• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১৯, ৩০ আশ্বিন ১৪২৬
প্রকাশিত: জুন ২৯, ২০১৯, ০৩:৩০ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জুলাই ৪, ২০১৯, ০৩:০৪ পিএম

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের গুরুত্ব

মিল্টন বিশ্বাস
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের গুরুত্ব

৯ জুন (২০১৯) এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান, সৌদি আরব এবং ফিনল্যান্ডে ২৮ মে থেকে ৭ জুন পর্যন্ত সফরের সাফল্য বর্ণনা করার সময় এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, জুলাইয়ে যখন চীন সফরে যাবেন তখন রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করবেন। তিনি আরো জানান, ‘চীন এবং ভারত দু’টি দেশের সঙ্গেই আমাদের বন্ধুত্ব এবং আমরা সেই বন্ধুত্ব রক্ষা করেই চলেছি।’ অর্থাৎ চীনা সরকারের আমন্ত্রণে ১ থেকে ৫ জুলাই পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর সে দেশ সফরে রোহিঙ্গা ইস্যু বিশেষ গুরুত্ব পাবে। এছাড়া বিদ্যুৎ খাতসহ বিভিন্ন
খাতে দুই দেশের মধ্যে মোট আটটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হবে বলে বিভিন্ন সংবাদ সূত্রে জানা গেছে। শেখ হাসিনা ২ ও ৩ জুলাই চীনের দালিয়ানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের অধিবেশনে যোগ দেবেন এবং বাংলাদেশ ও এশিয়ার সম্ভাবনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরবেন।

বেইজিংয়ে অবস্থানকালে চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করবেন। সেখানে যে আটটি চুক্তি ওসমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হবে সেগুলো হলো- ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি এলাকায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ ও সম্প্রসারণে কাঠামো চুক্তি, ডিপিডিসি এলাকা প্রকল্পে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ ও সম্প্রসারণে সরকারি পর্যায়ে কনসেশনাল ঋণ চুক্তি, ডিপিডিসি এলাকা প্রকল্পে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ ও সম্প্রসারণে প্রেফারেনশিয়াল বায়ার’স ঋণ চুক্তি, পাওয়ার গ্রিড নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণে
কাঠামো চুক্তি, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কারগরি সহায়তা চুক্তি, বিনিয়োগ সহযোগিতা ওয়ার্কিং গ্রুপ প্রতিষ্ঠা বিষয়ে এমওইউ, ব্রহ্মপুত্র/ ইয়ালু ঝাংবো নদের পানি প্রবাহ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত বিনিময়ের পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়ন বিষয়ে এমওইউ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় ও পর্যটন কর্মসূচির বিষয়ে এমওইউ।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের ফলে সত্তর দশকের প্রথমার্ধে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চীনের সঙ্গে যে সম্পর্কের সূচনা করেছিলেন, সেই দ্বার আরো বেশি উন্মুক্ত হবে। পাকিস্তান আমলে শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৫২ ও ১৯৫৭ সালে চীন সফরের পর দুই দেশের সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েছিল। চীনের মহান নেতা মাও সেতুংয়ের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎ হয় ১৯৫২ সালে সে দেশ সফরের সময়। সারা জীবন তিনি এই মহান নেতাকে শ্রদ্ধা করেছেন। যদিও একাত্তরে চীন সরকার পাকিস্তানের সমর্থক ছিল। তবে মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তাঁর দেখানো পথেই হাঁটছেন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে আটটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)-এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে রোহিঙ্গা ইস্যু। ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার ঢল নামার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এটিই প্রথম চীন সফর। 

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের যে ভূমিকা বাংলাদেশ চেয়েছিল তা এখনো পায়নি। পশ্চিমা বিশ্ব রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর বৈশ্বিক চাপ সৃষ্টি ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে চীনকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব যে নতুন মাত্রায় উন্নীত হয়েছিল সে অনুযায়ী বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে তখন দুই দেশের মধ্যে যে চুক্তিগুলো হয়েছিল সেগুলো বাস্তবায়নের কাজ চলছে। বাংলাদেশ চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই)’ যোগ দিয়েছে।

