• ঢাকা
  • শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: এপ্রিল ১২, ২০১৯, ০৬:২১ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ১৫, ২০১৯, ০৯:৫৩ পিএম

বহুধা পার্বণের মেলবন্ধনে বাংলা নববর্ষ

গোলাম মোস্তফা
বহুধা পার্বণের মেলবন্ধনে বাংলা নববর্ষ
গোলাম মোস্তফা

আমাদের এই দেশটি ঋতুবৈচিত্র্যের দেশ। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠান আমাদের জীবনকে করেছে বর্ণাঢ্যময়। বহুধা পার্বণের মেলবন্ধনে আমাদের জীবন হয়েছে ঋদ্ধ ও সমৃদ্ধ। বাংলা নববর্ষে বাঙালি জীবনে কয়েক শ’ বছর ধরে চলা ‘হালখাতা’ সংস্কৃতির সঙ্গে সম্প্রতি যোগ হয়েছে পান্তা ইলিশ।

বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ কীভাবে এলো? কীভাবেই-বা পহেলা বৈশাখ বাংলাভাষী এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান উৎসবে পরিণত হলো? আমাদের বাঙালি জীবনের সঙ্গে কৃষি ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কৃষিকাজকে প্রাধান্য দিয়েই বাংলা নববর্ষের উৎপত্তি, এটি আমরা সাদামাটাভাবে জানি। পহেলা বৈশাখ শুরুর দিকে ‘ফসলি মাস’ হিসেবে পালন করতেন বাংলার কৃষক। চৈত্র মাসের শেষদিন পর্যন্ত তারা ফসল তোলার পাশাপাশি খাজনাদি পরিশোধ করতেন এবং পহেলা বৈশাখে একে অপরকে মিষ্টিমুখ করিয়ে পরের বছরটিকে বরণ করে নিতেন। পহেলা বৈশাখ যেমন বাঙালির হৃদয়ে নতুন আশা-উদ্দীপনা সৃষ্টি করত, একইভাবে ‘ভূমিহীন’ তথা বর্গাচাষিদের জন্যও দিনটি যন্ত্রণাদায়ক হিসেবে বিবেচিত হতো।

বাংলা সন বা তথা বঙ্গাব্দ কীভাবে এলো অথবা এ সনের প্রবর্তক কে- এ নিয়ে রয়েছে নানা  মতপার্থক্য। বাংলা নববর্ষ পঞ্জিকার শুরু গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জিকার এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্ত পালিত একটি সর্বজনীন উৎসব, এক সময় তেমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ ‘ফসলি মাস’ হিসেবে পালিত হতো, তবে ফসলি মাস হিসেবে এটি পালিত হতো মুঘল আমলে। এর আগে কৃষকরা বর্ষ শুরু করতেন অগ্রহায়ণ মাস থেকে। আগেকার দিনে অগ্রহায়ণ মাসে ধান কাটা শুরু হতো বলে এ মাসকে বছরের প্রথম মাস ধরা হতো।                                                                                              

........................

‘‘চৈত্র মাসের শেষদিন পর্যন্ত তারা ফসল তোলার পাশাপাশি খাজনাদি পরিশোধ করতেন এবং পহেলা বৈশাখে একে অপরকে মিষ্টিমুখ করিয়ে পরের বছরটিকে বরণ করে নিতেন। পহেলা বৈশাখ যেমন বাঙালির হৃদয়ে নতুন আশা-উদ্দীপনা সৃষ্টি করত, একইভাবে ‘ভূমিহীন’ তথা বর্গাচাষিদের জন্যও দিনটি যন্ত্রণাদায়ক হিসেবে বিবেচিত হতো’’

........................

মূলত মুঘল আমলেই বৈশাখে বর্ষবরণ রীতির প্রচলন শুরু হয়। বহুল জনশ্রুতি মতে, সম্রাট আকবরের আমলে বাংলা সন প্রবর্তন হয়। কিন্তু এর আগেও তিন জনের নাম পাওয়া যায়, যারা বাংলা নববর্ষ সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে রয়েছেন। তারা হলেন-  গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক, তিব্বতের রাজা স্রংসন (তিনি ৬০০ খ্রিস্টাব্দের কিছু আগে রাজা হন এবং মধ্য ও পূর্ব ভারত জয় করে দুই দশক রাজত্ব করেন।) এবং সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ।

বলা হয়ে থাকে, রাজা শশাঙ্কের আমল ষষ্ঠ শতাব্দী থেকেই ‘শক পঞ্জিকা’র প্রচলন ছিল। তখন বাংলা সনকে বলা হতো ‘শকাব্দ’। ইতিহাসে শশাঙ্ক প্রথম সার্বভৌম রাজা হিসেবে বিবেচিত। তার রাজ্যের রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণে। তিনি গৌড়বঙ্গে স্বাধীনভাবে রাজত্ব শুরু করেছিলেন ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দের ১২ এপ্রিল। ওইদিন থেকে বঙ্গাব্দ শুরু হয় বলে অনেকে দাবি করে থাকেন। তবে তিনিই যে বাংলা সনের প্রচলন করেন-  এ কথা অনেকে স্বীকার করতে চান না। এটাও সত্যি, রাজা শশাঙ্কই যে ‘শকাব্দ’ তথা বাংলা সনের উদ্ভাবক-  তারও কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। এ কারণে এ নিয়ে বিতর্ক চলছে যুগের পর যুগ। তবে অপর একটি পক্ষের দাবি, ৬০০ খিস্টাব্দের কিছু আগে স্নরংসন নামে এক তিব্বতি রাজা মধ্য ও পূর্ব ভারত জয় করেন। তিনি তিব্বতের কৃষিকাজে প্রচলিত মৌসুমভিত্তিক দিন গণনা ভারতবর্ষে  চালু করেন। তাদের দাবি, স্সরংসনের নামের শেষাংশ থেকে ‘সন’ শব্দটি এসেছে।

কারও কারও মতে, স্সরংসনেরও ৯০০ বছর পর তথা ১৪৯৪-১৫১৯ খ্রিস্টাব্দে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামলে বাংলা সনের প্রচলন শুরু হয়। সুলতান হোসেন শাহ নিজেকে বাঙালি বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন। ‘শাহ-এ-বাঙালিয়ান’ বলে নিজের পরিচয় লিপিবদ্ধ করেছেন তিনি। তার আমলেই প্রথম কৃষকদের ‘ফসলি সন’ শাসকগোষ্ঠীর আনুকূল্য পায়। সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ বাংলা সনের প্রবর্তক, সেটি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। দালিলিকভাবে প্রমাণ পাওয়া যায়, ‘বাংলা সনের’ প্রবর্তক ‘মুঘল-এ-আজম’-  সম্রাট আকবর। তিনি ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ হিজরি সনের (চাঁদ) সঙ্গে মিল রেখে ‘ইলাহি সন’ নামে নতুন এক সনের প্রচলন করেন। তখন কৃষকের কাছে এ সনটি ‘ফসলি সন’ হিসিবে পরিচিতি পায়। খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ষষ্ঠ শতাব্দীতে ব্যবহৃত তথা রাজা শশাঙ্কের সময়কার ‘শক পঞ্জিকা’র নামগুলোকে সংস্কারের নির্দেশ দেন সম্রাট আকবর। এ আদেশমতে, তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি খ্রিস্টাব্দ (সৌর পঞ্জিকা) এবং আরবি হিজরির (চন্দ্র পঞ্জিকা) ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম চালু করেন, যা ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ থেকে গণনা শুরু হয়।

