• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০৩ আগস্ট, ২০২১, ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮
প্রকাশিত: মার্চ ১৫, ২০২০, ০৬:৫৮ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ২, ২০২০, ০৯:২১ এএম

ভাইরাসের চেয়ে ভয়ঙ্কর করোনার অন্য প্রভাব

ভাইরাসের চেয়ে ভয়ঙ্কর করোনার অন্য প্রভাব

বাংলাদেশের জন্য অতিজরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়াবে চীন কীভাবে তার পুরো অর্থনীতি ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে গুছিয়ে নেয়। চীনের জন্য সুখবর হলো, এরই মাঝে তারা করোনাকে প্রায় নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে। ১২ মার্চ চীনে করোনা আক্রান্ত লোকের সংখ্যা দশের নিচে নেমে এসেছে। এটি ধারণা করা যেতে পারে যে, চীন অতিদ্রুত তার উৎপাদন ব্যবস্থা সচল করবে ও বিশ্ব অর্থনীতির পতনের চাকাটাকে তার মতো করে কিছুটা থামাতে পারবে।

বাংলাদেশ তো বটেই, বিশ্বের এমন কোনো জনপদ এখন খুঁজে পাওয়া যাবে না যাদের কাছে করোনা ভাইরাস পরিচিত নয়। বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ এই মহাবিপদ থেকে দেশবাসীকে রক্ষার জন্য সব প্রকারের সাবধানতা অবলম্বন করে যাচ্ছে। দিন দিন মানুষের সচেতনতাও বাড়ছে। যদিও আমরা অঞ্চলভিত্তিক কোয়ারেন্টাইন জাতীয় কোনো চরম পদক্ষেপ নিইনি, তবু মুজিববর্ষের অনুষ্ঠান থেকে জনসমাগম বর্জন ও অন্যান্য জনসমাগম নিয়ন্ত্রিত করার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের অতি সতর্ক অবস্থানও স্পষ্ট করেছি। আমাদের সৌভাগ্য যে, আমাদের দেশে এখনো এই ভাইরাসে কেউ নিহত হয়নি। দেশে সাকল্যে পাঁচজন আক্রান্ত হওয়ার মাঝে দুজন সুস্থ হয়ে যাওয়া, একজনের বাড়ি ফিরে যাওয়া ও তৃতীয় জনেরও অবস্থার উন্নতি হওয়া আমাদের জন্য স্বস্তিদায়ক বিষয়। আর দুজনের নতুন করে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেল। যদিও নতুন নতুন নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তারপরও সব স্তরে এ বিষয়ে সচেতনতা কাজ করছে। আগামীতে এই ভাইরাস কোন পর্যায়ে আমাদের আক্রমণ করে সেটি বিবেচনার বিষয় হবে। তবে করোনা ভাইরাসে দুনিয়ার অবস্থা ভয়ঙ্কর।

চীনে একটি পুরো প্রদেশকে কোয়ারেন্টাইন করা, ইতালির মতো পুরো দেশটাকেই কোয়ারেন্টাইন করা, ইরানে জুমার নামাজ বন্ধ করা, মক্কা শরিফে তাওয়াফ বন্ধ করা, ডেনমার্কের বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া ইত্যাদি অনেক কিছু বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ঘটনা। করোনার প্রভাবে আলোচনা সভা, মেলা, সম্মেলন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি বন্ধ হওয়ার হিসাব কষে শেষ করা যাবে না। মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মহামারি আকারে এর বিস্তারের দিকটি বিবেচনা করলে আতঙ্কিত হতেই হয়। যদিও সারা বিশ্বের হিসাব অনুসারে এই ভাইরাসে মৃত্যুর হার মোটেই আতঙ্কজনক নয় তথাপি ভ্যাকসিন না থাকায় বা যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় ভয়ের পরিমাণটা বেড়েছেই। এরই মাঝে প্রতিদিনই নতুন নতুন পদক্ষেপ দিয়ে দুনিয়াটাকেই যেন একটি কোয়ারেন্টাইন শিবির বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। খুব সম্প্রতি আমেরিকায় ইউরোপীয়দের যাতায়াত বন্ধ করা বা ভারতে সাধারণ যাতায়াত বন্ধ করা অবশ্য লাল বাতি দেখানো বা অতি সতর্কতা জারি করার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আমি আমার শৈশবের কথা স্মরণ করতে পারি। সেই সময়ে না ছিল প্রযুক্তি, না ছিল যোগাযোগ। তখন আমাদের এলাকায় আশ্বিন-কার্তিক মাসে কলেরার আতঙ্ক ছড়াত। তখন কলেরার কোনো চিকিৎসা ছিল না। গ্রাম কি গ্রাম কলেরায় উজাড় হয়ে যেত। এখন তো ওটা কোনো রোগই না। আমরা এরই মাঝে দুনিয়াকে সার্স বা মার্স ভাইরাসে শঙ্কিত হতে দেখেছি। আমাদের ডেঙ্গু আতঙ্কও কাজ করে। এর সঙ্গে করোনা ভাইরাসের বিষয়টি নতুন বিশ্ব পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

আমি নিজে মনে করি আজকের অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। স্বাস্থ্যসহ সব বিষয়েই মানুষের গবেষণা করার শক্তি এখন যা তাতে প্রতিষেধক বা চিকিৎসা দুটিরই সমাধান দুনিয়ার কোনো না কোনো প্রান্ত থেকে আমরা পাবই, যতদিন না পাব শঙ্কাটা ততদিনের।

তবে করোনার চিকিৎসা বা প্রতিষেধক যদি আসেও বা এটির হাত থেকে শারীরিকভাবে যদি আমরা বেঁচেও যাই তথাপি করোনার অন্য প্রভাবটা আতঙ্কিত করতে পারে। বস্তুত করোনার জন্য দেশ-প্রদেশ-শহর-মিলকারখানা বন্ধ হতে থাকায় এর অন্য প্রভাবগুলো নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা হচ্ছে। কেউ কেউ মনে করছেন যে, এই ভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা যাই হোক এর বহুমুখী প্রভাব দুনিয়াকে এমনভাবে সহ্য করতে হবে, যা এর আগে কখনো হয়তো মোকাবিলা করতে হয়নি। চীনের পরিস্থিতি আমরা প্রায় সবাই জানি। চীনের জন্য বাংলাদেশের পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে উৎপাদন ও আমদানিমুখী বহু কর্মকাণ্ড জটিল অবস্থায় পড়েছে। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে করোনার প্রভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে যে ধস নামে তা তুলনাহীন। বিশেষজ্ঞরা এরই মাঝে বলতে শুরু করেছেন যে, করোনার স্বাস্থ্য ঝুঁকির চেয়ে অন্য প্রভাব ধারণার বাইরে। ব্রিটিশ পত্রিকা ইনডিপেনডেন্ট গত ১২ মার্চ ওমর হাসানের এক লেখায় উল্লেখ করেছে, ‘জনগণের কাছে করোনা ভাইরাসের স্বাস্থ্যঝুঁকির চেয়ে এর আর্থিক ঝুঁকি বেশি। এই ভাইরাস সরাসরি যদি আপনার জীবনে আঘাত হানে তবে সেটি হয়তো আপনাকে কর্মচ্যুত করা বা ব্যবসায়ে দেউলিয়া বানানো। এই সপ্তাহে শেয়ারবাজার থেকে ট্রিলিয়ন ডলার গায়েব হয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করেন, তবে হয়তো তার পুনর্নির্বাচনে জয়ী হওয়া নাও হতে পারে। করোনা ভাইরাসকে ট্রাম্পের বড় দুর্বলতা বলেও চিহ্নিত করা হচ্ছে। আজ পর্যন্ত করোনা ভাইরাস সারা দুনিয়ায় ৪ হাজার ৩৮৯টি প্রাণহানি ঘটিয়েছে। এর মাঝে ৩১ জন আমেরিকানও আছেন। কিন্তু এই ভাইরাস কোটি কোটি মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব করে দেবে, বিশেষ করে এর ফলে যখন শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে তারপর থেকে। এরই মাঝে রাশিয়া ও সৌদি আরবের মাঝে তেলযুদ্ধ শুরু হয়েছে ও সিরিয়ায় আরো শরণার্থী সংকট দেখা দিয়েছে।’

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন করোনা ভাইরাসের জন্য টিকা আবিষ্কারের চেয়েও জরুরি হচ্ছে অর্থনীতির টিকা দেয়া। আমরা জানি যে রোগ হলে চূড়ান্ত পরিণতি হতে পারে মৃত্যু। তবে বেঁচে থেকে যদি খাবার জোটানো না যায়, যদি পাওনা পরিশোধ করা না যায় বা যদি ঋণগ্রস্ত হতে হয় বা সন্তানের শিক্ষার ব্যবস্থা বা অন্য অসুখের চিকিৎসা না করা যায়, তবে সেই অবস্থাটি মোটেই সুখদায়ক হবে না। এরই মাঝে করোনার চাপ গিয়ে পড়েছে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের ওপর। আমেরিকার শেয়ারবাজারের কথাই ধরুন। করোনার ফলে শেয়ারবাজারে যখন ধস নামল তখন সাধারণ মানুষ শত শত কোটি টাকা মুহূর্তে হারিয়ে ফেলল। আমেরিকার জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ। মুক্তবাজার অর্থনীতির অন্য দেশগুলোরও একই দশা। শেয়ারবাজার বস্তুত এসব দেশের অর্থনীতির ভিত্তি। এটি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। করোনার ঘটনার মতো ঘটনায় শেয়ারবাজারে ধস নামে আর সর্বস্বান্ত হয় সাধারণ মানুষ। আমাদের শেয়ারবাজারের পতনের ফলাফলও বস্তুত নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্তকেই সবার আগে আঘাত করে।

