• ঢাকা
  • শনিবার, ০৬ জুন, ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৮, ২০২০, ০৭:৫২ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ১৮, ২০২০, ০৭:৫৫ পিএম

পুরো পৃথিবীর আজ গভীর অসুখ

জহিরুল হক বাপি
পুরো পৃথিবীর আজ গভীর অসুখ
জহিরুল হক বাপি

ছোটবেলার একটা ঘটনা দিয়ে শুরু করি। ছোটবেলা মানে এইচএসসির পরের সময়। আমার কিন্ডারগার্টেন ও পাশাপাশি বাসার এক বন্ধু বরিশাল মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলো। সেখানে থাকে। ঢাকা আসে। বরিশালের গল্প করে। আমার ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাস কিন্তু বরিশাল যাওয়া হয় নাই। বরিশালের প্রতি আমার আলাদা একটা আকর্ষণ ছিল। কবি জীবনানন্দ দাশের বরিশাল। বন্ধুর মুখে বরিশালের গল্প শুনে বরিশাল যাওয়া একেবারে ফরজ হয়ে গেল। একদিন সন্ধ্যায় বন্ধুর জমজ বোন, আরও ২/৩ জন বন্ধু মিলে সদরঘাট থেকে বরিশালের উদ্দেশে রওনা দিলাম।

ডেকে রাতভর আড্ডা-টাড্ডা দিতে দিতে সকালে বরিশাল নামলাম। সদরঘাট থেকে সোজা লেডি হোস্টেল। কিন্তু বন্ধু হলে নাই। সেখান থেকে গেলাম ছেলেদের হলে। বন্ধুর মেডিকেলের বন্ধুর রুমে। সেখানে জানতে পারলাম বন্ধু গেছে স্থানীয় এক বাসায় গোছল করতে। ৪ দিন ধরে ছেলে বা মেয়েদের হলে পানি নাই। ছেলেরা হলের সামনের পুকুরে গোছল করে। কিন্তু মেয়েদের গোছল করা খুব সমস্যা। দেখার কেউ নাই। যে যার মতো ব্যবস্থা করছে। ঘটনাটা তখনই আমার মনে খুব দাগ কেটে ছিল বলে এখনও মনে আছে। এই যে বিশৃঙ্খলা, দায়িত্ব-জ্ঞানহীনতা খুব সহজেই একজন শিক্ষার্থীর অভ্যাসে ঢুকে যেতে পারে, ঢুকাটা খুবই স্বাভাবিক। এই সব বিশৃঙ্খলা, দায়িত্ব-জ্ঞানহীনতাই মনে ভেতর সহজ মনে হয়ে যায়। পরবর্তী জীবনে শিক্ষার্থীদের কাছে এই সবই স্বাভাবিক আচরণ। 

আজ পুরো পৃথিবীর গভীর অসুখ। প্রতিটা দেশ করোনার সাথে নিজেদের মতো যুদ্ধ করে যাচ্ছে। এই যুদ্ধের প্রধান সৈনিক চিকিৎসারা। আমাদের দেশের শ্রদ্ধেও চিকিৎসকরাও জানবাজি রেখে লড়াই করছেন। কিন্তু কিছু কিছু চিকিৎসকের বিরুদ্ধে দায়িত্ব অবহেলা, চিকিৎসা না করার অভিযোগ উঠেছিল প্রথম দিকে। এর মধ্যে উল্লেখ্য করার মতো ঘটনা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসরা। সদ্য ফাইনাল দেয়া একবারেই নতুন এই চিকিৎসকরা ভয়াবহ ছোঁয়াচে করোনা রোগীর চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃত জানিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কর্তৃৃপক্ষ কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। দেশের, মানুষের যে কোনও বিপদ আপদে তরুণাই এগিয়ে যায়। প্রাণের ঝুঁকি থাকলেও হিসাব করে না।

