• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৯, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: অক্টোবর ২৭, ২০১৯, ০৬:২৭ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : অক্টোবর ২৭, ২০১৯, ০৬:২৭ পিএম

‘ব্যবস্থা বদলের’ সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে

রুহিন হোসেন প্রিন্স 
‘ব্যবস্থা বদলের’ সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে

রাজনীতি নিয়ে সারাদেশের মানুষের উৎকণ্ঠার শেষ নেই। কী হচ্ছে? কী হবে? এসব প্রশ্ন সর্বত্র। একাংশ মানুষ নিজের মত করে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিচ্ছেন। তবে অস্বস্তি সর্বত্র। সম্প্রতি ‘ক্যাসিনোর’ মধ্য দিয়ে লুটপাট, দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়নের যে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেল তা হয়তো অনেকের ধারণায় ছিল না। লুটপাটের অর্থনীতির ধারা যে নীতিহীন রাজনীতির জন্ম দিয়েছে তার থাবায় শুধু কতক দুর্বৃত্তরা নয়, নামকরা রাজনীতিকদের(!) চেহারাও উন্মোচিত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে অমানবিকতার কুৎসিত চিত্র বিবেকবোধসম্পন্ন মানুষকে হতবিহ্ববল করে তুলছে।
 দুঃশাসনের যাতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষ নিজে টিকে থাকতে ব্যস্ত। আর দুর্বৃত্ত লুটেরা গোষ্ঠী ব্যস্ত পাল্লা দিয়ে লুটপাটের অবাধ ধারা অব্যাহত রাখতে। এসব চলছে ক্ষমতাসীনদের পৃষ্ঠপোষকতায়। গডফাদার আর মাফিয়াতন্ত্র এদের পাহারাদারের ভূমিকা পালন করছে। এই পাহারাদারদের টিকিয়ে রাখতেও দুর্বৃত্তরা দায়িত্ব পালন করছে। এজন্য মানুষের মতামতকে উপেক্ষা করে, রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে যেন-তেন প্রকারে ক্ষমতায় থাকা আর লুটপাটের ধারাকে অব্যাহত রাখাটা এইসব দুর্বৃত্তদের জন্য জরুরি কাজ।
 
দুই.
প্রায় এক দশক ধরে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আছে। এরা অতীতের বিএনপি-জাতীয় পার্টির ধারার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বাতিল করে মুক্তিযুদ্ধের ধারার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালুর বিপরীতে ঐ ধারাকেই লালন করে চলেছে। তাই তো লুটপাটের পরিমাণ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় হয়েছে লাগামহীন। মানবিক মূল্যবোধ হচ্ছে বিপর্যস্ত। রাজধানীর মতিঝিল পাড়ার ক্লাবে ক্যাসিনো-বাণিজ্য, দরিদ্র ও অভিজাত এলাকায় প্রতারণার নানা ফাঁদ, ব্যাংক ডাকাতি, শেয়ার বাজারে লুটপাট, টাকা পাচার, টেন্ডার-বাণিজ্য, বড়-ছোট প্রকল্পে গোষ্ঠীবদ্ধ লুটপাট, দখলদারিত্ব, কমিশন বাণিজ্য ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এই ধারা বিস্তার লাভ করেছে ‘টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া’ সর্বত্র। ‘দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ প্রশাসনিক কর্মকর্তা আর দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক নেতা’ মিলে তৈরি হওয়া দুর্বৃত্তায়নের ধারা সর্বত্র। কোথাও কম, কোথাও বেশি। এভাবেই তো চলছে।

মানুষের কণ্ঠরোধ ছাড়া এ ধারা অব্যাহত রাখা যেকোনও শাসকদের জন্য সহজ নয়। তাই কেড়ে নেয়া হয়েছে জনগণের ভোটাধিকার। অতীতের সব কারসাজিকে ছাপিয়ে আগের রাতে ভোটের উৎসবের(!) নির্লজ্জতাকে কথার মারপ্যাঁচে হালাল করার চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা হচ্ছে না। ‘নির্বাচন কমিশন’, ‘সাংসদ’, ‘সাবেক মন্ত্রী’, এদের বচনে বেরিয়ে আসছে সত্য কথন। উন্নয়নের ঢাক-ঢোল পেটালেও দৃশ্যমান বৈষম্য ও নির্লজ্জ লুটপাট মানুষের মনকে স্বস্তি দিচ্ছে না। বিদেশে উন্নয়নের গল্প শুনিয়ে দেশের গণতন্ত্রহীনতাকে চাপা দেয়া যাচ্ছে না। গণতন্ত্রহীন দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম যোগ হচ্ছে। বরং এই দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশসহ এ অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারকারী দেশগুলো ও সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তি সুবিধা আদায় করছে। সরকার দেশের স্বার্থ উপেক্ষা করে অসম চুক্তি করে চলেছে।

