• ঢাকা
  • বুধবার, ০১ এপ্রিল, ২০২০, ১৮ চৈত্র ১৪২৬
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৮, ২০২০, ০৬:৪২ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জানুয়ারি ২৮, ২০২০, ০৬:৪২ পিএম

পাথর সময়ের গান

মো. মোজাহিদুল ইসলাম নয়ন 
পাথর সময়ের গান

এক জীবনে যতটুকু দেখা তারও কালপর্ব থাকে, থাকে উত্থান-পতন। ব্যক্তি সে সবের তুলনামূলক বিচারে সময়, সমাজ আর সভ্যতার গুনগত বিশ্লেষণ দাঁড় করায়। এরকম ব্যক্তিক মূল্যায়নে আঁকা হয় পরিবর্তনের ক্যানভাস। যাতে ওড়ে বর্ণিল পাখি, বাহারি ফুল, নিস্পাপ সম্পর্ক আবার পরশ্রীকাতরতা, মানুষ হয়ে মানুষকে খুনের মতো বিভৎসতাও। এভাবে আরও হাজারটা মানুষের মূল্যায়ন যদি হাজির করা যায় তাতেও দেখা যাবে কমবেশী একই কলা-কুশলীর যতো কায় কারবার। কিন্তু ব্যক্তিক দৈর্ঘ্যে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেলেও বিবর্তন দেখতে হলে ইতিহাসের দিকেই তাকাতে হয় কারন ইতিহাসের মহাকালে তৈরি হয় মানবেতিহাসের বিবর্তন। সেখানে পাওয়া যায় মানুষের আদিমাবস্থা, সংগ্রামের সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমা, নব নব আবিস্কার আর ব্যর্থতার রেখাচিত্র। পাওয়া যাায় মানুষ হয়ে মানুষের বুকে ছুরি চালানোর নির্মমতা, দুর্বলের উপর সবলের পৈশাচিক শোষণ, অন্যের দেশ ও সম্পদ দখল, সবাইকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবার অপ্রিয় সব কাহিনী। আছে বিজয়গাঁথা, সভ্যতার কল্যাণে ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা আরও কতো কিছু!

সভ্যতার এ বিবর্তন ধারায় থরে থরে সাজানো যতো ঘটনা সেখানে গরিষ্ঠ সংখ্যায় রয়েছে অধর্ম, অন্ধত্বের বশে তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা আর রাজনীতির ধর্মীয় করনে সৃষ্ট যুদ্ধ-বিগ্রহের সালতামামি। ইতিহাসের হাজার বছরের দীর্ঘ যাত্রাপথ তাই ধর্মান্ধতা আর তজ্জনিত উন্মাদনার ধোঁয়ায় ঢাকা। মানুষের অনেক সৃজনশীল আবিস্কার সভ্যতায় যুগান্তর আনলেও তথাকথিত ভেদবুদ্ধি শোষণের নতুন নতুন ভিত্তিভূমি তৈরি করেছে। আজ শুধু একটি-দুটি দেশেই নয়- সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় উগ্রবাদ, জাতের নামে বজ্জাতি এমন রূপ পরিগ্রহ করেছে যে তা দেশ-মহাদেশের সীমানা পেড়িয়ে বৈশ্বিক দানবে পরিনত হয়েছে। এ অন্ধত্ববাদ আর পশ্চাৎপদতা বিশ্বের জন্য অগ্রাধিকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডাকে ম্লান করে দিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে সুদান, ব্রাজিল থেকে ভারত, চীন থেকে মিয়ানমার, পাকিস্তান থেকে ইরান, লিবিয়া থেকে সিরিয়া, ইয়েমেন থেকে শ্রীলংকা, সমগ্র দক্ষিন এশিয়া পূর্ব আফ্রিকা সবখানেই চলছে উগ্রবাদ বসিয়েছে তার ভয়ানক থাবা। মানুষের মুখ আজ ঢেকে দিচ্ছে উগ্রবাদী ষণ্ডাদের বিশাল বিশাল বপু।

