• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬
প্রকাশিত: এপ্রিল ১১, ২০১৯, ০২:১৮ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ১২, ২০১৯, ০৮:২৯ পিএম

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র : স্বাধীন বাংলাদেশের সাংবিধানিক উৎস

আবুল খায়ের
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র : স্বাধীন বাংলাদেশের সাংবিধানিক উৎস

আধুনিককালে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র উদ্ভবের ইতিহাসে প্রজাতন্ত্র থেকে গণপ্রজাতন্ত্রে উত্তরণে মানব জাতিকে ১৬০টি বছর পাড়ি দিতে হয়েছে। ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ফরাসী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্বের প্রথম বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্র, যা সমগ্র ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের একমাত্র নিদর্শন। প্রথম প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ১৩২ বছর পর ১৯২১-এ মহাচীনে গঠিত হয় চীনা কমিউনিস্ট পার্টি। প্রতিষ্ঠার ২৮ বছর পর চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক সর্বব্যাপী জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রায় ৬ কোটি মানুষের সুমহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৯৪৯-এর অক্টোবরের ১ তারিখে মহান চীন বিপ্লব প্রতিষ্ঠা করে ইতিহাসের প্রথম শ্রমিক-কৃষকের 'গণপ্রজাতন্ত্রী চীন', যা সমগ্র এশিয়ার প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের অন্যতম পূর্ণাঙ্গ নিদর্শন। একই বছরের জুনের ২৩ তারিখে ভারতবর্ষ বিভাজিত হওয়ার দু'বছর পর খণ্ডিত অংশের পূর্বাঞ্চল তথা পূর্ববঙ্গে গঠিত হয় আওয়ামী লীগ। প্রতিষ্ঠার ২২ বছরের ব্যবধানে পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রাম করে ১৯৭১-এর এপ্রিলের ১০ তারিখে মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত 'বাংলাদেশ গণপরিষদ' কর্তৃক ঘোষিত হয় ইতিহাসের দ্বিতীয় গণপ্রজাতন্ত্র 'গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ', যা আমরা অর্জন করেছিলাম বাঙালীর মহান গণতান্ত্রিক বিপ্লব ১৯৭১-এর ডিসেম্বরের ১৬ তারিখের বিজয়ের মাধ্যমে ত্রিশ লক্ষাধিক প্রাণ আর চার লক্ষাধিক মা-বোনের মহত্তর আত্মত্যাগের বিনিময়ে। বাঙালীর মহান মুক্তিযুদ্ধে চীনের বিরোধী ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও প্রিয় মাতৃভূমির নামকরণে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ কেন 'গণপ্রজাতন্ত্র' বেছে নিয়েছিলেন? এ প্রশ্নের উত্তরে সংক্ষেপে এটুকু বলা যায় যে, রাষ্ট্র বিবর্তনের ধারণা ও তত্ত্বানুযায়ী রাষ্ট্রীয় চরিত্রের এরূপটিই ছিল সর্বাধুনিক। আর বাস্তবতা ছিল এই যে, নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিগণ যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে একত্রিত হয়ে গণমানুষের সার্বভৌমত্বে অভিষিক্ত হওয়ার জাতীয় মুক্তির মহৎ আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করতে রাষ্ট্র সৃষ্টির ইতিহাসে সর্বোচ্চ অর্জনগুলো থেকে সবচেয়ে আধুনিক রূপটি গ্রহণ করেছিলেন, যা প্রতিফলিত হয় রাষ্ট্রীয় নামকরণে। স্বাধীন বাংলাদেশের স্রষ্টা ও রূপকাররা অপরূপ সুন্দর এক বিশুদ্ধ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন। আনুষ্ঠানিকভাবে 'গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ' নামকরণের ঘোষণাটি ছিল দূরদর্শী একটি সিদ্ধান্ত, যা বিধিবদ্ধ হয়েছে প্রথমে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে ও পরে সংবিধানে।
