• ঢাকা
  • রবিবার, ৩১ মে, ২০২০, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
প্রকাশিত: অক্টোবর ৭, ২০১৯, ০৩:৩২ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : অক্টোবর ৭, ২০১৯, ০৩:৩২ পিএম

খাবারে ভেজাল দিবেন না ভাই

সাইদুল ইসলাম খন্দকার
খাবারে ভেজাল দিবেন না ভাই

বেশ কিছুদিন আগের কথা।উত্তরায় সন্ধ্যের পর পর  টং দোকান থেকে করা লিকার দিয়ে এক কাপ চা । ঠিক এমন সময় একজনের কণ্ঠস্বর একটু আলাদা করে কানে লাগলো । দেখলাম একজন বিদেশি নাগরিক। কিছু খুঁজছেন ৬ ফুট ২ ইঞ্চি  লোক দোকানদার কে ইংরেজিতে কিছু একটা বোঝাতে চাইছে আর ওই দোকানদার বেচারা তার দিকে তাকিয়ে শুধু বড় বড় চোখ করে দেখছে। ওর নাম ডেভিড ।একজন নাইজেরিয়ান নাগরিক । জন্ম নাইজেরিয়ার জাফার স্টেটে।

এটা মূলত নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিম স্থানে অবস্থিত | এখানে কি করেন তা জানার আগেই তার সাথে গড়ল্প জমিয়ে ফেলেছি।আসলে ডেভিড কে  একটু জানার পরেই ,আমার কৌতুহলী সব প্রশ্নগুলো ফেলুদার প্রশ্নের মত রূপান্তরিত হয়ে গেলো।ডেভিডকে  জানাপর জন্য আমি উদগ্রীব হয়ে গেলাম।ভিনদেশী মানুষের গল্প শুনতে আমার খুব ভালো লাগে । একটি ফরেইন পাসপোর্ট ধারী  টুরিস্ট ভিসা নিয়ে এ দেশে এসে কা্জ করছে । কথার সময় যত বাড়তে লাগলো ডেভিডও তার মনের না বলা কথা বলতে উদগ্রীব হযে উঠলো। ডেভিড এবার উৎসাহিত হয়ে ,তার সাহসের গল্প শোনাতে লাগল। অনেক চড়াই উতরাই পার করে ডেভিড এদেশে এসেছে।

সারা পৃথিবীতে মেক্সিকো ভিন্ন ভিন্ন ভাবে পরিচিত । তার মধ্যে অন্যতম হলো ড্রাগ উৎপাদন এবং বিক্রি।  মেক্সিকান ড্রাগ কার্র্টেল লিডাররা উত্তর সাউথ ক্যালিফোর্নিয়ায় ক্যারিবিয়ানদের  ড্রাগ সরবরাহকারী হিসেবে ব্যবহার করে থাকে এবং ডেভিড  এমনই একটি চক্রের সাথে কাজ করত আর একবার ধরা পড়েছিল লোকাল ক্যালিফোর্নিয়ার পুলিশের কাছে । প্রায় দু'বছর ওখানে জেল খাটে ,এছাড়াও কলম্বিয়াতে কলম্বিয়ান কোকেন বিক্রয়কালীন সময়ে ধরা পরে আবার ও ৬ মাস জেল খাটেন। আমি ডেভিডের  কথাগুলো শুনতে শুনতে ভিতর খুব রোমাঞ্চিত হতে লাগলাম ,এবার আমার মাথার ভিতরে একটা বুদ্ধি গজ গজ করা শুরু করল । ডেভিডকে খথা প্রসঙ্গে আমি বলে ফেললাম, তোমাকে খুব ভালো একটা বুদ্ধি দিতে পারি ,যা কিনা তোমার জেলে যাওয়া থেকে বাঁচাতে পারে এবং তুমি অধিকতর মুনাফা করতে পারবে । ড্রাগ সরবরাহকারী ব্যবসার থেকে এ কাজে ঝুঁকি কম। এবার ডেভিডের মধ্যে একটি এক্সাইটমেন্ট তৈরি হলো সে আমার আইডিয়াটা শুনবে বলে । আমি ওকে বললাম  দেশে গিয়ে তুমি এটা নিয়ে মিয়ান তৌসের দোকান দাও (এটা মূলত একটা পাম্পকিন সুপ ) ।

