• ঢাকা
  • রবিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২১, ২৭ চৈত্র ১৪২৭
প্রকাশিত: মার্চ ৫, ২০২১, ০৫:০১ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ৫, ২০২১, ০৫:০১ পিএম

বিশ্ববাজার কাঁপানো টালি শিল্প ধ্বংসের পথে 

বিশ্ববাজার কাঁপানো টালি শিল্প ধ্বংসের পথে 

সাতক্ষীরার কলারোয়াকে ডাকা হয় ইতালিনগর। কারণ এখানে উৎপাদিত টালি ইতালিতে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি করা হয়। পরে তা নজর কাড়ে জার্মান, দুবাই, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের। এক পর্যায়ে দেশের মাটি পৌঁছে যায় ইউরোপ- আমেরিকায়। 

২০১০ সাল পর্যন্ত টালি শিল্পের মালিকদের সুদিন ছিল। আজ হারিয়ে যাচ্ছে সাতক্ষীরার কলারোয়ার টালি শিল্প। ভালো নেই টালি শিল্পের মালিক ও শ্রমিকরা। জৌলুশ হারিয়ে ধ্বংসের পথে সম্ভাবনাময় টালি শিল্প। শ্রমিকদের হাসি-কান্না-স্বপ্নের টালি রপ্তানিতে এক সময় পাওয়া যেত শত কোটি বৈদেশিক মুদ্রা। 

সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ না পাওয়া, আর্ন্তজাতিক বাজার সৃষ্টিতে সরকারের সহযোগিতার অভাব, আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার না পাওয়া ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিসহ নানা সমস্যার কারণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভবনাময় এ শিল্প পৌঁছে গেছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। 

উপজেলার মুরারিকাটি ও শ্রীপতিপুর গ্রামে অর্ধ শতাধিক টালি কারখানার অধিকাংশই বন্ধ হয়ে গেছে। টালি শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় চার হাজার শ্রমিক মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ৪১টি কারখানার মধ্যে সচল আছে মাত্র ১৫টি।

কলারোয়া টালি কারখানার মালিক ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি ও কলারোয়া ক্লে টাইলসের মালিক গোষ্ট চন্দ্র পাল বলেন, “পূর্বপুরুষদের পেশা অনুযায়ী এখানকার পালরা প্রতিমা তৈরি করতেন। প্রতিমা তৈরি করে মুরারিকাটি ও শ্রীপতিপুর এলাকার পালরা সারাদেশে খ্যাতি অর্জন করেন। ২০০০ সালের দিকে এখানে টালি নির্মাণ শুরু হয়। ২০০২ সালের দিকে ইতালিয়ান ব্যবসায়ী রাফায়েল আলদো আসেন বাংলাদেশে।” 

গোষ্ট চন্দ্র পাল আরও বলেন, “বিভিন্ন জায়গা ঘুরে নারায়ণগঞ্জে টালি তৈরির কাজ শুরু করেন রাফায়েল। কিন্তু ওই এলাকা টালি তৈরির উপযুক্ত না হওয়ায় তিনি দেশে ফিরে যান। রাফায়েল ফিরে গেলেও কোম্পানির ম্যানেজার রুহুল আমিন দেশের বিভিন্ন স্থানে টালি তৈরির মাটি খুঁজতে থাকেন। কলারোয়ার কুমারপাড়ায় এসে পেয়ে গেলেন মাটির ঠিকানা।  কারার এক্সপোর্ট ইমপোর্ট প্রা. লি. এর মালিক রুহুল আমিন কলারোয়া মৃৎশিল্পীদের পোড়া মাটির টালির সম্ভবনার পথ দেখান। সেই সূচনা। শুরুতেই পাঁচটি কারখানার উৎপাদিত টালি ইতালিতে রফতানি হত। এ কারণে এলাকাকে অনেকেই ইতালিনগর বলে থাকেন। দুই বছর যেতে না যেতেই এখানকার উৎপাদিত টালি নজর কাড়ে জার্মান, দুবাই, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের। দেশের মাটি পৌঁছে যায় ইউরোপ- আমেরিকায় ।” 

কলারোয়া ক্লে টাইলসের মালিক বলেন, “মোংলা বন্দর দিয়ে কলারোয়ার টালি চলে যায় ইউরোপে। বিনিময়ে আসে বৈদেশিক মুদ্রা। চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এখানকার টালি কারখানার সংখ্যাও বেড়ে যায়। এসব কারখানায় কাজ পান প্রায় চার হাজার শ্রমিক। ২০১০ সাল পর্যন্ত টালি শিল্পের মালিকদের সুদিন ছিল। প্রতিটি টালি ৩০ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। এতে করে প্রতি বছর এ শিল্প থেকে ৩০০ কোটিরও অধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হত।” 

গোষ্ট চন্দ্র পাল বলেন, “এক কন্টেইনারে ১৫ হাজার পিস টালি নেওয়া হত। প্রতি মাসে ৩০ কন্টেইনার টালি যেত ইটালিতে। বর্তমানে পাঁচ থেকে ছয় কন্টেইনার টালি যায় ইতালিতে। প্রতি বছর নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হয় টালি মৌসুম। ৩১ মে পর্যন্ত চলে উৎপাদন। বর্তমানে অনেকেই টালি উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন। সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ পেলে এবং আর্ন্তজাতিক বাজার সৃষ্টিতে সরকার যদি সহযোগিতা করে তাহলে আমরা আবার অধিক পরিমান টালি ইউরোপ- আমেরিকায় রপ্তানি করতে পারব। এতে পুনরায় আমাদের আগের দিন ফিরে আসবে।”

ব্যবসায়ীরা বলেন, প্রতি কন্টেইনার টালির উৎপাদন খরচ প্রায় এক লাখ টাকা। ইউরোপের বাজারে যার মূল্য দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। বছরে প্রায় ৪০০ কন্টেইনার টালি রপ্তানি করে শত কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা হত। বর্তমানে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মালিকদের অসম প্রতিযোগিতার কারণে এ শিল্প আজ ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে। আগের মতো টালি রপ্তানি করা যাচ্ছে না। আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিসহ নানা সমস্যার সমাধান করে এ শিল্পকে আমারা রক্ষা করতে চাই। টালি যাতে আগের মতো রপ্তানি করতে পারি।