• ঢাকা
  • শনিবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২১, ৮ কার্তিক ১৪২৮
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২২, ২০২১, ০৫:৪৬ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : সেপ্টেম্বর ২২, ২০২১, ১১:৪৬ এএম

ব্যক্তিগত গাড়ির চাপে অচল ঢাকা

ব্যক্তিগত গাড়ির চাপে অচল ঢাকা

রাজধানীর সড়ক বেশির ভাগ সময় অচল থাকে ছোট গাড়ির চাপে। সড়কে গণপরিবহন কম থাকলেও ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। সড়কে নামছে নানা ফ্যাশনের বাহারি সব গাড়ি। এসব গাড়ির চাপেই ভেঙে পড়েছে রাস্তার শৃঙ্খলা। ১০ বছরে ঢাকায় নিবন্ধিত গাড়ি বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্র, তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ; শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন সেবা রাজধানীমুখী। এ কারণে মানুষের মূল স্রোত রাজধানীকেন্দ্রিক। আর তাই মানুষের যাতায়াতের চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গাড়ি। যার প্রভাবে যানজটে অচল প্রায় দুই কোটি মানুষের শহর ঢাকা।

সর্বশেষ বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, ঢাকায় যানজটে গড়ে দিনে নষ্ট হচ্ছে প্রায় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা। বছরে এই মহানগরে যানজটে ক্ষতি হচ্ছে কমপক্ষে এক লাখ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) গত আগস্ট মাস পর্যন্ত নিবন্ধিত গাড়ির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢাকায় নিবন্ধিত মোট গাড়ির তুলনায় শুধু মোটরসাইকেলই নিবন্ধিত হয়েছে ৪৯ শতাংশ। প্রাইভেট কার (ব্যক্তিগত গাড়ি) নিবন্ধিত হয়েছে ১৮ শতাংশ। আর বাস নিবন্ধিত হয়েছে দুই শতাংশ। অর্থাৎ গণপরিবহনের তুলনায় ব্যক্তিগত ও ছোট গাড়ির নিবন্ধন বেশি হয়েছে।

বিআরটিএ’র তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট পর্যন্ত ঢাকায় নিবন্ধিত হয়েছে মোট ১৭ লাখ ১৩ হাজার ৫৫৪টি গাড়ি। এর মধ্যে মোটরসাইকেল আট লাখ ৪৯ হাজার ৩৩৫টি, প্রাইভেট কার তিন লাখ আট হাজার ৮৬০টি, বাস ৩৬ হাজার ৯৭৮টি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় প্রায় ৮০ শতাংশ যাতায়াত পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে, যার অর্ধেক আবার কিলোমিটারের মধ্যে। স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতের জন্য সাইকেলে বা হেঁটে নিরাপদে চলাচলের পরিবেশ তৈরি করা দরকার। তাতে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

ওয়ার্ক ফর আ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের প্রকল্প কর্মকর্তা আতিকুর রহমান জানান, ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা উচিত, কিন্তু সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা, যেমন সহজ শর্তে গাড়ি কেনার ঋণ দেওয়ার মতো বিষয়গুলো প্রকারান্তরে আরও বেশি মানুষকে গাড়ি কেনায় উৎসাহিত করছে।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে মেয়র পদপ্রার্থীরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বিজয়ী হলে তাঁরা প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণে জোড়-বিজোড় পদ্ধতি চালু, প্রাইভেট কারে সিএনজি ব্যবহার বন্ধ, উচ্চহারে পার্কিং চার্জ আরোপ, সাইকেলের জন্য আলাদা লেন ও গণপরিবহন ব্যবস্থা শক্তিশালী করবেন। কিন্তু, দৃশ্যচিত্রে দেখা যায় উল্টো। রাজধানীতে দিন যতিই যাচ্ছে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ততই বাড়ছে। পর্যাপ্ত গণপরিবহন না থাকায় প্রাইভেট কারের ওপর নির্ভর হয়ে পড়েছে নগরবাসীর বড় একটি অংশ। কর্মস্থলে যাতায়াত, ছেলেমেয়ের স্কুলে যাতায়াত, বেড়ানো, কেনাকাটায় প্রাইভেট কারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছেই।  

