• ঢাকা
  • বুধবার, ০১ এপ্রিল, ২০২০, ১৮ চৈত্র ১৪২৬
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০, ১২:২২ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০, ১২:৪৬ পিএম

মধ্যবিত্তদের একটু স্বস্তিতে বাঁচতে দিন

গোলাম মোস্তফা
মধ্যবিত্তদের একটু স্বস্তিতে বাঁচতে দিন

মাচার ওপর কে রে- আমি কলা খাই না। চোরের হাতেনাতে ধরা পড়ার পর বহুল প্রচলিত উক্তি। মাচার ওপর কী করছে- জিজ্ঞাসা করা না হলেও ধরা পড়ে পক্ষান্তরে কলা খাওয়ার কথা স্বীকার করে নিচ্ছে। আমাদের সরকারও সম্প্রতি ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদ কমিয়ে দিয়ে এ রকম একটি হাস্যরসের উদ্রেক ঘটিয়েছে। জনমনের বিভ্রান্তি নিরসনে তাই সরকারের পক্ষ থেকে এখন বলা হচ্ছে- সঞ্চয়পত্রে নয়, সুদ কমানো হয়েছে ডাকঘর সঞ্চয় স্কিমের। ডাকঘরে যে সঞ্চয় ব্যাংক রয়েছে, সেই ব্যাংকের সুদের হার সব ব্যাংকের সুদের হারের সমপর্যায়ে নিয়ে আসতেই এটা করা হয়েছে। কথাটা তো ঠিক, ওটা ব্যাংক। তাও আবার সরকারি ব্যাংক। দেশের অর্থনীতির গতি ত্বরান্বিত করতে সরকার সব ব্যাংকে নয়-ছয় সুদহার কার্যকর করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকে সরকার এটা কার্যকর করবে সেটাই তো স্বাভাবিক। ডাকঘর থেকে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের যেমন সঞ্চয়পত্র কেনা যায়, তেমনি ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকেও মেয়াদি হিসাব ও সাধারণ হিসাব খোলা যায়। গোলটা বেঁধেছে এখানেই। ব্যাপারটি হচ্ছে সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানো নিয়ে, তা যেখান থেকেই কেনা হোক।

সারাদেশে পোস্ট অফিস আছে সাড়ে ৮ হাজার। আর সঞ্চয় ব্যুরোর অফিস আছে মাত্র ৭৩টি। গ্রামগঞ্জের ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারী ও ছোট ছোট চাকরিজীবীর বেঁচে থাকার ভরসার স্থল এই ডাকঘর সঞ্চয়পত্র। এ সঞ্চয়পত্রের গ্রাহক হচ্ছেন অবসরপ্রাপ্ত নারী-পুরুষ, বিধবা মহিলা, কর্মজীবী মহিলা, মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ চাকরিজীবী- যারা ‘ট্রাকসেলের’ চালের জন্য লাইনে দাঁড়াতে পারেন না। সরকারের কোনো ভাতার তালিকাতেও নেই এরা। এরা সঞ্চয়পত্রের সুদের টাকায় তাদের সংসার চালায়, ছেলেমেয়েদের স্কুলের বেতন দেয়, ওষুধপত্র কেনে, বাজার-সদাই করে। এরা গরিবও নয়, ধনীও নয়- মধ্যশ্রেণির লোক। যাদের জন্য সরকারের কোনো সাহায্য-প্রকল্পও নেই। সঞ্চয়পত্র সরকারের একটি কল্যাণকামী উদ্যোগ। এটা কোনো ব্যবসা নয়, সরকার কোনো ব্যবসাও করে না। তাই ব্যাংকের সুদের সঙ্গে এর তুলনা করা মোটেও সমীচীন নয়। অথচ ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদ ব্যাংকের সুদের সঙ্গে তুলনা করে তা কমিয়ে এনেছে সরকার।

সরকারের ‘বোঝা বাড়ছে’- এ অজুহাতে সঞ্চয়পত্রের সুদ কমিয়ে মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্তকে সর্বস্বান্তের পথে ঠেলে দেয়া ঠিক নয়। এতে দেশের ভোগস্তর নিচে নেমে যায়। করের বোঝাও এখন বেশ বেশি। অথচ সাধারণ মানুষের হাতে বিকল্প তেমন কিছু নেই। সবাই ব্যবসা করতে পারে না, সবাই সরকারের কাছে হাতও পাততে পারে না। আবার সবাই শেয়ারবাজারে যায় না, যেতে পারেও না। অথচ সরকার ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদ কমিয়ে দিয়ে এদেরকে আবার শেয়ারবাজারমুখী করতে চাইছে। শেয়ারবাজারের অবস্থাও সবার জানা। ওটা আর এখন ভরসা করার কোনো জায়গা নয়। অথচ কয়েকদিন আগে সরকার ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদ ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশ করেছে। সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ৬ শতাংশ করা মানে আসলে সঞ্চয়কারীকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেয়ার শামিল। ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি আর ট্যাক্স বাদ দিলে আদতে সঞ্চয়কারী কিছুই পাবে না।

কিছুদিন আগেও সঞ্চয়পত্রে সঞ্চয় করতে দেশের মানুষকে উৎসাহ দেয়া হতো। এখানে সঞ্চয় করে মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্তরা বেশ উপকারও পেত। অথচ ২০১৫ সাল থেকে সরকার সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদের হার গড়ে ২ শতাংশ করে কমিয়ে দেয়। ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্রের সুদের ওপর উৎসে কর ৫ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশ কার্যকর করে। এখানে একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাইে চলে আসে। আর তা হলো- এ খাতে সরকার বছরে লাখ লাখ সঞ্চয়কারীকে কত টাকা ‘সুদ-ভর্তুকি’ দিচ্ছে? এবং আর মাথাপিছু এই ‘ভর্তুকির’ পরিমাণই-বা কত। হিসাব করলে দেখা যাবে মাথাপিছু এই ‘সুদ-ভর্তুকির’ পরিমাণ খুবই সামান্য, বিশেষ করে সরকার প্রদত্ত অন্যান্য খাতের ভর্তুকির তুলনায়। তা যত টাকাই হোক, এর পুরোটাই কিন্তু চলে যায় বাজারে, যে বাজার (মার্কেট) অর্থনীতির মূলস্তম্ভ; অর্থনীতি সচল রাখার চালিকাশক্তি। একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে দেশের সঞ্চয় বাড়ানো, জনগণকে সঞ্চয়ে উৎসাহ দেয়া। সঞ্চয়পত্রকে স্থিতিশীল সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসেবে ধরে রাখা। অর্থাৎ আজ সুদের একরকম হার- কাল অন্যরকম নয়। আজ সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের ঊর্ধ্বসীমা এক, কাল অন্যরকম নয়। আজ সঞ্চয়পত্রের সুদ করমুক্ত, কাল সঞ্চয়পত্রের সুদ করের আওতায় আনা নয়। এরই মধ্যে নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে স্থিতিশীল সঞ্চয়পত্রের যথেষ্ট ক্ষতিসাধন করা হয়েছে।

