• ঢাকা
  • বুধবার, ০৮ এপ্রিল, ২০২০, ২৫ চৈত্র ১৪২৬
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০, ১১:৪০ এএম
সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০, ১১:৪০ এএম

ঝুলছে তদন্ত, কাটেনি আতঙ্ক 

অগ্নিদগ্ধ চুড়িহাট্টায় জীবন আছে, প্রাণ নেই

এস এম সাব্বির খান
অগ্নিদগ্ধ চুড়িহাট্টায় জীবন আছে, প্রাণ নেই

বছর পেরিয়ে গেছে রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার। শোক কাটিয়ে ধ্বংস্তূপের মাঝ থেকে ফের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নেমেছে পুরাতন ঢাকার এই এলাকাটির বাসিন্দারা। কিন্তু আপন হারানোর শোক, প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পাওয়া ও ঘটনার তদন্তে বিলম্বের হতাশা, পুনর্বাসন ব্যবস্থাপনার মন্থরতা আর প্রাণঘাতী 'ক্যামিকেল বাঙ্কারের' আতঙ্ক নিয়ে বেঁচে থাকা এলাকার প্রতিটি মানুষ যেন বেঁচে আছে, শুধুই বেঁচে আছে বলে। কোথাও নেই জীবনের উচ্ছ্বাস কিংবা প্রাণের চঞ্চলতা।

অগ্নিদগ্ধ চুড়িহাট্টার ভয়াবহ এ ঘটনায় নিহতদের ময়না তদন্ত আজও পুরোপুরি শেষ করতে পারেনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল। সব লাশের ময়না তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়ায় মামলার তদন্ত প্রতিবেদনও আলোর মুখ দেখেনি। আদালত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দফায় দফায় তারিখ দিলেও তা দাখিল হচ্ছে না। তাই এগোচ্ছে না তদন্তের কাজ।

ময়না তদন্ত শেষ না হওয়ায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চকবাজার থানার পুলিশ পরিদর্শক কবীর হোসেনও হতাশ। তিনি ময়না তদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। এছাড়া আজ পর্যন্ত মামলার বাদী ও সাক্ষীদের জবানবন্দিও নেওয়া হয়নি।

এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কবীর হোসেন বলেন, লাশের ময়না তদন্ত প্রতিবেদন এখনো শেষ হয়নি। নিয়মিত মামলা দায়েরের পর আগের করা অপমৃত্যু মামলা শেষ হয়ে গেছে। আমি এখনো ময়না তদন্ত প্রতিবেদন পাইনি বলে তদন্ত কাজও শেষ করতে পারছি না। হয়তো খুব তাড়াতাড়িই ময়না তদন্তের প্রতিবেদন পেয়ে যাব।

আদালত, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট তথ্যে জানা গেছে, আলোচিত এ অগ্নিকাণ্ডের নিয়মিত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ পেছানো হয়েছে নয়বার। তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি।

তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে অনেকটাই হতাশ মামলার বাদী মো. আসিফ। চুড়িহাট্টার আগুনে নিহত মো. জুম্মন (৫২) তার বাবা। তিনি বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের ‘ক্যাটসআই’-এর শোরুমের বিক্রয়কর্মী।

মামলার অগ্রগতির বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা কবীর হোসেন জানান, অগ্নিকাণ্ডের কারণ হিসেবে অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার তালিকায় আরও ৫/৬ জনের নাম এসেছে। কিন্তু তাদের ঠিকানা নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েছি। অনুসন্ধানে পাওয়া ঠিকানায় কাউকে পাইনি। আশপাশের কেউ ঠিকানা বলতেও পারছে না।

তিনি বলেন, আমরা খুব তাড়াতাড়িই তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার চেষ্টা করছি। তবে এ প্রসঙ্গে আদালতের পক্ষ থেকে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তার কাছে কিছু জানতে চাওয়া হয়নি বা কোনো তাগিদও দেইয়া হয়নি বলেই জানিয়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

এদিকে ময়না তদন্তের ধীরগতির ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদের বক্তব্য, আগুনে পোড়া লাশের ডিএনএ রিপোর্ট গত সপ্তাহে হাতে পাওয়া গেছে। তাছাড়া এই কাজের দায়িত্বে থাকা এক চিকিৎসক বদলি হওয়ার কারণে 'একটু' দেরি হয়েছে।

তিনি বলেন, আশা করছি আজ ৬৭টি লাশের মধ্যে অধিকাংশ ময়না তদন্ত রিপোর্ট পুলিশের কাছে দিতে পারব। এছাড়া যে চিকিৎসক বদলি হয়েছেন তিনি এলেই বাকি রিপোর্টগুলো তার সই নিয়ে দেওয়া হবে।

