• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর, ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬
প্রকাশিত: নভেম্বর ৬, ২০১৯, ০৭:৪৭ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ৬, ২০১৯, ০৭:৪৭ পিএম

 বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসিরা এমন কেন হয় ?

 দীপংকর গৌতম
 বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসিরা এমন কেন হয় ?

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দেশের প্রধানতম বিশ্ববিদ্যালযের একটি। সাভারে কাছে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। আন্দোলনে অগ্নিগর্ভা এ বিশ্ববিদ্যালয়টি আমাদের অনেকের স্মৃতির সাথে যুক্ত। আমি এখানে না পড়লেও এখানের আন্দোলন সংগ্রাম-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কারনে বার বার গিয়েছি। ওখান থেকে খবর পেলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোড়ে শাহবাগে দাঁড়িয়ে জাহাঙ্গীরনগরের গাড়িতে ঝুলতে ঝুলতে মাত্র ৫০ পয়সা দিয়ে গিয়েছি জাহাঙ্গীরনগর।

 যেসব বন্ধুদের ডাকে যেতাম তারা অনেকেই এখনশিক্ষক।অনেকে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে। একসময় শিক্ষক , কবি শামীম রেজার নেতৃত্বে ‘জলপাইতলার আড্ডা’ নামে একটা লিটলম্যাগ করার কথা ছিলো। পরে যেকোন কারনে করা হয়ে ওঠেনি। সালাম-বরকত হল, কামালুদ্দীন হলে বেশি থেকেছি। আলবেরুনীএক্সটেনশনে আড্ডা দিয়েছি বেশি। তবে ক্যাফেটেরিয়া ,মুক্তমঞ্চ, ডেইরি গেট, পরিবহন,বটতলার মোড়ের খাবার খুব টানে তবে সবই এখন স্মৃতি অনেক। দেয়াল খুঁজলে আমার আঁকা চিত্রের ছাপ এখনও হয়তো পাওয়া যেতে পারে।তাই টানটাও অনেক বেশি। 

ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ে২০০২ সালে ভিসি আনোয়ার উল্লাহর অপসারনের দাবিতে আমরা দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলাম। বিডি আর নিয়োগ করা হয়েছিলো আমাদের দমাতে। না পারে নি। ভিসি আ্নোয়ারউল্লাহ দলদাস ছিলেন। বিএনপি জামাত জোটের আজ্ঞাবহ। রাতে শামসুন্নাহার হলে পুলিশ ঢুকিয়ে ছাত্রীদের লঠিপেটা করেছিলেন। আর ছাত্রদলের মেয়েরা তার সাথে সহযোগীর কাজ করেছিলো। আমরা এঘটনা শোনার পর তীব্র বেগে ফেটে পড়েছিলাম। কার্টুন কর্মশালা থেকে প্রতিবাদী গানের অনুষ্ঠান নিয়মিত ছিলো। একটা ছড়াপত্র একাই বের করে বিক্রি করতাম আমি। সে টাকায় আন্দোলনের খরচের অনেক যোগান দিতাম। 

আমার সহযোগী ছিলো উদীচীর ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক মামুন। সেসব দিনে জাহাঙ্গীরনগরের বন্ধুরা আমাদের সাথে একাত্ম ঘোষনা করতে এসেছিলো। এভাবে আমরা আন্দেলনের মাধ্যমে ভিসিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিলাম। কিন্তু দুঃখজনক হলো ভিসি পদত্যাগ করলেও মেয়েদের হলে পুলিশ ঢোকানোর কারনে তার কোন বিচার হয়নি। ভিসির লেলিয়ে দেয়া কোন ক্যাডারের বিচার হয়নি। বরং সেদিনের ছাত্রদলের ক্যাডার রতন এখন চারুকলার শিক্ষক। 