১৯৭১-এর ১০ এপ্রিল মুজিবনগরে 'গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ' নামক যে নবীন রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘোষিত এবং এর ভিত্তিতে যে সরকার গঠিত হয় তার সাংবিধানিক ভিত্তি হচ্ছে 'স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র'। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র উদ্ভবের প্রেক্ষাপট, পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর সীমাহীন নিপীড়ন-নির্যাতন-বঞ্চনা, অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বৈষম্য এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিরুদ্ধে বাঙালী জাতির বীরত্ব অভিব্যক্ত হয়েছে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে। ঘোষণাপত্রের আধারে গণপ্রজাতন্ত্রের মূলনীতি হিসেবে ধারিত হয়েছে মানব জাতির সেইসব সুমহান আদর্শ তথা 'জাতীয়তাবাদ', 'সাম্য', 'মানবিক মর্যাদা' ও 'সামাজিক ন্যায়বিচার'- যা ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে চর্চিত হয়ে আসছে কয়েক সহস্র বছর ধরে। মুক্তিযুদ্ধের মহান মিত্র ভারতবর্ষের ঐক্যবদ্ধ ইতিহাসের অংশীদার বাঙালী প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর পূর্বে পুণ্ড্রনগরে যে নগররাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল তার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ছিল-'রাজনীতি ধর্মনীতি নহে', 'পরধর্ম নিন্দা নিষিদ্ধ', 'অহিংসা পরম ধর্ম' ও 'জীবে দয়া করে যেইজন সেইজন পুজিছে ঈশ্বর'। পুণ্ড্রনগর থেকে উৎসারিত রাষ্ট্রীয় মূলনীতি বাঙালীর সমাজ বিকাশের অনত্মঃস্রোতে প্রবাহিত হয়ে, নিরন্তর শ্রেণী সংগ্রামের মধ্যদিয়ে শাণিত হয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মূলনীতি হিসেবে আধুনিক রূপ পরিগ্রহ করে মুজিবনগরে। কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া পুন্ড্রনগরের রাষ্ট্রদর্শন ছায়া ফেলে ঐতিহাসিক মুজিবনগরে, যা লিপিবদ্ধ হয়ে আছে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে। খণ্ডিত অস্তিত্ব নিয়ে জাতি হিসেবে আমরা পরম সৌভাগ্যবান বটে। কেননা বিশ্বের অল্প কয়েকটি জাতিরই রয়েছে এমন প্রত্যয়দীপ্ত, পূর্ণাঙ্গ ও সুসংযত একটি ঘোষণাপত্র। প্রতিক্রিয়াশীল শাসকের বিরুদ্ধে সংগ্রামী জনতার রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের অন্তহীন প্রেরণার উৎস এই সাংবিধানিক দলিলটি। বাঙালী জাতির রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বে অভিষিক্ত হওয়ার প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র।
প্রতিটি জাতিরই একটি স্বাধীনতা দিবস রয়েছে। কিন্তু বাঙালী জাতির শুধু স্বাধীনতা দিবসই নয়, রয়েছে বিজয় দিবসও। উপমহাদেশের অন্য কোন জাতিরই জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত ত্রিশ লক্ষাধিক মানুষের আত্মত্যাগে সমৃদ্ধ, এমন গর্বিত ও মহিমান্বিত বিজয় নেই। ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর, মহান স্বাধীনতা থেকে মহত্তর বিজয়। গণহত্যার রক্তের জমিন থেকে বিজয়ের লাল-সবুজের পতাকা। গণহত্যা, প্রতিরোধ, যুদ্ধ আর ধ্বংসের মৃত্যু উপত্যকা থেকে বিদ্রোহ, বিপ্লব, বীরত্ব আর সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মাতোয়ারা বীর বাঙালীর এযাবৎকালের শ্রেষ্ঠ অর্জন, স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। ২৬ মার্চ এবং ১৬ ডিসেম্বর যেন একসূত্রে গাঁথা। আর এই সূত্রের সেতুবন্ধন হচ্ছে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। বিজয়ের বীজ রোপণ এবং স্বাধীনতা ঘোষণার অনুমোদন রয়েছে ১০ এপ্রিল ১৯৭১-এ প্রণীত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে। ঘোষণাপত্রটি অনুমোদিত হয়েছিল বাংলাদেশ গণপরিষদে। গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল '৭০-এ নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের সমন্বয়ে '৭১-এর ১০ এপ্রিল, মুজিবনগরে। আর এই উভয় পরিষদে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্যদের সুনির্দিষ্ট শপথনামার ভিত্তিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শপথ গ্রহণ করিয়েছিলেন ৩ জানুয়ারি, '৭১-এ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। ঐতিহাসিক শপথ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, '৬ দফা ও ১১ দফা আজ আমার নয়, আমার দলেরও নয়। এ-আজ বাংলার জনগণের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। কেহ যদি এর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তবে বাংলার মানুষ তাঁকে জ্যান্ত সমাধিস্থ করবে। এমনকি আমি যদি করি আমাকেও।'
জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের নেতৃত্ব প্রদানকারী দল আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে ১০ এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করে, বাংলাদেশ গণপরিষদ গঠন করে ৩ জানুয়ারির শপথ দিবসের শপথনামা, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ ও বাংলার মানুষের কাছে প্রতিশ্রুত অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিনিধিত্বকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ কর্তৃক সরকার গঠনের ও শাসনতন্ত্র প্রণয়নের রাজনৈতিক বৈধতাকে পাকিস্তানী সামরিক শাসকচক্র বিচ্ছিন্নতাবাদের কানাগলিতে নিক্ষেপ করে নিষ্ঠুর পন্থায় দমাতে চেয়েছিল। কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক তথা গণতান্ত্রিক বৈধতা রক্ষা করে আওয়ামী লীগদলীয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধকালীন বাস্তবতায় জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের সমন্বয়ে বাংলাদেশ গণপরিষদ গঠন করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের যে যুদ্ধ শুরু করে তার আদর্শিক উৎসস্থল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। নিপীড়নের বিরুদ্ধে, উৎপীড়কের বিরুদ্ধে জনপ্রতিনিধিরা গণপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার গঠন করে যুদ্ধ ঘোষণা ও পরিচালিত করেছিল বলেই যুদ্ধটি ছিল সর্বব্যাপী জনযুদ্ধ এবং ন্যায়যুদ্ধ। আর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি ছিল এই ন্যায়যুদ্ধ ও জনযুদ্ধের সংবিধান।
এ রকম একটি জনযুদ্ধকালীন বাস্তবতায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অধিবেশনে মিলিত হওয়া, বাংলাদেশ গণপরিষদ গঠন, 'স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র' প্রণয়ন ও 'আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎকরণ আদেশ' গ্রহণ এবং এর ভিত্তিতে সরকার গঠনের পুরো প্রক্রিয়াটি বিশুদ্ধ গণতান্ত্রিক। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সৃষ্টির ইতিহাসে প্রধান প্রধান মতবাদ তথা 'সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব', 'বলপ্রয়োগ তত্ত্ব' এবং 'শ্রেণী সংগ্রাম তত্ত্ব' ধারণ করে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতাকে অক্ষুন্ন রেখে আধুনিককালের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র উদ্ভবের ইতিহাসে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায়, স্বৈরশাসন থেকে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক শাসনে, অন্যায়-অবিচার থেকে সামাজিক ন্যায়বিচারে, অসাম্য থেকে সাম্যে, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা থেকে ভাষাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িকতায়, সর্বোপরি সেনাতন্ত্র থেকে গণপ্রজাতন্ত্রে উত্তরণ ঘোষিত হয়েছে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণাটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসৃত। সংবিধানের ৪র্থ তফসিলের ৩নং ধারার (১) নং উপ-ধারায় 'ধারাবাহিকতা রক্ষা ও অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাবলী' শিরোনামে উল্লেখ আছে যে, '১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ হইতে এই সংবিধান প্রবর্তনের তারিখের মধ্যে প্রণীত বা প্রণীত বলিয়া বিবেচিত সকল আইন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বা যে কোন আইন হইতে আহরিত বা আহরিত বলিয়া বিবেচিত কর্তৃত্বের অধীন অনুরূপ মেয়াদের মধ্যে প্রযুক্ত সকল ক্ষমতা বা কৃত সকল কার্য এতদ্বারা অনুমোদিত ও সমর্থিত হইল এবং তাহা আইনানুযায়ী যথার্থভাবে প্রণীত, প্রযুক্ত ও কৃত হইয়াছে বলিয়া ঘোষিত হইল।' ১৯৭২-এর ৪ নবেম্বর অনুমোদিত ও ১৬ ডিসেম্বর প্রবর্তিত সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে ২৬ মার্চের ঘোষণা এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সাংবিধানিক আইন হিসেবে অনুমোদিত, সমর্থিত এবং স্বীকৃত। ফলে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের বক্তব্যকে উপেক্ষা করা সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের রয়েছে নিয়মতান্ত্রিক তথা সুনিয়মিত ধারাবাহিক বিকাশ এবং সাংবিধানিক উৎস ও পরম্পরা। সাংবিধানিক পরিভাষায় যাকে বলা হয় 'লেজিলশেন বাই রেফারেন্স'।
এই সাংবিধানিক পরম্পরার উৎসস্থল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং ৩ জানুয়ারি ৭১-এর শপথনামাটি হচ্ছে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের উপক্রমণিকা এবং সেহেতু প্রজাতন্ত্রের আঁতুড়ঘর তথা বাংলাদেশ গণপরিষদ গঠনের অন্যতম সাংবিধানিক উৎস। সংবিধানের প্রস্তাবনায় এবং অনুচ্ছেদ ১-এ যথাক্রমে 'গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি' এবং "...প্রজাতন্ত্র, যাহা 'গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ' নামে পরিচিত হইবে" উল্লেখ আছে। বাংলাদেশ যে 'গণপ্রজাতন্ত্রী' রাষ্ট্র হবে এই ঘোষণাটি ঘোষণাপত্রের ১১নং প্যারায় স্পষ্ট ঘোষিত হয়েছে, 'যেহেতু আমরা বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী ঘোষণা করিতেছি এবং উহা দ্বারা পূর্বাহ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা অনুমোদন করিতেছি।' বাংলাদেশ গণপরিষদ কর্তৃক 'গণপ্রজাতন্ত্র' প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের 'স্বাধীনতার ঘোষণার' এই যে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন তা রাষ্ট্র উদ্ভবের তথা সাংবিধানিক বিকাশের বিধিবদ্ধ ধারাবাহিকতাকে নির্দেশ করার পাশাপাশি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক, বিধানিক, সর্বোপরি শাসনতান্ত্রিক রূপরেখাও নির্দেশ করে। সংবিধানের প্রস্তাবনায় যা আছে বিমূর্ত আকারে, ঘোষণাপত্রে তা আছে মূর্ততায়। ঘোষণাপত্র হচ্ছে সংবিধানের ভ্রূণাবস্থা, ঘোষণাপত্রের বিকশিত ও বর্ধিত রূপই হচ্ছে সংবিধান। স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জন্মসনদ হচ্ছে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। তাই বাঙালী জাতির জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের গুরুত্ব অপরিসীম।
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, এতে রয়েছে ১৮টি প্যারাগ্রাফ ও ৪৮৯টি শব্দ মাত্র। ঘোষণাপত্রের অন্তর্নিহিত চেতনা এবং আদর্শিক শক্তি প্রজাতন্ত্রের সাংবিধানিক-চৈতন্যিক ভিত্তি। এমনকি ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে রচিত পররাজ্যগ্রাসী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের চেয়েও বাঙালী জাতির স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ধারণে, মতাদর্শিক কাঠামো নির্মাণে এবং বক্তব্য প্রকাশে অধিকতর মানবিক, গণতান্ত্রিক, নিয়মতান্ত্রিক। ঘোষণাপত্রটি একটানা পড়লেই বোঝা যায় আমাদের জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সম্পর্কিত অবস্থান নির্ণয়ে এটাই সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক ও নিয়ামক শক্তি। বলা যায় যে, প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য উভয় সভ্যতায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র উদ্ভবে সবচেয়ে সুসংহত, অভেদ্য ও সুসংযত রাজনৈতিক এবং সাংবিধানিক দলিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। যা জনসাধারণের সার্বভৌম শক্তিকে প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উপস্থাপন করে।
প্রজাতন্ত্রের সূচনালগ্নে এই দলিলটি রাজনৈতিক বৈধতার শক্ত ভিত হিসেবে কাজ করে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সুদূরপ্রসারী তাৎপর্যের জন্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে গৌরব বহন করবে। সাংবিধানিক সাহিত্যের তথা দলিলের যেসব অসাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকে অর্থাৎ এর শব্দচয়ন, শব্দসমষ্টি, বাক্যবিন্যাস, ভাষাগত রচনাশৈলী, বক্তব্যের অখন্ডতা-পূর্ণাঙ্গতা, রচনাকৌশল, আবেগ-অলঙ্করণ, মৌলিকত্ব, বর্ণনাত্মকভঙ্গি, ইতিহাসচিত্রণ, পরিস্থিতিচিত্রণ- এর সবই জাতীয় আবেগ মন্থন করে কর্তৃত্বব্যঞ্জক অধিকারিত্বে ঘোষণাপত্রে বিদ্যমান। ঘোষণাপত্রটি অপূর্ণ থেকে যেত যদি আবেগ, সাংবিধানিক অভিব্যক্তি, বেদনা, উচ্ছ্বাস, অহঙ্কার, কপটতা, ছলনা, ষড়যন্ত্র, বৈষম্য ও চক্রানত্মের বিষয়গুলো মূর্তনির্দিষ্ট না হতো। ঘোষণাপত্রের বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি ও সিদ্ধান্তসমূহ সুসংগঠিত, সুসংযত, সংক্ষিপ্ত, বক্তব্যবাহক এবং ইতিহাস সচেতন। এর অলঙ্কারিক শব্দবর্ণালি সমগ্র জাতির স্বাধীন রাষ্ট্রপ্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষাকে মানসকাঠামোতে ধারণ এবং নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালীর বীরত্ব ও সাহসিকতাকে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে উন্নীত করে। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর সীমাহীন অত্যাচার-নির্যাতন ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক কার্যকলাপের বিপরীতে রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের সংগ্রামে বীর বাঙালীর আত্মত্যাগে সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঘোষণাপত্রের বক্তব্যে এক প্রশান্ত গাম্ভীর্যে নির্বাণ প্রাপ্ত হয়। মহাকবি গ্যেটের ভাষায়- "...এ নির্যাতন থেকে যদি পাই এক মহত্তম সুখ, তবে কেন সেজন্য মনোপীড়া, তৈমুরের শাসনেও হয়নি কি আত্মার অশেষ নির্বাণ...!"
