• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২১, ২৯ চৈত্র ১৪২৭
প্রকাশিত: মার্চ ৩, ২০২১, ১০:১৪ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ৪, ২০২১, ০৩:৪২ পিএম

মশার ঘনত্ব বেড়েছে ৪ গুণ, অতিষ্ঠ নগরবাসী

মশার ঘনত্ব বেড়েছে ৪ গুণ, অতিষ্ঠ নগরবাসী

গত কয়েক দিন ধরে মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী। সন্ধ্যা নামার আগেই কেউ জ্বালছেন কয়েল, কেউ করছেন স্প্রে, কেউবা আবার ঢুকছেন মশারির ভেতর। তারপরও নেই নিস্তার। দিনের বেলায়ও মশার কামড়ে নাকাল নগরবাসী।

গবেষকরা বলছেন, ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানীতে কিউলেক্স প্রজাতির মশার ঘনত্ব বেড়েছে প্রায় চার গুণ। এখনই মশা নিধনের বিষয়ে সিটি করপোরেশনে পক্ষ থেকে সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে মার্চ মাসে উৎপাত আরো বাড়তে পারে। 

এদিকে মশা নিধনে জনসচেতনতা ও জনসম্পৃক্ততা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। অন্যদিকে নগরবাসীকে আরো খানিকটা ধৈর্য ধরার অনুরোধ করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।

নগরবাসীর অভিযোগ

রাজধানীর গুলশান-২ এলাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানির নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করেন আবুল কালাম আজাদ। তিনি মন্তব্য করেন, সন্ধ্যার পর মশার যন্ত্রণায় এক মিনিট স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারেন না। এত মশা উড়তে থাকে যে হাতের মুঠোয় ধরা যায়। 

মশার ওষুধের নামে সিটি করপোরেশন শুধু কেরোসিন ছিটায় আর ধোঁয়া দেয়। কাজের কাজ কিছুই হয় না বলে অভিযোগ করেন এই নিরাপত্তারক্ষী।

মশার কামড়ে অতিষ্ঠ মগবাজার এলাকার গৃহিণী তানজিল ওয়াহিদ বলেন, “দিনের বেলা কোনোভাবে পার করলেও সন্ধ্যার পর মশার উপদ্রবে টেকা যায় না। দরজা-জানালা বন্ধ করেও মশার কামড় থেকে রেহাই নেই। কয়েল বা মশার স্প্রে দিয়েও এখন আর কোনো কাজ হয় না। সিটি করপোরেশনের লোকজন মাঝে মধ্যে মশা মারার ধোঁয়া দিয়ে গেলেও উৎপাত কমে না।”

হাতিরঝিল এলাকায় বন্ধু-বান্ধব নিয়ে গল্প করছিলেন গাড়িচালক মোশরফ হোসেন। আড্ডারত অবস্থায়ই তাকে কয়েকবার মশা তাড়াতে দেখা যায়। তিনি বলেন, “কি দিন, কি রাত, মশার জ্বালায় টেকা দায়। সন্ধ্যার পর তো রাস্তায় দাঁড়ানোই যায় না। মশার কামড় থেকে বাঁচতে গাড়িতে গিয়ে বসি। কিন্তু সেখানেও একই অবস্থা। শান্তি নেই ঘরেও। মশার যন্ত্রণায় ছেলে-মেয়েরা পড়াশুনা পর্যন্ত ঠিকঠাক করতে পারে না।”

ডেমরা এলাকার বাসিন্দা নাহিদ আক্তার বলেন, “ছেলে-মেয়ে নিয়ে ভয়ে ভয়ে থাকি কখন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হই। মশার হাত থেকে বাঁচতে সব সময় কয়েল জ্বালিয়ে রাখি, তাও লাভ হয় না। রাতে ঘুমাতে গেলে মশারির নিচে মশা ভন ভন করে।”

গবেষকের তথ্য-উপাত্ত ও বিশ্লেষণ

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার দৈনিক জাগরণকে বলেন, “গত ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানীতে মশার ঘনত্ব বেড়েছে চার গুণ। এর ৯৫ শতাংশই হচ্ছে কিউলেক্স প্রজাতির মশা। বাকি ৫ শতাংশ হচ্ছে এডিসসহ অন্যান্য জাতের। কিউলেক্স মশার কামড়ে ফাইলেরিয়া বা গোদ রোগ হয়। তবে ঢাকায় গত কয়েক দশকে এই রোগ হতে দেখা যায়নি। দেশের অন্যান্য স্থানেও এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা খুবই কম।”