আমাকে ছাত্রদলের যে ক্যাডাররা রাজু ভাস্কর্যে মাহমুদুজ্জমান বাবু গান গাওয়ার সময় তুলে নিতে চেয়েছিল পরে তাদের  ছাত্রলীগের হয়ে ঘুরতেদেখেছি। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্যের মতো ব্যক্তি যখন কোন ছাত্র সংগঠনের কথায় চলে , তাদের ক্যাডারদের ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তাদের পারিতোষিক দেন,সেই গন্ধে সেখানে হাঙ্গর ছুটে যায়-তা নিয়ে তিনি দেন -দরবার করেন, স্বামী-ছেলেকেব্যবহার করতে যার লজ্জা করে না তাকে ছাত্ররা সম্মান করবে কিভাবে? এসব প্রশ্ন যখন ওঠে তখন আমাদের বলার কিছুই থাকে না ।
২.
প্রাচীন ভারতের পন্ডিত চানক্য বলেছেন, দুর্বলের বল রাজা, শিশুর বল কান্না, মূর্খের বল নীরবতা, চোরের মিথ্যাই বল। চানক্যের কথা সামনে রেখেই বলছি আমাদের দেশের পন্ডিতদের কথা একজন উপাচার্য হবেন এমন একজন যিনি সব ধরনের আলোচনার  উর্ধে থাকবেন।আমরা একজন শীল ভদ্রের নাম জানি। তিনি প্রাচীন ভারতে বর্তমান বিহার প্রদেশে অবস্থিত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান আচার্য বা চ্যান্সেলরের পদে শীলভদ্র ২০ বছরের বেশি দায়িত্ব পালন করেছেন।

 বর্তমান কুমিল্লা জেলার অধিবাসী বিশ্ববিশ্রুত এই পণ্ডিত চান্দিনাথানার কৈলান গ্রামে ৫২৯ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ ৬৫৪ খ্রিস্টাব্দে। মহাস্থবির শীলভদ্র গুপ্ত শাসন যুগের মানুষ এবং বৌদ্ধজগতের মহাপণ্ডিত। ভারতবর্ষের মহাপন্ডিতদের তালিকায় তিনি বিশেষভাবে সম্মানিত। সেই বিশ্ববিদ্যারয়ের উপাচার্য হয়েছিলেন নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আরসি মজুমদার বা রমেশ চন্দ্র মজুমদার এখনও সবার প্রনম্য। 

এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আহমদ শরীফ, সিরাজুল ইসলাম স্যার, আবুল কাশেম ফজলুল হক, হুমায়ুন আজাদ বা জাহাঙ্গীরনগরের নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সেলিম আল দীন,আবসার আহমেদ,আনু মোহাম্মদ,খালেদ হোসেনসহ অনেকশিক্ষক আছেন যারা প্রনম্য। কিন্তু যখোন খেকেই শিক্ষকরা দলদাসবৃত্তি শুরু করলো তকন থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান আর থাকলো না। প্রশ্ন হলো যেসব শিক্ষকরা দলদাসবৃত্তি করেন তাদের কি এসব না করলেই নয়।

 যেসব ছাত্ররা তাদের আরেক ভাইকে কুপিয়ে টিয়ে মারেতাদের কি এসব না করলেই নয়? এসব করে ছাত্রলগের যেসব ছাত্র নেতারা শাস্তি পেলেন অপদস্ত হলেন তাদের সম্মানে কি মোটেওলাগেনি? আর এর থেকে শিক্ষা নিলো কি কেউ? নিলে বুয়েট হত্যাকান্ড কিভাবে হয়? কেন সরকারের নির্দেশে পদত্যাগ করতে হয় ভিসিদের?মান সম্মান তলানিতে না ঠেকিয়ে কেউ পদত্যাগ করতে পারেন না?ঢাকার কাছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে চাঁদাবাজির অভিযোগে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সহযোগি ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন আসার পর প্রকল্পটি আলোচনায় আসে। 

এই প্রকল্পকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রে পরিবর্তন আসে শুধু তাই না ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিকে ভিসি চাঁদা দিয়েছেন টেলিফোন সংলাপ ভাইরাল হয়ে যায় । তারপরে আর কি বলার থাকে। সাধারন মানুষের ধারনা ছিলো এরপরে ভিসি পরিবর্তন হবেই। কিন্তু হননি। পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামকে অপসারণের দাবিতে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে আন্দোলন করছিলো শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীরা। 

আান্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় সাংবাদিকসহ অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার (৫ নভেম্বর) বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে আন্দোলনকারীদের অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে এ হামলার ঘটনা ঘটে।এ সময় ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে আন্দোলনকারীরা। পরে দুপুর ১টার দিকে উপাচার্য তার বাসভবন  থেকে  বের হয়ে কার্যালয়ে যান।  হামলার বিষয়ে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারের মুখপাত্র  লেখক, অধ্যাপক রায়হান রাইন বলেন, ‘আমদের পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে তার বাসভবনেরসামনে অবস্থান করছিলাম। অবস্থানের এক পর্যায়ে উপাচার্যপন্থী শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা এসে আমাদের উঠিয়ে দিতে চায়।

 কিন্তু উঠাতে না পেরে ছাত্রলীগ দিয়ে আমাদের ওপর হামলা করেছে। ছাত্রলীগ আমাদের কয়েকজন শিক্ষকদের উপরও নির্মম নির্যাতন চালায়।তারা সাংবাদিকদেরও ছাড়  দেয়নি।’ এরপর জরুরি এক সিন্ডিকেট সভার আয়োজন করা হয়। পরে সেই সভার অনির্দিষ্টকালের মতো বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সিন্ধান্ত  নেন সিন্ডিকেট সদস্যরা। 
 ৩.

ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দিয়ে মারধরের ঘটনার আধঘণ্টা পর উপাচার্যপন্থি শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও পুলিশের কড়া পাহারায় উপাচার্য তার বাসভবন থেকে বেরিয়ে কার্যালয়ে এসেছেন। দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনিক ভবনের সম্মেলনকক্ষে সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দেওয়াকে তিনি ‘গণঅভ্যুত্থান’ আখ্যা দিয়ে বলেন, সহকর্মী শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষার্থী, বিশেষ করে ছাত্রলীগের কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ কারণ তারা দায়িত্ব নিয়ে এ কাজটি করেছে।

 ভিসির একবারও মনে হয়নি যারা মার খাচ্ছে তার লেলিঢে দেয়া ক্যাডারদের হতে তারিাও তার সন্তানতুল্য-ছাত্র। একটা নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তারা আন্দোলন করছে। তার আগেও ছাত্রদের অনেক আন্দোলন হয়েছে। কোন ভিসি আন্দোলনের মাস্তান,ক্যাডার ব্যবহার করে টেকেননি। বরং জাবি ভিসি এমনসব নজির স্থাপন করছেন যা ইতিহাস হবে।যদিও উপাচার্য ফারজানা ইসলাম নিজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ফিরোজ উল হাসান বলেছেন এবারের আন্দোলনে জামায়াত শিবিরেরতৎপরতা দেখতে পেয়েছেন তারা।

মিস্টার হাসান মঙ্গলবার বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, 'জামাত শিবির বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্দোলনের নামে অস্থিতিশীল করছে। আরও অপ্রীতিকর ঘটনার আশংকায় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়েছে"।ওইদিন ক্যাম্পাসে ব্রিফিং এ ভিসি দাবি করেন তার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনকারীদের পেছনে আছে জামায়াত শিবির। কয়েক দশক ধরে  যারা সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন ,ছাত্র থাকাকালে ও পরবর্তীতে শিক্ষক হয়ে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন এই ভিসি তার সেসব দেশবরেণ্য সহকর্মীদের জামায়াত-শিবির বলে আখ্যা দিচ্ছেন। তারা এখন দুর্নীতির কারণে ভিসির পদত্যাগ চাইছেন বলে"।

আনুমুহাম্মদ, মীর্জা তাসলিম সুলতানা, রায়হান রাইন, সাইদ ফেরদৌস ছাত্র জীবন থেকে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবার পরিচিতি স্বমহিমায় খ্যাত। সময়ের কি অদ্ভুত খেল আজ এসব বরেণ্য শিক্ষক করছেন। এই প্রকল্পটি যখন পাশ হয়, তখন একে 'অস্বচ্ছ' দাবি করে আন্দোলন-প্রতিবাদও করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়টির একদল শিক্ষক। এসব  দলদাস ভিসিদের জ্ঞাতসারে বিশ্বদ্যিালয়ের হলে ছাত্ররা টর্চার সেল বানিয়েছে। আর ভিসিরা বানাচ্ছে কারাগার। এভাবে ক্ষমতা ধরে রাখা যায় না।

 তাই এত জল ঘোলা না করে সুস্থভাবে পদত্যাগ করলে সম্মান ক্ষুন্ন হতো না। কিন্তু ভিসি কি সারা জীবন থাকা যাবে? তা্হলে এত অঘটন ঘটানো কেন? বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে বা মাস্তান লেলিয়ে নতুন কোন ইতিহাস গড়া সম্ভব নয। তাতে পরিস্থিতি বরং খারাপ হবে ভিসি মহোদয় কি বিষয়টি নিয়ে আরেকবার ভাববেন না সরকারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক অন্যান্য ভিসিদের মতোই থাকবেন।তারপর নিলজ্জের মতো বিদায়- এদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে ছাত্ররা চাঁদাবাজ,মাদক সেবন করবে নাতো মধু খাবে?

লেখক: সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী