• ঢাকা
  • বুধবার, ০১ এপ্রিল, ২০২০, ১৮ চৈত্র ১৪২৬
প্রকাশিত: মার্চ ১১, ২০২০, ০৪:১৭ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ১১, ২০২০, ০৪:১৭ পিএম

অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ তো বটেই, বেপরোয়াও

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ তো বটেই, বেপরোয়াও

ঢাকা শহর এখন পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্টতম শহরে পরিণত হয়েছে। ঢাকার নিচে ছিল আর একটি মাত্র শহর, সেটি সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক। সিরিয়াতে সংঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাই দামেস্কের ওই দশা। কিন্তু বাংলাদেশে তো কোনো যুদ্ধ নেই। তাহলে বাংলাদেশের রাজধানীর কেন এই দুর্দশা? হ্যাঁ, যুদ্ধ একটা অবশ্যই আছে। যুদ্ধ চলছে এই বাংলাদেশেও; সেটা দরিদ্রের সঙ্গে ধনীর যুদ্ধ। তার নাম শ্রেণিযুদ্ধ। আমরা ওই যুদ্ধের খবর রাখি না; খবর রাখতে চাইও না। রাখলে বুঝতাম, ঢাকা কেন সবচেয়ে নিচে নেমে গেল। উন্নতি? হ্যাঁ, হচ্ছে। অবশ্যই উন্নতি হচ্ছে। উন্নতির দৃশ্য ও গল্প তো কোনো নতুন ব্যাপার নয়। উন্নতি ব্রিটিশ শাসনে হয়েছে, পাকিস্তান আমলেও কম হয়নি। ব্রিটিশরা তো বলতেই পারে যে, তারা আমাদের জন্য রেলের গাড়ি, টেলিগ্রাফের সংযোগ, স্টিমারে যাতায়াত-- এসবের ব্যবস্থা করে দিয়েছে; শিল্প-কারখানা তৈরি করেছে। ইংরেজি ভাষা শিখিয়েছে এবং চা কীভাবে খেতে হয়, সেটা পর্যন্ত হাতে ধরে দেখিয়ে দিয়েছে। আর আইয়ুব খান তো ১০ বছর ধরে মনের সুখে উন্নতির গান গাইতে গাইতে রাজত্ব করে গেলেন। উন্নয়নের দশক উদযাপন শেষে সবচেয়ে সুন্দর গানটি গাইবার সময়েই তার পতন ঘটল। কিন্তু ওইসব উন্নতি নিয়ে আমরা তো সন্তুষ্ট ছিলাম না। উন্নতির ওই দাতাদের আমরা মেরেধরে বিদায় করেছি। কারণ? কারণ হলো উন্নতিটা ছিল পুঁজিবাদী ধরনের। তাতে উন্নতির সঙ্গে সমানতালে বাড়ছিল বৈষম্য ও বঞ্চনা। দেশের সম্পদ চলে যাচ্ছিল বিদেশে। এখনকার উন্নতিরও তো ওই একই দশা। উন্নতি অল্প কিছু মানুষের, যারা চেপে বসে আছে বাদবাকিদের ঘাড়ের ওপর। আর উন্নতির সব রসদ জোগাচ্ছে ওই বাদবাকিরাই। এই উন্নতরা উন্নতি করেছে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে। দেশের সব দৈনিকেই বেরিয়েছিল অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর খবরটা-- গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের ধনীরা যে গতিতে ও যে হারে উন্নতি করেছে, তার তুলনা সারা বিশ্বের কোথাও নেই। উন্নতির উন্মাদনায় অধুনা চীন ছুটছে বুলেটের গতিতে। কিন্তু উন্নতির দৌড়ে বাংলাদেশের ধনীরা চীনের ধনীদেরও পেছনে এবং লজ্জাতে ফেলে দিয়েছে। প্রতিযোগিতায় প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের ধনীরা হার মেনেছে। রণে ভঙ্গ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ধনীরাও। এ উন্নতির অবিশ্বাস্য গতির উল্টো পিঠে লেখা রয়েছে মানুষের দুর্দশা, শঙ্কা ও কান্না।

