• ঢাকা
  • বুধবার, ০১ এপ্রিল, ২০২০, ১৮ চৈত্র ১৪২৬
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২, ২০২০, ০৩:৩৯ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারি ২, ২০২০, ০৩:৩৯ পিএম

বন্ধু তুমি শত্রু তুমি

তাপস কুমার দত্ত
বন্ধু তুমি শত্রু তুমি

অশান্ত এই বিশ্বে বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনাকেই মনে করা হয় সবচাইতে বড়ো অস্ত্র। আর এসব আলোচনার শুরুতে এবং শেষে একটি আন্তরিক হ্যান্ডশেকের গুরুত্ব সীমাহীন। সেই ক্ষেত্রে হ্যান্ডশেকও একটি অস্ত্র বটে। স্নায়ুবিজ্ঞান বলে, নিউরোকেমিক্যাল স্তরে একটি ভালো হ্যান্ডশেক নাকি মস্তিষ্ক থেকে অক্সিটোসিন হরমোন নিঃসৃত করে, জন্ম দেয় সম্পর্কের উষ্ণতার। এজন্যই হয়তো উত্তর কোরিয়ার কিমের সঙ্গে সাক্ষাতের আগে ট্রাম্প বলেছিলেন তিনি কিমের সঙ্গে একটি উষ্ণ হ্যান্ডশেকের অপেক্ষায় রয়েছেন।

হাতে হাত মেলানোর মাধ্যমে যেন বোঝানো হয়, আমি দূরের কেউ নই, আমি ধরাছোঁয়ার বাইরের কেউ নই। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়—আমি তোমাদেরই লোক। অন্তত বন্ধুত্বের অলিখিত আহ্বান থাকে হাত মেলানোর মধ্যে। কিন্তু এই হাত মেলানোটাকে এক লাইনে বলা যায়, ‘বন্ধু তুমি শত্রু তুমি’ গানের মতো। চিকিৎসাবিজ্ঞান অন্তত স্পষ্ট করে বলছে—বন্ধুত্ব নয়, হাত মেলানোটা আসলে শত্রুত্বের পরিচয়। কারণ, পরস্পরের হাত মেলানোর মাধ্যমে তারা দুজন বরং পরস্পরের শত-সহস্র জীবাণু শেয়ার করে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডোর একটি গবেষণা বলছে, একজন মানুষ সারা জীবনে গড়ে ১৫ হাজার বার হ্যান্ডশেক করে থাকেন। অন্যদিকে আমরা প্রায় ১৫০ প্রজাতির ক্ষতিকর সোয়া ৩ হাজার জীবাণু বহন করি আমাদের হাতের তালুতে। আর হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে সেই জীবাণুগুলো শেয়ার করি অপরের সঙ্গে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টা ভয়ানক অস্বাস্থ্যকর। কিন্তু হাত না মেলানোর বিকল্প কী? কেউ যদি হাত মেলাতে না চায়, তাহলে তার মতো অভদ্র এবং অপমানজনক ব্যাপার আর কী আছে? দুই জন অপরিচিতর প্রথম সাক্ষাতের সময় পরস্পরের হাতে হাত মেলানোটা নাকি বলে দেয় তারা পরস্পরকে কোন দৃষ্টিতে দেখেন। এমনকি চাকরির ক্ষেত্রে বুদ্ধিমান নিয়োগকর্তারা নাকি হ্যান্ডশেকের ধরন দেখেও অনেক কিছু ধরে ফেলেন। চাকরির ইন্টারভিউতে কীভাবে হ্যান্ডশেক করতে হবে, সেটা নিয়েও ইন্টারনেটে বিবিধ টিপ্স পাওয়া যায়। সেখানে বলা আছে, হ্যান্ডশেকের সময় খুব বেশি শক্ত করে হাত ধরা যাবে না। তাতে মনে হবে আপনি অন্যের ওপর জোর খাটাতে চান। অর্থাৎ ব্যক্তি হিসেবে আপনি আক্রমণাত্মক ও কর্তৃত্ববাদী। আবার খুব বেশি নরম করেও হ্যান্ডশেক নয়, তাতে নাকি মনে হবে আপনার মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব রয়েছে। এজন্য চাকরিপ্রার্থীকে পরামর্শ দেওয়া হয় তার বন্ধুদের সঙ্গে করমর্দন করার অনুশীলন করতে। কিন্তু সেই অনুশীলন যদি ‘মিস্টার বিনের’ মতো হয়, তাহলে সেটা ভয়ংকর হবে নিঃসন্দেহে। আবার হ্যান্ডশেকেরও নাকি রকমফের রয়েছে। আর এসব রকমফেরই নাকি বলে দেবে আপনার উলটো দিকের মানুষটি আপনাকে নিয়ে কী ভাবছেন। যেমন—হ্যান্ডশেক করার সময় যদি হাতের তালু ঘামে ভিজে থাকে, তাহলে বুঝবেন সামনের মানুষটি রীতিমতো ভয় পেয়ে আছেন। আবার যার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করছেন, তার হাত যদি খুব ঠান্ডা থাকে তাহলে বুঝবেন, মানুষটি আপনার সঙ্গে আলাপে খুব একটা আগ্রহী নন। ঠান্ডা হাতে যারা হ্যান্ডশেক করেন, তারা খুব একটা মিশুকে হন না, নিজেকে নিয়েই থাকতে ভালোবাসেন। অন্যদিকে খুব আগ্রহ নিয়ে জোরে জোরে বারবার হাত ঝাঁকিয়ে এবং খুব জোরে চাপ দিয়ে যারা হাত মেলান, তাদের সব সময় বিশ্বাস না করাই ভালো। হতে পারে তিনি মানুষটিই এরকম। আবার এটাও হতে পারে তিনি অতিরিক্ত আগ্রহ দেখিয়ে আসলে কিছু আড়াল করার চেষ্টা করছেন। এক হাত দিয়ে হাত মিলিয়ে অন্যহাতটি সেই হাতের ওপরে রেখেও অনেকে হ্যান্ডশেক করেন। কারোর প্রতি বেশি মনোযোগ ও ভালোবাসা বোঝাতেই এভাবে হ্যান্ডশেক করা হয়ে থাকে। তবে এসব টিপস হলো রাশিচক্রের মতো, যার কোনো বাস্তবিক ভিত্তি নেই। কারণ মানুষ বড়ো বিচিত্র জীব। মানুষের মনস্তত্ত্বও তাই মহাবিশ্বের মতোই জটিল।