মশার ঘনত্ব পরীক্ষার বিষয়ে তিনি জানান, তারা প্রতি মাসে ঢাকার ৬টি এলাকায় মশার লার্ভা পরীক্ষা করেন। এলাকাগুলো হলো— মোহাম্মদপুর-শ্যামলী, উত্তরা, পরীবাগ-শাহবাগ-সেন্ট্রাল রোড, খিলগাঁও-বাসাবো, শাঁখারীবাজার এবং শনির আখড়া। এই ছয়টি এলাকার প্রতিটি থেকে তারা ডিপারের (মশার লার্ভা মাপার যন্ত্র) ২০০টি করে নমুনা সংগ্রহ করেন। তারপর প্রতিটি নমুনা পরীক্ষায় কতটি মশার লার্ভা পাওয়া গেল তা গড় করে একেকটি এলাকার ঘনত্ব নির্ণয় করেন। পরে ৬টি এলাকার আলাদা আলাদা ফলকে আবার গড় করে পুরো ঢাকার মশার ঘনত্ব নির্ণয় করা হয়।

মশার উৎপাতে নগরবাসী অতিষ্ঠ হবে এমন পূর্বাভাস আগেই দিয়েছিলেন জানিয়ে ড. কবিরুল বাশার বলেন, “আমরা ফেব্রুয়ারি মাসেই বলেছিলাম, ফেব্রুয়ারির শেষে এবং মার্চ মাসের শুরুতে মশার উৎপাতে অতিষ্ঠ হবে নগরবাসী। বছরের অন্যান্য সময়ে আমরা যেখানে প্রতি ডিপারে মশার লার্ভা পেতাম ১০ থেকে ১৫টি, সেখানে ফেব্রুয়ারি মাসে পাওয়া গেছে ৫০টির বেশি।” 

প্রাকৃতিকভাবে ঝড়-বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত বা সিটি করপোরেশন মশক নিধনে র্যাপিড ক্রাশ প্রোগ্রাম না নেওয়া পর্যন্ত মশার এই উপদ্রব কমবে না বলে মনে করেন তিনি।

মশা নিধনে সিটি করপোরেশন বছরজুড়ে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে, তারপরও মশার উপদ্রব বাড়ছে কেন?—এমন প্রশ্নের জবাবে এই অধ্যাপক বলেন, “মশা নিধনে সিটি করপোরেশনের অনেকগুলো ঘাটতি রয়েছে। মশা নিধনে প্রয়োজন সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা, নির্দিষ্ট সময় পর পর লার্ভিসাইট ও এডালটিসাইট করা এবং মশার ঘনত্ব বুঝে কীটনাশক প্রয়োগ করা। সিটি করপোরেশন যদি নিয়ম মেনে বিজ্ঞানভিত্তিক এবং সমন্বিতভাবে চেষ্টা করে, তাহলে মশা না কমার কোনো কারণ দেখছি না।”

ড. কবিরুল বাশার আরো বলেন, “আমরা যদি যে পরিবেশে মশার জন্ম হয়, সেটি তৈরি হতে না দিই বা পরিবেশ তৈরি হলে সেটাকে পরিষ্কার করে নিয়মিত লার্ভিসাইট করি, তাহলে মশা জন্মাবে না এবং তা টেকসই হবে। এছাড়া আমরা যদি জলাশয়গুলোতে লার্ভা খায় এমন মাছ ছেড়ে দিই সেগুলো প্রাকৃতিকভাবে লার্ভা খেয়ে মশা নিয়ন্ত্রণে রাখবে। কিন্তু এগুলো কিছুই না করে আমরা শুধু কীটনাশক ছিটাই তাহলে পুরোপুরি মশক নিধন আশা করা যায় না। এই জায়গায় আমাদের ঘাটতি আছে।”

শুধু সিটি করপোরেশনকে দোষারোপ না করে নগরবাসীরও কিছু দায়িত্ব পালন করতে হবে বলে জানিয়েছেন এই গবেষক। তিনি বলেন, “আমরা যদি আমাদের নিজের আঙিনাটাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখি, ড্রেন-ডোবা-নর্দমা তৈরি না করি, তাহলে মশা জন্মানোর সুযোগ পাবে না। এতে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে সিটি করপোরেশনকেও সহযোগিতা করা হবে। দুই পক্ষের সমন্বিত চেষ্টায় সহজেই নগরীর মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।”