২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ের পাশের একটি চারতলা ভবনে লাগা আগুন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভবনটিতে রাসায়নিক আর প্লাস্টিক-পারফিউমের গুদাম থাকায় মুহূর্তেই আগুনের লেলিহান আরও বেড়ে যায়। আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট। ১৪ ঘণ্টা চেষ্টায় অবশেষে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডে রাতেই ৬৭ জনের পোড়া লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে আরও চারজনের মৃত্যু হয়। মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭১ জনে। আবার এদের মধ্যে চার জনের লাশ ময়না তদন্ত ছাড়াই নিয়ে যান তাদের স্বজনরা। অগ্নিকাণ্ডের পরদিন অবহেলার কারণে সৃষ্ট আগুনে মৃত্যু ও ক্ষতির অভিযোগ এনে চকবাজার মডেল থানায় মামলা করেন বাবা হারানো মো. আসিফ। মামলার অভিযোগপত্র অনুযায়ী এ মামলার আসামি বাড়ির মালিকের দুই ছেলে শহীদ ও হাসানসহ অজ্ঞাত পরিচয় ১০-১২ জন।

জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১৬ এপ্রিল এজাহারভুক্ত আসামি দুই ভাই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তারা ওই বছরের ৮ আগস্ট হাইকোর্ট থেকে ছয় মাসের জামিন পান। এরপর রবিবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) এ জামিনের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ান বিচারপতি আবদুল হাফিজ এবং মো. ইজারুল হক আকন্দের হাইকোর্ট বেঞ্চ।

কেমন আছে চুড়িহাট্টা

চুড়িহাট্টায় ক্ষতিগ্রস্ত হাজী ওয়াহেদ ম্যানশন ভবনটির দেয়ালের প্লাস্টার কোথাও কোথাও খসে পড়েছে। কোথাও কালসিটে দাগ, এখনও সেই ভয়াল রাতের নিরব সাক্ষী হয়ে ঝুলে রয়েছে। পুরো ভবনের অনেকটাই বিধ্বস্ত। জানালার রডগুলো বেঁকে আছে, কোনো মতে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটি যেন প্রাণহিন চুড়িহাট্টার কালচিত্র! ভবনটি পরিত্যক্ত হলেও নিচে বসেছে কয়েকটি অস্থায়ী দোকান। ভবন মালিক নিচের কয়েকটি দোকান ঠিক করে নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সরকারি বিভিন্ন সংস্থার বাধায় মালিকের সেই বাসনা পূরণ হয়নি।

কেমিক্যাল আতঙ্কে স্থানীয়রা

আগুনের ভয়াবহতার কারণ হিসেবে কেমিক্যাল ও রাসায়নিক পদার্থকেই দায়ী করেছেন স্থানীয়রা এবং সরকারি বিভিন্ন সংস্থা। সেই ঘটনার স্মৃতি রোমন্থন করতে এখনো আঁতকে উঠেন স্থানীয়রা।

মামলার অভিযোগপত্রেও রাসায়নিক দ্রব্যকে দায়ী করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়, চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিকের দুই ছেলে তাদের চারতলা বাড়ির বিভিন্ন ফ্লোরে রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ রাখতেন। মানুষের জীবনের ঝুঁকি জেনেও অবৈধভাবে রাসায়নিকের গুদাম করার জন্য ব্যবসায়ীদের কাছে তারা অতিরিক্ত অর্থের লোভে বাসা ভাড়া দেন তারা।

স্থানীয় মুদি দোকানদার রিয়াজুদ্দিন বলেন, এখানে অধিকাংশ গুদামেই রাসায়নিক দ্রব্য থাকে। আগুনের ঘটনার পরে প্রশাসন বিভিন্ন সময় অভিযান চালালেও এখন আর কেউ আসে না।

ষাটোর্ধ্ব আফসার আলী বলেন, গ্যাস সিলিন্ডার আর কেমিক্যাল আতঙ্কে আমাদের দিন কাটে। এগুলো যেন মৃত্যুপুরী। আমরা দ্রুত এসব অপসারণে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

প্রতিশ্রুতি ছিল ক্যামিকেল গুদাম অপসারণের, শিশু পার্ক গড়ে ওঠার, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন আর চুড়িহাট্টার বিধ্বস্ত রুপ মুছে দিয়ে বেঁচে থাকার নতুন প্রেক্ষাপট সৃষ্টির। এসব পাওয়ার কথা তো দূর এখনও অজ্ঞাতজন হিসেবে পড়ে থাকা পোড়া লাশের হতাশাও দূর করা সম্ভব হয়নি কারো পক্ষে। আর যারা বেঁচে আছেন তাদের এই বেঁচে থাকাটাই আজ এলাকার অনেকের কাছে অভিশাপ বলে মনে হচ্ছে। হয়তো এই শোক ভুলানো যাবে না চুড়িহাট্টার কিন্তু বাঁচার জন্য এলাকার মানুষকে প্রতিশ্রুতি পূরণের মাধ্যমে খানিকটা টিকে থাকার সম্বল তো দেয়াই যায়। প্রশ্ন হচ্ছে আর কত আগুনের উত্তাপ ছড়াতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের ঘুম ভাঙাতে?