এ রকম পরীক্ষ-নিরীক্ষা থেকে আমাদের অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। নতুবা মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্তরা দীর্ঘশ্বাসের নিগড় থেকে কোনোদিনই বেরিয়ে আসতে পারবে না। আমাদের দেশের মতো সব দেশেই মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্তরা সবচেয়ে বেশি বিপদের মুখে থাকে। বিশেষ করে যখন বাজারে অযৌক্তিকভাবে কোনো পণ্যের দাম বাড়ে, তখন এ মধ্যবিত্তরাই সবচেয়ে বিপদের সম্মুখীন হয়। তারা চাইলেই তাদের আয় হঠাৎ করে বাড়িয়ে তুলতে পারে না। তাদেরকে একটি নির্দিষ্ট আয় দিয়েই সংসার নির্বাহ করতে হয়। ফলে হঠাৎ করে বাজারে কোনো পণ্যের দাম বেড়ে গেলে সে আঘাত প্রথমে এসে লাগে এই মধ্যবিত্তদের গায়ে। তাই দরকার যে কোনো সঞ্চয়পত্রকে স্থিতিশীল সঞ্চয় মাধ্যম হিসেবে ধরে রাখা। সরকারের টাকার অভাব নেই; অভাব আদায় ব্যবস্থার। ভ্যাটের টাকা অনাদায়ী, সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের টাকা অনাদায়ী, আয়করের টাকা অনাদায়ী, লাখ লাখ প্রাইভেট কোম্পানির অর্ধেকই আয়কর রিটার্ন দেয় না। পোশাক ব্যবসায়ীদের অর্ধেকও রিটার্ন দেয় না। ওইসব আদায় করুন। অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ওইসব টাকা আদায়ের ব্যাপারে, কোনো ধরনের সঞ্চয়পত্রেরই সুদ কমানো নয়। আজকে যারা অবসর জীবনযাপন করছেন, তারা একসময় রাষ্ট্রকে সেবা দিয়েছেন। এখন তাদের বয়স হয়েছে, তারা আর কোনো কাজ করতে পারেন না। তারা আজ রাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ নাগরিক। তাই সরকারের উচিত এমন ব্যবস্থা নেওয়া, যাতে তাদের আয় না কমে।

উন্নত দেশগুলোয় এদের নানারকম সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। আমাদের দেশে ওইসব সুযোগ-সুবিধা রাতারাতি দেওয়া সম্ভব না হলেও তারাই কিন্তু তাদের মেধা-শ্রম, শক্তি-সামর্থ্য দিয়ে দেশকে গড়ে তুলেছেন। এদের অবদান রুধির ধারার মতো দেশের মাটির সঙ্গে মিশে থাকবে। দেশে আজ উন্নয়নের জোয়ার এসেছে। আমাদের দেশ আজ নিম্নআয় থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হচ্ছে। এ মুহূর্তে গতি একটু মন্থর হলেও গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি অসাধারণ গতি পেয়েছে। আর এই গতির তোড়ে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে বানের পানির মতো। বছরে গড়ে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে ১২ হাজার ২৩৫ জন। বর্তমান সরকারের আমলে কোটিপতি যেমন বেড়েছে, তেমনি কমেছে দারিদ্র্যও। তবে কোটিপতি বাড়া আর দরিদ্র কমার মধ্যে ভারসাম্য আনাটা জরুরি, বৈষম্য কমিয়ে আনাটা জরুরি। নইলে উন্নয়নটা ঠিক সাধারণ মানুষের কাছে স্বাস্থ্যকর বলে মনে হচ্ছে না। সঞ্চয়পত্রে সুদের হার না কমানোর জন্য সফল কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর একটা বক্তব্য টেনেই লেখাটা শেষ করব। ২০১৫ সালের বাজেট আলোচনায়

তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেছিলেন যে, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোয় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে মধ্যবিত্ত, অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক ও কর্মচারী। তাই তিনি ২০১৫ সালে বাজেট আলোচনায় তৎকালীন অর্থমন্ত্রীকে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার না কমানোর জন্য অনুরোধ করেছিলেন। তিনি তখন তার আলোচনায় আরও উল্লেখ করেছিলেন, শেখ হাসিনার সরকার- জনগণের সরকার; জনগণের কল্যাণ হয়, এমন কাজ করাই এ সরকারের নীতি। তাই অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর অগ্নিঝরা ওই বক্তব্যটি এখনও যথাযথ ও সময়োপযোগী বলেই প্রতীয়মান। পরিশেষে বলতে চাই, মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তদের বেহাল অবস্থার মধ্যে না রেখে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারিকদের যেভাবেই হোক- এদের হাতে রাষ্ট্রের সুফল পৌঁছে দেওয়ার একটা ব্যবস্থা করতে হবে। মধ্যবিত্তদের একটু স্বস্তিতে বাঁচার এবং একটু ভালোভাবে টিকে থাকার জন্য একটা পথ স্থির করতেই হবে।

লেখক : সাংবাদিক, দৈনিক জাগরণ [২০-০২-২০২০]

এসকে