• ঢাকা
  • রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২০, ১৫ চৈত্র ১৪২৬
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২০, ০৩:১০ এএম
সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২০, ০৪:৫৪ পিএম

দিল্লির দঙ্গলে সাংবাদিক লাঞ্ছনা, অতঃপর...

এস এম সাব্বির খান
দিল্লির দঙ্গলে সাংবাদিক লাঞ্ছনা, অতঃপর...

সাংবাদিকতার মত দুঃসাহসি পেশায় যারা নিয়োজিত তাদের সামর্থ্য, সাহসিকতা আর নির্ভীক উক্তির উদাহরণ হিসেবে একটি কথা আমাদের দেশে সুদীর্ঘকাল ধরেই প্রচলিত রয়েছে, "সাংবাদিকরা হচ্ছে লাইসেন্সধারী দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মাস্তান।" আর সম্ভবত এমন মাস্তানদের সঙ্গে মাস্তানি ফলানোর পস্তানি কতটা, তা মুখে না বললেও বেশ টের পাচ্ছে দিল্লির একদল অতি উৎসাহি গেরুয়া রংবাজ। সাংবাদিকের প্যান্ট ধরে টান দিতে গিয়ে এখন উল্টো তাদেরই ধুতি সামলানো দায় হয়ে পড়েছে।

দিল্লিতে সিএএ ও এনআরসি বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে বিক্ষোভরত সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর হামলা পরিচালনাকারী বেপরোয় উগ্রপন্থী হিন্দু গোষ্ঠির লাগামে শেষ পর্যন্ত জোর টান পড়েছে। লাগাতার তিন দিন ধরে ক্ষমতাসীন দলের আঞ্চলিক নেতাদের মদদপুষ্ট এই পাণ্ডবদের তাণ্ডবে ঝরে গেছে বহু প্রাণ, রীতিমত বিধ্বস্ত রাজধানী দিল্লি। 

'দিল্লির দঙ্গল' বন্ধে কেন্দ্রীয় সরকারের কুম্ভকর্ণদের ঘুম ভাঙাতে বরাবরের মতই দুঃসাহসি ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় ভারতীয় গণমাধ্যম। কিন্তু সংবাদ সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত সাংবাদিকদের ওপর হামলা, কাজে বাধা প্রদান, ক্যামেরা ও মোবাইল কেড়ে নেয়ার মত নজিরবিহীন ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে এই উগ্র হিন্দুবাদীরা। যার এক পর্যায়ে সাংবাদিকদের লাঞ্চিত করতে পড়নের প্যান্ট খুলে 'জাত যাচাই'য়ের প্রচেষ্টাও চালায় তারা। যা উপমহাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনও ঘটেছে বলে জানা যায়নি। 

তবে গয়াল-কপিলের অনুসারীরা হয়তো ভুলেও ভাবেনি যে, সাংবাদিকের প্যান্ট টান দিতে গিয়ে তাদের নিজেদের ধুতি খসে পড়ার উপক্রম হবে। আর এ কথা যে একেবারে অমূলক নয় তা বিশ্ব গণমাধ্যমের দিকে আর দিল্লির সাংবাদিক লাঞ্চনার পরবর্তী ঘটনাগুলো পর্যায়ক্রমে বিবেচনা করলেই বোঝা যায়।

দিল্লি সংঘাতের শুরু থেকেই চলমান পরিস্থিতি নিয়ে পর্যায়ক্রমে সংবাদ প্রচার করে যাচ্ছিলো ভারতীয় গণমাধ্যম। এ ঘটনায় দেশব্যাপী কঠিন সমালোচনার মুখে পড়ে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। বিতর্কিত এই ইস্যুটি নিয়ে চলমান আন্দোলন ও পরবর্তী সহিংসতার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে এক পর্যায়ে হামলা-হেনস্তার শিকার হতে শুরু করেন সাংবাদিকরা।

সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) উত্তপ্ত এলাকার খবর সংগ্রহে গিয়ে হুমকির মুখে পড়ে কোনও রকমে রেহাই পান জনৈক বাঙালি সংবাদকর্মী। একই দিনে রাজধানীর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মৌজপুরে হামলাকারীদের গুলিতে জখম হন জে কে টুয়েন্টিফোর সেভেন নিউজ চ্যানেলের বাঙালি সংবাদকর্মী আকাশ। তাকে চিকিৎসার জন্য স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) আরেক সাংবাদিক গুলিবিদ্ধ হন। বেধড়ক মারধর করা হয় আরও দু’জনকে।

হামলাকালে দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় মসজিদে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। মুসলমানদের বাড়ি-ঘর ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। তেমনি একটি জ্বলন্ত মসজিদের ছবি তুলতে গেলে মারধরের শিকার হন এনডিটিভির দুই সাংবাদিক অরবিন্দ গুণশেখর ও সৌরভ শুক্লা।

তবে টাইমস অব ইন্ডিয়ার সিনিয়র চিত্র সাংবাদিক অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে যা ঘটে তাতে শুধু ভারত নয় রীতিমত ফুঁসে ওঠে ভারত-বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্ব মিডিয়া। ভারতীয় বার্তা সংস্থা দ্য হিন্দুস্তান নিউজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে প্রথম সেই অভিজ্ঞতার কথা জানান অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়।

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে আমরা মৌজপুর মেট্রোরেল স্টেশনে পৌঁছাতেই এক হিন্দু সংগঠনের সদস্য আমাদের কপালে তিলক এঁকে দিতে তৎপর হন। আপত্তি জানালে তিনি বলেন, ভাই আপনিও তো হিন্দু। তাহলে অসুবিধা কিসের?

