• ঢাকা
  • বুধবার, ০১ এপ্রিল, ২০২০, ১৮ চৈত্র ১৪২৬
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২০, ০৪:৫৯ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারি ৯, ২০২০, ০৮:২৬ পিএম

চাঁপাইনবাবগঞ্জে শিক্ষার মানোন্নয়ন : কী হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছে

এ জেড এম নূরুল হক
চাঁপাইনবাবগঞ্জে শিক্ষার মানোন্নয়ন : কী হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছে

ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সুখী-সমৃদ্ধ দেশ নির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত সরকার যথাযথভাবেই উপলব্ধি করে যে, দরিদ্রতা, নিরক্ষরতা, পশ্চাতপদতা, সাম্প্রদায়িকতা ও দুর্নীতিমুক্ত এক উন্নত, সমৃদ্ধ, সুখী মর্যাদাশীল জাতি গড়তে শিক্ষার প্রসারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ কারণে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সীমিত সম্পদ থাকা সত্বেও ৩৭,১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। বর্তমান সরকার বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে নানামুখি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে :

২০০৯ সনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত সরকার ২০২১ সনের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত করতে রূপকল্প ২০২১ প্রণয়ন করে। রূপকল্প ২০২১ এ শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়। প্রণয়ন করা হয় জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০১০। সরকারের শিক্ষাবান্ধব কর্মসূচি ও প্রণোদনার ফলে জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় নির্ধারিত সর্বস্তরে শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। বিদ্যালয়ে ভর্তির হার বেড়েছে, কমেছে ঝরে পড়ার হার। বছরের শুরুতে নতুন বই প্রদান, উপবৃত্তিসহ শিক্ষার নানাবিধ সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের বিপুল যুবকশ্রেণিকে মানবসম্পদে পরিনত করা সম্ভব হয়েছে, যারা উন্নত জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করে দেশের অর্থনীতির চাকাকে বেগবান করছে।

জাতীয় পর্যায়ের ন্যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতেও সোনার মানুষ গড়তে শিক্ষা বিভাগ কাজ করছে যাচ্ছে। সরকারের সকল শিক্ষা কার্যক্রমকে অধিক কার্যকর করতে এবং শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে জেলা প্রশাসন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জেলা পর্যায়ের অন্যান্য সরকারি বিভাগ ও সুশীল সমাজের সহায়তায় প্রণিত হয়েছে ‘শিক্ষার মানোন্নয়ন: চাঁপাইনবাবগঞ্জ মডেল’। পাঁচ বছর মেয়াদি এ কর্মপরিকল্পনার মূখ্য উদ্দেশ্য হল এ জেলার শিক্ষার মানোন্নয়নে সময়ানুগ ও বাস্তবতা সমর্থিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা এবং সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থ ও স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকদের আর্থিক ও সাংগঠনিক সহায়তায় প্রনীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কার্ক্রক্রম গ্রহণ করা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ২০২০ সনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এ মডেলে ২০ টি কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসনের ঐকান্তিক স্বদিচ্ছা, পরিকল্পনা, ও সমন্বয়ে ২০১৯ সনে প্রণিত এ মডেলের কার্যক্রম শুরু হয়েছে পূর্ণোদ্দমে।
শিক্ষার মানোন্নয়ন: চাঁপাইনবাবগঞ্জ মডেল” এর প্রথম কর্মপরিকল্পনায় রয়েছে শিক্ষার্থীদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধকরণ। শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত করতে বছরে দুইবার আন্তঃশ্রেণি এবং আন্তঃবিদ্যালয় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিতর্ক, কুইজ প্রতিযোগিতা, রচনা প্রতিযোগিতা ইত্যাদির আয়োজন করার কথা এ কর্মপরিকল্পনায় বলা হয়েছে। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রচিত শিশুদের উপযোগি বইসমূহ পাঠদানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রতি মাসে চার ঘন্টা এসকল বিষয়ের উপর পাঠদানের আয়োজন চলছে । 

মাসিক কুইজ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সেরা শিক্ষার্থী নির্বাচন করে পুরস্কৃত করার কথা বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধকরণের জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ পরিদর্শন ও শিক্ষক শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আলোচনার আয়োজন করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসন বিশেষ উদ্যোগে প্রকাশিত শেখ মুজিব আমার পিতা, ফজিলাতুন্নেসা আমার মাতা, সাতই মার্চের ভাষণ, বঙ্গবন্ধুকে জানি, আমাদের ছোট রাসেল সোনা শীর্ষক লিফলেট ও বুকলেট শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে।