 ওই প্রকল্পের আওতায় ৬১টি রাষ্ট্রকে এক পতাকাতলে আনতে চাচ্ছে চীন। এর ফলে ভারত ও চীনের মধ্যে যে আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে, তার নিরসন হবে বলে আশাবাদী বিভিন্ন মহল। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে নতুন করে রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর সহযোগিতা চাইতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফর করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে সময় সম্ভব না হলেও এবার যে সফর হচ্ছে তাতে তিনি রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশের বিপদ ও দুর্ভাবনার কথা সরাসরি চীনকে জানানোর সুযোগ পাবেন। এর আগে চলতি বছর(২০১৯) তিনি রোহিঙ্গা ইস্যু সৌদি
আরব সফরের সময় ওআইসিতে তুলে ধরেছেন। গত ২৬ জুন জাতীয় সংসদে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের অতি দ্রুত ফেরত পাঠানো না গেলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনও বারবার এ বিষয়ে বিদেশিদের সতর্ক করেছেন। বিশেষ করে চীন প্রসঙ্গেও তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গারা না ফিরলে এর প্রভাব চীনের সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর পড়তে পারে।
২.
২০১৪ সালের জুন মাসে চীনের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে ছয় দিনের(৬-১১ জুন) সরকারি সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে ১৪ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে তাঁর সফরের সাফল্য তুলে ধরেছিলেন। চীন সফরের পর সেসময় বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির অংশীদারিত্বের সম্পর্ক আরো নিবিড়তর হওয়ার ব্যাপারে আশা প্রকাশ করেছিলেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর সেই সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস, সমতা এবং একে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘ইকোনোমিক পার্টনারশিপ’ থেকে পর্যায়ক্রমে ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’-এ উন্নীতকরণের বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা হয়। তাঁর সফরের অন্যতম সফলতা ছিল চীনা প্রকল্পে দেশটি তার বাৎসরিক অনুদানের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ করে। আগে এই অনুদান ছিল বছরে ১৫ কোটি ইউয়ান (চীনা মুদ্রা) বা আড়াই কোটি ডলার। যা বাড়িয়ে দেশটি ৩০ কোটি ইউয়ানে (৫ কোটি মার্কিন ডলার) উন্নীতের ব্যাপারে সম্মত হয়। বিখ্যাত লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরী ২০১৪ সালের ১৫ জুন প্রকাশিত এক কলামে লিখেছিলেন- ‘হাউস অব লর্ডস-এর সেমিনারে একজন ব্রিটিশ এমপি এবং ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের দুই সদস্যও(বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন)। একই কথার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে চীন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক
সহযোগিতা সম্পর্কে লন্ডনের একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে। তাতে বলা হয়েছে, একই সঙ্গে চীন ও জাপানের মতো বর্তমানে মিত্র নয় এমন দুটি দেশ থেকে বিশাল সহযোগিতা আদায় করা এবং পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারতে নতুন মোদী সরকারের সঙ্গে দ্রুত সম্পর্কের সেতুবন্ধন তৈরি করা বাংলাদেশের মতো একটি ছোট ও গরিব দেশের পররাষ্ট্রনীতির অভাবনীয় সাফল্যই বলা চলে।’

বাংলাদেশ চীনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও প্রতিবেশী। কারণ প্রাচীন বাংলা পরিদর্শনে আসা পরিব্রাজক হিঙয়েন শাং কিংবা সিল্ক রুটের বণিকরা দীর্ঘকাল ধরে ভারতবর্ষের এই বাংলা ভূখণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাংলাদেশের প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্ক গভীর ছিল বলেই ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। আর সেই সম্পর্ক স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর শাসনামল থেকে এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে সর্বোচ্চ অবস্থায় পৌঁছাবে বলে মনে করেন উভয় দেশের নেতারা। ২০১৪ সালে শেখ হাসিনার চীন সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে পাঁচটি অর্থনৈতিক এবং কারিগরি ও প্রযুক্তি সহায়তা চুক্তি সই হয়। তবে বহুল আলোচিত গভীর সমুদ্রবন্দর চুক্তিটি সই হয়নি। চুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে, চীন এবং বাংলাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তা, কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশন এবং নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির মধ্যে চুক্তি, দুর্যোগ প্রতিরোধে প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি বিনিময়ে সহযোগিতা স্মারক, বন্যা প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা সহযোগিতা এবং চীনের জন্য বাংলাদেশে বিশেষ অর্থনৈতিক ‘জোন’ গড়তে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের বেপজার মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই।