হঠাৎ উন্নতরা এ দেশের কোনো ভবিষ্যৎ আছে বলে বিশ্বাস করে না। তারা তাই মহাব্যস্ত দেশের সম্পদ লুণ্ঠন ও পাচারে। মোগলরা সম্পদ নিয়ে যেত দিল্লিতে; ইংরেজরা নিয়ে গেছে লন্ডনে; পাকিস্তানিরা নিত রাওয়ালপিন্ডিতে। এখন আমাদের বাঙালি ভাইয়েরা পাঠাচ্ছে সুইজারল্যান্ড, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ায়। এদের কারও জবাবদিহির সামান্যতম দায় নেই। কার কাছে দায় থাকবে? রাষ্ট্র তো এদেরই করতলগত। উন্নতি কাদের শ্রমে ও ঘামে সম্ভব হচ্ছে, তাও আমরা জানি। কাজী নজরুল ইসলাম তার ছোট্ট একটি কবিতা লিখেছিলেন ‘কুলি মজুর’ নামে। ওই কবিতাতে পুঁজিবাদী উন্নতির ভেতরকার খবরটা পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়ে গেছেন তিনি। ওটি লেখা হয়েছিল আজ থেকে ৯৬ বছর আগে। তিনি জিজ্ঞেস করেছেন রাজপথের মোটর, সাগরের জাহাজ, রেললাইনের রেলগাড়ি, জমিতে অট্টালিকা-- এসব কাদের দান? এগুলো কার খুনে রাঙা? জবাবটা তার ওই প্রশ্নের ভেতরেই বসে আছে। সব উন্নতিই শ্রমিকের শ্রম দিয়ে তৈরি। উন্নতিমাত্রেই শ্রমিকের খুনে রাঙা। বিনিময়ে শ্রমিক কী পেয়েছে? বেতন? কত টাকা? নজরুলের ভাষায়- ‘বেতন দিয়াছ?- চুপ রও যত মিথ্যাবাদীর দল!/ কত পাই দিয়ে কুলিরে তুই কত ক্রোর পেলি বল্?’ কত দিলেন আর কত পেলেন, এ প্রশ্নের জবাবে শিল্পের মালিকরা কী বলবেন? এ দেশে শিল্পের অনেক বিকাশ ঘটেছে সত্য, কিন্তু শ্রমিকের ভাগ্য কতটা বদলেছে? শিল্প মালিকরা কত দিচ্ছেন তাদের শ্রম অনুপাতে? আর যা-ই দিচ্ছেন, এর বিনিময়ে কত আদায় করে নিচ্ছেন?

দেশে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আরেকটিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার সময় পাওয়া যাচ্ছে না। মানুষের সহনশীলতা কি বৃদ্ধি পাচ্ছে? হয়তো তাই, তবে আরও বড় সত্য এই যে, মানুষ ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। মানুষ অত্যন্ত ব্যস্ত থাকছে নিজেকে নিয়ে। ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। জীবিকার সমস্যা তাকে তাড়া করে বেড়ায়। প্রতিযোগিতা রয়েছে; আছে প্রদর্শন বাতিক। অসুবিধা আছে যোগাযোগের। সামাজিক যোগাযোগ যা আছে, তা বিকল্প হয়ে দাঁড়াচ্ছে মানবিক যোগাযোগের; তাতে ছায়া আছে, তাপ নেই। ওদিকে দার্শনিকভাবে এই মতও প্রচার করা হচ্ছে যে, ছোট ছোট সমস্যাই তো ভীষণ বড়। সেগুলোর মীমাংসা করা না গেলে বড় বড় সমস্যার মীমাংসা করব কীভাবে? দেখানো হচ্ছে, ছোট সমস্যাগুলো আসলে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। ক্রেতা-বিক্রেতা, স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, ডাক্তার-রোগী, শিক্ষক-ছাত্র, বাসের হেলপার-নারী যাত্রী, ছেলেমেয়ে, উকিল-মক্কেল; হাজার হাজার দ্বন্দ্ব। এগুলোর দিকে না তাকিয়ে রাষ্ট্র, সমাজ, পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এসব মস্ত বিষয় নিয়ে মাথা ঘামালে ব্যবস্থা বদল হবে না। বড় রয়েছে ছোটর ভেতরেই। ছোটকে আগে মোকাবিলা করা চাই। আবার এও তো বলা যাবে এবং বলা হচ্ছেও-- সমস্যা তো শুধু আমাদের নয়, সারা বিশ্বেরই। বিশ্বের সর্বত্র রয়েছে বঞ্চনা ও অত্যাচার, হত্যা-আত্মহত্যা। ধর্ষণ কোথায় না ঘটছে! কোথায় নেই দুর্নীতি! ভোগবাদিতা, নিষ্ঠুরতা, সহিংসতা, প্রকৃতির সঙ্গে নির্মম শত্রুতার কোথায় অভাব? ইত্যাদি।

ভ্রান্তির এসব বিলাস কিন্তু বাস্তবতাকে বদলাবে না। ঝড়ের মুখে বালুতে মুখ লুকালে বিপদ কাটে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তো আমরা দেখছি, বড়াই করে বলিও যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের এক উজ্জ্বল ইতিহাস। একাত্তরে আমরা যুদ্ধ করেছি, প্রাণ দিয়েছি। হারিয়ে দিয়েছি হানাদারদের। কিন্তু কই; বেশিরভাগ মানুষের বেশি বেশি দুঃখ তো কাটল না। বাড়লই। ব্যাখ্যা কী? ব্যাখ্যা হচ্ছে, শাসক বদলেছে, শাসন বদলায়নি। রাষ্ট্র আগের মতোই রয়ে গেছে, বরং পুরনো হওয়াতে এবং বেপরোয়া চালকদের হাতে পড়ে রাষ্ট্রযন্ত্রটি আগের চেয়েও কষ্টচালিত ও যন্ত্রণাদায়ক হয়ে পড়েছে। কিন্তু সেটাই-বা কেন হলো? রাষ্ট্র তো ভাঙল, আকারে গেল ছোট হয়ে; কিন্তু বদলাল না কেন স্বভাবচরিত্রে? বদলাল না এই জন্য যে, রাষ্ট্রক্ষমতা চলে গেছে পেটি বুর্জোয়াদের হাতে। পাকিস্তানি বুর্জোয়ারা রণে ভঙ্গ দিয়ে লেজ গুটিয়ে সরে পড়েছে; কিন্তু তাদের জায়গায় বসে গেছে বাঙালি পেটি বুর্জোয়ারা, যাদের আজন্ম স্বপ্ন বুর্জোয়া হওয়ার। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্বটা পেটি বুর্জোয়াদের হাতেই ছিল। থাকাটাই ছিল স্বাভাবিক। সমাজতন্ত্রীরা যুদ্ধে ছিল ঠিকই, কিন্তু নেতৃত্বে থাকতে পারেনি। রাষ্ট্রক্ষমতা চলে গেছে জাতীয়তাবাদী পেটি বুর্জোয়াদের হাতে। তারা তাদের স্বপ্ন সফল করার জন্য পাকিস্তানিরা যা যা করত, ঠিক তাই তাই করেছে। সমানে লুটপাট ও জবরদখল করেছে এবং সে কাজে রাষ্ট্রক্ষমতাকে ব্যবহার করার ব্যাপারে কোনো গাফিলতি করেনি।

ইসলামপন্থি দলগুলোকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী পুরনো পাপী, তাদের নৃশংসতার খবর আমরা রাখি; কিন্তু হেফাজতপন্থিরা যেভাবে কদম কদম এগিয়ে যাচ্ছে, আবার প্রশ্রয়ও পাচ্ছে, তাও কম বিপজ্জনক নয়। রাজনীতির মধ্য দিয়ে হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার অপপ্রয়াস নতুন কিছু নয়। নানা মহল থেকে বলা হচ্ছে, রাজনীতি এ দেশে শ্রী হারিয়ে ফেলেছে। এই যে হেফাজতিদের সঙ্গে মিলেমিশে রাজনীতি, এরও ভিন্ন ব্যাখ্যা আছে। হেফাজতপন্থিরা নির্বাচনে আসবে না, তারা তলোয়ার নিয়ে রাস্তায় নামবে। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের সময় তাদের নৃশংসতার কিছু নমুনা ঢাকাবাসী পেয়ে গেছে। তাদের দাবিগুলোর কয়েকটির ভয়াবহতা অতুলনীয়; যেমন ধর্মদ্রোহ আইন চালুর দাবি। এই আইন পাকিস্তানে চালু হয়েছে; ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশে এটা চালু করার দাবি কেউ কখনও তুলতে পারবে-- এটা ছিল কল্পনার বাইরে! কিন্তু হেফাজত সে দাবি ঠিকই তুলেছে। ইতোমধ্যে তাদেরকে ছাড় দেওয়া হয়েছে; তাদের দাবি অনুযায়ী বাংলা মাধ্যমের পাঠ্যপুস্তকে উদ্ভট সব পরিবর্তন আনা হয়েছে (তারা অবশ্য ইংরেজি মাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ করেনি; ওই মাধ্যম তাদের নাগালের বাইরে)। সম্প্রতি তারা জোর দাবি তুলেছে পাঠক্রম থেকে বিবর্তনবাদ নিষিদ্ধ এবং কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা করার। সরকার যদি ওই দাবি মেনে নেয়, তাহলে অবাক হবো না মোটেও। তাদের দেওয়া শিক্ষা-সনদকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির সমমর্যাদাদানের সরকারি সিদ্ধান্ত এর মধ্যেই গৃহীত হয়ে গেছে। শোনা যায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিমূল্যবান কিছু জমিতেও তারা স্থায়ী দখলদারিত্ব কায়েম করে ফেলেছে, সরকারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে। কওমি মাদ্রাসার ধারা থেকে হাজারে হাজারে মানুষ বের হয়ে আসছে; করার মতো কাজ পাচ্ছে না। ফলে লুম্পেনদের বর্ধিষ্ণু বাহিনীতে আগামীতে এরাও যোগ দেবে, ওই বাহিনীর স্ফীতি ঘটাবে। বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা এখন তেমন শোনা যায় না। আগামীতে হয়তো অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলাও কষ্টকর হবে।

এসব সম্ভাবনা যে মোটেই সুসংবাদ নয়, সেটা বুঝতে কোনো কষ্ট নেই। সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝে দেশের ধনীরা। তারা তাই তাদের ভবিষ্যৎ দেশে না গড়ে বিদেশে গড়ে তুলছে। দেশে তারা কওমি মাদ্রাসার জন্য টাকা ঢালে; কিন্তু নিজেদের সন্তানদের বিদেশে পাঠায়, যে বিদেশ থেকে ওই তরুণরা আর কখনও ফিরবে না। না ফিরুক, ক্ষতি নেই। কিন্তু তারা যে দেশের মানুষের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, তার কী হবে? মূল কথাটা হচ্ছে, এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা। ব্যক্তিমালিকানা থেকে সামাজিক মালিকানায় যাওয়া। সে কাজটা করার নেতৃত্ব দিতে হবে দেশের বামপন্থিদেরই। কিন্তু মুশকিল হলো, বামপন্থিরা শক্তিশালী নয়। তাদেরকে শক্তিশালী হতে দেওয়া হচ্ছে না। সরকার তাদের পছন্দ করে না। আর মিডিয়া তো পুরোপুরিই তাদের বিপক্ষে। তার কারণ হলো, মিডিয়ার মালিকরা সবাই ব্যক্তিমালিকানার পক্ষে। ইসলামপন্থি দলগুলো যে রাজনৈতিকভাবে প্রশ্রয় পাচ্ছে এবং সামাজিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে, তার প্রধান কারণ কিন্তু এই যে, ধনীদের মতো এরাও, ধনী-গরিব নির্বিশেষে ব্যক্তিমালিকানায় বিশ্বাসী। আগামী দিনে দেশে ইসলামপন্থি দলগুলোই হয়তো প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা দেবে। সেটা যে ভালো কোনো ব্যাপার হবে না, তার প্রমাণ মার্কিন আধিপত্যে বিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশকে আমরা নিশ্চয় মধ্যপ্রাচ্য করতে চাইব না।

 

 

লেখক : শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক