• ঢাকা
  • শনিবার, ০৬ জুন, ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
প্রকাশিত: এপ্রিল ৩, ২০২০, ১০:২৫ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ৩, ২০২০, ১০:২৮ পিএম

কোভিডের ভয়াবহ ঝুঁকিতে বাংলাদেশ, বাঁচতে হলে যার বিকল্প নাই

সাঈদ আহমেদ
কোভিডের ভয়াবহ ঝুঁকিতে বাংলাদেশ, বাঁচতে হলে যার বিকল্প নাই
সাঈদ আহমেদ

করোনাভাইরাস জনিত রোগ কোভিড-১৯ প্রতিরোধে আমরা কি ভুলপথে হাঁটছি? পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে শুধুই লকডাউন কি যথেষ্ট?

গৃহীত পদক্ষেপ প্রতিনিয়ত যাচাই-বাছাই করা অত্যন্ত জরুরি। বিশ্বে ভাইরাসের ধরন ও বিস্তৃতি পর্যবেক্ষণ, বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ এবং আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ আমাদের বাঁচাতে পারে এই প্রাণঘাতী ভাইরাস থেকে। অন্যথায়, ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সময়ক্ষেপণ আনতে পারে ভয়াবহ বিপর্যয়।

দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় দিনের পর দিন লকডাউন চলতে পারে না, একইভাবে টেস্ট না করে সবাইকে গণহারে ঘরবন্দি করে রাখাটাও বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না।  ভাইরাস বিশ্ব ভ্রমণ করছে এবং ছড়িয়ে পড়ছে খুব দ্রুত। মাত্র তিনমাস আগে আক্রান্ত ছিল শুধু চীন। তখন আমরা ব্যস্ত ছিলাম চীনের সমালোচনায়। নিজেরা কোনও প্রস্তুতি নেই নাই। অনেকেই এটাকে চীনের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ভেবেছে এবং চীনকে গালি-গালাজ করেছে। অথচ চীন থেকে ভাইরাস গেলো ইউরোপে। সাথে সাথে আমেরিকা।  গত কয়েকদিনে যুক্তরাষ্ট্রে মৃতের সংখ্যা হয়েছে দ্বিগুণ। 

জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৫০ হাজার ২৩০ জন। আক্রান্ত হয়েছেন ৯ লাখ ৮১ হাজার ২২১ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন দুই লাখ ৪ হাজার ৬০৫ জন।

করোনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে ইতালিতে। দেশটিতে এ পর্যন্ত ১৩ হাজার ৯১৫ জনের প্রাণহানি হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ ১৫ হাজার ২৪২ জন। সুস্থ হয়েছেন ১৫৮ হাজার ২৭৮ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ইতালিতে মারা গেছেন ৭৬০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৩০০ মানুষ। যার মধ্যে আছেন ১৮ বাংলাদেশিও। এই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ৫৩ বাংলাদেশিসহ প্রাণহানি ৫ হাজার। আক্রান্ত ২ লাখেরও বেশি।ইতালির পর স্পেনেও প্রাণহানি ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। দেশটিতে মোট প্রাণহানি ১০ হাজার ৩ জন। স্পেনে সেখানে এ পর্যন্ত মোট ১ লাখ ১০ হাজার ২৩৮ জন আক্রান্ত হয়েছে করোনাভাইরাসে।

দেশে নতুন করে আরও ৫ জনের শরীরে কোভিড-১৯ শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে দেশে কোভিডে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬১ জন।  স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) কোভিড সংক্রান্ত অনলাইন ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় এ ভাইরাসে কেউ মারা যায়নি। ফলে দেশব্যাপী এ ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা যা ছিল তাই আছে। মোট মৃত ৬ জন। তিনি বলেন, ২৪ ঘণ্টায় দেশে ৫১৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। (আপডেট- বাংলাদেশ সময় রাত ১০ টা ১৬ মিনিট, ৩ এপ্রিল, ২০২০)।

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও চিকিৎসার জন্য বিখ্যাত বড় বড় দেশগুলোর যদি এই শোচনীয় অবস্থা হয় তবে মহামারি লাগলে আমাদের কী হতে পারে ভাবতে পারেন? পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশগুলো অসহায় হয়ে গেছে।  নিউ ইয়র্কে সংক্রমণের সংখ্যা সবার উপরে। নিউ ইয়র্কের মেয়র অনুরোধ করেছেন দেশের অন্যান্য স্থানের ডাক্তার ও নার্সদের সেখানে গিয়ে সেবা দিতে। নিউ ইয়র্কের স্টেটেন আইল্যান্ড ইউনিভার্সিটি হসপিটালের নার্স যিনি ৩৭ বছর ধরে এই পেশায় আছেন তাকে আমরা প্রায় কাঁদতে দেখেছি। যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।  তিনি তার দীর্ঘ পেশা জীবনে আইসিইউতে এমন ভয়াবহ অবস্থা দেখেননি। স্বাস্থ্য সেবায় অনন্য ইউরোপের দেশগুলো আজ অসহায়। ইতালিতে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের প্রায় বাইরে চলে গেছে। স্পেনের অবস্থা ভয়াবহ। সেখানে কয়েকশত চিকিৎসক মারা গেছেন। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশগুলোর অবস্থা যদি হয় এমন আমাদের দেশে মহামারি লাগতে কী হতে পারে ভাবা যায়? আর মহামারি যে হবে না তা কি আমরা বুকে হাত দিতে বলতে পারি? আমরা কিন্তু নিশ্চিত নই ঠিক কতজন এই ভাইরাস বয়ে বেড়াচ্ছেন। আমাদের বিশ্বাস করতে হবে যে এটা আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন।