মডেলের দুই নম্বর পরিকল্পনায় রয়েছে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে মেন্টর নিয়োগ। মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের বাঁধাসমূহ চিহ্নিত করে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার লক্ষ্যে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে মেন্টর নিয়োগ করা হচ্ছে। তাঁরা সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়সমূহ নিয়মিত পরিদর্শন করে বিদ্যালয়ের সমস্যাসমূহ চিহ্নিত করছেন। বিদ্যালয়ের বিদ্যমান অসুবিধাসমূহ দূরীকরণে জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় সম্ভাব্য সমাধান প্রস্তাব আকারে উপস্থাপন করছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধকরণে তাঁর দপ্তরসহ সরকারের সকল দপ্তরের কার্যক্রম ও সাফল্য সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের অবহিত করছেন। প্রতিষ্ঠান প্রধানদের সাথে তিনি সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে তাঁদের সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা পালন করছেন।

শিক্ষকের ঘাটতি পূরণের জন্য স্থানীয়ভাবে অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের কথা বলা হয়েছে এ মডেলের তৃতীয় পরিকল্পনায়। যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের ঘাটতি  রয়েছে, সেগুলোর ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় বসবাসকারী শিক্ষিত বেকার/চাকুরিপ্রার্থীদের মধ্য থেকে সেখানে অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।ইতোমধ্যে ছয় জন বেকারকে অস্থায়ী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অস্থায়ীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পিটিআই চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও শিবগঞ্জের ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে।

 স্থানীয় আর্থিকভাবে স্বচ্ছল, বিদ্যানুরাগী ব্যক্তিদের অনুদান ও সহায়তায় এ সকল শিক্ষকদের বেতন ভাতাদির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এতে একদিকে শিক্ষকের ঘাটতি পূরণ হবে; অন্যদিকে আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষিত বেকারদের অস্থায়ী কর্মসংস্থান হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনয়নের কথা বলা হয়েছে এ মডেলের চতুর্থ কর্মপরিকল্পনায়। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা, ও জবাবদিহিতা আনয়নের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সকল আর্থিক লেনদেন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সম্পাদন করা হবে। খাতভিত্তিক ব্যাংক একাউন্ট খুলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেতন ও ফি প্রদান/গ্রহণসহ সকল লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলে সম্পন্ন করতে উৎসাহিত করার কথা বলে হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে বাস্তবায়নে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহকে অনুপ্রাণিত করা হচ্ছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদানের জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হচ্ছে।
মডেলের পাঁচ নম্বর কর্মপরিকল্পনায় শিক্ষকদের পেশাগত মানোন্নয়নে জোর দেয়া হয়েছে।

 শিক্ষকদের গুণগত মান উন্নয়নের জন্য সরকার যে সকল কর্মসুচি গ্রহণ করেছে, তার পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ইনহাউজ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। “সরকারি কর্মচারিদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ৬০ ঘন্টার প্রশিক্ষণ” এর আদলে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরণের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।ছয় নম্বর কর্মপরিকল্পনায় রয়েছে সমন্বিত রুটিন চালু করার বিষয়টি। এতে বলা হয়েছে মনিটরিং এর সুবিধার্থে জেলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য ধরণ অনুযায়ী একই রুটিন চালু করা হবে। সকল বিদ্যালয়ের পাঠদান একই সময়ে শুরু হবে এবং একই সাথে শেষ হবে। ২০২০ সনের মধ্যে জেলার শতকরা ষাট ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এ সমন্বিত রুটিনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য জেলা প্রশাসনের নিজস্ব তদারকিতে শিক্ষাবিদদের একটি দল কাজ করছে।

অতিথি বক্তার ব্যবস্থাকরণের জন্য পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ শিক্ষক ও এ জেলায় সরকারি কাজে সফররত কর্মকর্তাদের অতিথি বক্তা হিসেবে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হবে। দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজে অধ্যয়নরত এ জেলার স্থায়ী অধিবাসী শিক্ষার্থীদের দিয়ে সুবিধা মতো সময়ে বিশেষ উদ্বুদ্ধকরণ ক্লাসের ব্যবস্থা করা হবে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে জেলার মেধাবী প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের তালিকা প্রস্তুত করতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দেবেন্দ্র নাথ উঁরাও নেতৃত্বে একটি উপকমিটি কাজ শুরু করেছে।

 মডেলটির সপ্তম ভাগে বলা হয়েছে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবার থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া হ্রাসকল্পে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিত্তিক কমিটি গঠন করা হবে। দরিদ্র কৃষক, পরিবহণ ও নির্মাণ শ্রমিকসহ নিম্ন আয়ের মানুষদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে ভর্তি এবং ভর্তির পর ঝরে পড়া রোধের জন্য এককালীন বৃত্তি/আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে। বিদ্যালয়ে শতভাগ উপস্থিত শিক্ষার্থীদের বিশেষ আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হবে। চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি, বিভিন্ন ব্যবসায়ী সমিতি, সুশীলসমাজকে তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে শিক্ষাবৃত্তি প্রদানে উদ্বুদ্ধ করা হবে। অভিভাবকহীন শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতকরণে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে
জেলা প্রশাসনের এ কর্মপরিকল্পনায়। জেলায় বিদ্যালয় গমনোপযোগী অভিভাবকহীন শিশুদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তালিকাভুক্ত যেসব শিশু আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না, তাদের সরকারি শিশু পরিবারে আশ্রয় প্রদান করে লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।

স্থানীয় জনগণকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও শিক্ষার মানোন্নয়নে ভুমিকা রাখতে উদ্বুদ্ধকরণের জন্য জেলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রাক্তণ মেধাবী ছাত্র ও কৃতি শিক্ষকদের বিস্তারিত তথ্য নিয়ে আমার বিদ্যালয় ডাইরেক্টরি প্রকাশ করা হবে। শিক্ষার্থীদের সাহিত্যচর্চায় আগ্রহী করে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন জাতীয় দিবসে বিদ্যালয় ভিত্তিক দেয়ালিকা প্রকাশের ব্যবস্থা করা হবে। বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের নেটওয়ার্ক সৃষ্টির জন্য এবং বিদ্যালয়ের উন্নয়নের বিষয়ে তাঁদের ক্রমাগত দায়িত্বশীল রাখার জন্য বিদ্যালয় ভিত্তিক বাৎসরিক স্মরণিকা প্রকাশে উৎসাহিত করা হবে। এ কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যগত তথ্যাদি নিয়ে স্বাস্থ্যকার্ড চালু করা হবে।

 স্বাস্থ্যকার্ডে শিক্ষার্থীর রক্তের গ্রুপ, উচ্চতা, ওজন, চোখের দৃষ্টি, পুষ্টির মান ইত্যাদি তথ্য লিপিবদ্ধ করা হবে। ইতোমধ্যে হেলথ কার্ড প্রস্তুত ও বিতরণের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এতে বলা হয়েছে সিভিল সার্জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ কর্তৃক গঠিত চিকিৎসক দলসমূহপ্রতি বছর দুই বার শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবে এবং এসকল তথ্যাদি হালনাগাদ করবে। লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সংস্কৃতি চর্চাকে গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের শারীরিক বিকাশের জন্য আন্তঃবিদ্যালয়/আন্তঃউপজেলা ক্রীড়া প্রতিযোগিতাসমূহ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আয়োজন করা হবে। খেলাধুলায় আগ্রহী ও শারীরিকভাবে উপযুক্ত শিক্ষার্থীদের বাছাই করে বিভিন্ন খেলাধুলায় উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রশিক্ষণের জন্য বাছাইকালে নারী শিক্ষার্থীদের প্রাধান্য দেয়া হবে।

প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতি ছয় মাসে অন্ততঃ একটি করে আন্তঃবিদ্যালয় খেলাধুলার আয়োজন করবে। সাংস্কৃতিক চর্চাকে গতিশীল করার জন্য প্রত্যেক স্কুলকে জাতীয় দিবসে কুচকাওয়াজ ও শারীরিক কসরতে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হবে। প্রত্যেক বিদ্যালয়ে “কালচারাল ক্লাব” ও “ডিবেটিং ক্লাব”গঠন করা হবে। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্থানীয়ভাবে খণ্ডকালীন কালচারাল টিচার নিয়োগ করে শিক্ষার্থীদের নৃত্য, সংগীত ও নাট্যচর্চার সুযোগ দেয়া হবে। এ উদ্দেশ্যসমূহ বাস্তবায়নে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে উপজেলা ভিত্তিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। শতভাগ স্কাউটিং বাস্তবায়নের উপর জোর দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে বছরে দুইবার স্কাউটিংয়ের ইভেন্ট আয়োজন করা হবে। শিক্ষার্থীদের মাঝে নেতৃত্বের গুণাবলীর বিকাশ ও উদ্ভাবনী চিন্তার প্রসারের জন্য সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে স্কাউটিংয়ের আওতায় নিয়ে আসা হবে এবং স্কাউটিংয়ের স্থানীয়, আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।