দুই সিটি করপোরেশনের বক্তব্য

এদিকে নগরীর মশা নিধনের বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। ডিএনসিসি’র প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জোবায়দুর রহমান দৈনিক জাগরণকে বলেন, “মশা নিয়ন্ত্রণে আমাদের প্রতিদিনের রুটিন কার্যক্রম চলমান আছে। সকালে আমরা লার্ভিসাইট করি, বিকালে ফগিং করি। এছাড়া প্রতিনিয়ত কচুরিপানা-ড্রেন পরিষ্কার করা হচ্ছে। এর বাইরে গত ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমরা বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছি। আবার আগামী ৮ মার্চ থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত আমরা সমন্বিত কিউলেক্স মশক নিধন অভিযান পরিচালনা করবো।”

ডিএনসিসি’র এই কর্মকর্তা আরো বলেন, “এবারের অভিযান অন্যবারের থেকে অনেকটা আলাদা। আগে আমরা ডিএনসিসি’র ১০টি অঞ্চলের সবগুলোতে একই দিনে একইভাবে অভিযান পরিচালনা করতাম। কিন্তু এবার একদিনে একটি অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করা হবে। যেদিন যে অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করা হবে, সেই অঞ্চলে সব জনবল, যন্ত্রপাতি, ওষুধ কাজে লাগানো হবে। অভিযান পরিচালনার জন্য মেয়র আতিকুল ইসলাম ইতোমধ্যে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দিয়েছেন। প্রায় সাড়ে ১২’শ জনবল এই অভিযানে কাজ করবে।”

প্রথমবারের মতো মশা নিধনের ড্রোন ব্যবহার করা হবে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, “যেসব জায়গা দুর্গম, সরাসরি লার্ভিসাইট বা কীটনাশক প্রয়োগ করা যাচ্ছে না, সেই জায়গাগুলোতে ড্রোন ব্যবহার করা হবে। এবারের সাফল্য ও ব্যর্থতার ওপর নির্ভর করবে পরবর্তী সময়ে এটিকে আরো বড় পরিসরে ব্যবহার করা হবে কিনা।”

তবে নগরীরর মশা নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা ও জনসম্পৃক্ততা প্রয়োজন জানিয়ে তিনি আরো বলেন, শুধু সিটি করপোরেশনের একার চেষ্টায় মশা নিধন করা সম্ভব না। এজন্য ত্রি-পাক্ষিক সমন্বয় প্রয়োজন। সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে নগরবাসী ও স্থানীয় কাউন্সিলরদের মশক নিধনে কাজ করতে হবে। সিটি করপোরেশন একটা ড্রেন বা খাল পরিষ্কার করে দেওয়ার পর স্থানীয় জনগণকে অবশ্যই এটা মনে রাখতে হবে, তারা যেন কোনো আবর্জনা ফেলে ড্রেনটাকে আবার বদ্ধ না করে দেন, খালের পানির প্রবাহ ব্ন্ধ না করেন বা জলাশয়গুলোকে যেন ভাগাড়ে পরিণত না করেন। এই সমন্বয় না হলে মশক নিধন পুরোপুরি সম্ভব নয়।”

অন্যদিকে রাজধানীবাসীকে আরো কিছু দিন ধৈর্য ধরতে অনুরোধ করেছেন ডিএসসিসি’র মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। তিনি বলেন, ঢাকাবাসীকে আমরা একটু ধৈর্য ধারণ করতে অনুরোধ করছি। আমরা কৌশল পরিবর্তন করেছি। এখন যে কার্যক্রম নিচ্ছি, সকালের কার্যক্রম ৪ ঘণ্টায় চলছে, বিকেলের কার্যক্রম আরো বৃদ্ধি করেছি। সুতরাং আমরা আশাবাদী, আগামী দুই সপ্তাহ পর কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। তবে ডেঙ্গুর জন্য আমাদের কৌশল পরিবর্তন করে আবার এপ্রিল থেকে কার্যক্রম শুরু করব।”

স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর ভাষ্য

তবে গত বছরের তুলনায় এ বছর মশা কম বলে দাবি করেছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম। সম্প্রতি রাজধানীর একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্টেশন পরিদর্শনে গিয়ে তিনি বলেন, “ডেঙ্গু মশা নিয়ন্ত্রণে দুই সিটি করপোরেশনকে সব ধরনের সহযোগিতা দেয়ায় মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। এখন অ্যানোফিলিস ও কিউলেক্স মশা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মশাগুলো খুব বিপদজনক নয়। তাই আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা সবাই মিলে এই সমস্যা থেকে নগরবাসীকে পরিত্রাণ দেয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি ঢাকা শহরের খাল-নালা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে পারলে এসব মশার উপদ্রব থেকে নগরবাসীকে অনেকাংশে মুক্তি দেয়া সম্ভব।”