ধর্মীয় উগ্রবাদ, সাম্প্রদায়িকতা আর পুঁজিবাদ হাত ধরাধরি করে যে অসুরশক্তি তৈরি করেছে সেটাই আজ এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছে যতো মূল্যবোধ। মানুষকে তুচ্ছ করার, নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানের তথাকথিক অপচেষ্টা ভেঙ্গে ফেলছে মানবতার পাঁচিল। মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস হারিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে প্রতিজন হয়ে পড়ছে ভীষণ একা। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা থেকে উৎগত সামাজিক অস্থিরতা আর তার থেকে রাজনীতি মাঠও তাঁতিয়ে উঠছে মূহুর্মূহু। মানুষ আজ দ্বিগি¦দিক শূণ্য হয়ে শুধু অজানায় ছুটছে আর ছুটছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ যেসব দেশে অসম যুদ্ধ আর অস্থিতিশীলতা চলছে তাতে বিপুল সংখ্যক মানুষ উদ্বাস্তুু জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকে বাঁচতে মানুষ তারস্বরে ছুটেছে একটুখানি শান্তির আশায়। ভুক্তভোগী প্রত্যেকেই নির্মম সব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে এবং যাচ্ছে। তাদের প্রায় সবার ক্ষেত্রেই স্ব-স্ব ধর্মীয় পরিচয়ই কাল হয়েছে। তথাকথিত উন্নত দেশগুলো পলিয়ে আসা মানুষগুলোকে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করছে না, তারা শেষ বিচারে তাদেরকে ধর্মের ভিত্তিতেই বিচার করছে। জার্মানী, ফ্রান্স, ইতালী, গ্রীস, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড তথা ইউরোপীয় ইউনিয়নভূক্ত দেশগুলো যে মানবতার মায়াকান্না করছে সেটা অনেকটাই লোক দেখানো, কারন তারাই তো অনেকাংশে বা সম্পূর্ণইভাবে ওইসব যুদ্ধের নেপথ্য কারিগর! 

রাজনীতির স্বার্থে ধর্মের উগ্রবাদী আচরণকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া এবং ধর্মের স্পর্ষকাতরতার দোহাই দিয়ে যারা আজ ক্ষমতা আর দখলের নেশায় বুঁদ হয়ে আছেন তারা নিশ্চয়ই ধুরন্ধর। এ সকল অপশক্তি সফলতার সাধারণ সংজ্ঞায় হয়তো সফলকামও হচ্ছে, কিন্তু বিশ্বমানবতা তথা পৃথিবীর সুস্বাস্থ্যের জন্য তা কত ভয়াবহ পরিনতি ডেকে আনছে সেটা কী অনুমান করছি আমরা? অনুমান করিছ না বলে রাজনীতির আগাছা, তথাকথিত ধর্মের ধ্বজাধারী আর এই অচলায়তনের সুবিধাভোগীরাই আজ গরিষ্ঠ হচ্ছে। দিনে দিনে প্রসারিত হচ্ছে তাদের হাতও। সংখ্যাধিক্যের সুবিধা আর ক্ষমতার প্রিভিলেজ নিয়ে যে বেসামাল খেলা চারিদিকে চলছে সেটাই আপাতত নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে বিশ্বের বেশীর ভাগ মানুষ। এ এক নির্মম বাস্তবতা, পাথর সময়। 

অল্প কিছু মানুষ যাঁরা বিবেকের দ্বারা চালিত হয়, মানবতার জন্য যাঁদের হাহাকার আছে তাঁরাই শুধু ক্ষীণস্বরে গেয়ে যাচ্ছে মানবতার গান। আপাতত এমন গানের দর্শক, পৃষ্ঠপোষক এবং সমর্থক খুব একটা নেই। কিন্তু এই সামান্য সংখ্যা আর গানই আমাদের বাঁচার আশা। তাই আসুন, এই পাথর সময়ে জারি রাখি সেই গান।

লেখক : অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন সন্ধানী