বাংলা সনের আধুনিকায়ন

বাংলা সন বা বঙ্গাব্দকে আজকের আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক রূপ দেয়ার কৃতিত্ব অবশ্য বাংলা একাডেমির। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে একটি কমিটি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থ-সাংস্কৃতিক জীবনে কিছু সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা নির্ণয় করে। বাংলা সন গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির মতোই ৩৬৫ দিনের। গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির প্রতি চার বছরের ফেব্রিরুয়ারি মাসে একটি অতিরিক্ত দিন যুক্ত রয়েছে, কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞাননির্ভর হলেও বাংলা সনে এ দিনটি রাখা হয়নি। এ কারণে যাপিত জীবনে কিছুটা সমস্যা দেখা দিত। পরে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন কমিটির প্রস্তাবনা অনুযায়ী বাংলা একাডেমি বাংলা সনকে বিজ্ঞানসম্মত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এখানে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, বাংলা সনের প্রথম পাঁচ মাস (বৈশাখ-ভাদ্র) ৩১ দিন, এর পরের ছয় মাস (আশ্বিন-চৈত্র) ৩০ দিন এবং প্রতি চতুর্থ বছরের ফাল্গুন মাসে অতিরিক্ত একটি দিন যোগ করে ৩১ দিন করা হয়।

পহেলা বৈশাখ উদযাপন সম্পর্কে অনেকেই ধর্মীয় ব্যাপার দাঁড় করিয়ে এটিকে হিন্দু সংস্কৃতি বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। আদৌ তা নয়। পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণ করার রীতিটা সেই অনেককাল আগে থেকেই প্রচলিত। অর্থাৎ সম্রাট আকবরের আমল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয়। সে সময় সবাই চৈত্র মাসের শেষদিনের মধ্যে যাবতীয় খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতেন। এর পরের দিন পহেলা বৈশাখে কৃষকরা নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টিমুখ করাতেন। আয়োজন করা হতো বিভিন্ন উৎসবের। এসব আয়োজনের মূলে ছিল ‘হালখাতা’। এই হালখাতার মাধ্যমেই পুরনো দিনের হিসাবের সমাপ্তি টেনে নতুন দিনের হিসাব খোলা হতো। সব হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করা হতো।

পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু যেভাবে-

গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে পহেলা বৈশাখ নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালন করা হতো। সাধারণত চৈত্রসংক্রান্তি থেকে এ উৎসবের শুরু হতো। এ উপলক্ষে গ্রামাঞ্চলে মেলার আয়োজন করা হতো। তখনকার দিনে গ্রামীণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে একে ‘বান্নি’ বলা হতো। তবে সে সময় এসব আয়োজন শহরবাসীর মধ্যে দেখা যেত না। ১৯১৭ সালের দিকে কলকাতা ও ঢাকায় পহেলা বৈশাখ পালন করা হয় কিছুটা আনুষ্ঠানিকভাবে। এরপর দেশ ভাগের পর কলকাতায় পহেলা বৈশাখ পালিত হলেও এ বাংলায় তেমনভাবে পালিত হতো না। এ কারণে পহেলা বৈশাখ পালনকে অনেকে হিন্দু সংস্কৃতি বলে মনে করেন।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন-নির্যাতন এবং বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি তাদের বিদ্রূপ-বিদ্বেষের কারণে এ বাংলার মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। যার প্রতিবাদস্বরূপ ঢাকার সংস্কৃতিকর্মীরা স্বল্পপরিসরে রমনা পার্কে পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু করেন। ১৯৬৭ সালে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে যুক্ত হয় ছায়ানট। এরপর থেকেই পহেলা বৈশাখের আয়োজনের ব্যাপকতা পেতে থাকে; ধীরে ধীরে এ উৎসব সর্বজনীন হয়ে ওঠে।

রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ মঙ্গল শোভাযাত্রা

রাজধানীতে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের গানের মাধ্যমে নতুন বছরের সূর্যকে আহ্বান। পহেলা বৈশাখে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে আহ্বান জানান।

ঢাকায় বৈশাখের উৎসবে কয়েক বছর ধরে আরেকটি অনুষঙ্গ হলো মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে এ দিন সকালে শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। এ শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জনজীবন এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। শোভাযাত্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করে থাকে।

“মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা...” কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শুদ্ধ সুন্দর এ প্রার্থনার মধ্য দিয়ে নতুন বছর শুরু করে বাঙালি। পহেলা বৈশাখের উৎসব আমাদের জীবনে শুধু উৎসব নয়, সমাজের সব অন্যায়-অসাম্য-সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জ্বলে ওঠার প্রেরণা।