• ঢাকা
  • সোমবার, ০৯ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২, ২০১৯, ০৩:১৬ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : ডিসেম্বর ২, ২০১৯, ০৫:১১ পিএম

২২ বছরেও অধরা পাহাড়ের শান্তি

এস এম সাব্বির খান
২২ বছরেও অধরা পাহাড়ের শান্তি

পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২২ বছর পূর্তি

...........

সংঘর্ষ, সংঘাত, সহিংসতা, রক্তপাত—  স্বাধীন বাংলাদেশের পথচলায় সুদীর্ঘ ৪৮ বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু আজও এমনটাই রয়ে গেছে দেশের প্রধান চার পাহাড়ি অঞ্চল। আজও সেখানে অভিন্ন জাতিসত্ত্বার ঐক্য গড়ে ওঠেনি।প্রতিষ্ঠিত হয়নি শান্তি। চলমান অস্থিতিশীলতার কারণেই প্রাকৃতিক সম্পদ, নৈসর্গিক প্রাচুর্য আর নৃতাত্ত্বিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির যে অবারিত সম্ভাবনা রয়েছে দেশের পার্বত্য অঞ্চলে তা আজও যেমন দেশের উন্নয়নে পুরোপুরিভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। তেমনি দেশের একটি বৃহৎ মানবসম্পদের একটি বড় অংশকে সংযুক্ত করা সম্ভব হয়নি প্রগতিশীল বাংলাদেশের উন্নয়নের মূলধারায়।

১৯৭৩ সালে যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার যে দুঃসাধ্য কাজ হাতে নিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তখনই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল পার্বত্যাঞ্চলকে মূলধারায় সন্নিবেশিত করার। কারণ পার্বত্যাঞ্চল কোনও বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড নয় বরং স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশেরই অংশ। কিন্তু ১৯৭৫ সালের সেই কলঙ্কময় কালরাত্রিতে জাতির পিতারনৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের যে স্বপ্নকে ব্যাহত করা হয়, তার কষাঘাত থেকে ছাড় পায়নি পার্বত্য বাংলাদেশও।

সোমবার (২ ডিসেম্বর) পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২২ বছর পূর্তি। ১৯৯৭ সালের এদিন সরকার ও জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে সই হয় ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি। ঐতিহাসিক এ চুক্তির পর খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে শান্তিবাহিনীর শীর্ষ গেরিলা নেতা সন্তু লারমা তার বিপুলসংখ্যক সহযোগী নিয়ে অস্ত্র-সমর্পণের মধ্য দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। সরকার তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ প্রদান করে। তবে বহু কাঙ্ক্ষিত এই চুক্তির সব ধারা বাস্তবায়ন নিয়ে রয়ে গেছে বিতর্ক। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির পক্ষ থেকে চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়ার জন্য সরকারকেই দায়ী করা হচ্ছে। অন্যদিকে সরকার বলছে, শান্তির জন্য অস্ত্র সমর্পণের শর্ত তারা গত ২২ বছরেও পূরণ করেনি। শান্তিচুক্তির এই দুই পক্ষের দাবি পরস্পরবিরোধী হলেও পাহাড়ে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় শান্তি যে ফেরেনি, তা নিয়ে তেমন মতভেদ নেই।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পাহাড়িদের সশস্ত্র সংগ্রামের পথ ছেড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করার কথা। অথচ চুক্তির ২২ বছর পরও পাহাড়ে শান্তি ফেরেনি। উল্টো আরও তিনটি সশস্ত্র আঞ্চলিক দলের উত্থান ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে চার সংগঠনের কাছে পার্বত্যাঞ্চল জিম্মি হয়ে পড়েছে। পাহাড়ে বসবাসকারী শান্তিপ্রিয় মানুষকে জিম্মি করে চাঁদাবাজি, আধিপত্য এবং কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সংগঠনগুলোর মধ্যে খুনোখুনি চলছেই। চাঁদার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে সর্বশেষ রাঙামাটিতে গুলি করে হত্যা করা হয় জেএসএসের (মূল) আঞ্চলিক চিফ কালেক্টর বিক্রম চাকমাকে।

গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের তথ্য মতে, পার্বত্যাঞ্চলে চারটি সশস্ত্র সংগঠন প্রতিবছর প্রায় ৪০০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে। সরকারি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত ঠিকাদারদের মূল বাজেটের ১০ শতাংশ হারে চাঁদা দিতে হয় তাদের। এ অর্থ দিয়েই সংগঠনগুলো সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা, লবিং এবং অস্ত্র সংগ্রহ করে থাকে।

সংগঠন চারটি হলো- জেএসএস (সন্তু), জেএসএস (এমএন লারমা), ইউপিডিএফ (প্রসিত) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)।

