• ঢাকা
  • সোমবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২১, ১২ মাঘ ১৪২৭
প্রকাশিত: নভেম্বর ১৮, ২০২০, ১২:২৪ এএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ১৮, ২০২০, ১২:২৪ এএম

ভাস্কর্যের ধর্মীয় অপব্যাখ্যা ও বঙ্গবন্ধুবিরোধী অপশক্তির আস্ফালন

এসএম সাব্বির খান, প্রিন্ট সংস্করণ
ভাস্কর্যের ধর্মীয় অপব্যাখ্যা ও বঙ্গবন্ধুবিরোধী অপশক্তির আস্ফালন
স্বাধীন বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান - ফাইল ছবি
পার্সিয়ান কবি ফেরদৌসীর ভাস্কর্য

প্রতিটি পর্যায়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ঐতিহাসিক সেই সংগ্রামের নেতৃত্ব প্রদানকারী মহান নেতা- স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বিতর্কিত করার ঘৃন্য অপচেষ্টা চালায় একটি গোষ্ঠী। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি ঢাকার ধোলাইপাড়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ভাস্কর্য অপসারণ ও দেশের বিভিন্ন স্থানে জাতির পিতার ভাস্কর্য স্থাপনের কার্যক্রম বন্ধের দাবি তুলে নতুন করে বিতর্ক উস্কে দেয়ার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করা হচ্ছে। আর এই প্রেক্ষাপট থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিষয়টিকে ইসলামিক মূল্যাবোধের অবমাননা তথা কোরআন-সুন্নার বিধান লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়ে তা অপসারণের দাবি তুলেছে কয়েকটি ইসলামিক সংগঠন।

এরইমধ্যে দেশের আলোচিত দুইজন রাজনীতিক-মাওলানা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য অপসারণের দাবি জানিয়ে সমাবেশ করেছেন। তাদের একজন হলেন চরমোনাই'র পীর এবং অপরজন হচ্ছেন ইসলামী আন্দোলন-এর সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করীম। গত শুক্রবার ভাস্কর্য নির্মাণের স্থল ঢাকার ধোলাইপাড় এলাকায় আয়োজিত এক সমাবেশে বক্তব্য প্রদানকালে ফয়জুল করীম বলেন, ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপনের চক্রান্ত তৌহিদি জনতা রুখে দেবে। রাষ্ট্রের টাকা খরচ করে মূর্তি স্থাপনের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে ফিরে আসতে হবে। মূর্তি স্থাপনের সিদ্ধান্ত বাতিল না হওয়া পর্যন্ত তৌহিদি জনতার আন্দোলন চলবে। সরকার যদি ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন থেকে সরে না আসে, তাহলে কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব।

একই দিনে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও হেফাজতে ইসলামের নেতা

মাওলানা মামুনুল হক ঢাকার বিএমএ মিলনায়তনে খেলাফত যুব মজলিস ঢাকা মহানগরীর এক অনুষ্ঠানে বলেন, বঙ্গবন্ধুর মূর্তি স্থাপন বঙ্গবন্ধুর আত্মার সঙ্গে গাদ্দারি করার শামিল। যারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন করে তারা বঙ্গবন্ধুর সু-সন্তান হতে পারে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন মুসলিম হিসেবে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাঁর মূর্তি তৈরি করে রাস্তার মোড়ে মোড়ে স্থাপন করা হলে তা হবে বঙ্গবন্ধুর আত্মার সঙ্গে বেইমানি।

বিজ্ঞানী আবু রায়হান আল বিরুনির ভাস্কর্য

এদিকে তাদের এ দাবিকে ‘কট্টর’ সাম্প্রদায়িক আচরণ হিসেবে উল্লেখ করে দেশের প্রগতিশীল ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং বুদ্ধিজীবীরা বলেছেন, মৌলবাদীদের এই আস্ফালনকে কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না। তারা এমন বিভ্রান্তকর মন্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে উদার ইসলামিক মূল্যাবোধকে যেমন সংকীর্ণতায় অবরুদ্ধ করছে তেমনি জাতির পিতার অবমাননার অপপ্রয়াসও চালাচ্ছে।

বিশিষ্ট মহলের দাবি, ‘বঙ্গবন্ধু’ কোনো রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক বিতর্কের ইস্যু হতে পারেন না। যারাই এ কাজটি করছে তাদের মূল উদ্দেশ্য ইসলামিক মূল্যাবোধের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন নয় বরং শুধুমাত্র জাতির পিতার মর্যাদা ক্ষুন্ন করা এবং বর্তমান সরকারকে বিতর্কিত করা। আলোচিত প্রসঙ্গে দেশের তরুণ ইতিহাসবিদ মাসুম খানের ভাষ্য, সুস্পষ্টভাবেই বলা যায় সাম্প্রদায়িক শক্তি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তা না হলে তারা 'ভাস্কর্য' কে 'মুর্তি' আখ্যা দিয়ে ভ্রান্ত ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতো না। তাদের সমস্যা ভাস্কর্য নিয়ে নয়, 'বঙ্গবন্ধু' নিয়ে। তা না হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এত এত ভাস্কর্য নিয়ে যাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই, আজ সুনির্দিষ্টভাবে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য অপসারণে তারা এত মরিয়া কেন?

