• ঢাকা
  • সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৮ আশ্বিন ১৪২৬
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৯, ০৪:৪৯ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৯, ০৪:৪৯ পিএম

দেবর-ভাবির লড়াই!

চিররঞ্জন সরকার
দেবর-ভাবির লড়াই!

আমাদের সমাজে ভাবি ও দেবরের সম্পর্ক বেশ মধুর। দেবরদের নানা ধরনের অন্যায় আবদার মেটাতে, নানা অপকর্ম থেকে রক্ষা করতে ভাবিরা যুগে যুগে ত্রাতার ভূমিকা পালন করেছেন। আবার ভাবিদের দুঃখ-বেদনা-একাকিত্বের সাথি হয়ে দেবররাও অপরিমেয় ভূমিকা পালন করেছেন। মায়ের মৃত্যুর পর ভাবিরাই মায়ের স্নেহ দিয়ে দেবরকে মানুষ করেছেন, এমন ঘটনা আমাদের সমাজে হরহামেশাই দেখা যায়। আবার স্বার্থের দ্বন্দ্বে দেবর-ভাবির সম্পর্ক তিক্ত হওয়ার ঘটনাও সমাজে বিরল নয়। দেবর-ভাবির সম্পর্কটা কেবল বন্ধুত্ব, স্নেহ, শ্রদ্ধা-প্রীতি কিংবা বৈরিতার হয় না, অনেক সময় তা রোমান্টিকও হয়। আমাদের দেশের লোককাহিনিতে, সাহিত্যে, গানে এর অনেক উদাহরণ আছে।

এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। বউদির সঙ্গে তার সম্পর্কটিও অত্যন্ত আলোচিত। কাদম্বরী দেবী, বাংলা সাহিত্যে এক আলোচিত ও ব্যাপক পরিচিত নাম। মাত্র ১০ বছর বয়সে তার বিয়ে হয় রবীন্দ্রনাথের দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে। মূলত বয়সের ব্যাপক পার্থক্যের কারণেই কাদম্বরী দেবীর সঙ্গে স্বামীর একটা দূরত্ব থেকেই যায়।

অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ আর কাদম্বরী দেবী কাছাকাছি বয়সের কারণে ছোটোবেলা থেকেই তাদের মধ্যে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। রবীন্দ্রনাথের লেখার প্রথম পাঠকও ছিলেন কাদম্বরী। অনেকের মতে, রবীন্দ্রনাথের এত বিখ্যাত হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান কাদম্বরী দেবীর। ছোটো থেকে একসঙ্গে বড়ো হতে হতে তাদের মধ্যে সম্পর্কটা দেবর-বউদি বা বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর চেয়েও বেশি কিছু হয়ে যায়। সেটা শ্রদ্ধা-প্রেম-ভালোবাসা-নির্ভরতার এক মিশ্রণ।

রবীন্দ্রনাথের বিয়ের চার মাসের মাথায় আত্মহত্যা করেন কাদম্বরী দেবী। তার এই আত্মহত্যার ঘটনা দীর্ঘদিন ধামাচাপা দিয়ে রাখে ঠাকুর পরিবার। যদিও পরে সেটা ঠিকই প্রকাশ পেয়ে যায়। কাদম্বরী দেবী কেন আত্মহত্যা করেছিলেন—সেটা আজও এক রহস্য!

যাহোক, আজ আমরা দেবর-ভাবির সম্পর্কের রসায়ন নিয়ে আলোচনা করব না। আমরা আলোচনা করব পদ-পদবি-ক্ষমতা নিয়ে এক দেবর-ভাবির লড়াইয়ের ঘটনা। সাবেক সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব নিয়ে দেবর-ভাবির লড়াই এখন তুঙ্গে। জাতীয় পার্টির ‘নেতৃত্ব’ নিয়ে জি এম কাদের (দেবর) ও বেগম রওশন এরশাদের (ভাবি) মধ্যে বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে।

রওশন এরশাদ আকস্মিকই তার সমর্থকদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। এর পালটা হিসেবে জি এম কাদেরও নিজেকে জাতীয় পার্টির বৈধ চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করে রওশনপন্থিদের প্রতি সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দিয়েছেন। যদিও তিনি বলেছেন যে, বেগম রওশন এরশাদকে মায়ের মতো শ্রদ্ধা করেন। জি এম কাদের মুখে যা-ই বলুন না কেন, জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব নিয়ে দেবর-ভাবির সম্পর্ক বর্তমানে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের মতোই তিক্ত হয়ে উঠেছে। এ সম্পর্ক আবার কখনো মধুর হয় কি না, তা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে।

জি এম কাদের সঙ্গে রওশনের দ্বন্দ্ব্ব অবশ্য অনেক পুরোনো। এরশাদ কখনো বউকে, কখনো ভাইকে সামনে টেনে এনেছেন। এরশাদের জীবদ্দশায় জি এম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধী দলীয় উপনেতা পদে পদায়ন এবং অপসারণ নিয়েও বিরোধ হয়। রওশনের চাপেই স্বামী এরশাদ বাধ্য হয়েই ভাই কাদেরকে হটিয়ে তাকে (রওশন) বিরোধী দলের উপনেতা পদে বসান। এরশাদ তার মৃত্যুর আগে ৪মে জি এম কাদেরকে পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করেন এবং তার অবর্তমানে পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে একটি সাংগঠনিক নির্দেশনা দেন। তখন থেকেই রওশন অনুসারী বলে পরিচিত কয়েকজন সিনিয়র নেতা বেঁকে বসেন।

এর আগে যদিও এরশাদ বেঁচে থাকার সময় দলের চেয়ারম্যান পদ জি এম কাদেরকে ‘উইল’ করা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর লড়াই তীব্র আকার ধারণ করেছিল। জি এম কাদেরকে ‘পদ দেওয়া’ এবং সেই পদ থেকে ‘অব্যাহতি’ নিয়ে রংপুর বিভাগের নেতারা আলটিমেটাম দিয়ে কর্মসূচি ঘোষণা করেন। পরে বাধ্য হয়েই জি এম কাদেরকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং রওশন এরশাদকে সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা পদে বসানো হয়।

এরশাদের মৃত্যুর পর গত ১৮ জুলাই বনানী কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জাপার মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা জি এম কাদেরকে পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। এতে অসন্তুষ্ট হন রওশনপন্থিরা। চেয়ারম্যান হওয়ার পর কেন্দ্রীয় কার্য নির্বাহী কমিটির বৈঠক করেন জি এম কাদের। অতঃপর ২০ জুলাই ভাবি রওশন এরশাদের মান ভাঙাতে তার গুলশানের বাসভবনে যান। এ সময় দেবর কাদেরকে দোয়াও করে দেন মাতৃতুল্য ভাবি রওশন এরশাদ। সেই ‘দোয়া’র ৪৮ ঘণ্টা না পেরোতেই ২২ জুলাই সোমবার গভীর রাতে জি এম কাদের জাপার চেয়ারম্যান নন বলে একটি বিবৃতি পাঠান। রওশন এরশাদের প্যাডে হাতে লেখা ‘জি এম কাদের জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান নন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ শীর্ষক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে রওশন এরশাদ লিখেছেন, ‘সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের মারফত আমরা জানতে পেরেছি জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে; যা আদৌ কোনো যথাযথ ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালনকালে জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্র ধারা ২০(২)এর খ-এ দেওয়া ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। প্রেসিডিয়ামের সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতামতের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করবেন। চেয়ারম্যানের অবর্তমানে ধারা ২০(২)এর ‘ক’-কে উপেক্ষা করা যাবে না। আশা করি, বর্তমানে যিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি পার্টির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরবর্তী চেয়ারম্যান না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন।’ বিবৃতিতে এ ঘোষণার প্রতি একমত পোষণকারী সাত জন সংসদ সদস্য ও প্রেসিডিয়াম সদস্যের নাম উল্লেখ করা হয়।

দেবর-ভাবির লড়াই নয়; এরশাদ যখন জীবিত ছিলেন তখন স্বামী-স্ত্রীর লড়াই ছিল ওপেন সিক্রেট। গত কয়েক বছরে স্বামী-স্ত্রীর বিরোধী বহুবার পত্রিকার শিরোনাম হয়েছে। মন্ত্রিসভা থেকে জাতীয় পার্টির মন্ত্রীদের পদত্যাগ করা-না-করা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কয়েকবার ঝগড়া হয়।

এরশাদ ও রওশন এরশাদের বিরোধের জেরই বর্তমানের দেবর-ভাবি বিরোধ। স্বামী এরশাদ ও স্ত্রী রওশনের রাজনীতি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত ঘটে ২০০৭ সালে। তখন রওশন এরশাদ ছিলেন তারেক রহমানের হাওয়া ভবনের অনুগত। ২২ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনকে ইস্যু করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারিবারিক বিরোধ রাজনৈতিক বিরোধে রূপ নেয়। এরশাদ আন্দোলনরত আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান নিয়ে মহাজোটের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। আর রওশন এরশাদ বিএনপির ইচ্ছানুযায়ী প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে লাঙ্গলের প্রার্থী দেন।

দেশের টলটলায়মান রাজনীতির মধ্যে সে সময় জাতীয় পার্টি থেকে স্বামী এরশাদকে বহিষ্কার করে রওশন এরশাদ নিজে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও গোলাম মসিহ (বর্তমানে সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত) মহাসচিব করেন। এরশাদও অনেকটা বাধ্য হয়ে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করেন। পরবর্তী সময়ে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ ও গাইবান্ধা থেকে তিনটি আসনে প্রার্থী হয়ে রওশন পরাজিত হন। এরশাদের রংপুর-৩ ছেড়ে দেওয়া আসনে উপনির্বাচনে রওশন এমপি হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে এরশাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে রওশন এরশাদ নির্বাচনে অংশ নেন এবং জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা হন। স্বামী-স্ত্রীর সবশেষ বিরোধ নতুন রূপ নেয় ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে ভাই জি এম কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান করায়। এই সিদ্ধান্তে স্বামী এরশাদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন রওশন। ভাঙনের মুখে পড়ে দল। শেষ পর্যন্ত রওশন এরশাদকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান পদে বসিয়ে ভাঙন ঠেকানা হয়।

প্রথমে স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্ব, এরপর দেবর-ভাবির দ্বন্দ্বে পড়ে জাতীয় পার্টির এখন ত্রিশঙ্কু অবস্থা। দেবর-ভাবির দ্বন্দ্বে দেবর জি এম কাদের কতটা এগিয়ে রয়েছেন তা সামনেই দেখা যাবে। ইতিমধ্যে জি এম কাদের একটি চিঠি স্পিকারকে পাঠিয়েছেন তাকে বিরোধীদলীয় নেতা ঘোষণার জন্য। এই কঠিন লড়াইয়ে রওশন টিকতে পারবেন কি? রসিকজনরা বলছেন, এমনও হতে পারে যে, এবারও রওশন এরশাদ, জি এম কাদেরের নেতৃত্ব মেনে না নিয়েই তাকে উদ্দেশ্য করে গেয়ে উঠতে পারেন ভাওয়াইয়া গান : ‘ও সাধের দেওরা, তুই হইলি কবে পাক্কা সেয়ানা!’

 লেখক : রম্যরচয়িতা

Islami Bank