পুরো ঘোষণাপত্র পাঠে একক কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টি নয়, বরং কোটি কণ্ঠের সমবেত উচ্চারণ যেন ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয় কাল থেকে মহাকালে। বৈষম্য-বঞ্চনা থেকে মুক্ত হয়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের এক মহত্তম সৃষ্টির উল্লাসে কিয়ৎকালের জন্য ইতিহাস যেন ভারমুক্ত হয়; সমবেত জনপ্রতিনিধিগণ আপন কর্তব্যকর্ম পালনে স্থির প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে মুক্ত স্বাধীন বিশ্বে অকপটে নিজ জাতির স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা ও এর ন্যায্যতা-বৈধতা ঘোষণা করে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কণ্ঠে এভাবে উপস্থাপিত হয়ে একটি জনগোষ্ঠীর স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রপ্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষার বিধিবদ্ধ রূপ আমরা প্রত্যক্ষ করি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে।
ঘোষণাপত্রের বক্তব্য শুধু জাতীয় নয়, আন্তর্জাতিক, একদেশদর্শী নয় সর্বজনীনও বটে। বাঙালী জাতির রাজনৈতিক অধিকারের দলিল হিসেবে মানব সভ্যতার প্রগতির পথে ১৯৪৮-এ জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত "মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণার" সাথে ঘোষণাপত্রের বক্তব্য একাত্মতা প্রকাশ করে আন্তর্জাতিকতা ও সর্বজনীনতা পেয়েছে। জাতীয় সার্বভৌমত্ব, অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিক মর্যাদাবোধ, মানুষে মানুষে সাম্যের জয়গান ও সামাজিক ন্যায়বিচারের অঙ্গীকারে বাঙালী জাতি ২৩ বছরের সংগ্রামের চূড়ান্ত মাহেন্দ্রক্ষণে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে একসূত্রে গ্রথিত হয়েছিল এক স্থানে, এক সময়ে এবং একটি দলিলে : ঐতিহাসিক মুজিবনগরে, ১৯৭১-এর ১০ এপ্রিলে, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে।
জাতীয় স্বাধীনতা অর্জনে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র নিযুত মানব সন্তানের আত্মত্যাগে শাণিত। ঘোষণাপত্রে প্রচ্ছন্নভাবে ব্যক্ত হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের চেতনা সংবলিত চার মূলনীতি- গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণার সাংবিধানিক স্বীকৃতি রয়েছে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে। স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে পক্ষে-বিপক্ষে কুতর্কের আড়ালে সুকৌশলে ধামাচাপা দেয়া হয়েছে এর সাংবিধানিক স্বীকৃতিকে। ঘোষণাপত্র সম্পর্কে সীমাহীন নীরবতার অস্ত্রে ঘায়েল করা হয়েছে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের মূল চেতনাকে। স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব নিয়ে, মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত প্রথম সরকারের নেতৃত্বে যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে সমাজে ও রাষ্ট্রে বিস্তর বিভ্রান্তিকর কথা চালু করা হয়েছে। আর এটি সম্ভবপর হয়েছে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রসহ জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস ও বঙ্গবন্ধুর চেতনা সম্পর্কে সীমাহীন উদাসীনতার সুযোগে। স্বাধীন বাংলাদেশের সাংবিধানিক এই দলিলটি সম্পর্কে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের শক্তি কেন যথাযথ আলোকপাত করেনি, কেন ঘোষণাপত্র সম্পর্কে নীরবতা প্রদর্শন করেছে তা বোধগম্য নয়, এবং এই উদাসীনতা ক্ষমার অযোগ্য।
দেরিতে হলেও এতদসংক্রান্ত বিষয়ে সম্প্রতি আদালতের রায়ে ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে উর্ধে তুলে ধরার যে প্রয়াস তা প্রশংসনীয়। তবে আদালতের রায়-ই যথেষ্ট নয়, এ বিষয়ে বাড়াবাড়ি যে পরিমাণে হয়েছে তাতে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ঘোষণাপত্র বিষয়ে সংসদে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন ও নিষ্ঠার সঙ্গে সে আইনের প্রয়োগ জরুরী। স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের উৎসস্থল তথা প্রজাতন্ত্রের আরম্ভস্থল হিসেবে বিবেচ্য এই সাংবিধানিক দলিলটির চর্চা ও আবশ্যকতা, এর ন্যায্যতা ও বৈধতা এবং জাতীয় ইতিহাসে এর গুরুত্ব, এর রাজনৈতিক দর্শন-জাতীয়তাবাদ, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার সম্পর্কে ব্যাপক অনুশীলনের প্রথম ধাপে পুরো ঘোষণাপত্রটি সংবিধানে ও নবম-দশম শ্রেণীর পাঠ্য-পুস্তকে অন্তর্ভুক্তকরণ আজ সময়ের দাবি।
লেখক : প্রকাশক ও গবেষক
[email protected]

Islami Bank