পৃথিবীর নিয়মই এই। কিন্তু এই নিয়ম এই তরুণ, সদ্য চিকিৎসকরা ভাঙল কেন? এইটা ভাবা খুব জরুরি। এ বিষয়ে ভাবতে ভাবতে আমার চোখে, মনে কিছু ব্যাপার ধরা পড়লো। আমি বিশেষজ্ঞ নই। সাধারণ জ্ঞানে যা চোখে পড়ল তাই লিখছি।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাজ কি? শুধু সিলেবাস শেষ করা? আমরা যদি প্রাচীন ইতিহাস বা বিশ্বের দিকে তাকাই উত্তর হচ্ছে ‘না’। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান দায়িত্ব ‘মানুষ’ তৈরি করা। দ্বিতীয় দায়িত্ব পেশাজীবী তৈরি করা। ময়মনসিংহ মেডিকেলর ঘটনা থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি আমরা দুই জায়গায়ই ফেল করেছি। উল্টা প্রকৃতির নিয়ম ধ্বংস করে দিয়েছি। তা না হলে ওইসব নবীন চিকিৎসক তো আগ বাড়িয়ে আসার কথা। কেন এমন হলো? আমি ওই তরুণদের দোষ দিতে পারছি না। তারা শিক্ষাটা পেয়েছে কি? চিকিৎসা বিদ্যার সাথে সাথে তাদের মানসিক গঠন তৈরির জন্য একাডেমিক ভাবে কতটুকু শিক্ষা দেয়া হয়েছে? সম্ভবত কিছুই না। তাদের নৈতিক শিক্ষা, চিকিৎসক হিসাবে ‘অহম’ তৈরির জন্য নির্ভর করা হয়েছে হাওয়ার ওপর। কিন্তু সে হাওয়াও তো দূষিত। এ নবীন চিকিৎসকরা সিনিয়র, শিক্ষকদের দেখে কি শিখেছে? এ নিয়ে নতুন করে বলার কিছুই নাই। সিনিয়ররাও তাদের সিনিয়রদের দেখে দেখে একই মানসিক অবস্থায় গেছে। প্রথমেই আমি আমার বন্ধুর মেডিকেল জীবনের একটা ঘটনা বলেছি এই কারণেই। পারপার্শিক ঘটনা যে কোনও মানুষের ওপর প্রচণ্ড প্রভাব ফেলে। শাস্তি দিলে তো যে কাউকেই শাস্তি দেয়া যায়। ‘শাস্তি’ শব্দটা আসলে এক ধরনের অসহায়ত্ব। শাস্তি দিয়ে ২/১ জনের মানসিক অবস্থা হয়ত নিয়ন্ত্রণ করা যায় কিন্তু মানসিক পরিবর্তন অসম্ভব। মানসিক অবস্থা তৈরির জন্য দরকার প্রশিক্ষণ। একজন চিকিৎসককে যেমন এনাটমি, সার্জারি, রোগ, ওষুধ মুখস্থ করানো হয় তেমনি তার মানসিক অবস্থাকেও ‘চিকিৎসক’ হিসাবে তৈরি করতে হয়। সামরিক বাহিনীতে সমর বিদ্যা শেখানোর সাথে তাকে মানসিকভাবে ‘সৈনিক’ হিসাবে গড়ে তোলা হয়। তাই তো যুদ্ধ ক্ষেত্রের একজন সৈনিক পাশের যোদ্ধাকে গুলি, গোলায় মরে যেতে দেখেও ভয়ে পালায় না। এগিয়ে যায় শত্রু নিধনে। কখনও কখনও মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও সৈনিক আগায়। প্রশিক্ষণের সময় সমর বিদ্যার সাথে সাথে বিভিন্ন অ্যাকাডেমিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তার মানসিক অবস্থা এমন তৈরি করা হয়। একদিন করোনার এই দুর্যোগ কেটে যাবেই যাবে। আমাদের তখন মনোযোগ দিতে হবে শিক্ষা ক্যারিকুলামের ওপর। এই মুহূর্তে যেহেতু চিকিৎসকরা প্রথম সারির যোদ্ধা তাই তাদের শিক্ষার ব্যাপারে বললাম। নজর দিলে দেখা যাবে প্রতিটি সেক্টরের অবস্থাই এক। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর্থিক উন্নতির শিক্ষা দেয়া হচ্ছে আর আত্মার উন্নতির জন্য আমরা শিক্ষার্থীদের ছেড়ে রেখেছি হাওয়ার ওপর। সেই হাওয়াও দূষিত। আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করবো নবীন ওই চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে যেন কোনও ব্যবস্থা না নেয়া হয়। বরং তাদের অবস্থা দেখে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা যেন গভীর ক্ষত, বিষগুলো, ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করেন। এগুলো সমাধানের ব্যবস্থা করেন।

লেখক ● লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা