• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২০, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
প্রকাশিত: মার্চ ২৭, ২০২০, ১০:৩৯ এএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ২৭, ২০২০, ১০:৫৭ এএম

করোনা প্রতিরোধে বাংলাদেশ

অব্যবস্থাপনার জেরে প্রবল হচ্ছে সংকটের আশঙ্কা

এস এম সাব্বির খান
অব্যবস্থাপনার জেরে প্রবল হচ্ছে সংকটের আশঙ্কা

সাম্প্রতিক পরিস্থিতে দেশের চিকিৎসা ও সাংবাদমাধ্যমের মত গুরুত্বপূর্ণ দুটি ক্ষেত্রে সরকারি মন্ত্রণালগুলোর 'কঠোর ব্যবস্থা' আর 'নজরদারি'র বজ্র আঁটুনি গাঁথার ফাঁকে চলমান সংকট মোকাবিলায় মূল করণীয়গুলো রয়ে যাচ্ছে অবহেলিত। আর সময় পেরিয়ে যাচ্ছে বিধি ব্যবস্থার ফসকা গেরোর ফাঁক গলে। যা করোনার মত বৈশ্বিক প্রলয় প্রতিরোধে বিভিন্ন গুরুত্বপুর্ণ ক্ষেত্রগুলোর সঙ্গে সরকারের সমন্বয়হীনতার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে। ব্যাহত করছে জটিল অবস্থার নিরসনে সর্বস্তরের মানূষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যখন প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয় তখনই এর ব্যাপকতা ও আগ্রাসি ভয়াবহতা সম্পর্কে আগাম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছিল বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোতে। তবে তারও প্রায় মাসখানিক আগে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসেই আসন্ন এই মহাসংকট সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়ে ছিলেন দেশের চিকিৎসকরা। শুধু তাই নয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে এ বিষয়ে সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণের কথাও জানান তারা। কিন্তু তার পরেও সংশ্লিষ্টদের অবহেলা আর অসচেতনতার কারনে বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনা আক্রান্তদের সেবা প্রদানকালে চরম বিপদের মুখে পড়েছেন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা।

বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতে এমনটাই জানানো হয়েছিল। মূলত করোনা আক্রান্ত রোগির স্বাথ্য সেবা প্রদানে কোনো চিকিৎসক অস্বীকৃতি জানালে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরিবার কল্যান মন্ত্রণলয়ের, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, সরকারি স্বাথ্য ব্যবস্থাপনা-২ অধিশাখার পক্ষ থেকে জারিকৃত এক নির্দেশনার জবাবে প্রকাশিত এক প্রতিবাদ লিপিতে এ কথা জানানো হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জারিকৃত সেই নির্দেশনা বাতিলও ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এত জল ঘোলা করার মাঝে ঠেকানো যায়নি অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি।

বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) রাতে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে আরও একজন চিকিৎসক করোনাভাইরাসে আক্রাত হয়েছেন বলে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এ নিয়ে ওই হাসপাতালে দুজন চিকিৎসক করোনা  আক্রান্ত হলেন। 

জানা গেছে,গত শনিবার ওই হাসপাতালে রাজধানীর এক বাসিন্দা মারা যান। শ্বাসকষ্ট নিয়ে গত ১৭ মার্চ ওই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর সেই ব্যক্তির শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়।

পরে হাসপাতালটির আইসিইউতে ভর্তি চিকিৎধীন অবস্থায় সে রাতেই মারা যান আক্রান্ত ব্যক্তি।

ওই ব্যক্তির করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নিশ্চিত হওয়ার পর পরই সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা কোয়ারেন্টিনে যান। কিন্তু এর আগেই গত ২২ মার্চ ওই হাসপাতালের একজন চিকিৎসক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানা যায়।

বৃহস্পতিবার রাতে হাসপাতালটির আরো এক চিকিৎসক এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন।

এমন পরিস্থিতিতে জনসাধারনের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই গত মাসে চিকিৎসকদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা পোশাক ও মাস্কসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি সরবরাহের সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বাণ জানিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বরাবরা লিখিত আবেদন জানিয়েছিলো বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার এসোসিয়েন। প্রকাশিত প্রতিবাদ ও গণপদত্যাগ লিপিতে এমন তথ্যই জানায় তারা।

এতে বলা হয়, তাদের সেই আহ্বান আমলে না নিয়ে সময় মত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে অবহেলা করে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা। যার ফলে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হলে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবে রোগিদের সেবা প্রদানে নিবেদিত হতে পারছেন না চিকিৎসকরা। তবুও স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়েই সাধ্যমত সেবা প্রদানে কাজ অব্যাহত রাখেন দেশের চিকিৎসক সমাজ। তবে অতিমাত্রায় স্বাস্থ্য ঝুঁকি সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় বেশকিছু জায়গায় রোগিদের সেবা প্রদানে অপারুতা প্রকাশে বাধ্যহন তারা।

এ অবস্থার মাঝে সেবা প্রদানে অস্বীকৃতি জানালে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা জারি করা হলে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন তাঁরা। মূল সমস্যা তুলে না ধরে চিকিৎসকদের বিতর্কিত করার জন্য এবং নিজেদের ব্যর্থতা আরাল করতেই মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ ধরণের অপমানজকনির্দেশ জারির বিপরীতে আসল সত্য প্রকাশ্যে আনেন চিকিৎসা ক্যাডাররা। একই সঙ্গে এই চিঠি প্রত্যহার করে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানিয়ে কর্মবিরতীতে যাওয়ার কথাও বলেন তারা।

পরে এই নির্দেশনা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। কিন্তু তাতে করে মূল সমস্যা যে সমাধান হয়নি তারই প্রমাণ একের পর এক চিকিৎসকের এই করোনা সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা।

এমন চরম সংকটের মাঝে গুরুদায়িত্ব পালনের পরিবর্তে চিঠি চালালাচালী আর ক্ষমতা প্রয়োগের যে বিতর্কিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয় বএ মন্তব্য করেছেন দেশের সচেতন সমাজ।

তাঁরা বলছেন সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে এমন পদস্থদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে একদিকে যেমন বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থে নেয়া সরকার প্রধানের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর সুফল থেকে অনেকাংশে বঞ্চিত হচ্ছে মানুষ। অন্যদিকে তেমনি মানুষের জন্য নিরন্তর কাজ করে গেলেও সাধারনের পক্ষ থেকে প্রত্যাশিত সমর্থন ও সহযোগিতা পাচ্ছে না সরকার। অর্থাৎ এই মধ্যবর্তী দুষ্টচক্রের কারনে জনগণ ও সরকার উভয়পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর এই দুইটি প্রধান পক্ষই যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে কি শুধু ঐ সুবাধাভোগী মধ্যবর্তীদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য রাষ্ট্রব্যবস্থা? দেশের সচেতন নাগরিকদের মত এখন সাধারণ মানুষের মুখেও এই একই প্রশ্ন।

এসকে