• ঢাকা
  • শনিবার, ০৬ জুন, ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
প্রকাশিত: এপ্রিল ৮, ২০২০, ০৯:৫৪ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ৯, ২০২০, ০৯:৪০ এএম

প্রেক্ষাপট ‍‍‘৭৫-এর ১৫ আগস্ট

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে খুনি মাজেদের ভূমিকা

এস এম সাব্বির খান
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে খুনি মাজেদের ভূমিকা
রক্তাক্ত ১৫ই আগস্ট

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের কাণ্ডারি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, যা সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ও নির্মম রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। বিদেশি ষড়যন্ত্রের সেই নীলনক্সা বাস্তবায়নে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে এদেশেরই একদল পথভ্রষ্ট সেনা সদস্য, যার মূলহোতা ছিল ধূর্ত মেজর জিয়াউর রহমান ও আওয়ামী লীগের আস্তিনের সাপ - ক্ষমতালোভী খন্দকার মোশতাক।

ইতিহাসের কলঙ্কময় সেই হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক ৬ আসামির মধ্যে অন্যতম আবদুল মাজেদকে সোমবার (৬ এপ্রিল) মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুর সাড়ে এগারো নম্বর এলাকা থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের একটি চৌকস টিম।

১৫ই আগস্ত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কুশীলব খুনি আব্দুল মাজেদ

জাতির জনককে সপরিবারে নির্মমভাবে খুনের অন্যতম কুশীলব বরখাস্ত হওয়া এই ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ। দুই যুগ পালিয়ে থাকার পর অবশেষে ধরা পড়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতির পটভূমি রচনাকারী রক্তাক্ত কাল রাতে কী ছিল খুনি মাজেদের ভূমিকা? ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা হলো সেই তথ্য।

সুপরিকল্পিত এই ষড়যন্ত্রকে বাস্তবায়নে যে নীলনক্সা আঁকা হয় তার প্রথম ধাপটিই ছিল ধানমন্ডিতে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু ভবন, বঙ্গবন্ধুর ভাগনে শেখ মনির বাসভবন এবং মিন্টু রোডে অবস্থিত বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসভবন ঘেরাও করে একযোগে হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করা। যাতে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সকল সদস্যকে নিকেশ করা যায়। গুরুওত্বপূর্ণ এই তিনটি প্লটের তৃতীয়টির অর্থাৎ আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসভন ঘেরাও ও সেখানে হত্যাযজ্ঞ পরিচালনার প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে থাকা সেনা কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন এই খুনি আব্দুল মাজেদ।

বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি ও সাবেক পানিমন্ত্রী শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত- ছবি সংগৃহিত 

যেভাবে ঘটানো হয় পরিকল্পিত এই নির্মম হত্যাকাণ্ড

বঙ্গবন্ধু ভবনে হত্যাকাণ্ড: রক্ত গঙ্গায় ভাসে নিষ্প্রাণ বাংলাদেশ

রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের বাসায় এই অভিযানের নেতৃত্ব দেন মেজর একেএম মহিউদ্দিন আহমেদ। মেজর বজলুল হুদা  রাষ্ট্রপতির বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রথম ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্টের অ্যাডজুট্যান্ট থাকায় তাকে দলে রাখা হয়েছিল। দলে মেজর এসএইচএমবি নূর চৌধুরীও ছিলেন । রক্ষীদের দায়িত্বে থাকা ক্যাপ্টেন আবুল বাশার মেজর ডালিমের অধীনে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বিদ্রোহীরা জোর করে বাসভবনে প্রবেশের চেষ্টা করলে বাসভবন রক্ষা করতে যেয়ে কিছু রক্ষী নিহত হয়েছিল। শেখ কামাল  নিবাসকে রক্ষা করতে গিয়ে আহত হয়েছিলেন, আক্রমণকারীরা কমপ্লেক্সে প্রবেশের পরে ক্যাপ্টেন হুদা তাকে হত্যা করেছিলেন। শেখ মুজিব বিদ্রোহীদের কাছে জিজ্ঞাসা করলেন "তোমরা কী চাও?"। শেখ মুজিবকে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় মেজর নূর ও ক্যাপ্টেন হুদা তাঁকে গুলি করেন। শেখ মুজিবের ছেলে শেখ জামাল, জামালের স্ত্রী রোজী, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, শেখ মুজিবের স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেছাকে প্রথম তলায় বাথরুমে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে মেজর আবদুল আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেমুদ্দিন গুলি করে তাদের সবাইকে বাথরুমের ভিতরে গুলি করে হত্যা করে। মেজর ফারুক ঘটনাস্থলে ক্যাপ্টেন হুদাকে মেজর এবং সুবেদার মেজর আবদুল ওহাব জোয়ারদারকে লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি দেন। ফারুক এসে পৌঁছান একটি ট্যাঙ্কে করে। শেখ মুজিবের ডাক পেয়ে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমদ বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে যাওয়ার পথে নিহত হন।

