• ঢাকা
  • বুধবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬
প্রকাশিত: নভেম্বর ৩, ২০১৯, ০৩:৩৪ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ৩, ২০১৯, ০৩:৪৬ পিএম

 ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র সংগঠনের ভূমিকা

       আকমল হোসেন
 ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র সংগঠনের ভূমিকা

পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলের প্রথমদিকে এই ভূখন্ডে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ছাত্ররাই ছিল লড়াকু ও অগ্রনী ভূমিকায়। ছাত্র অধিকার, সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার অধিকার এবং জাতীয় অধিকারে তাদের সোচ্চার হতে দেখা গেছে। এখনও দেখা যায় তবে আগের মত, জোড়ালো এবং শক্তি সামর্থ নিয়ে নয়। আরেকটি ব্যতিক্রমী ঘটনা হচ্ছে আগে এই সব আন্দোলনের মূল চালিকা শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখতো ছাত্র সংগঠনগুলি। সেসব ছাত্র সংগঠনের অবস্থা আর তেমন নেই। ছাত্র রাজনীতি যে সংকটের বেড়াজালে আটকে গেছে এসব ঘটনা তারই পরিচায়ক।

 ছাত্র সংগঠনগুলোর এক সময় ছিল যখোন তারা  স্বাধীন অবস্থান থেকে ছাত্র সমাজের শিক্ষা সংস্কৃতি সংক্রান্ত দাবি দাওয়া নিয়ে সোচ্চার এর পর জাতীয় বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে এবং জাতির জন্য করা প্রয়োজন এমন সব দাবি নিয়ে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের বরাবর চাপ সৃষ্টি করতো প্রেসার গ্রুপ হিসেবে। ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্র বিজ্ঞানের আলোকে অন্তঃসারশুন্য, ধর্ম ভিত্তিক দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়। তার পর থেকে অদ্যবধি ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় রাজনীতির গতি প্রকৃতির কারণে ছাত্র রাজনীতির বৈশিষ্ট্যটি আলোচনা করলে মোটা দাগে তিনটি বিষয় পরিস্কার। ১৯৫২-১৯৭০ ছাত্র আন্দোলনের স্বকীয় অবস্থান নিজস্ব অধিকার ভিত্তিক আন্দোলন। 

পাশাপাশি জাতীয় ইস্যু নিয়ে স্বাধীন অবস্থান থেকে আন্দোলন। এ গুলির মধ্যে ভাষা রক্ষার আন্দোলন, সামরিক শাসন বিরোধী  ৬ দফা ও ১১ দফা ভিত্তিক আন্দোলন এবং ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্দোলন। দেশস্বাধীন হওয়ার পর দেশ গঠনের আন্দোলন। কিন্তু পরবর্তীতে সামরিক শাসকের দ্বারা নতুন রাজনৈতিক দল গঠন, ছাত্র-সমাজকে ঐ সকল রাজনৈতিক দলের হুকুমের গোলাম করা। আর্থিক ও বৈষয়িক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির চালু হয়। 

 যার মধ্য দিয়ে রাজনীতির মূল ধারায় আদর্শের বিচ্যুতি,ঘটতে শুরু করে। ছাত্র অধিকার আদায়ে ছাত্র আন্দোলন রচনার বিপরীতে ছাত্র সংগঠনগুলি নিজস্ব স্বাধীন অবস্থান হারিয়ে রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ছাত্র সংগঠনগুলির গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন আসে বা  গঠনতন্ত্রগুলি অকার্যকর হয়ে পরে। এ ধারাটিতে ১৯৭৫ সালের পর ছেদ ঘটে। কর্মীর সংখ্যা বিচারে বৃহৎ ছাত্র সংগঠনগুলি রাজনৈতিক দলের হুকুমের গোলামে পরিণত হয়।

ক্ষমতাসীন দলের আশীবার্দ শুধু ছাত্র সংগঠনগুলি ছাত্র সমাজের সমস্যা ভুলে ক্ষমতাসীন দলের উন্নয়নের ফিরিস্তির জপমালা গাইতে শুরু করে। ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার নিরাপত্তার লাঠিয়াল হিসেবে জনগণের অর্থে পালিত পুলিশ আর আমলাতন্ত্রের মতই ছাত্র সংগঠনগুলি ব্যবহার হতে থাকে। সেই কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা অথবা অনেক জনপ্রতিনিধিরা ছাত্র-জনতার ন্যায় সঙ্গত দাবির আন্দোলনকে দমন করতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনকে ব্যবহার করে।