তবে হাত মেলানোটা যে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর এবং সেটার একটা মুভমেন্ট হওয়া প্রয়োজন, এটা মনে করছেন অনেক স্বাস্থ্য-গবেষক। তবে অ্যান্টি-হ্যান্ডশেক মুভমেন্ট তো চাট্টিখানি কথা নয়। কারণ হাত মেলানোর বিশ্বসংস্কৃতি অনেক প্রাচীন। প্রায় দুই হাজার বছর আগে গ্রিসে প্রথম চালু হয় হাতে হাত মেলানোর সংস্কৃতি। তার সুফলের কথা তো আগেই বলা হয়েছে। হাত মেলানোর পালটা হিসেবে সেই প্রাচীন গ্রিসে এটাও কথিত ছিল যে, হাতে হাত মেলানোটা আসলে ঈশ্বরের শাস্তি। আধুনিক বিজ্ঞান আণুবীক্ষণিক ভাবে বর্ণনা করতে পারে সেই শাস্তির কথা। সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সব সময়ই হাত দিয়ে মুখ কিংবা নাক চেপে ধরেন। সেখানকার জীবাণু সব হাতে চলে আসে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এমন ব্যক্তির সঙ্গে হাত মেলানোর মধ্যে বিপদ আছে ষোলো আনা। পরিসংখ্যান বলছে বেশিরভাগ মানুষেরই এ বিষয়ে কোনো জ্ঞান নেই। তাই তো সৌজন্যতা বজায় রাখতে গিয়ে ক্ষতিকর সব জীবাণুকে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে আসেন নিজের শরীরে। আর জীবাণুরাও তখন ছড়িয়ে পড়তে থাকে মহা আনন্দে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক রিপোর্ট অনুসারে তৃতীয় বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষই ঠিকমতো হাত ধোয় না বা ধুতে জানে না। যে কারণে প্রতি বছর এসব দেশে পেটব্যথা, ডায়ারিয়া, সর্দিজ্বরের মতো রোগ বেশি দেখা যায়। এমনকি টাইফয়েড, এনটেরিক ফিবারসহ একাধিক রোগে আক্রান্তের সংখ্যাও অনেক। আর এসব জীবাণু হ্যান্ডশেকের মাধ্যমেই এক শরীর থেকে অন্য শরীরে ছড়িয়ে থাকে। এ কথা এখন নি¤œমাধ্যমিকের বিজ্ঞান বইতেও আছে যে, ঠিকমতো হাত না ধুলে খুব সহজেই জীবাণুদের স্বর্গরাজয় হয়ে ওঠে হাতের তালু। নাগরিক জীবনে পাবলিক টান্সপোর্টের সিটে-হাতলে বারো রকম মানুষের বারো শ রকমের জীবাণু থাকে। আর সেসব জীবাণু চলে আসে হাতের তালুতে। কিন্তু কজন আর বাড়িতে ফিরে ভালো করে সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করেন! এই আধুনিক যুগে আমরা সারাক্ষণই মোবাইল ফোন ব্যবহার করে থাকি। মোবাইল ফোনের স্ক্রিনেও রয়েছে ভয়াবহ সব জীবাণু। এসব জীবাণুও সহজেই চলে আসে হাতের তালুতে, আর হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয় অন্যের হাতে।

