• ঢাকা
  • শনিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১০ ফাল্গুন ১৪২৬

জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর ক্ষণগণনা

মুজিববর্ষ
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৮, ২০২০, ০৯:২৬ এএম
সর্বশেষ আপডেট : জানুয়ারি ২৮, ২০২০, ০৯:২৬ এএম

টাকা দিলেই মেলে পুলিশি সরঞ্জাম

হালিম মোহাম্মদ 
টাকা দিলেই মেলে পুলিশি সরঞ্জাম
হাতকড়া

র‌্যাব-পুলিশসহ বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক, হ্যান্ডকাপ, ওয়াকিটকি, জ্যাকেটসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম অবাধে বিক্রি বেড়েছে। আর এসব পোশাক ও অন্যান্য সামগ্রী অপব্যবহার করে বেড়ে গেছে অপরাধ চক্রের নানা রকম প্রতারণা ও অপকর্ম।

ভুয়া ডিবি, ভুয়া পুলিশ, ভুয়া মেজর, ভুয়া দুদক কর্মকর্তা আটকের খবর প্রায় প্রতিদিনই প্রকাশ হচ্ছে গণমাধ্যমে। সম্প্রতি এ ধরনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় আইন সংস্থার কর্মকর্তাদের ভাবিয়ে তুলেছে।  

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা কর্মকর্তা আবদুল বাতেন দৈনিক জাগরণকে বলেছেন, রাজধানীর পলওয়েল মার্কেট ও রজনীগন্ধা সুপারমার্কেটে অবাধে বিক্রি হচ্ছে র‌্যাব-পুলিশের পোশাক। সেখানে পাওয়া যায় হাতকড়াসহ আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর সব ধরনের সরঞ্জাম। 

তিনি বলেছেন, পোশাক ও সরঞ্জাম বিক্রির ব্যাপারে নিয়ম-নীতি মানা হচ্ছে না। এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে অপরাধীরা। তারা পুলিশ বা র‌্যাবের পোশাক পরে ছিনতাই, ডাকাতি, খুন ও অপহরণের মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটাচ্ছে। আর ইমেজ সঙ্কটে পড়ছে পুলিশ ও র‌্যাব। অবশ্য ওই মার্কেটে পুলিশ-র‌্যাবের জ্যাকেট, হাতকড়া, লাইটিং ডিটেক্টর, ব্যাজ, বাঁশি, ক্যাপ, বেল্ট, জুতা, পিস্তল কাভারসহ সব সরঞ্জামই বাইরের লোকের কাছে বিক্রি করা হয়। অথচ পুলিশ সদর দফতর থেকে নির্দেশনা দেয়া রয়েছে পরিচয়পত্র ছাড়া কারও কাছে কোনও সরঞ্জাম বিক্রি করা যাবে না।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক দৈনিক জাগরণকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এক শ্রেণির প্রতারক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে অপহরণ ও প্রতারণা করছে। কিছু প্রতারককে এরই মধ্যে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, পুলিশের পোশাক ও সরঞ্জাম বাইরে বিক্রি হচ্ছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। এ কাজে সহায়তা করছে দুর্নীতিবাজ কিছু পুলিশ সদস্য। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। পুলিশের পোশাক ও সরঞ্জাম বিক্রির জন্য নীতিমালা রয়েছে। কেউ অমান্য করলে তদন্ত সাপেক্ষে শনাক্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, চাকরিচ্যুত ও অবসরে যাওয়া কিছু পুলিশ সদস্য তাদের ব্যবহৃত পোশাক জমা না দিয়ে  অন্যের কাছে বিক্রি করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের পোশাক ও সরঞ্জাম ব্যবহারে কড়াকড়ি না থাকায় অপরাধীরা অপরাধ ঘটানোর সুযোগ পাচ্ছে। এক সময় তালিকাভুক্ত দোকান ছাড়া অন্য কোথাও পুলিশি সরঞ্জাম বেচাকেনা করা যেতো না। যে কেউ ইচ্ছা করলেই পুলিশি সরঞ্জাম কিনতে পারতো না। পুলিশ সদস্যদেরও যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে পোশাক ও সরঞ্জাম কিনতে হতো। এখন যে কেউ পুলিশি সরঞ্জাম কেনাবেচা করতে পারেন। তাতে কারও অনুমতির প্রয়োজন হয় না।
শুধু তাই নয়, খোলা বাজারে র‌্যাব-পুলিশের মনোগ্রামসহ ছাপানো আইডি কার্ডও বিক্রি হচ্ছে। তাতে যে কেউ নিজের নাম লিখে ও ছবি বসিয়ে হয়ে যাচ্ছেন পুলিশ বা র‌্যাবের বড় কর্মকর্তা।
 
সেনাবাহিনী বা আনসার বাহিনীর আইডি কার্ড কিনতে পাওয়া যায় রাজধানীর নীলক্ষেত বাকুশাহ মার্কেটে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, নয়া পল্টনের পলওয়েল মার্কেট ও কচুক্ষেতের রজনীগন্ধা সুপার মার্কেটে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পোশাক ও সরঞ্জাম বিক্রি হয়। পুলিশ সদস্যরা ওইসব মার্কেট থেকে পোশাক ও সরঞ্জাম কিনে থাকেন। পুলিশের প্রবিধানে (পিআরবি) পুলিশি সরঞ্জাম খোলাবাজারে বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে পোশাক বিক্রি বেআইনি।

২০১২ সালে এক কার্যনির্বাহী আদেশে পুলিশের পোশাক ব্যবহার সাধারণের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। তারপরেও বিভিন্ন সিকিউরিটি কোম্পানি, পাড়া-মহল্লার বাসা-বাড়ির দারোয়ান ও নাইটগার্ডরা অহরহ র‌্যাব-পুলিশের মতো পোশাক ব্যবহার করছে। তারা পুলিশের মতো হাতকড়া, র‌্যাংক ব্যাজও ব্যবহার করছে। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে।

সম্প্রতি পলওয়েল মার্কেটের বেশকিছু দোকানে ক্রেতা সেজে পুলিশের বিভিন্ন সরঞ্জাম কিনতে চাইলে বিক্রেতারা অনায়াসে বিক্রি করতে রাজি হন। তবে সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পর তারা সতর্ক হন। 
বিক্রেতারা বলেন, পুলিশের পরিচয়পত্র না দেখে বিক্রি করা যাবে না। তবে ওইসময় ডিসেন্ট স্টোর, গাজীপুর পুলিশ স্টোর, বরিশাল মিলিটারি স্টোরসহ কয়েকটি দোকানে অবাধে এসব সরঞ্জাম বিক্রি করতে দেখা গেছে। 

সংশ্লিষ্ট মার্কেটের এক স্টোর কর্মচারী জানান, নির্দেশনা থাকার পরেও পোশাক ও সরঞ্জাম বিক্রি করেন তারা। সব দোকানেই বিক্রি হয়। রজনীগন্ধা সুপার মার্কেটেও এসবের বেচাকেনা চলে। 

পলওয়েল মার্কেটের ভেন্ডার (অনুমতিপ্রাপ্ত পুলিশি সরঞ্জাম বিক্রেতা) রুহুল আমিন, আবু হেনা ও রাসেল জানান, পুলিশ সদর দফতর ও পলওয়েল মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির নির্দেশনা অনুযায়ী পোশাক ও সরঞ্জাম পরিচয়পত্র দেখে বিক্রি করা হয়। তবে জুতার কালি, ব্রাশ প্রভৃতি ছোটখাটো জিনিস বিক্রির বিষয়ে তেমন কোনও নিষেধাজ্ঞা বা নির্দেশনা নেই।

পুলিশ সদরের এক কর্মকর্তা বলেন, পলওয়েল মার্কেটে কিছু দোকান নির্দিষ্ট করা আছে। ওইসব দোকান থেকে পুলিশ সদস্যরা পোশাক ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনতে পারেন। তবে খোলাবাজারে সহজলভ্য হওয়ায় এসবের অপব্যবহার হচ্ছে।

তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর মতো সাপ্লাই কোরের মাধ্যমে পুলিশের সরঞ্জাম বেচাকেনার ব্যবস্থা করলে প্রতারকরা অপকর্মের সুযোগ পেতো না। যারা প্রতারকদের কাছে সরঞ্জাম বিক্রি করছে তাদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকায় গ্রেফতার আবদুল মালেক, মালেক চৌধুরী, জাহাঙ্গীর আলম, ইয়াসিন, বাদল ও আব্বাস আলী পুলিশের পোশাক ব্যবহার করে প্রতারণার কথা স্বীকার করেন আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর কাছে।
 
তারা জানান, পলওয়েল মার্কেট ও রজনীগন্ধা সুপার মার্কেট থেকে সহজেই সরঞ্জাম কেনা যায়। তবে এক হাজার টাকার জিনিসের জন্য অন্তত চার হাজার টাকা দিতে হয়। তখন দোকানিরা পরিচয়পত্র দেখার প্রয়োজনবোধ করেন না।

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে গ্রেফতার আনিছ ও আবদুল হক পুলিশকে জানান, চট্টগ্রাম পুলিশ লাইনস এলাকার কয়েকটি দোকানে পুলিশ ও র‌্যাবের সরঞ্জাম কিনতে পাওয়া যায়। 
জামিনে মুক্ত মুন্সীগঞ্জের রিন্টু মিয়া, টঙ্গীর সোহেল রানা ও জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, খুব সহজেই পলওয়েল মার্কেট থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সরঞ্জাম কেনা যায়, সে ক্ষেত্রে তারা দাম অনেক বেশি রাখে বিক্রেতারা।

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) এর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম বলেন, এ রকম প্রতারকচক্র সারা দেশেই আছে। র‌্যাবের নাম ব্যবহার করে তারা বহু প্রতারণার ঘটনা ঘটিয়েছে। অনেককে ধরা হয়েছে, অন্যদের ধরার চেষ্টা চলছে। 
র‌্যাবের পোশাক-সরঞ্জাম খোলাবাজারে পাওয়া যাওয়ার কথা স্বীকার করে তিনি এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের প্রতি সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

বুধবার (২২ জানুয়ারি) পলওয়েল মার্কেট থেকে ৪০০ জোড়া হাতকড়া জব্দ করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মঙ্গলবার (২১ জানুয়ারি) রাজধানীর পান্থপথ থেকে ডিবি পরিচয় দেয়া পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়।
 
ডিবির উপ কমিশনার (পশ্চিম) মোল্লা নজরুল ইসলাম দৈনিক জাগরণ বলেন, পলওয়েল মার্কেটে হাতকড়া ক্রয়-বিক্রয় করতে নিষেধ করা হয়েছে ব্যবসায়ীদের। তারপরেও সেখানে হাতকড়া পাওয়া গেলে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। হাতকড়া পরা অবস্থায় কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে উদ্ধার হয় ঢাকা মহানগর ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সদস্যসচিব রফিকুল ইসলাম মজুমদারের মরদেহ। ওই হাতকড়ায় খোদাই করে পুলিশ লেখা ছিল। এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়নুল আবেদীন বলেছেন, বাজারে ‘পুলিশ’ লেখা হাতকড়া কিনতে পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, সন্ত্রাসীরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে। 

উপ কমিশনার মোল্লা নজরুল জানান, পলওয়েল মার্কেট থেকে উদ্ধার হওয়া হাতকড়াগুলোতে পুলিশ লেখা ছিল না। 

সম্প্রতি কলাবাগান থানাধীন পান্থপথ থেকে ডিবি পরিচয়ে ছিনতাই-ডাকাতি করার অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। তারা হলেন- মামুন (৩০), এবাদুল (৩৬), রাসেল (২৫), সালাম ফরায়েজী (৪২) ও তোতা ওরফে লিটন (৩০)। তাদের কাছ থেকে একটি ওয়্যারলেস, একজোড়া হাতকড়া, ডিবি লেখা একটি জ্যাকেট ও একটি মোটর সাইকেল উদ্ধার করা হয়।
গোয়েন্দা কর্মকর্তা আবদুল বাতেন বলেন, ২১ জানুয়ারি (মঙ্গলবার) অপহরণের পাঁচ দিন পর রাজধানীর ডেমরা এলাকা থেকে মামা-ভাগ্নেকে উদ্ধার করা হয়। একইসঙ্গে ৮ অপহরণকারীকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে অপহরণের কাজে ব্যবহৃত একটি প্রাইভেটকার, তিনটি মোটরসাইকেল, ম্যাগজিনসহ একটি পিস্তল, পাঁচটি ডিবি পুলিশের জ্যাকেট, পুলিশ সার্জেন্টের র‌্যাংক ব্যাজসহ একটি ইউনিফরম শার্ট এবং পুলিশ কনস্টেবলের একটি শার্ট, সাতটি স্টিলের লাঠি, তিনটি কালো রঙের ছোট-বড় ওয়্যারলেস সেট, চারটি পিস্তল সদৃশ লাইটার, পাঁচটি সিরিঞ্জ, ২০টি ইনজেকশন, একসেট সেনাবাহিনীর পোশাক তৈরির থান কাপড়, ১৫টি বিভিন্ন কোম্পানির মোবাইল সেট (সিম সংযুক্ত) এবং একটি আইপ্যাড উদ্ধার করা হয়।

মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ইয়াসির আরাফাত খান বলেন, ভুয়া ডিবি পুলিশের পরিচয়ে আমার দোকান থেকে সোনা বিক্রির ২৭ লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র। মামলা করেছি কিন্তু কেউ এখনও ধরা পড়েনি।

তদন্ত কর্মকর্তা এস আই সফিকুল বলেন, ভুয়া ডিবি পুলিশের পরিচয় দিয়ে এর আগেও মতিঝিল এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ২৭ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িতদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে।
 
পুলিশের হাতকড়া অপরাধীদের কাছে পাওয়ার বিষয়ে আবদুল বাতেন বলেন, পলওয়েল মার্কেটে খোলা বাজারে এসব হাতকড়া বিক্রি হয়। তবে তা কিনতে হলে পুলিশ সদস্যদের পরিচয়পত্র এবং বিপি নম্বর লিখে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করে কিনতে হয়। বিষয়গুলো তদারকির জন্য পুলিশের আলাদা একটি দলও রয়েছে। তারপরেও এই হাতকড়া অপরাধীদের কাছে কীভাবে গেল, তা খতিয়ে দেখা হবে।
 
আবদুল বাতেন জানান, চক্রটি বগুড়া, রংপুর ও সিরাজগঞ্জে তৎপরতা চালিয়ে আসছিল। সম্প্রতি তারা ঢাকায় সক্রিয় হয়েছে। 

এএইচএম/বিএস