• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল, ২০২০, ২৬ চৈত্র ১৪২৬
প্রকাশিত: মার্চ ২৪, ২০২০, ০৬:৪১ এএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ২৪, ২০২০, ০৬:৪২ এএম

ছুটির ঘোষণায় সর্বনাশের শঙ্কা!

আমিনুল ইসলাম রোকন
ছুটির ঘোষণায় সর্বনাশের শঙ্কা!
এ যেন করোনার উদযাপন! হোম কোয়ারেন্টাইনে না থেকে বাড়ীর পথে ঢাকাবাসী। সর্বনাশের সূচনা নয়তো?

 


বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ আকার নেয়া মহামারি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বিষাক্ত ছোবল হেনেছে বাংলাদেশেও। ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সমিশনের মাধ্যমে লোকাল ট্রান্সমিশন ঘটেছে। অর্থাৎ বিদেশ থেকে করোনাভাইরাস পজিটিভ ব্যক্তি দেশে ফিরে দেশের ভেতরের লোকদের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়িয়ে দিয়েছেন। করোনার ভাইরাল ট্রান্সমিশন ( ভাইরাস সংক্রমণ) পদ্ধতি তিনটি। এরমধ্যে বাংদেশ এরইমধ্যে দ্বিতীয় স্তর পার করে ফেলেছে। এখন বাকি আছে শুধু কমিউনিটি ট্রান্সমিশন, যেটাকে সহজ ভাষায় বলা যেতে পারে গণহারে আক্রান্ত হওয়া।

সরকার এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চেয়েছিল যেকোনো মূল্যে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বা গণহারে করোনাভাইরাস সংক্রমণের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে। এ জন্য নানা পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে। সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হয়েছিল হোম কোয়ারান্টাইনের ওপর। যেহেতু ভাইরাসটি ছোঁয়াচে এর জন্য সামাজিক মেলামেশা বন্ধ করে ঘরে থাকাটাই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হিসেবে নেয়া হয়েছিলো। যে কারণে সোমবার মন্ত্রীপরিষদ সচিব সংবাদ সম্মেলন করে দেশে ১০ দিনের (২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল) ছুটি ঘোষণা করেন। অথচ এই ছুটির ঘোষণাই এখন হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের অসচেতন আর কাণ্ডজ্ঞানহীন্তার কারণে বিপত্তি পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে চরম হারে।

ছুটির ঘোষণা দিয়ে মন্ত্রীপরিষদ সচিবের সংবাদ সম্মেলন শেষ হতেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন ঢাকার মানুষ। ১০ দিনের ছুটি, আর কী ঘরে থাকা যায়? সবাই গিয়ে ভিড় করেন ট্রেন স্টেশন আর গণ-পরিবহন কাউন্টারে। যেন "চাঁদ দেখা গেছে কাল ঈদ"! সচেতন নাগরিকরা আবার এই ভিড়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে শঙ্কার বিষয়টি তুলে ধরছেন। একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে ঢাকাস্থ ট্রেন স্টেশনে মানূষের উপচে পরা ভিড়। আঁটসাঁট হয়ে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে সবাই যার যার গন্তব্যের টিকিট সংগ্রহ করছেন। এখন প্রশ্ন হলো ট্রেন স্টেশনের এই ছবিটি কিভাবে শঙ্কার হলো? ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সমিশনের মাধ্যমে বিমানবন্দর হয়ে এরইমধ্যে করোনা দেশে ঢুকে গেছে। সৃষ্টি হয়েছে লোকাল ট্রান্সমিশন। এই লোকাল ট্রান্সমিশন এখন দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। যার সবচেয়ে ভয়াবহ রুপ ধারণ করবে ঢাকা থেকে মানুষের বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে, অর্থাৎ দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া মানুষগুলোর যে কারো মাধ্যমে তা এবার জেলা, উপজেলা, নগর, বন্দর, গ্রাম সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করছে।

এখন প্রতিদিনই করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে মৃত্যুও। সরকারি হিসেবে দেশে এ পর্যন্ত করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৩৩, মারা গেছেন ৩ জন। পুলিশের হিসাবে মার্চের প্রথম ২০ দিনে বিদেশ থেকে ফিরেছেন ২ লাখ ৯৩ হাজার মানুষ। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এসেছেন কোভিড-১৯ আক্রান্ত দেশগুলো থেকে। বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই তারা যার যার বাড়িতে চলে গেছেন। তাদের মধ্যে মাত্র ১৮ হাজার বিদেশফেরত স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টাইনে আছেন। অন্যদের কোনো হদিস নেই। গত সপ্তাহ পর্যন্ত এসব প্রবাসী স্বাভাবিকভাবেই গ্রামে-গঞ্জে, হাটবাজারে ঘুরেছেন, সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। এই বিদেশফেরতদের মধ্যে কেউ সংক্রমিত হয়ে থাকলে তা কত মানুষের মধ্যে ছড়াবে, সে বিষয়ে কোনো ধারণাই করা যাচ্ছে না। মাঠ থেকে পাঠানো প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পুলিশের কর্মকর্তারা এক ‘ভয়ংকর পরিণতি’র আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

এখন চলমান পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিণতি কীভাবে ঘটতে পারে তা একটু দেখে নেয়া যাক। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে করোনায় আক্রান্ত এবং সাসপেক্টটেডদের বেশিরভাগই ঢাকায় অবস্থান করছেন। এখন সরকারের তরফ থেকে ছুটি ঘোষণার পরপরই এই যে সবাই আপনদের জীবননাশে উদ্দাম ছুট দিয়েছেন সেটাই হয়ে ওঠতে পারে সর্বশান্ত হবার সবচেয়ে বড় কারণ। হাজার হাজার মানুষ গিয়ে হাজির হলেন স্টেশনে, পরিবহণ কাউন্টারে। ধরুন সেখানে মাত্র দু- একজন ছিলেন যাদের শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি ছিলো। এই দু- একজনের শরীরের ছোঁয়া কতজনের গায়ে লেগেছে? ভাইরাসটির ট্রান্সমিশন (ছড়িয়ে পড়া)  পদ্ধতি বলছে একজন থেকে স্টেশনে উপস্থিত সবার ট্রান্সমিশন হতে পারে আর সে জন্যে দরকার আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে স্রেফ একটি হাঁচি বা কাশি। যদি এমনটি হয় তাহলে ঢাকা স্টেশন থেকে কতজন এই ভাইরাসের পরিবাহক হয়ে পুরো দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছেন? সেক্ষেত্রে নিজের অজান্তেই তারা শরীরে বাহন করে নিয়ে চলে যাবেন এই ঘাতক করোনাও। এভাবে আজকের ইতালির মতো শহর থেকে শহরে, ঘর থেকে ঘরে ছড়িয়ে পড়বে অদৃশ্য ঘাতকটি। আর যদি এমন সর্বনাশ ঘটে যায় পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ। বাংলাদেশের ঘনবসতীপূর্ণ পরিস্থিতি অনুমানে ধারণা করা যায়, অপ্রত্যাশিত এই আশঙ্কা সত্য হলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় করোনা মহাপ্রলয়ে সৃষ্ট বধ্যভূমিতে পরিণত হবে দেশটি। যা হয়তো উহান বা ইতালির কথা ভুলিয়ে দেবে সারা বিশ্বকে। সেক্ষেত্রে বলতে হবে, মূলত করোনার মহামারি নয় বরং বাংলাদেশকে সর্বনাশের শেষ প্রান্তে ঠেলে দিলো তার অসচেতন জনগোষ্ঠী।

এসকে