সূত্র জানায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন উপদলীয় সংঘাতের জেরে গত ৫ বছরে ২০৭ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ১১৪ জনই ছিল বাঙালি। চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম ১০ মাসে ১৪ জন বাঙালিসহ নিহত হয়েছে ৫৬ জন। সেই সঙ্গে প্রশাসন উদ্ধার করেছে বিশাল অস্ত্রের মজুদ। এর মধ্যে রয়েছে ৫৪টি রকেট লঞ্চার, ৬৪১টি এসএমজি ও বিভিন্ন ধরনের রাইফেল ৫৯৪টি ও চার শতাধিক দেশি পিস্তল ও বন্দুক। এছাড়া হাত বোমা ও মর্টার শেল রয়েছে কয়েকশ। 

গোয়েন্দাদের দাবি, জেএসএস (মূল) এবং ইউপিডিএফের (মূল) কাছে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র রয়েছে। এ সংগঠনগুলো বছরে ৪০০ কোটি টাকার ওপরে চাঁদা তুলে। ঠিকাদারি ব্যবসা, জিপ চালানো, নৌকা, ট্রলার, বনের কাঠ, পাথর উত্তোলন থেকে শুরু করে সব ধরনের ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম থেকে চাঁদা তোলা হয়।

পাহাড়ে বিভিন্ন সংঘাতে গত ছয় বছরে ৩২১ জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর ২০৭ জন এবং বাঙালি ১১৪ জন। এর মধ্যে ২০১৪ সালে ৫৪ জন, ২০১৫ সালে ৬৯ জন, ২০১৬ সালে ৪১ জন, ২০১৭ সালে ৩৩ জন, ২০১৮ সালে ৬৮ জন এবং ২০১৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৫৬ জন খুন হয়েছেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির শীর্ষ নেতা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার জন্য সরকারকেই দায়ী করে আসছেন।

রোববার (১ ডিসেম্বর) আয়োজিত এক সম্মেলনে তিনি বলেন, সরকার জুম্ম জাতিগুলোকে চিরতরে নির্মূলকরণের হীন উদ্দেশে যুগপৎ বাঙালিকরণ ও ইসলামীকরণের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করে চলেছে। 

তার অভিযোগ, সরকার চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন করেনি। পাহাড়ে এখনও অস্ত্রবাজি, খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজি হচ্ছে। আর এর প্রধান শিকার হচ্ছে পাহাড়ের সাধারণ অধিবাসীরা।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আধিপত্যের লড়াইয়ে পার্বত্য অঞ্চলের চার আঞ্চলিক সংগঠনের সদস্যদের রক্ত ঝরছে প্রায় প্রতিদিন। রোববারও চাঁদার টাকার ভাগ-বাটোয়ারাকে কেন্দ্র করে জনসংহতি সমিতির চিফ কালেক্টর বিক্রম চাকমা গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।

সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানায়, চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়নের কাজ শেষ হয়েছে। ১৫টি ধারার আংশিক বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ৯টি ধারা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য জেলাগুলোর প্রশাসনিক ৩৩ বিভাগের মধ্যে ১৭টি বিভাগ জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করেছে সরকার।

গত ২০ বছরের বেশি সময় ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন সন্তু লারমা। নিয়মিত নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও ১৯৯৯ সালের ২৭ মে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর পর থেকে আজ অবধি আঞ্চলিক পরিষদে কোনও নির্বাচন হয়নি। কোন ক্ষমতাবলে দুই দশক ধরে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ সন্তু লারমা আঁকড়ে ধরে রয়েছেন, তা জানার আগ্রহ রয়েছে পার্বত্যাঞ্চলের বাসিন্দাদের।

অভিযোগ রয়েছে, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়া সত্ত্বেও সন্তু লারমা কখনই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, জাতীয় শোক দিবস, বিজয় দিবসসহ কোনও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান পালন কিংবা তাতে যোগদান করেন না। আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদটি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাপূর্ণ। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও ভোটার হওয়া এবং জাতীয় পরিচয়পত্র গ্রহণে তার আগ্রহ নেই।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সভাপতিত্বে রাঙামাটিতে বিশেষ আইন-শৃঙ্খলা সভায় তিনটি মন্ত্রণালয় থেকে আমন্ত্রণ জানানো সত্ত্বেও সন্তু লারমা সেই সভায় অংশ নেননি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান নামের তিনটি জেলার মোট ৫০৯৩ বর্গমাইল আয়তন। যা এক বিশাল সম্ভাবনার উৎস, এই বাংলাদেশেরই এক ও অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এটি।

সময় এসেছে  পাহাড়ের সেই কান্না হাসিতে রূপান্তরের। সময় এসেছে সকল প্রতিকূলতা ঠেলে অবরুদ্ধ অশান্ত পাহাড়ের বুকে স্বাধীনতার সুফল পৌঁছে দেয়ার। স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তির সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে সদম্ভে মাথা তুলে দাড়িয়েছে। প্রসারিত হচ্ছে প্রাপ্তির পরিধি। হাতে হাত রেখে সেই প্রাপ্তির প্রাচুর্যে পরিপূর্ন হোক সর্বস্তরের বাঙালির প্রত্যাশা- উৎকর্ষিত হোক পাহাড় থেকে বালিচর, সাগর থেকে সমতল।

 

এসকে/এসএমএম

আরও পড়ুন