• ঢাকা
  • শনিবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২০, ২০ চৈত্র ১৪২৬
প্রকাশিত: মার্চ ১৩, ২০২০, ০৬:১৫ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ১৩, ২০২০, ০৬:৫৬ পিএম

পোড়ার জন্যই যাদের জন্ম

গোলাম মোস্তফা
পোড়ার জন্যই যাদের জন্ম

বস্তিতে আগুন লাগা এখন আর কোনো নতুন বিষয় নয়। গত আট মাসে রাজধানীতেই চারটি বস্তি আগুনে পুড়ে ছাই হলো। একের পর এক বস্তি পুড়ছে আর গৃহহীন হচ্ছে নিম্নআয়ের মানুষ। বস্তিতে আগুন লাগার ঘটনায় প্রতিবারই তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, অথচ এসব কমিটির প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না। গত বুধবার সকালে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর বস্তিতে আরেকটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে গেছে। এতে প্রায় ৫ সহস্রাধিক লোক আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছেন। এখানে বসবাসকারীদের অধিকাংশের ঠাঁই হয়েছে আশপাশের ৫-৬টি বিদ্যালয়ে। সরকারের পক্ষ থেকে থাকা-খাওয়ার আপাত ব্যবস্থা করা হলেও সব হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। মাঝে মাঝে বস্তি পুড়বে আর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে-- এটাই দেখে আসছে দেশের সাধারণ মানুষ। তাই তাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন, এ ঘটনার কি কোনো শেষ নেই?

প্রতিবছরই ঢাকা শহরসহ সারাদেশে অসংখ্য বস্তিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে থাকে। এতে হাজার হাজার নিম্নআয়ের মানুষ সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন, কখনও কখনও নির্মমভাবে প্রাণও হারান তারা। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্যানুযায়ী, গত বছর (২০১৮ সালের জানুয়ারি-ডিসেম্বর) সারাদেশে ১৬৫টি বস্তিতে আগুন লাগে। এর মধ্যে ঢাকায় ৩৩, চট্টগ্রামে ৪৩, রংপুরে ৮৮ এবং সিলেট বিভাগে ১টি বস্তি আগুনে পুড়ে যায়। গড় হিসাবে ৩ দিন অন্তর অন্তর দেশের কোথাও না কোথাও বস্তিতে আগুন লাগে।

এসব বস্তির মানুষগুলো আসে দেশের নানা প্রান্ত থেকে। নগর ও গ্রামের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানাবিধ প্রাকৃতিক আপদ যেমন- বন্যা, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, শৈতপ্রবাহ, লবণাক্ততার কারণে মানুষ জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে শহরে আসেন। এসে এসব মানুষ আশ্রয় নেন শহরের বস্তি অথবা ফুটপাতের কোনো খোলা জায়গায়। এখানে এসেও তাদের স্বস্তি নেই। স্বার্থের যূপকাষ্ঠে প্রায়ই বলি হতে হচ্ছে তাদের। মনুষ্য সৃষ্ট আগুনে অসহনীয় হয়ে উঠছে তাদের জীবন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগ, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইউপিপিআর (আরবান পার্টনারশিপস ফর পভার্টি রিডাক্সন প্রজেক্ট)-এর জরিপ অনুযায়ী, দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ ভাগ। এর মধ্যে ৮ শতাংশ মানুষ একেবারে হতদরিদ্র। যাদের সত্যিকার অর্থেই কোনো বাড়িঘর নেই। এমনকি মাথা গোঁজার মতো ন্যূনতম জায়গা পর্যন্ত নেই। হতদরিদ্র এসব মানুষই বস্তিগুলোর স্থায়ী বাসিন্দা। ২০১৫ সালের বস্তিশুমারি অনুযায়ী দেশে বস্তিবাসীর সংখ্যা সাড়ে ২২ লাখ। এদের অর্ধেকের বেশি বাস করেন ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাঁচ হাজারের বেশি বস্তিতে।

এসব বস্তির অধিকাংশই গড়ে ওঠে ব্যক্তিমালিকানায় অথবা স্থানীয় ‘দালালচক্রের’ নিয়ন্ত্রণে। ভাড়া বা চাঁদা নেয়ার সামান্য তারতম্য হলেই চলে উচ্ছেদ। আর এই উচ্ছেদের নতুন পথ হলো অগ্নি-থেরাপি; অগ্নিকাণ্ডে নিঃস্ব করে তাদের সরিয়ে দেয়া। এভাবেই এসব এলাকা দখলে নেয় তারা। মিরপুরের চলন্তিকা, ঝিলের পাড়, ৭ নং ও আরামবাগ এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের পর এ ধরনের প্রশ্ন বারবার দেশবাসীর সামনে চলে আসে। নিকটঅতীতে কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের পরও এসব প্রশ্নের সুরহা করা যায়নি।

অথচ এ বস্তিবাসীরাই শহরজীবনের চালিকাশক্তি। তাদের শ্রমেই টিকে আছে নগরের যানবাহন, গার্মেন্টস শিল্পকারখানা, হাটবাজার, গৃহকর্মীর সেবাসহ নানা ব্যবস্থা। এই ব্যয়বহুল শহর তাদের বসবাসের জন্য তেমন কোনো ব্যবস্থাই করা হয়নি। তারা যেমন জীবিকার প্রয়োজনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসে, এই শহরও তেমনি তাদের লুফে নেয় নিজেদের স্বার্থে। এদের ছাড়া একদিনও চলে না নগরীর অর্থবিত্তের মালিকদের। অথচ বিভিন্ন প্রকল্পের নামে এদেরকে উচ্ছেদ করা হয় বুলডোজার দিয়ে। দখলমুক্ত করতে কোনো কোনো সময় বুলডোজার হেরে গেলে লাগিয়ে দেয় হয় আগুন! এ দেশের মানুষের এটাই দেখে আসছে বারবার।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনের বিষয়ে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও, আজও এর স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ করা বস্তিতে আবার গড়ে উঠেছে নতুন বস্তি। এমনকি ঢাকা নগরীর উন্নয়নের বিশদ পরিকল্পনা নেয়া হলেও উপেক্ষিতই থেকে গেছে বস্তিবাসীদের আবাসনের বিষয়টি। কিছুদিন আগেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানীর ইস্কাটনে মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ফ্ল্যাট উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বস্তিবাসীর জন্য ভাড়াভিত্তিক ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনার কথা শোনান দেশবাসীকে। তারা যেন শান্তিতে থাকতে পারেন, সেজন্য প্রতিদিন, সপ্তাহ বা মাসভিত্তিক ভাড়া পরিশোধ করার কথা উল্লেখ করেন তিনি। এর আগেও সরকার রাজধানীর ভাসানটেকে বস্তিবাসীদের জন্য যে ১০ হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণ করছে, সেগুলো চলে গেছে মধ্যবিত্তদের হাতে। তাই আর গালগল্প না করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণই সবার প্রত্যাশা।

বস্তিবাসীদের বাস্তবতা বিবেচনা করে পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বস্তি গড়ে সংশ্লিষ্ট বস্তিতেই নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে এগোনো উচিত। পাশাপাশি বস্তিতে আগুন লাগা নিয়ে সংশয় দূর করতে প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু নিরপেক্ষ তদন্তও জরুরি এবং তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ করে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াও জরুরি।

বস্তিতে ঠাঁই নেওয়া মানুষের নাগরিক সুবিধা পাওয়ার অধিকার বিশ্ব স্বীকৃত। আমাদের দেশেও এই অধিকারের লড়াই চলছে দীর্ঘদিন ধরে। এর মধ্য দিয়ে আইনগত ও নীতিগতভাবে বস্তিবাসীদের জন্য সিটি করপোরেশনের বেশ কিছু করণীয় নির্ধারণ করা আছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি জনাব খায়রুল হকও তার রায়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন ঢাকার একটি বস্তির সব বাসিন্দাকে দুই বছরের মধ্যে পুনর্বাসন করার জন্য। কিন্তু তা এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। এসব নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষকে, যেমন পাবলিক ওয়ার্কস, রাজউক ইত্যাদিকে। কিন্তু তা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা নেই।

দেশের উন্মূল এসব মানুষের জীবনকাহিনী লিখতে গিয়ে মনে পড়ছে নির্বাসিত কবি দাউদ হায়দারের ‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’ কবিতার কয়েকটি চরণ। ... এরা কেন জন্ম নেয়?/ এরাই তো আমাদের সুখের বাধা অভিশাপ।/ মরণ এসে নিয়ে যাক, নিয়ে যাক/ লোকালয়ে কিসের ঠাঁই এই শত্রুর?... সত্যিই এরা শত্রু। অর্থগৃধ্নু মানুষের শত্রু। বস্তিবাসীরা কি কোনো মানুষ? এরা শুধু সমাজকে দেবে!! নেবে কেন?

লেখক : সাংবাদিক