রক্ষীবাহিনী একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের পরে আত্মসমর্পণ করে। মেজর নূর বাথরুমে নিয়ে গিয়ে শেখ মুজিবের ভাই শেখ নাসেরকে গুলি করে হত্যা করে। মেজর পাশা একজন হ্যাভিল্ডারকে মায়ের কাছে কাঁদতে থাকা শেখ রাসেলকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা এ সময় সৈন্যদের বাড়ি লুটপাটের করতে দেখেছিল। প্রবেশ পথে একটি মৃত পুলিশের লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। মেজর হুদা মোহাম্মদপুরের শেরশাহ রাস্তায় গিয়ে কার্পেন্টারদের ১০ টি কফিনের অর্ডার করেন। মেজর হুদা পরের দিন সেনাবাহিনীর একজন সহচরের মাধ্যমে লাশগুলি সরিয়ে নিয়ে যায়।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিশেষ মুহূর্তে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

• শেখ ফজলুল হক মণির বাসভবন হলো মৃত্যুপুরী

শেখ ফজলুল হক মণি শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু পরিবারের অন্যতম একজন উত্তরসূরিও। তিনি তার স্ত্রী বেগম আরজু মনির সাথে তার বাড়িতে অত্যাকাণ্ডের শিকার হন। সে সময় আরজু মনি গর্ভবতী ছিলেন। তার ছেলে শেখ ফজলে নূর তাপস  ও শেখ ফজলে শামস পরশ ভাগ্যক্রমে রক্ষা পান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডিতে ১৩/১১ রোডে শেখ মনির বাড়িটি ২০-২৫ সেনা সদস্য দ্বারা ঘিরে ফেলা হয়ে। এর পর ভেতরে ঘটানো হয় নির্মম হত্যাকাণ্ড।

• আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসভবনে চালানো হত্যাযজ্ঞ ও খুনি মাজেদের ভূমিকা

আবদুর রব সেরনিয়াবাত ছিলেন প্রাক্তন পানি সম্পদ মন্ত্রী এবং শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্নিপতি। তিনি মিন্টু রোডে তার বাসায় ভোর ৫ টা ৫০ মিনিটে নিহত হন। তার বাড়িতে মেজর আজিজ পাশা, মেজর শাহরিয়ার রশিদ এবং ক্যাপ্টেন নুরুল হুদার সঙ্গে এই ক্যাপ্টেন মাজেদের নেতৃত্বাধীন একটি দল আক্রমণ করেছিল। এই হামলায় সেরনিয়াবাতের ভাগ্নে শহীদ সেরনিয়াবাত, কন্যা বেবি সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্তো আবদুল্লাহ বাবু এবং ছেলে আরিফ সেরনিয়াবাতও শহীদ হয়েছিলেন। এই হামলায় তিনজন গৃহকর্মীও মারা যান। তবে তার ছেলে আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ হামলায় বেঁচে গিয়েছিলেন এবং ওই বাড়িতে আরও ৯ জন আমলার সময় গুরুতর আহত হন।

২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাঁচ খুনির ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তারা হলেন- লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর বজলুল হুদা, লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহম্মেদ (আর্টিলারি) ও লে. কর্নেল একেএম মহিউদ্দিন আহম্মেদ (ল্যান্সার)। আর সর্বশেষ আটক হলো এই মাজেদ। যার ফাঁসি কার্যকর হওয়া এখন কেবলই সময়ের ব্যাপার মাত্র।

এখনও ১২ জনের মধ্যে ৫ জন বিদেশে পালিয়ে রয়েছেন। পলাতকরা হলেন- কর্নেল খন্দকার আবদুর রশিদ, লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল এএম রাশেদ চৌধুরী, রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, লে. কর্নেল এসএইচ নূর চৌধুরী।

তথ্যসূত্র সহায়ক:

* ষড়যন্ত্রের জালে বিপন্ন রাজনীতি (প্রকাশিত ১ম খণ্ড) - আবেদ খান, সম্পাদক, দৈনিক জাগরণ

*  উইকিপিডিয়া সূত্র

* সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দৈনিক ইত্তেফাক ও দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তথ্যসূত্র