এ মুহূর্তে বিশ্ব তোলপাড় করে তুলেছে চীনের করোনাভাইরাস। গতকাল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্ব জুড়ে জারি করেছে জরুরি অবস্থা। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চীনে করোনায় মারা গেছেন ২১৩ জন। আক্রান্তের সংখ্যা ৯ হাজার ৬৯২। চীন ছাড়াও ১৮টি দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে। আর এসবের পরিপ্রেক্ষিতে সতর্কতা হিসেবে বলা হচ্ছে, হ্যান্ডশেক নৈব নৈব চ। হ্যান্ডশেক দূরের কথা, অন্যের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে কথা বলুন। কারণ, করোনার জীবাণু কারো মধ্যে প্রবেশ করলে সেটা রোগে প্রকাশ হতে সময় নেয় দুই থেকে ১৪ দিন। কিন্তু এই সময়ের মধ্যেই ঐ করোনা-বাহক অন্যদের মধ্যে দেদারসে ছড়িয়ে দিতে পারে আরো আরো করোনাভাইরাস। সুতরাং ঘরটা অন্ধকার। আর সাপটা কোথায় আছে কেউ জানে না। এক্ষেত্রে সাপটা মানস জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে সারা ঘরে। ২০০২-২০০৩ সালে সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম বা সার্সের সংক্রমণে বিশ্ব জুড়ে প্রায় ৮০০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। তার পেছনেও ছিল করোনাভাইরাস। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এই নতুন সংস্করণ সেই সাবেক করোনাভাইরাসেরই জ্ঞাতি। জানা গেছে, নতুন এই করোনাভাইরাসে মৃত্যুহার ৩-৪ শতাংশ। এই মৃত্যুহার অবশ্য সার্স (১০%) এবং মার্সের (৩৬%) তুলনায় অনেক কম। অন্তত এখন পর্যন্ত।

লেখাটি এতখানি পড়ার পর নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে, হ্যান্ডশেক আসলে অন্যের শরীরের জীবাণুদের আমন্ত্রণ জানানোর ফাঁদ মাত্র। তাহলে হ্যান্ডশেকের বিকল্প কী? এই অশান্ত সময়ে মানুষে মানুষে দূরত্ব কি আরো বাড়িয়ে দেবে না অ্যান্টি-হ্যান্ডশেক মুভমেন্ট? বিশ্বশান্তি থেকে শুরু করে বন্ধুত্বের উষ্ণতা প্রকাশে হ্যান্ডশেকের গুরুত্ব তো অস্বীকার করার উপায় নেই। এক্ষেত্রে ভালো উদাহরণ তৈরি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। স্ত্রী মিশেলের সঙ্গে তিনি ফিস্ট বাম্প জনপ্রিয় করতে চেষ্টা করেন। ফিস্ট (হাত মুঠো) করে পরস্পরের হাতের উলটো পিঠে আলতো টোকা দেওয়া যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এতে হাত মেলানোর মাধ্যমে ছড়ানো ৯০ শতাংশ জীবাণু আটকানো সম্ভব হবে। সুতরাং আজ থেকে আর হ্যান্ডশেক নয়, শুরু হয়ে যাক নতুন ফিস্ট বাম্প। 

এসকে

লেখক : সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার