• ঢাকা
  • শনিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৯, ২ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫, ২০১৯, ০৫:১৫ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : অক্টোবর ১৫, ২০১৯, ০৫:১৫ পিএম

বুয়েটে ছাত্রহত্যা ছাত্ররাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতি

আবুল কাসেম ফজলুল হক
বুয়েটে ছাত্রহত্যা ছাত্ররাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতি

হত্যা, আত্মহত্যা, দুর্ঘটনায় মৃত্যু ইত্যাদি বাংলাদেশে ভীষণভাবে বেড়ে গেছে। কোনো কোনো হত্যাকাণ্ড দেশি-বিদেশি প্রচারমাধ্যমে এমনভাবে আলোচিত হয় যে তা দুনিয়া-কাঁপানো ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এমনি একটি ঘটনায় বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শেরে বাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে হলের ছাত্র আবরার ফাহাদকে উক্ত হলেরই ছাত্রলীগের কিছু ছাত্রনেতা পিটিয়ে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের নির্মমতা ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। প্রচারমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ১৯ জন ছাত্রনেতা দীর্ঘ সময় ধরে আবরারকে পিটিয়ে মেরেছে। প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে যে, সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দিল্লিতে গিয়ে ভারত-সরকারের সঙ্গে যেসব চুক্তি করে এসেছেন, আবরার ফেসবুকে সেগুলোকে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বলে প্রচার করার কারণেই হলের ছাত্রলীগের ছাত্রনেতারা ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে আমৃত্যু পিটিয়েছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনা কেবল আবরারের বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনকেই কাঁদায়নি, কাঁদিয়েছে অধিকাংশ দেশবাসীকেই।

এই ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটে যাওয়ার পরেই সরকার, সরকারি দল, সরকারের বাইরের বিভিন্ন দল, সিভিল সোসাইটি অরগানাইজেশনগুলোর বিশিষ্ট নাগরিকেরা সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা যে ধরনের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন, এক্ষেত্রেও সেই ধরনের প্রতিক্রিয়াই প্রকাশিত হচ্ছে। ছাত্রছাত্রীদের কিংবা জনদাবির তীব্রতার মধ্যে বুয়েটের শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিয়ে অবস্থা শান্ত করা হয়েছে। প্রতি ঘটনার পরেই পুলিশ, র্যাব ও আদালতকে সক্রিয় করা হয়—বছরের পর বছর, দশকের পর দশক চলে যায়।...একের পর এক ঘটনা কোথাও না কোথাও ঘটে চলে। দেশবাসী এ অবস্থাকে মেনে নিয়ে চলে। উন্নত অবস্থা সৃষ্টি নিয়ে কারো আগ্রহ দেখা যায় না। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে মনে হয়, বাংলাদেশের জন্য এটাই স্বাভাবিক।

সিভিল সোসাইটি মহল থেকে এবং আরো নানা মহল থেকে ক্রমাগত বলা হয় ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’। বিভিন্ন মহাদেশের বিভিন্ন জাতি ‘সংস্কৃতি’ বলে যা বুঝত বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাগরিকেরা, অনেক রাজনীতিবিদ ও অনেক প্রচারমাধ্যম ঠিক তার বিপরীত বিষয়কে সংস্কৃতি বলে প্রচার করেন। বিচারহীনতা, জুলুম-জবরদস্তি, দুর্নীতি, ধর্ষণ, নারীনির্যাতন, প্রশ্নফাঁস, অপহরণ এই ধরনের সব ঘটনার সঙ্গে সংস্কৃতি কথাটি যুক্ত করে প্রচার চালানো হয়। সংস্কৃতি বলতে, সভ্যতা বলতে কী আমাদের উপলব্ধি করা উচিত—তা নিয়ে কারো কোনো অনুসন্ধিসা দেখি না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকেই জাতীয় অবস্থা সম্পর্কে আমার যে উপলব্ধি হয় তা তো আমি সংস্কৃতি বিষয়ে ক্রমাগত লিখে আসছি, বলে আসছি। সেই সঙ্গে নৈতিক চেতনার ও মূল্যবোধের উন্নতির উদ্যোগের কথাও বলে আসছি।