এসব প্রশ্ন চলতি ধারার নীতিহীন রাজনৈতিক দলসমূহ এড়িয়ে যাবেন। সুবিধামত ইস্যু সামনে আনবেন। কোন আমলে কি হয়েছে, এটি নিয়ে পাল্লায় মাপামাপিতে সময়ক্ষেপণ করবেন। আর মানুষকে এরই মধ্যে বন্দি করে রাখতে চাইবেন। ক্ষমতাসীনদের আচরণে এটি সাধারণ মানুষ দেখছেন। দেখছেন এক সময় ক্ষমতায় থাকা আর এখন ক্ষমতার বাইরে থাকা গোষ্ঠীর গর্জন। এরা ’৭১-এর ঘাতক সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে সাথে নিয়ে গণতন্ত্রের বুলি আওড়াচ্ছেন। ক্ষমতায় থাকার সময় দুর্নীতির প্রতীক হয়ে ওঠা ব্যক্তিকে নেতা মেনে সুশাসনের ছবক দিচ্ছেন। আর এদের সাথে সমবেত হওয়া নানা গোষ্ঠী সমস্যার মূলে হাত না দিয়ে নানা সময় ‘অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচন’, ‘জাতীয় সরকার’সহ নানা ফর্মুলা হাজির করে প্রচলিত ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে সমাধানের পথ খুঁজছেন।

‘জাতীয় ঐক্য’ এখন অনেক সময় সবকিছুর দাওয়াই হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে। দেশের মানুষের জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে। ঐ মুক্তিযুদ্ধের অর্জন, সংবিধানের চার মূলনীতি প্রতিষ্ঠার কথা বা অঙ্গীকার নেই এদের। এমনকি ১৯৯০ এ গণঅভ্যূত্থানের তিন জোটের রূপরেখা ও আচরণবিধি মানা ও বাস্তবায়নের কথাও শোনা যায় না। ঐ রূপরেখা ও আচরণবিধিতে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন, দক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছিল। একইসাথে বলা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা। বলা হয়েছিল সাম্প্রদায়িক অপশক্তি দমন, সাম্প্রদায়িক প্রচার-প্রপাগান্ডা বন্ধ, এদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের কথা। বলা হয়েছিল সংকট হলে পারস্পরিক কথা বলে সমস্যা সমাধানের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির কথা। এসব মীমাংসিত বিষয়ে নিজেদের আচরণ পাল্টানো ছাড়া ঐক্যের আলোচনা বা কথায় কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা আশা করা যায় না। বরং এসব শব্দ চয়নে প্রচলিত ব্যবস্থা অব্যাহত রেখে যার যার সুবিধা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে। আর সার্বিক সমস্যা সমাধানে জনগণের সামনে ভুল বার্তা আসছে, মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে।
তিন.
প্রশ্ন হলো, তাহলে কি যেভাবে চলছে সেইভাবেই চলবে? আমরা কি নির্বাক দর্শক হয়ে থাকবো? মোটেই না। মানুষের চোখের সামনে যে নীতিহীন ধারা চলছে তার বিপরীতে নীতিনিষ্ঠ ধারাকে তুলে ধরতে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে নীতিনিষ্ঠ শক্তিকে। প্রচলিত ব্যবস্থা রক্ষায় সরকার, শাসক ধারার দলগুলো, রাষ্ট্রযন্ত্র আর এখন শক্তিশালী প্রচারমাধ্যম ভূমিকা রেখে চলেছে। এই ধারা আমাদের সামনে নানা ইস্যু নিয়ে এসে ঐসব ঘটনার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া সংগঠিত করতেই সীমাবদ্ধ রাখতে চায়। দেশি-বিদেশি পুঁজির মালিক, কর্পোরেট ব্যবসায়ী আর সাম্রাজ্যবাদ চায় শাসকদের দ্বি-দলীয় ধারায় দেশ পরিচালিত হোক। তাইতো মানুষকে বিভ্রান্ত করে সংকটকে সামনে রেখে টোটকা সমাধান চায় এসব গোষ্ঠী।

কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই এগিয়ে যেতে হবে। ভরসা করতে হবে জনগণের শক্তির ওপর। এ জন্য শব্দ চয়নে সীমাবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে তার সমস্যা সমাধানে সচেতন ও সংগঠিত করার কাজ করতে হবে। দুর্বৃত্ত আর দুর্বৃত্তায়ন বন্ধে সারাদেশে অভিযান সংগঠিত করা, লুটেরাদের মুখোশ উন্মোচনে সমবেত কণ্ঠে আওয়াজ তুলতে হবে। দেশের উন্নয়নের গতি অব্যাহত রেখে বৈষম্য নিরসন এবং মানুষের মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার বিকল্প নির্দেশনা দিতে হবে। দুঃশাসন হটিয়ে মানুষের মতামতের ভিত্তিতে সরকার গঠনের জন্য প্রচলিত ব্যবস্থা পাল্টিয়ে নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ও অবাধ ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একইসাথে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী এবং সর্বত্র স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় জনগণকে পাহারাদারের ভূমিকায় নিতে হবে। ভিশন মুক্তিযুদ্ধ-৭১ বাস্তবায়নে দেশবাসীকে জাগ্রত করতে হবে। দুর্বৃত্ত ও দুর্বৃত্তায়িত চক্র এবং তাদের স্বার্থে পরিচালিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সমাজে যে ‘লোভ ও ভয়ের’ সংস্কৃতি চালু করেছে, তার থেকে মানুষকে মুক্ত করার দায়িত্বও পালন করতে হবে।

এসব কাজে পরিকল্পিতভাবে সময় দিয়ে নিষ্ঠাবান বামপন্থি নেতা-কর্মীদের অগ্রণী ভূমিকা পালনই সময়ের দাবি। আমরা চলমান দুঃশাসন হটিয়ে, ব্যবস্থা বদলের লক্ষ্যে যে বিকল্প শক্তি সমাবেশ গড়ে তোলার সংগ্রাম করছি, সেখানে নানা ধরনের দোদুল্যমানতা কাজ করছে। তাই আমাদের অগ্রণী ও দৃশ্যমান ভূমিকাই পারবে এসব দোদুল্যমানতাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখাতে।এ কাজে আমরা দায়িত্ব পালন না করতে পারলে, সফল না হলে, নানা নামে প্রচলিত ব্যবস্থা বহাল থাকবে। দুর্বৃত্ত আর দুর্বৃত্তায়নের সাময়িক উত্থান-পতন দেখবো। এর মধ্যে সুবিধাবাদীরা তাদের পথ খুঁজে নেবে। আর বর্তমান সংকটকে পুঁজি করে সাম্প্রদায়িক ও বিরাজনীতিকরণের অন্ধকারের অপশক্তি আধিপত্য বিস্তারের পথ খুঁজবে। যা আমাদের আরও পেছনের দিকে নিয়ে যেতে চাইবে।

২০০ বছরের ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম, ২৪ বছরের পাকিস্তানী স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই, অসংখ্য মানুষের জীবনদান এবং ১৯৭১ এর স্বশস্ত্র সংগ্রামে ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মোৎসর্গ ও কোটি মানুষের সংগ্রামে অর্জিত দেশ ও দেশের মানুষকে এই অবস্থায় নিয়ে যেতে দিতে পারি না।তাই প্রচলিত ব্যবস্থা পাল্টাতে বিকল্প শক্তি সমাবেশ গড়ে তুলতে বাম গণতান্ত্রিক জোটের কর্মকান্ডেরর পাশাপাশি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) দুঃশাসনের অবসান ঘটিয়ে সার্বিক সংকট সমাধানে ব্যবস্থা বদলের আন্দোলন বেগবান করতে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত মানুষকে সচেতন ও সংগঠিত করতে নভেম্বর মাস জুড়ে পদযাত্রা, সভা-সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

এ সময়ে জাতীয় দাবির সাথে স্থানীয় দাবি যুক্ত করে দেশবাসীর কাছে আমাদের আহ্বান পৌঁছে দিতে হবে। সচেতন ও আগ্রহীদের পার্টিতে সংগঠিত হওয়ার পথ রচনা করতে হবে। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আগামীতে আরও কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নিজেদের ‘ভরসার শক্তি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে লোভ আর ভয়কে অতিক্রম করে সাধারণ মানুষকে প্রচলিত ‘ব্যবস্থা বদলের’ সংগ্রামে সামিল করতে হবে। ব্যবস্থা বদলের সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে। আমাদের কর্মকান্ডই মানুষের সামনে দৃশ্যমান করবে বিকল্পের। মানুষই বলবে এরাই বিকল্প। এই নীতিনিষ্ঠ শক্তিই মানুষকে মুক্তির পথ দেখাবে।

লেখক : সম্পাদক, সিপিবি