আমাদের দেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত বন্ধ করে লকডাউন করে দেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে। দেশের মানুষের সংখ্যা কমপক্ষে ১৬ কোটি। যারা লকডাউনে আছেন তারা কি সবাই করোনাভাইরাস মুক্ত? যেহেতু ১৪ দিনের আগে এই ভাইরাসের লক্ষণ প্রকাশিত হয়না আমরা এখন নাও জানতে পারি। যদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই অন্যান্যের সাথে বসবাস করেন তবে তিনি অন্যদের সংক্রমিত করবেন যেমনটি হয়েছে ঢাকার টোলারবাগে। ইতালিফেরত ছেলে দ্বারা বাবা সংক্রমিত হয়েছেন। এভাবে যদি সারাদেশে পরীক্ষার অভাবে কয়েক হাজার অশনাক্ত কিন্তু সংক্রমিত ব্যক্তি থাকেন তারা কয়েক লাখ মানুষকে সংক্রমণ করবে। তখন একই সাথে এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে সেবা দেয়ার সক্ষমতা আছে?

বাঁচতে হলে যে পরিকল্পনায় যেতে হবে সেটা হল ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আইসোলেশন। সরকার ১১ এপ্রিল পর্যন্ত অফিস আদালত বন্ধ করেছেন। এটা ভালো সিদ্ধান্ত। এখন থেকে প্রথম পর্যায়ে এক মাসের পরিকল্পনায় যেতে হবে। এতে দিনমজুরদের কষ্ট হবে কিন্তু এর বিকল্প নেই। অনেক ব্যক্তি ও সংগঠন গরিব-অসহায়দের সাহায্য করছেন। এটা অব্যাহত থাকলে এক বা দুই মাস আমরা চালিয়ে নিতে পারবো। প্রতিটি জেলায় একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা সদর হাসপাতালে কমপক্ষে ১০০ বেডের আইসোলেশন সেন্টার খোলা হবে তার দেখভাল করবে স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও সেনাবাহিনী। সেখানে প্রয়োজনীয় ডাক্তার, নার্স, পিপিই সহ সব ওষুধ সরবরাহ করা হবে। সরকারের সব অনুদানসহ  যে কোনও আর্থিক যোগান সেনাবাহিনীর মাধ্যমে হতে হবে। না হলে বালিশ, অ্যাপ্রোণ, নারকেল গাছ, টিনের চালা কিনেই সব শেষ করে ফেলবে। দ্বিতীয় পদক্ষেপ হল ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। প্রতিটি জেলায় জেলা প্রশাসক ও সেনাবাহিনীর যৌথ নেতৃত্বে পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজ চলবে। জেলার সব সরকারি ও বেসরকারি (মান নিশ্চিত করে) হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে দায়িত্ব দেয়া হবে। তদারক করবে সেনাবাহিনী। পুলিশ নিশ্চিত করবে সবাই পরীক্ষা করছে কি না। যারা পজিটিভ হবে তাদের বাধ্যতামূলকভাবে আইসোলেশনে যেতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্ব পূর্ণ হলো— অর্থের যোগান। সরকার ও জনগণকে বিশ্বাস করতে হবে যে আমরা খুব বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছি এবং আমাদের অস্তিত্ব সঙ্কটাপন্ন। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ খেলাপিদের তালিকা সংগ্রহ করে সরকার তাদের কাছে টাকা ফেরত চাইবে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে টাকা দিতে হবে অথবা তাদের বিরুদ্ধে মামলা করবে বা তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দেয়া হবে। ওষুধ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো ওষুধ পাঠাবে। না দিলে মামলা বা লাইসেন্স বাতিল। প্রয়োজনে সরকার তাদের আয়কর মাফ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর তহবিলের অর্থ ও ঋণ খেলাপিদের কাছ থেকে আদায়কৃত অর্থ থেকে ভাইরাস শনাক্তকরণের যাবতীয় কিট কেনা হবে। শনাক্তকরণের সহজ ও সাশ্রয়ী পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র যে দাবি করছে তা যদি সত্য হয়, তাহলে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে তা ব্যবহার করতে হবে, প্রয়োজনে পেটেন্ট কিনে নেবে সরকার। টাকা আদায়ের জন্য ঋণখেলাপিদের বাধ্য করা এবং জনগণকে পরীক্ষা করতে ও আইসোলেশনে বাধ্য করতে প্রয়োজনে সংসদে আইন পাস করবে সরকার। পরিশেষে আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতামত হলো— এই ক্রান্তিলগ্নে অন্য মন্ত্রণালয় বাদ দিয়ে হলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজের হাতে নিলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সহজ হবে। পুনরায় বলতে চাই, আমাদের দেশকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিশ্বাস করতে হবে এবং করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন মনে করতে হবে। শুধু তাহলেই ইউটোপিয়ার মতো শোনা গেলেও এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব যার কোনও বিকল্প নাই।

লেখক ● শিক্ষক, কিং খালিদ বিশ্ববিদ্যালয়