এর প্রায় ১৫ মিনিট পর সেখানকার দুই গোষ্ঠীর মধ্যে পাথর ছোড়াছুড়ি শুরু হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে ‘মোদী মোদী মোদী’ স্লোগানের মধ্যে কালো ধোঁয়ায় আকাশ ছেয়ে যায়। শুনেছি স্থানীয় একটি মুসলিম বাড়িতে আগুন লাগানো হয়েছে। সেদিকে এগোতে গেলেই একটি শিবমন্দিরের কাছে একদল লোক এসে আমাদের বাধা দেয়। অগ্নিকাণ্ডের ছবি তুলতে যাচ্ছি শুনে তারা আমাদের বলেন, ভাই আপনিও তো হিন্দু। তাহলে ওখানে যাচ্ছেন কেন? আজ গোটা হিন্দু সমাজ জেগে উঠেছে।

এরপর ঘটনাস্থলে পৌঁছে ছবি তুলতে গেলে লাঠি ও লোহার রডধারী একদল লোক আমাদের ঘিরে ফেলে। তারা আমার ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলে সহযোগী সাংবাদিক সাক্ষী চাঁদ তাদের বাধা দেন। রুখে দাঁড়াতেই সেখান থেকে সশস্ত্র দলটি চম্পট দেয়।

তবে কিছুক্ষণ পরেই আমরা বুঝতে পারি, আমাদের পিছু নেয়া হয়েছে। অনুসরণকারীদের মধ্যে এক তরুণ এগিয়ে এসে আমাকে সতর্ক করে বলে, ‘‘তুই একটু বেশি চালাকি করছিস। তুই হিন্দু, না মুসলিম?’’

এক পর্যায়ে তারা আমার প্যান্ট খুলে ধর্মীয় চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করলে হাতজোড় করে অনেক অনুনয় করি। তখন কিছু হুমকি-ধামকি দিয়ে আমাদের ছেড়ে দেয় তারা। দি হিন্দুস্তান নিউজ।

এর পরই বিষয়টি ব্যাপক সাড়া ফেলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। এর আগ পর্যন্ত ভারত ইস্যুতে বিশ্ব মিডিয়ার মূল দৃষ্টি ছিল ট্রাম্পের সফরকে কেন্দ্র করে। কিন্তু পরবর্তীতে দিল্লি ইস্যুই হয়ে ওঠে মুখ্য। মুখে প্রতিবাদ না করলেও ঠিকই দিল্লি ইস্যুকে স্পট করে সাংবাদিক লাঞ্চনাকারী উগ্রপন্থীদের অপতৎপরতা বন্ধে একযোগে রুখে দাঁড়ায় গোটা দুনিয়ার সাংবাদিক মহল। চলমান এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারত সরকার ও প্রশাসনের প্রতিটি পর্যায়ের ব্যর্থতা ও মদদদাতাদের থলের কথা তখন বিশ্বব্যাপী ক্যামেরা আর কাগজে ছিটকে বের হতে শুরু করে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত। 

পরবর্তী ২৪ ঘন্টারও কম সময়ে দিল্লির মসনদ থেকে হাইকোর্ট, প্রসিশন থেকে প্রশাসন এমন তৎপর হয়ে ওঠে যে, দিল্লি নিয়ে মৌনব্রত ভেঙে কথা বলে ওঠেন খোদ নরেন্দ্র মোদী আর অমিত সাহাও। অমিত সাহার লাগাতার তিন বৈঠক, মাঝরাতে বিচারপতীর বাড়িতেই এজলাস আর শুনানি, দিল্লি পুলিশের উপর মহলে রদ বদলের ঢেউ, ক্ষমতাসীন দলের মহারথীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে খোদ হাইকোর্টের নির্দেশনা, হাসপাতালে ভিআইপিদের চক্কর, অনুদানের আশ্বাস, নিরাপত্তা জোরদার, হিন্দুবাদী পাণ্ডা বাহিনীর দ্বারে দ্বারে প্রশাসনের হানা ও গ্রেফতার। একেবারে যাকে বলে এলাহি কাণ্ড! অথচ গত দু'তিন দিন এই সহিংসতার লাগাম টানার ব্যাপারে কোন তাড়নাই পরিলক্ষিত হয়নি সংশ্লিষ্ট মহলে।

শুধু তাই নয়, নিজ দল ও আদালতের ব্যাপক জেরার মুখে এখন একেবারে চুপসে গেছে কপিল মিশ্রের দম্ভোক্তি। দিল্লিজুড়ে আরআইএফ আর সেনাদের তাড়া খেয়ে পিঠটান দিয়েছে অবাঞ্চিতরা। প্রতিটি পর্যায় থেকে আক্রান্ত দিল্লির মুসলমানদের জন্য আসছে অহিংস শান্তির বার্তা। 

চলমান এই চরম সংকটের মাঝে ভারতের গণমাধ্যম বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার নৈতিক আদর্শ বজায় রেখে সত্য প্রকাশে নিবেদিত থেকেছে এবং সে দেশের আপামর জনগণ যেভাবে সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রধর্ম পালনে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়িয়েছে তা সাম্প্রতিক বিশ্বের প্রেক্ষাপটে একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচ্য। তারা প্রমাণ করেছে, বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্র চর্চাকারী ভারতের বুকে এমন উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সদস্যেরাই প্রকৃত সংখ্যালঘু।