ডেভিড  ঠিক. বুঝতে পারলো না ,এখানে আসলেই মুনাফা কোথায় ? ওর প্রশ্ন  ছিল আমার তো সংরক্ষণ করার কোন ব্যবস্থা নেই ?এবং ওখানে এই টাইপের অনেক খাবার দোকান আছে, আমি কিভাবে প্রতিযোগিতামূলক এই খাবারগুলোর থেকে অধিক মুনাফা অর্জন করব?এবার আমি বাংলাদেশের খাবার এবং ফল ব্যবসায়ীদের কিছু চিত্র তুলে ধরি ওর সামনে । ও এভাবে মুনাফা অর্জন করবে ভাবতেই সে চমকে উঠলো। বললো ড্রাগ বিক্রি করতে পারি,তাতে যfর ইচ্ছা সে নেবে,যার ইচ্ছা নেই সে নেবে না। কিন্তু খাদ্যে ভেজাল দিয়ে মানুষ হত্যা করে মুনাফা লুটবো এটা কোন মতেই সম্ভব না।   আজকাল বাজারে ফলমূলের দোকানে গেলে মৌমাছি আর চোখে পড়ে না, মাছের বাজারে নেই মাছের গন্ধ আর মাছির আনাগোনা। ডেভিড বলে এর কারণ কি? আমি বলি মাছে ফরমালিন মেশানোর ফলে বাজারে মাছের আঁশটে-পচা দুর্গন্ধ আর থাকে না।

একইভাবে কোনো ফলমূলের দোকানেও মৌমাছির আনাগোনা নাই বললেই চলে, কারণ কারবাইড মেশানোর কারণে মৌমাছি আর মধু আহরণ করতে ওই ফলে যায় না। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এগুলো বেশি দিন তাজা রাখার উদ্দেশে ফরমালিন, কারবাইড ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকে। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে কিংবা অতি অল্প কালের মধ্যেই অর্থ-বিত্তের মালিক হওয়ার নেশায় বুদ হয়ে থাকে ।  আমাদের দেশের অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার আশায় দুধ, ফল, মাছ-মাংসে এমনকি শাকসবজিতেও ফরমালিন, হাইড্রোজেন পার
অক্সাইড, কার্বাইডসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে নির্দিধায়। যারা এদের ফেরাতে পারে তারা সবাই এ কাহিনী জানে,কিন্তু জেগে ঘুমালে সে ঘুম ভাঙানোর সাধ্য কার? এখানে জিলাপি চানাচুরে মবিল মেশানো হয়। আরো শোনা যায় বিস্কুট, আইসক্রিম, কোল্ড ড্রিংকস, জুস, সেমাই, আচার, নুডুলস, এমন কি মিষ্টিতে টেক্সটাইল ও লেদার রং, পানিতে ক্যাডমিয়াম, লেড, ইকোলাই, লবণে সাদাবালু, চায়ে করাতকলের গুঁড়া, গুঁড়া মসলায় ভূষি কাঠ বালু ইটের গুঁড়া ও বিষাক্ত গুঁড়া রং। শিশু িখাদ্যেও বিষ। একজন পিতা বা মাতা তার সন্তানের জন্য বিষ কিনে নিযে যায় বিষয়টি ভাবতে কেমন লাগে?


এসব শোনার পরে ডেভিডের চেহারায় খুব বিমর্ষ ভাব চলে আসলো ,আমি এরকমটা ওর চোখে মুখে একটু আগেও দেখতে পাইনি ,ও বিড়বিড় করে কি যেন বলতে লাগলো | আমি ওকে যখন জিজ্ঞেস করলাম ,ও বলল একটা সলিড ফুড অর্থাৎ খাদ্যদ্রব্য ফলমূল-শাকসবজি সাথে তোমরা এখানে অপশনাল খাদ্য কিংবা ওষুধ পত্রাদি একসাথে কিভাবে মিলিয়ে ফেললে ? আমি যেটা করি , সেটা হলো অপশনাল । মানে তুমি যদি চাও ড্রাগ নিতে পারো কিংবা নাও নিতে পারো ।আর আমি একজন সরবরাহকারী কিন্তু সলিড ফুডে যে এরকমভাবে ভেজাল মেশানো যায় ,একটা মানুষকে এভাবে হত্যা করা যায় ,‘এটা আমি জানতাম না ।

এটা আমি জানিও না এবং এটা আমি জানব না ‘কারণ সলিড ফুড নিয়ে কোন কম্প্রোমাইজ হয় না , পৃথিবীতে কোথাও হয়নি আমার জানা মতে। হ্যাঁ এটা সত্যি আমরা মেনে নিলাম ক্যারাবিয়ানরা সারা বিশ্বের কোথাও না কোথাও ড্রাগ ,জালিয়াতি কিংবা বিভিন্ন  ধরনের অন্যায় অপকর্মের সাথে জড়িত থাকার অনেক নজির রয়েছে । তবে আমরাও জানি না যে মানুষের মূল খাদ্য দ্রব্যে ,শাকসবজি ,ফলমূলে এ কিভাবে ভেজাল মিশিয়ে হত্যা করা যায় । দেখো ডেভিড এটা আমাদের জন্য একটা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা ,আমরা এই ভেজাল খাবার খাই ,ভেজাল মেশাই কারণ আমাদের কোন অপশন নেই। আর অপ্রিয় সত্য হলেও এটাই সত্য। কোথায় ভেজাল নেই ? ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান থেকে যারা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তারা এ এই খাদ্যে ভেজাল মেশায় ,এটা জলের মত পরিষ্কার ।

শুধু পরিষ্কার না আসলে সভ্য জগতে এটা কেমন করে চলতে পারে ?আমাদের কষ্ট হয় তবু আমরা মেনে নেই।এবার ডেবিট কে জিজ্ঞেস করলাম তুমি বলতো কেমন করে এ ভেজাল কে রুখে দিবো ? হ্যাঁ এটা সত্যি রুখে দেওয়া সম্ভব একটি সামাজিক আন্দোলনের বিপ্লব ঘটিয়ে। একটি সামাজিক  তীব্র আন্দোলন এবং মাইন্ডসেট রুখে দিতে পারে এই ভেজাল ব্যবসা এবং ভেজাল কে “না”বলা । আইন প্রণয়নে কঠিন বাস্তবায়ন ‘মৃত্যুদণ্ড’। তুমি যদি (ডেভিডের দেশ)আমার দেশে এই ভেজাল করতে যাও , কোন আইনের দ্বারস্থ হতে হবে না ,গণমানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেবে , সেটা হবে খুবই ভয়ঙ্কর ।খাদ্য দ্রব্য ভেজাল করি না কারণ এটা একটা মহাপাপ ও গুরুতর অন্যায় ।এটা একটি সমাজ ,একটি দেশ এবং পৃথিবীর কোথাও কাম্য নয় ।

আমাদের কথোপকথনের একদম শেষ পর্যায়ে ।
যেতে যেতে ডেভিডের দীর্ঘনিঃশ্বাস আর বিড়বিড় করে বলতে লাগল (যা বাংলায় অনুবাদ করলে অর্থটি দাঁড়ায় )ভেজাল দিবেন না ভাই ....!

লেখক : সংগঠক ও প্রতিষ্ঠাতা, আমাদের গৌরব