সুনাগরিক চেকলিস্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের মাঝে উন্নত মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটিয়ে, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে, তাদের সকলকে দেশপ্রেমিক, দায়িত্বশীল, বিজ্ঞানমনস্ক সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আদর্শ নাগরিকের গুণাবলী সংবলিত চেকলিস্ট প্রণয়ন করা চ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের দ্বারা তার অনুসরণ ও অনুশীলন নিশ্চিতকরণ করা হচ্ছে।বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে বাল্যবিবাহ শুণ্যের ঘরে নামিয়ে আনার জন্য শিক্ষার্থীদের নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক “বালবিবাহ প্রতিরোধ কমিটি” গঠন করার কথা বলা হয়েছে কর্মপরিকল্পনার পনেরতম ভাগে। বাল্যবিবাহ আয়োজনের কোনো ঘটনা এ কমিটি জানতে পারলে তাঁরা স্থানীয়ভাবে প্রতিরোধ করবে।

 প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবে। এতে বলা হয়েছে বালবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির বাল্যবিবাহ সংক্রান্ত ষান্মাসিক প্রতিবেদন প্রস্তুত, উপস্থাপন এবং সংরক্ষণ করবে। জেলায় বিদ্যালয় গমনোপযোগী প্রতিবন্ধী শিশুদের ডেটাবেস তৈরি করে তাদের সুশিক্ষা নিশ্চিত করা হবে। প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধীবান্ধব শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য অন্তভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করা হবে। জেলায় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সন্তানদের তাঁদের নিজস্ব ভাষায় পাঠদানকে উৎসাহিত করা হবে। তাদের নিজস্ব ভাষায় পাঠ্যপুস্তক দ্বারা পাঠদানের ক্ষেত্রে কোন বাঁধাবিঘ্ন থাকলে তা চিহ্নিত করে সমাধানের ব্যবস্থা করা। শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষায় দক্ষ করে গড়ে তুলতে ইংরেজি ভাষায় বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হবে।প্রতি ছয় মাসে ইংরেজি ভাষায় বিতর্ক, কুইজ প্রতিযোগিতা, উপস্থিত বক্তৃতা ইত্যাদি প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সেরা ইংরেজি বক্তা/প্রতিষ্ঠান নির্বাচিত করে পুরস্কৃত করা হবে।

শিক্ষার্থীদের আগামী প্রজন্মের দক্ষ বিজ্ঞানমনস্ক ও প্রযুক্তিবান্ধব সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ডিজিটাল প্রযুক্তি, আইটি, আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স ও বিজ্ঞানের নিত্য নতুন আবিস্কার সম্পর্কে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ইভেন্ট, প্রশিক্ষণ কর্মশালাও প্রতিযোগিতার আয়োজন করা। বিজ্ঞানমনস্ক শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী/শিক্ষককে পুরস্কৃত করা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোন ইভেন্ট, প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ থাকলে তা গ্রহণে সচেষ্ট শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সহায়তা প্রদান করা হবে।

শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনে সততা ও শুদ্ধাচারের চর্চার উপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হবে। প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সততা স্টোর প্রতিষ্ঠা করা হবে। প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজস্ব উদ্যোগে সপ্তাহে একঘন্টা নৈতিক চরিত্র গঠন এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সুশাসনের প্রয়োজনীয়তা শীর্ষক উন্মুক্ত আলোচনার ব্যবস্থা করা হবে।সোনার বাংলা বিনির্মাণে শিক্ষার মানোন্নয়নে চাঁপাইনবাবগঞ্জ মডেল বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সর্বাত্মক সহযোগিতা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এ কর্মপরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন হোক এই কামনা করি।

লেখক : জেলা প্রশাসক, চাঁপাইনবাবগঞ্জ