 চুক্তি অনুযায়ী পটুয়াখালীতে চীনা সহায়তায় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কর্ণফুলী নদীর নিচ দিয়ে একটি মাল্টি লেন সড়ক টানেল তৈরি করার কথা ছিল। সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) অনুযায়ী চীন সরকার ১০০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ে এই টানেল নির্মাণ করছে। এছাড়া মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় একটি গার্মেন্টপল্লি স্থাপনে বেইজিংয়ে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সঙ্গে চীনের ওরিয়ন ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিং কম্পানির একটি এমওইউ সই হয়েছিল। এমওইউর আওতায় ওরিয়ন হোল্ডিং কম্পানি গজারিয়ায় একটি গার্মেন্টপল্লি নির্মাণ করবে। চীনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে শেখ হাসিনা বলেছিলেন তারা এক ‘সক্রিয় অংশীদার’ হবে। আর চীনা নেতৃত্বাধীন এশিয়া এ শতাব্দীতে অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে মহিমান্বিত হচ্ছে। সেসময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি খ্য ছিয়াংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে শেখ হাসিনা তাদের সঙ্গে কক্সবাজারের অদূরে সোনাদিয়া দ্বিতীয় গভীর সমুন্দ্রবন্দর নির্মাণ নিয়ে আলোচনাকরেছিলেন। চীন ইতোমধ্যেই চট্টগ্রামে একটি বন্দর প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এর ফলে ভারত মহাসাগরে তারা বিরাট প্রবেশাধিকারপাবে। এটা হবে তার জ্বালানি আমদানির জন্য এক বিকল্প রুট। দুই দেশ এখনো অবশ্য সোনাদিয়া সমুদ্রবন্দর প্রকল্প নিয়ে চুক্তি সই করেনি। তবে চীনা বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন যে, এটা শিগগিরই হতে পারে। চীনা নেতা মি. ঝি জিনফিং বলেছিলেন, ‘মেরিটাইম সিল্ক রোড প্রকল্পে’ বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। আর এই প্রকল্পটি গ্রহণে তিনিই মুখ্য উদ্যোক্তা।

 এর উদ্দেশ্য হচ্ছে কানেক্টিভিটি জোরদার করা, বন্দর নির্মাণ এবং অবাধ বাণিজ্য জোন তৈরি করা এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধি করা। অর্থাৎ বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্কের ক্ষেত্রে ১৪০ কোটি মানুষের দেশ চীনের স্বার্থ বেশ গুরুত্বপূর্ণভাবে বিজড়িত। বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কারণ বিদ্যমান ব্যবস্থায় চট্টগ্রামবন্দরের জেটিতে বড় কন্টেইনার জাহাজ ভিড়তে পারে না। ফলে এখানকার ব্যবসায়ীদের প্রথমে ছোট জাহাজে (ফিডার ভ্যাসেল) করে সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কার পোর্ট কেলাং, মালয়েশিয়ার তানজুম ও পেলাপাস বন্দরে গিয়ে পুনরায় বড় জাহাজে (মাদার ভ্যাসেল) তুলে ইউরোপ-আমেরিকায় পণ্য রপ্তানি করতে হচ্ছে। আমদানির ক্ষেত্রেও ঘটছে একই ঘটনা। এতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সময় ক্ষেপণ হচ্ছে। আমদানি-রপ্তানিতে এই খরচ কমিয়ে যুগোপযোগী নৌপরিবহন ব্যবস্থা চালু এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনের ‘হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পদক্ষেপ নিয়েছে। লক্ষ্য সিঙ্গাপুর বন্দরের মতো একটি ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর হিসেবে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দরকে প্রতিষ্ঠা করা। ৯ বিলিয়ন ডলারের এই বন্দরের ২০২০ সালে প্রথম ধাপের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ নিয়ে ২০০৯ সালের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, সোনাদিয়ায় এই বন্দর নির্মাণ হলে বাংলাদেশ একটি ‘রিজিওনাল কানেকটিভিটি হাব’ হিসেবে গড়ে উঠবে। এই অঞ্চলের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশের বেশি বাড়বে। বাংলাদেশ তাদের নিজেদের সাশ্রয়ী ও সহজ পণ্য পরিবহন ছাড়াও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান, ভুটান ও নেপালের পণ্য এই বন্দর দিয়ে ব্যবহার করতে পারবে।

৩.

অন্যদিকে ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফরে এসে আমাদের অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে উল্লেখ্যযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। শুরু হয় সম্পর্কের নতুন অধ্যায়। বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন। দেশটির অর্থনীতি এগিয়ে চলেছে প্রগতিতে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অদূরভবিষ্যতে চীনই হবে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। এজন্য সেই দেশের শীর্ষনেতার বাংলাদেশ সফর ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। কারণ উন্নয়নের সঙ্গী হিসেবে আমাদের প্রতিবেশী চীনকে সব সময় কাছে পেয়েছি। বাংলাদেশের উন্নয়নের বর্তমান ধারাকে অব্যাহত রাখার জন্য উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে চীনের অব্যাহত সহযোগিতা আমাদের দরকার। সফরের সময় চীনা প্রেসিডেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এক নতুন ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বন্ধু হিসেবে পাশে থাকতে প্রস্তুত চীন। তিনি বলেন, ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্কের পর্যায় থেকে দুদেশের সম্পর্ক এখন কৌশলগত অংশীদারিত্বের সম্পর্কে উন্নীত হবে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানান, দুদেশের মধ্যে ২৭টি নানা ধরনের চুক্তি এবং
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। চীন বাংলাদেশকে বিভিন্ন খাতে ২৪ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যার বেশিরভাগই অবকাঠামো তৈরিতে ব্যয় হচ্ছে। সেসময় বৈঠক শেষে দুই নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে ছয়টি প্রকল্প উদ্বোধন করেন। এর মধ্যেরয়েছে চট্টগ্রাম এবং খুলনায় (এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের) দুটি বড় তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প। চট্টগ্রামে কর্ণফুলি নদীর তলদেশদিয়ে একটি টানেল তৈরির প্রকল্পেও অর্থ সহায়তা দিচ্ছে চীন।

এ ছাড়া একটি সার কারখানা, ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট’ নামে একটি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপিত হচ্ছে চীনা অর্থ-সাহায্যে। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চীনের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের ১৩টি চুক্তি হয়েছে। এই চুক্তিগুলোতে প্রায় এক হাজার ৩৬০ কোটি ডলার ব্যবসা এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনা আছে।
এর মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকে শুরু করে অবকাঠামো, রেলওয়েসহ নানা খাতে বিনিয়োগ ও ব্যবসার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০১৬ সালে স্বাক্ষর হওয়া উল্লেখযোগ্য সমঝোতা স্মারকগুলো হলো - দুর্যোগ মোকাবিলা ও হ্রাসকরণ, সেতু নির্মাণ, বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা সহযোগিতা, বাংলাদেশ-চীন মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সম্ভাব্যতা যাচাই, সামুদ্রিক সহযোগিতা, দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সহযোগিতা, ইনফরমেশন সিল্ক রোড, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সহযোগিতা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা ইত্যাদি। অর্থাৎ চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের শিকড় অনেক গভীরে।

৪.

গত ১০ বছরে বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে বিশের অধিক চুক্তি ও এমওইউ স্বাক্ষর করেছে। ফলে ২০০৯ সাল থেকে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার ও আমদানির উৎসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এ বাণিজ্য খুবই ভারসাম্যহীন। বাংলাদেশ চীন থেকে ৬শ’ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করছে। বাংলাদেশ থেকে চীনে রফতানির পরিমাণ ৫০ কোটি ডলারেরও কম। দুই দেশের বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা থাকলেও বাংলাদেশ থেকে পাট ও পাটজাত, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত মাছ, সিরামিক এবং ডালসহ বিভিন্ন পণ্য
আমদানির মাধ্যমে এই বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে এপিটিএর অধীনে ২০১০ সালের জুলাই থেকে চীনে বাংলাদেশের ৪ হাজার ৭০০ পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বাকি সব রপ্তানিযোগ্য পণ্যও চীনের শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবে আশা করা যাচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে ৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। এর মধ্য দিয়ে চীন বাংলাদেশের শীর্ষ বাণিজ্য সহযোগী দেশে পরিণত হয়েছে। আগেই বলেছি ২০০৯ সাল থেকেই চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় আমদানি উৎস। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চীনের ৪৯টি কোম্পানি বাংলাদেশের ৮টি ইপিজেডে ৩০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে। এছাড়া চীনের আরো ৩০০টি কোম্পানির ২৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব বাংলাদেশের বিনিয়োগ বোর্ডের কাছে রয়েছে। মূলত চীনের রাষ্ট্রীয় এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, অবকাঠামো নির্মাণ, টেলিযোগাযোগ, সার, বস্ত্র, চামড়া, সিরামিক এবং প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।

২০১৪ সালের ১০ জুন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছিলেন, চীনের কাছে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ এবং তাঁর দেশ বাংলাদেশকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে।তিনি বলেন, কৌশলগত অবস্থানের কারণে ভারত মহাসাগরে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশ। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক একটি কৌশলগত সম্পর্ক এবং এ প্রেক্ষাপট বিবেচনায় চীন সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। আসলে ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এদেশে এসে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কে যুক্ত করেছেন পারস্পরিক সহযোগিতার নানান ক্ষেত্র। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছেন, ‘আমি খুব খুশি ছয় বছর পর বাংলাদেশের মতো একটা সুন্দর দেশ সফর করতে পেরেছি। চীন ও বাংলাদেশ ভালো প্রতিবেশী, ভালো বন্ধু এবং ভালো অংশীদার। ২০১৭ সাল হবে চীন-বাংলাদেশের বন্ধুত্বের বছর। আমি মনে করি, এই সফর সামগ্রিকভাবে দুই দেশের অগ্রযাত্রায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে। তিনি আরো বলেন, সমুদ্র বিষয়ে ও সন্ত্রাস মোকাবিলা, যৌথভাবে বিসিআইএসএম-এফসি, অর্থনৈতিক করিডর ও যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যু ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একযোগে কাজ করতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। চীন ও বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন ঐতিহাসিক পর্যায়ে
উপনীত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও বাড়বে। চীন বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে ও অংশীদার হিসেবে বিশ্বাস এবং সমর্থন নিয়ে কাজ করে যাবে।’ যদিও ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাঁর কোনো সহযোগিতা বাংলাদেশ সরকার পায়নি তবু কূটনৈতিক দিক থেকে আমরা হতাশ
হইনি।

৫.

বাংলাদেশ-ভারত-চীন-মায়ানমার (বিআইসিএম) অর্থনৈতিক করিডোর প্রতিষ্ঠায় চীনের প্রস্তাবের প্রতি বাংলাদেশ সমর্থন জানিয়েছে। এক সময়ের জনপ্রিয় ‘সিল্ক রুট’ হিসেবে পরিচিত এই করিডোরের ফলে নেপাল ও ভুটানসহ এ অঞ্চলের সব দেশের জনগণ লাভবান হবে। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে জনগণের সাথে জনগণের যোগাযোগ চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে অসাধারণ ভুমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বাংলা ভাষা কোর্সে বিপুল সংখ্যক চীনা ছাত্র-ছাত্রী অধ্যয়ন করেন। উভয় দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলা ও চীনা ভাষায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী সাংস্কৃতিক বন্ধনের অন্যতম সারথি। এ মুহূর্তে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময় অতীতের চেয়ে আরো বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশ সমৃদ্ধি, অগ্রগতি ও শান্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সরকার ও জনগণের সমর্থন এবং সহযোগিতায় সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলে আমরা মনে করেছিলাম। কারণ চীন আমাদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী দেশ। ২০১৯ সালে শেখ হাসিনার চীন সফরে সেই প্রত্যাশার কতটা উন্নয়ন ঘটে তা দেখার বিষয়। আমরা প্রত্যাশা করছি প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে রোহিঙ্গা ইস্যুতে যথেষ্ঠ অগ্রগতি হবে। চীন চাইলেই রোহিঙ্গা সংকট সমাধান করতে পারে। কারণ নিজভূমি থেকে উদ্বাস্তু নিরীহ জনগণ দেশে ফিরে যাক তা তারাও চায়। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করলে বাংলাদেশের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হবে চীনের; ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রও প্রসারিত হবে।

লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস,  অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ  এবং পরিচালক, জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

/ডিজি

Islami Bank