সমীক্ষা বলছে, ব্যক্তিগত গাড়িতে ১০ শতাংশেরও কম ট্রিপ হয়ে থাকে রাজধানীতে।

হেলথ ব্রিজ ফাউন্ডেশন অব কানাডার আঞ্চলিক পরিচালক দেবরা ইফরইমসন ঢাকার পরিস্থিতি নিয়ে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে গত ১৮ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে বলেন, নগরের যাতায়াত ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত গাড়িবান্ধব প্রকল্প (ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে) থেকে বের হয়ে অযান্ত্রিক যান, পথচারীদের প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

বুয়েটের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দখল, খোঁড়াখুঁড়িসহ বিভিন্ন অব্যবস্থাপনার কারণে ঢাকার ৪.৫ শতাংশ রাস্তাই ব্যবহার করা যায় না। এর ওপর প্রাইভেট কার দখল করে রাখছে চলাচলের রাস্তা। ঢাকা সমন্বিত পরিবহন গবেষণার তথ্যানুসারে, গতি, আকার ও ব্যবহারের দিক থেকে একটি বড় বাস একটি প্রাইভেট কারের আড়াই গুণ বেশি স্থান দখল করে। একটি বড় বাসে ৫১ জন যাত্রী বহন করা সম্ভব। প্রাইভেট কারে চালক ছাড়া তিনজন যাত্রী বহন করা যায়।

এ বিষয়ে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান দৈনিক জাগরণকে বলেন, ব্যক্তিগত গাড়ির প্রসঙ্গে বলতে গেলে, সড়কে যে পরিমাণ প্রাইভেট কার বেড়েছে তা অস্বাভাবিক। বিআরটিএ’র সমীক্ষা লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাবো নিবন্ধিত গাড়ির ভিতরে মটরসাইকেল, প্রাইভেট কারের নিবন্ধিত শতাংশই বেশি। যখন উন্নত দেশগুলো গণপরিবহন ভিত্তিক উন্নয়নের দিকে আগাচ্ছে, আমরা সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দিকে ঝুঁকছি। যেহেতু ঢাকায় সড়কের সংখ্যা বাড়ানোর খুব একটা সুযোগ নেই, নীতিমালায় পরিকল্পিত গণপরিবহনকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। শহরে যাতায়াতের উপযুক্ত মাধ্যম নির্ধারণের জন্য ট্রিপ লেংথ ডিস্ট্রিবিউশন ফাংশান (টিএলডিএফ) ব্যবহার করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, একটি নগরীতে সড়কব্যবস্থা ভালো থাকলে ১০ শতাংশ সড়ক হলেই একটি সুন্দর যাতায়াতের ব্যবস্থা হয়। সেই সাথে প্রাণবন্ত নগরীতেও পরিণিত হয়। সেখানে আমাদের আছে ৮ শতাংশ। দুঃখের সাথে বলতে হয়, নগরী উন্নয়নের জন্য যে খোঁড়াখুড়িসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন, ওয়াসা, ডিপিডিসি, যে কাজগুলো অব্যহত রেখেছে, তাতে ৮ শতাংশ সড়কের ভিতরে আমরা ৩.৫ শতাংশ সড়কও ব্যবহার করতে পারি না। আমরা গবেষণায় দেখেছি, ১০০% মানুষের ভিতরে ৭০% মানুষেরই ২.৫ কিলোমিটার ট্রিপ লেথ। আমাদের শহরে যদি সুন্দর প্রাণবন্ত ফুটপাতের ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে এই ২.৫ কিলোমিটার সড়ক সবাই হেঁটে অফিস থেকে শুরু করে যে যার কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ করতে পারবে।

জাগরণ/এমএইচ