আলোচিত প্রসঙ্গে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আ. ফ. ম. বাহাউদ্দিন নাসিম দৈনিক জাগরণকে বলেন, বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে বিখ্যাত মনীষী এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের ভাস্কর্য রয়েছে। শুধু তাই নয়, সেগুলো স্থাপনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়। মুসলিম বিশ্বের এসকল রাষ্ট্রগুলোতে ইসলামীক মূল্যাবোধ ও ধর্মীয় অনুশাষনের সবচেয়ে আদর্শ চর্চা অব্যাহত রয়েছে। সেখানে তো এ নিয়ে এমন কোনোও বিতর্ক সৃষ্টি হয় না। মূলত, বাংলাদেশের বুকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে হাজার বছরের ঐতিহ্য ও ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে সেটিকে বিতর্কিত করে এই সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে চায়। এই গোষ্ঠি যেকোনো ইস্যু পেলেই সেটিকে সাম্প্রদায়িকতার প্রেক্ষাপটে টেনে নিয়ে বিকৃত অপব্যাখ্যায় বিব্রত করে এবং বিভেদ-বিভাজন সৃষ্টির মাধ্যমে রাষ্ট্রের শান্তি বিনষ্ট করে। তারা এই সম্প্রীতির বন্ধনকে নষ্ট করে ধর্মীয় ফায়দা লুটে।

তিনি বলেন , তাদের এ ধরণের ধৃষ্টতা এবং অন্তঃসারশূন্য বক্তব্য আমাদের মাঝে ইসলামী মূল্যাবোধের যে একটি ধারা রয়েছে; সেটিকে বিনষ্ট করছে। এ ধরণের ধৃষ্টতাপূর্ণ কাজের বিরুদ্ধে বাংলদেশের জনগণ সব সময় সচেতন ছিল এবং থাকবে। জাতির পিতার প্রসঙ্গে যারা বিব্রতকর, বিভ্রান্তিকর মিথ্যাচার করে; জাতির জনকের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা চালায় তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ সর্বশক্তি নিয়ে রুখে দাঁড়াবে। আওয়ামী লীগের একজন নেতা হিসেবে এবং একজন বাঙালি হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে এদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুসারে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের সাংবাদিক-শিক্ষকসহ বিবেকসম্পন্ন সুশীল সমাজের নেতৃত্বে জাতির জনকের বিরুদ্ধে ভ্রান্ত প্রচারণাকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান করছি।

কিভা নগরীতে স্থাপিত মোহাম্মদ ইবনে মুসা আল খারিযমির ভাস্কর্য

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘‘বঙ্গবন্ধুরভাস্কর্য দেশের স্বাধীনতা ও ইতিহাসের অংশ। এই প্রজন্ম ভাস্কর্য দেখে শিখবে। ইতিহাস জানবে। এটা মূর্তি কেন হবে? এখানে তো কেউ পূজা করতে যাবে না।''
আলোচিত বিষয়ে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের প্রধান মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করীমের পক্ষে সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, ভাস্কর্য আর মূর্তি একই। ইসলামে মূর্তি স্থাপন হারাম। তারপরও সরকার যদি বঙ্গবন্ধুর মূর্তি স্থাপন করে তবে তৌহিদি জনতা তা মেনে নেবে না।

তবে বাংলাদেশ ওলামা লীগের মহাসচিব মাওলানা আবুল হাসান শাহ শরিয়তপুরী বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে ইসলামে কোনো সমস্যা নাই। এটা সবাই দেখবে সেই জন্য বানানো হচ্ছে। হেফাজত ও জামাত শিবির এর বিরোধিতা করতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।

বাগদাদ নগরিতে স্থাপিত ইবন মিনার ভাস্কর্য

সার্বিক পরিস্থিতি বিশেলেষণের ক্ষেত্রে, ভাস্কর্য শিল্পচর্চা ও স্থাপত্য শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গি পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে ইসলামের সোনালী যুগের গড়াপত্তনে ভূমিকা রাখা বিশিষ্ট মুসলিম বিজ্ঞানী, দার্শনিক, চিন্তাবিদ ও কবি সাহিত্যিকদের বিখ্যাত সব ভাস্কর্য সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। যার মধ্যে ইরানের তাবরীজ নগরীর 'নীল মসজিদ' প্রাঙ্গণে অবস্থিত প্রখ্যাত পার্সিয়ান কবি ফেরদৌসীর ভাস্কর্য, বিজ্ঞানী ও দার্শনিক আবু রায়হান আল বিরুনির ভাস্কর্য, উজবেকিস্তানের কিভা নগরীতে স্থাপিত মোহাম্মদ ইবনে মুসা আল খারিযমি এবং বাগদাদ নগরিতে স্থাপিত ইবন মিনার ভাস্কর্যটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যার প্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসলামীক দৃষ্টিকোন থেকে ভাস্কর্যের শৈল্পিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্যের স্বীকৃতি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। যা মুসলিম বিশ্বের ইতিহাস চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শুধু তাই নয় ইসলামীক মূল্যাবোধে আঘাতহানার মত হলে অথবা কোরআন-সুন্নাহর বিধান বিরোধী হলে মুসলিম বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রগুলোতে এসকল ভাস্কর্য কখনই স্থাপিত হতো না।