বিশ্বের মুক্তবাজার অর্থনীতির দেশগুলোকে তাই করোনা ভাইরাসকে মোকাবিলা করার চেয়েও জরুরি হয়ে পড়েছে করোনাসৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয় প্রতিরোধ করা। এরই মাঝে শেয়ারবাজারের বাইরে শিল্প ও বাণিজ্য ব্যাপকভাবে সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের মতোই কাঁচামালের সংকটে পড়েছে। ফলে তাদের উৎপাদন ও মজুত নেই। চীনের কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু প্রতিষ্ঠানই দেউলিয়া হওয়ার অবস্থায় পড়েছে। অন্যদিকে চীন করোনা ভাইরাসের সবচেয়ে চাপে থাকার পরও অন্তত মুক্তবাজার অর্থনীতির দেশগুলোর মতো আকস্মিকভাবে পতনের মুখে পড়বে না। তবে যে ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ এখনো চীন মোকাবিলা করছে, তাদের উৎপাদন ব্যবস্থা বা অর্থনীতি যে সংকটে পড়েছে তা কাটিয়ে উঠতে চীনকেও নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। ইনডিপেনডেন্ট মন্তব্য করেছে ‘বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের প্রকৃত প্রভাব পড়ার আগেই ডাক্তারদের পাশাপাশি অর্থনীতিবিদদের এখন করোনার দায়িত্ব নেয়া উচিত’। ওমর হাসান তার নিবন্ধে সতর্ক করেন যে বিশ্বের নবম বৃহত্তম অর্থনীতি ইতালি অচিরেই একটি চরম মন্দায় পড়াটা কেবল সময়ের ব্যাপার। এর ফলে একদিকে ইউরোপ ক্ষতিগ্রস্ত হবে অন্যদিকে ইউরোপের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী অংশীদার আমেরিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটি খুব সহজেই বলা যায় যে আমেরিকা ইউরোপের মন্দা সারা বিশ্বকেই আন্দোলিত করবে। দুনিয়াকে এখন ২০০৮ সালের সেই মহামন্দার কথা ভাবতে হচ্ছে। এবার সংকটটা আরো গভীর হবে-- কারণ ৮ বছর আগে চীন বিশ্ব অর্থনীতিতে যে ভূমিকা পালন করত এবার তা বহুগুণ বেড়ে গেছে। সৌদি-রুশ তেলযুদ্ধ, সিরিয়ার শরণার্থী সংকট, চীনের উৎপাদন ব্যবস্থা ইত্যাদি সব কিছুই আগামী দিনের বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরি করবে।

আমরা করোনাকেন্দ্রিক বিশ্ব অর্থনীতির অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ হলেও এবার আমাদের সচেতনভাবে অবস্থা মোকাবিলা করতে হবে। ২০০৮-এর বিশ্ব মন্দাকে আমরা বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উন্নয়ন কাকে বলে তা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছি। আমি নিজে বিশ্বাস করি এবারো আমরা আমেরিকা বা অন্যান্য মুক্তবাজার অর্থনীতির দেশগুলোর মতো সংকটাপন্ন হব না। চীন-ইউরোপ-আমেরিকাকে করোনা যেভাবে কাবু করতে পেরেছে এবং তাদের অর্থনীতিতে যতটা সংকট তৈরি করছে তার কোনোটাই বাংলাদেশে ঘটবে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এবং আমাদের নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, উৎপাদক সবাইকেই তাদের স্ব-স্ব দায়িত্ব পালন করতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য অতি জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়াবে চীন কীভাবে তার পুরো অর্থনীতি ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে গুছিয়ে নেয়। চীনের জন্য সুখবর হলো এরই মাঝে তারা করোনাকে প্রায় নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে। ১২ মার্চ চীনে করোনা আক্রান্ত লোকের সংখ্যা দশের নিচে নেমে এসেছে। এটি ধারণা করা যেতে পারে যে চীন অতি দ্রুত তার উৎপাদন ব্যবস্থা সচল করবে ও বিশ্ব অর্থনীতির পতনের চাকাটাকে তার মতো করে কিছুটা থামাতে পারবে।

আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের শ্রমজীবী মানুষগুলোকে কর্মক্ষম রাখা। অনেক দেশ এখন ভিসা বন্ধ করার পাশাপাশি যাতায়াতও বন্ধ করেছে। এই অবস্থাটি মোকাবিলায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্বাসে আমরা আশ্বস্ত হতে পারি।

সার্বিকভাবে এটি বলার বিষয় যে রোগকে প্রতিরোধ করার জন্য যে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তেমনি করোনা প্রভাবিত অর্থনীতি-ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্পকে সচল রাখার জন্যও সক্রিয় থাকি।

লেখক ● তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলাম লেখক এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী 

[email protected]