গভীর মর্মবেদনার সঙ্গে আমি দেখছি যে, সর্বক্ষেত্রে অপসংস্কৃতিকে সংস্কৃতি বলে ও নৈতিক পতনশীলতাকে দুর্নীতি বলে নিরন্তর হইচই করা হয়। বলা হয় ‘সহ্য করা হবে না’, তার বদলে এখন বলা হয় ‘জিরো টলারেন্স’। রাজনীতি, অর্থনীতি প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, পুলিশ বিভাগ, র্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনী, শিক্ষাব্যবস্থা ইত্যাদিতে সচেতনতা কোথায়? অনুসন্ধিত্সা কোথায়? জোড়াতালির সমাধান নিয়ে কোনোরকমে চলার চিন্তা ছাড়া উন্নত অবস্থা, উন্নত জীবন প্রতিষ্ঠার চিন্তা কোথায়? সংস্কৃতি অবলম্বন করে—নৈতিক চেতনাকে উন্নত করে বাংলাদেশকে স্বর্গরাজ্যে উন্নীত করা সম্ভব—এ বোধ কি বাংলাদেশে দেখা দিতে পারে না?

বুয়েটে শিক্ষার্থীরা দাবি তুলেছে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার। কথিত বিশিষ্ট নাগরিকদের থেকে এ দাবি আরো বড়ো করে উত্থাপন করা হয়েছে। অবস্থার চাপে বুয়েট কর্তৃপক্ষ বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। উপাচার্য অভিযুক্ত হয়েছেন দায়িত্বহীনার অভিযোগে। তিনি নিজের চেয়ার রক্ষার জন্য নমনীয় হয়েছেন। ছাত্রছাত্রীদের কাছে নতমস্তকে ক্ষমা চেয়েছেন। সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে যে, বুয়েটে ছাত্রলীগ পরিচালিত টর্চার সেল আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তৃপক্ষ সে সম্পর্কে জানে না। ছাত্রছাত্রীরা টর্চার সেল মেনে নিয়ে চলছে। ‘এ কেমন বঙ্গদেশ অন্ধকার, উত্থানরহিত!’

প্রশ্ন, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা নিয়ে। জাতীয় রাজনীতি নিয়েও। দেশি-বিদেশি কিছু প্রচারমাধ্যম গত অন্তত ৩০ বছর ধরে ক্রমাগত ছাত্ররাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতির কেবল খারাপ দিকগুলো, কেবল খারাপ দৃষ্টান্তগুলো, খুব বড়ো করে প্রচার করছে। রাজনীতিকে এবং রাজনীতিবিদরকে যথাসম্ভব খারাপরূপে চিত্রিত করছে। সিভিল সোসাইটি অরগানাইজেশনগুলো থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য অনেক বিশিষ্ট নাগরিক অরাজনৈতিক, নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি সামনে এনেছেন। কয়েকটি নির্বাচন অরাজনৈতিক, নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্ববধায়ক সরকার দিয়ে করা হয়েছে। তাতে জাতীয় রাজনীতির নিম্নগামিতা দ্রুততর হয়েছে।

অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি কথিত বিশিষ্ট নাগরিকেরা ১৯৮০-র দশকের শুরু থেকে ক্রমাগত উত্থাপন করে আসছেন। তাতে দেখা যাচ্ছে, ক্রমে বাংলাদেশে নির্বাচন নাই হয়ে গেছে। তারা রাজনৈতিক সমাজকে (Political Society) যতটা সম্ভব ছোটো ও দুর্বল করে সিভিল সোসাইটি অরগানাইজেশনগুলোকে যতটা সম্ভব বড়ো ও প্রবল করার তত্পরতা চালাচ্ছেন। তারা নাগরিক কমিটি, সামাজিক কমিটি, নাগরিক আন্দোলন, সামাজিক আন্দোলন, ইত্যাদি দ্বারা জনজীবন পরিচালনার তত্ত্ব প্রচার করেন। তারা ‘অদলীয় রাজনীতি’, ‘নির্দলীয় রাজনীতি’ ইত্যাদির তত্ত্ব প্রচার করেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উপায়ে রাজনৈতিক দলের উপযোগিতাকে অস্বীকার করেন। রাষ্ট্রের প্রয়োজনকেও তারা অস্বীকার করে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচার চালান।

বাংলাদেশে তারা নিঃরাজনীতিকরণের ও নিঃরাষ্ট্রকরণের কর্মনীতি নিয়ে কাজ করেন। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও বামপন্থিদের মধ্যে এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। ১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় তারা জেনারেল ওসমানীকে আওয়ামী লীগ থেকে সরিয়ে নিয়ে নাগরিক কমিটির প্রার্থী এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ‘এক দফা এক দাবি—এরশাদ তুই কবে যাবি’ এই স্লোগান নিয়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, বামপন্থি বিভিন্ন গ্রুপ, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশন ইত্যাদিকে পরিচালনা করেছেন। ১৯৯০-এর দশকে তারা নতুনভাবে রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং রাজনীতিকে বৃহত্ শক্তিবর্গের স্থানীয় দূতাবাসমুখী করেন।

নানাভাবে তারা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দিয়ে রাজনীতি পরিচালনার কর্মনীতি কার্যকরের চেষ্টা চালান। তারা নাগরিক কমিটি ২০০৬ নামে নতুনভাবে সংগঠিত করে যোগ্য প্রার্থী আন্দোলন চালান এবং তাতে জরুরি অবস্থা ঘোষিত হয় এবং প্রায় দুই বছর দেশে জরুরি অবস্থা কায়েম থাকে। রাজনৈতিক দল যাতে উন্নত চরিত্র লাভ না করে, কোনো নতুন রাজনৈতিক দল যাতে গড়ে না ওঠে, তার জন্য নানা কৌশলে তারা কাজ করেন। আওয়ামী লীগ, বিএনটি, জাতীয় পার্টি ও বামপন্থি গ্রুপগুলো তাদেরকে মেনে নিয়ে প্রত্যক্ষভাবে কিংবা পরোক্ষভাবে পরিচালিত হচ্ছে। তাতে বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এত নিকৃষ্ট রূপ লাভ করেছে। আওয়ামী লীগ কি বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা কায়েম করে চলছে?

আমি মনে করি, সিভিল সোসাইটি আরগানাইজেশনগুলোর পরিচালনায় ও প্রভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি আত্মবিলোপের পথে, আত্মবিনাশের পথে চলছে। অতীতে জাতীয় রাজনীতি দ্বারা, ছাত্ররাজনীতি দ্বারাও ভালো কাজ অনেক হয়েছে। হিন্দু-মুসলমান বিরোধের অপঘাত সত্ত্বেও রাজনীতি দ্বারাই ইংরেজ শাসনের ও জমিদারি ব্যবস্থার অবসান ঘটানো হয়েছে, ১৯৫৪ সালের একুশ দফা আন্দোলনের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, ছাত্রদের এগারো দফা আন্দোলন, স্বাধীনতাযুদ্ধ ও স্বাধীন সর্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা—ইত্যাদি ঘটনার মধ্যে রয়েছে রাজনীতির অসাধারণ গৌরবজনক ভূমিকা। সেসব সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে রাজনীতির কেবল খারাপ দিক, দুর্বলতার দিক সামনে এনে ব্যাপভাবে প্রচার করা হচ্ছে। এই ধরনের কাজ যারা করছে তারা বাংলাদেশবিরোধী।
এই বাস্তবতায় আবরার হত্যার সুযোগে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি তোলা হচ্ছে। বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি এর মধ্যেই নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রের ও রাজনীতির ইতিহাসের এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আশ্রয়ে বুঝতে চাইলেই বোঝা যায়—গত প্রায় ৪৮ বছরে বাংলাদেশকে রাষ্ট্ররূপে গড়ে তোলা হয়নি। রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলার প্রতিষ্ঠান যেটুকু হয়েছিল তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হচ্ছে না—যাত্রা ইংরেজির দিকে। শিক্ষাব্যবস্থা রাষ্ট্রগঠনের ও রাষ্ট্রভাষারূপে বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করার প্রতিকূল। যারা বাংলাদেশকে রাষ্ট্ররূপে গঠন করতে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষারূপে গঠন করতে চান না তাদের রাজনীতির দল কী হবে!

আবরারের পরিবারের প্রতি এবং বেদনার্ত দেশবাসীর প্রতি আন্তরিক সহানুভূতি জানাই। সকলের প্রতি আমার আবেদন—শুভবুদ্ধিকে জয়ী করুন ও জয়ী রাখুন এবং অশুভবুদ্ধিকে পরাজিত করুন ও পরাজিত রাখুন। তার জন্য যা-কিছু করা দরকার সবই করতে হবে। বাংলাদেশকে আমাদের অর্থাত্ বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীন-সর্বভৌম রাষ্ট্ররূপে গঠন করার, বাংলা ভাষাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষারূপে প্রতিষ্ঠা করার এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতিগঠনের ও রাষ্ট্রগঠনের অনুকূল রূপ দেওয়ার জন্য উন্নত চরিত্রের রাজনৈতিক দল অপরিহার্য।

 লেখক : প্রাক্তন অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়