে তো ধরা হচ্ছে না। যখন যেটা পাওয়া যাচ্ছে, তখন সেটাকে ধরা হচ্ছে। ধরার পরে পাওয়া যাচ্ছে কে কী। কাজেই অভিযান যখন চলছে তখন তার মধ্যে দিয়ে যখন যেটা বের হবার, বের হবে। অপরাধী অপরাধীই, দলও নাই, তার কিছু নেই। কাজেই অপরাধ করুক, অবশ্যই আমরা ধরব।

সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন করে তা দিয়ে বিলাসবহুল জীবন-যাপন, ফুটানি-ফাটানি কখনও এ দেশের মানুষ বরদাশত করবে না। অসৎ পথে উপর্জিত অর্থ দিয়ে বিরিয়ানি খাওয়ার থেকে সৎ পথে উপর্জিত অর্থে নুন-ভাত খাওয়া অনেক সম্মানের।

১৪ নভেম্বর জাতীয় সংসদে দেয়া বক্তব্যেও প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তর থেকে অপরাধ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত চলবে। অপরাধী যে-ই হোক, দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে অনুসন্ধানপূর্বক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে এ কথা বলেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, ক্যাসিনো ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ যেন কেউ করতে না পারে, সেজন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযানের পাশাপাশি কঠোর গোয়েন্দা নজরদারিও অব্যাহত রয়েছে। সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। দুর্নীতির বিষবৃক্ষসম্পূর্ণ উপড়ে ফেলে দেশের প্রকৃত আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য একটি সুশাসনভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ক্যাসিনো, জুয়া, মাদক, দুর্নীতিসহ সব ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এরইমধ্যে ক্যাসিনো, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের সঙ্গে জড়িত সব ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮, অস্ত্র আইন-১৮৭৮, বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪সহ অন্যান্য প্রযুক্তি আইনে মামলা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ যেন কেউ করতে না পারে, সেজন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযানের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও অব্যাহত রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। দুদক দুর্নীতিবিরোধী অভিযান অর্থাৎ দুর্নীতি অনুসন্ধানে তদন্ত ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১০ বছরে দুদক ১৩ হাজার ২৩৮টি অভিযোগের অনুসন্ধান, ৩ হাজার ৬১৭টি মামলা রুজু ও ৫ হাজার ১৭৯টি চার্জশিট দাখিল করেছে।

তিনি বলেন, তাৎক্ষণিক দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালনার জন্য দুদকের এনফোর্সমেন্ট ইউনিট সদা তৎপর রয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ওই ইউনিট সারা দেশে জেলা, উপজেলা, পৌরসভা এমনকী ইউনিয়ন পর্যায়ে বিভিন্ন দফতরে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করছে। এছাড়া আসামি গ্রেফতারে অভিযান পরিচালনা করে আসছে। ২০১৯ সালে এ পর্যন্ত দুদক ১৬টি ফাঁদ মামলা করেছে। ৬৮ জন আসামি গ্রেফতার করেছে। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে দুদক ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন ব্যক্তির সম্পদের তথ্য চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন দফতরে চিঠি দিয়েছে।

সবশেষ ১৬ নভেম্বর (শনিবার) সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বেচ্ছাসেবক লীগের জাতীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে দুর্নীতি, মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে অভিযান চলছে, তা অব্যাহত থাকবে। কেন দুর্নীতি করে টাকা বাড়াতে হবে? সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন করে তা দিয়ে বিলাসবহুল জীবন-যাপন, ফুটানি-ফাটানি কখনও এ দেশের মানুষ বরদাশত করবে না। অসৎ পথে উপর্জিত অর্থ দিয়ে বিরিয়ানি খাওয়ার থেকে সৎ পথে উপর্জিত অর্থে নুন-ভাত খাওয়া অনেক সম্মানের।

১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে প্রথম ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। একের পর এক ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান চালাতে থাকে র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর সাধারণ মানুষ নিজ থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অনিয়ম-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের তথ্য দিতে থাকে। তাদের তথ্য গোয়েন্দারা তদন্ত করে সত্যতা পায়।

ক্যাসিনো ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু থেকে নিয়মিত চললেও মাঝে এসেছে ধীরগতি। সবশেষ ৩১ অক্টোবর র‌্যাবের অভিযানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জুকে গ্রেফতার করা হয়। ওই অভিযানের পর ১৯ দিন পার হয়েছে। এখন অভিযানে ধীরগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তাদের কাছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে। সেগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত কার্যক্রম শেষ হলেই পুরোদমে আবার শুরু হবে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান।

র‌্যাবসহ আইনশৃখলা বাহিনীর একটি সংস্থার নথি পর্যালোচনা করে জানা যায় যায়, গত ২ মাসে মোট ৫০ ক্যাসিনো ও দুর্নীতি বিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি র‌্যাবের। বাকি ২০টি পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার। ১টি অভিযান রয়েছে মাদকদ্রর‌্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের। ঢাকায় ৩০টি ও চট্টগ্রামের মোট ১১টি ক্লাবে অভিযান চালানো হয়। ৫০টি অভিযানে গ্রেফতার হয়েছেন ২৭৫ জন। এর মধ্যে ২২৩ জন ঢাকায়। আর বাকি ৫৩ জন ঢাকার বাইরের জেলাগুলোয়। গ্রেফতার হওয়াদের মধ্যে অধিকাংশ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ২ জন, ঢাকার ৩ কাউন্সিলর, যুবলীগের ৬ জন ও কৃষক লীগের ১ জন। সরকার ও দুদক কর্তৃক দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আছে ৩৪ জনের বিরুদ্ধে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, অভিযানে ৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা নগদ, ১৬৬ কোটি টাকার এফডিআর, ১৩৩টি বিভিন্ন ব্যাংকের চেক, ৮ কেজি সোনা, ২৭টি অস্ত্র এবং সাড়ে ৪ হাজার বোতল মদ উদ্ধার করা হয়। অভিযানের ৫টি মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করেছে পুলিশ। অভিযান শুরু হওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশন এরইমধ্যে প্রভাবশালী ২৩ ব্যক্তি ও তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬০০ ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়েছে। এছাড়া আরও ৫০০ ব্যক্তির বিষয়ে তদন্ত চলমান রেখেছে দুদকসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সংস্থা। ওই ৫০০ বক্তির মধ্যে রয়েছেন সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তাসহ আরও অনেকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত অভিযানের বড় অংশই চালানো হয়েছে ঢাকায়। তবে সামনে এ অভিযান জেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। মাঠপর্যায়ে যারা অল্প সময়ে দুর্নীতি করে হঠাৎ ফুলেফেঁপে উঠেছেন তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে।  এ ছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি কার্যালয়ে দুর্নীতির যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে তা ভেঙে দিতে উদ্যোগ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কারা বিদেশে টাকা পাচার করেছে তাদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। শিগগিরই সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় এনে বিদেশে পাচার হওয়া টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হবে।

এইচএস/ এফসি

আরও পড়ুন