লাঠি-সোটা, আগ্নেয় অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পরে অধিকার বঞ্চিতদের আন্দোলন দমনে। আর প্রধান বিরোধী দল যারা এক সময় ক্ষমতায় ছিলেন তাদের আর্শীবাদপুষ্ট ছাত্র সংগঠন, ছাত্রদের অধিকার ভুলে সরকার পতনের আন্দোলনে আগুয়ান হয়। অতীতে পাওয়া সুবিধার স্মৃতি তাদের মনকে চাঙ্গা করে, হরতাল জ্বালাও পোড়াও আর গণতন্ত্র রক্ষায় জীবনপাত করে। কেউ ব্যবহার হয় ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতাকে নিরাপদ করতে, আর কেউ শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করে বিরোধী শক্তিকে ক্ষমতায় বসাতে।

 তাদের  কারণে বাস্তচ্যুত হয় অর্থাৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আবসিক হলের সিট হারায় মেধাবী ছাত্ররা। মেধা তালিকায় সিট থাকলেও তাতে থাকতে পারে না, অথবা তাদের থাকতে দেওয়া হয় না। আরও মজার ব্যাপার, বিশ্ববিদ্যালয় ও বৃহৎ কলেজগুলির ছাত্রাবাসে অর্থের বিনিময়ে আসন বরাদ্দ দেয় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র নেতৃবৃন্দ, অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের শাসকরা নিরব থাকেন। ক্ষমতাকেন্দ্রিক ছাত্র রাজনীতি চর্চার দৃশ্যমান ফলাফল হলো, এই ছাত্র সংগঠনগুলির কর্মীরা খুনাখুনি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অপহরণ, ধর্ষন, শিক্ষক লাঞ্চনা, প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ নানান লাভজনক কাজের সাথে যুক্ত হয়ে পরে।

 বিদ্যমান এই  বাস্তবতায় ছাত্র-ছাত্রীদের দৈনন্দিন জীবনের নানামুখী সমস্যা সমাধানে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী, পেশাজীবী সংগঠন অথবা বাম ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে কোন আন্দোলনের সূচনা ঘটলে তার উপর হামলা আসে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে এবং সরকার নিয়োজিত দলীয় স্বার্থ রক্ষাকারি দলদাস এই সব প্রতিষ্ঠান প্রধানরা আন্দোলনকারীদের দমাতে ঐ লাঠিয়ালদের ব্যবহার করেন, পচাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশে সব সময়  এককভাবে এই সংস্কৃতির চর্চা হয়েছে।

 এটা কোন ভাল লক্ষণ নয়, কথায় বলে পরের চালে ঢিল দিলে নিজের চালে পাটকেল পরে, এ প্রবাদের বাস্তব প্রতিফলন দেশবাসী দেখেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন অথবা ঢাকা শহরের ৭টি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভূক্ত করা দেরীতে ফলাফল ঘোষণ জনিত আন্দোলন অথবা চাকুরির বয়সসীমা বৃদ্ধিজনিত সৃষ্ট আন্দোলনকে দমাতে অধিকাংশ জায়গায়তেই সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের হামলা কোথাও পুলিশী হামলা ঘটেছে।

 এগুলি ছিল শ্রেণি পেশার মানুষের পেশাগত সমস্যা সমাধানের আন্দোলন, এটি কোনভাবেই সরকার বিরোধী বা সরকার পতনের আন্দোলন ছিল না, তাহলে কেন এবং কোন যুক্তিতে এই আন্দোলনকারীদের উপর হামলা ও মামলা হলো ? গণতন্ত্রের দেশে এ প্রশ্ন করা এবং এর উত্তর চাওয়া নিশ্চয় অযৌক্তিক নয়। অপরাধের শাস্তি এবং ভাল কাজের পুরস্কার না থাকলে যেখানে ভাল চিন্তা ও কাজের মানুষ সৃষ্টি হবে না। পাকিস্তান আমলেও শুধু নকল করার অপরাধে ছাত্র সংগঠনের অনেক কর্মীকে ঐ ছাত্র সংগঠন থেকে বাহিস্কার করা হয়েছে, আর আজ, ছাত্র সংগঠনের ধর্ষনকারী চাঁদা আদায়কারী খুনিদের সংগঠনের বড় পদে বসানো হয়।

 ছাত্র অধিকার নিয়ে সাধারণ ছাত্র ছাত্রীদের ব্যানারে আন্দোলন সংগ্রাম হতে দেখা যাচ্ছে। পাকিস্তান আমলেও যা ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে হতে দেখা যেত। বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলিও যেন সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারছে না। ছাত্র সংগঠনগুলিকে ছাত্রদের দাবি- দাওয়াকে নিয়ে মাঠে ময়দানে যেভাবে থাকার কথা সেটি আগের মত যাচ্ছে না। ছাত্ররাজনীতির এই দুর্বলতা না কাটালে অধিকার আদায়ের আন্দোলন বেগবান হবে না। কারণ দীর্ঘ মেয়াদী আন্দোলন ছাড়া পূঁজিবাদী ভোগবাদী এবং ক্ষমতালোভী শাসকদের নিকট থেকে ছাত্র সমাজ  ও জনতার দাবী আদায় করা সম্ভব নয়। বিষয়টি ছাত্র নেতৃত্বকে ভেবে দেখতে হবে। ছাত্ররাজনীতি স্বচ্ছ না হলে জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্বের ঘাটতি মিটবে না। 

১৯৭২  সালে ছাত্রলীগে বিভক্তি, জাসদ গঠন, জাসদ ও আওয়ামী লীগরে  মুখোমুখি সংঘাতময় অবস্থান এবং ১৯৭২ সালে ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধান এর নেতৃত্বে হাজী মোহাম্মদ মোহসীন হলে ছাত্রলীগের অপর  অংশের ৭ জন ছাত্রের হত্যাকান্ড, ছাত্ররাজনীতির স্বাভাবিক ও ইতিবাচক গতিপ্রবাহে আঘাত হানে। ১৯৭৫ সালের পর সামরিক বাহিনীর লোকজন ক্ষমতা দখল, এবং ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য ছাত্রসংগঠনকে  ব্যবহার শুরু করলে ছাত্র আন্দোলনের পূর্বের ইতিবাচক ধারাটি বিলুপ্তির পথে ধাবিত হয়। ফলে সংগঠনগুলিতে নিয়মিত  সম্মেলন না হওয়া, অছাত্র ও সন্ত্রাসীরা বৃহৎ ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বে আসার সুযোগ পায়।

 ছাত্র নেতৃত্বের বিপথগামী এই ধারাটি - বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের ছাত্র সংগঠনই ছাত্র রাজনীতির বিপথগামিতার জন্ম দিয়েছে। ইতিহাসই তার স্বাক্ষী। সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠন সরকারকে পাহারা দেয়াই তাদরে ধ্যান ও জ্ঞান বলে মনে কর। দল ক্ষমতাসীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্র সমাজের সব অধিকার পূরণ হয়ে যায় এমন হাব-ভাব তাদের। ছাত্র সমাজের সব ধরনের আন্দোলন সংগ্রামকে দমন করতে পুলিশি ভূমকিায় অবর্তীণ হয় সরকার সর্মথতি ছাত্র সংগঠন।এই কালচাররে পরর্বিতন না করলে ছাত্র আন্দোলনের ইতিবাচক ধারা রক্ষা পাবে না। ভোগবাদ, পূঁজিবাদ আর লুটেরাদের হাত থেকে রাজনীতিকে রক্ষা না করলে ছাত্র রাজনীতি রাহুমুক্ত হবে না। গণমানুষের মুক্তির আন্দোলন বেগবান করতে ছাত্ররাজণীতি ও ছাত্র আন্দোলনের বিকল্প নেই।

 লেখক :  অধ্যক্ষ,সাংগঠনকি সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ -বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি।