• ঢাকা
  • শনিবার, ০৬ জুন, ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৪, ২০২০, ০৬:০৬ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ২৪, ২০২০, ০৬:০৯ পিএম

করোনাভাইরাস : ‘কলঙ্ক’ আরোপের রাজনীতি

রাশেদ খান মেনন
করোনাভাইরাস : ‘কলঙ্ক’ আরোপের রাজনীতি
রাশেদ খান মেনন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডব্লুএইচও অর্থাৎ ‘হু’-কে অর্থায়ন বন্ধ করতে তার প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন। করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভূমিকায় ট্রাম্প যে ক্ষুব্ধ ছিলেন তা তিনি আগেই বলেছিলেন। এবং এই বলে হুমকি দিয়েছিলেন যে তিনি জাতিসংঘের এই সংস্থাটিকে অর্থ দেয়া বন্ধ করে দেবেন। তার অভিযোগ করনো ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পরিপ্রেক্ষিতে ডব্লুএইচও  তার মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে।

হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভূমিকা যাচাই করে দেখার নির্দেশ দিয়েছি। তার আগ পর্যন্ত সংস্থাটিতে তহবিল বন্ধ করার নির্দেশ প্রশাসনকে দিয়েছি। ট্রাম্প এর আগে অভিযোগ করে বলেছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ডব্লুএইচও-কে বেশি অর্থ দেয়। অথচ কোন কারণে ডব্লুএইচও খুব চীন কেন্দ্রিক। এর আগে সংবাদ মাধ্যমে তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে গত গত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে চীনে যখন করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হয় ‘হু’ তখন সে তথ্যটি বিশ্বকে জানায়নি। চীন যেভাবে বলেছে তারা সেভাবেই বিষয়টাকে নিয়েছে। 

আসলে ট্রাম্পের খড়গাঘাত ‘হু’-র উপর পরলেও তার আসল অভিযোগ চীনের বিরুদ্ধে। এটা অনেকটা ঝিকে মেরে বৌকে শেখানোর সেই পুরান কারণ। ডব্লুএইচও-কে এই মুহূর্তে বিপদে ফেলার কারণ এই যে ট্রাম্প যেভাবে করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের দায় চীনের ঘাড়ে চাপাতে চেয়েছিল ডব্লুএইচও তাতে রাজী হয়নি। ট্রাম্প করোনা ভাইরাসকে ‘চায়না ভাইরাস’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তার পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পিউ একে ‘উহান ভাইরাস’ বলে অভিহিত করেন। আর হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা একে ‘কুঙফ্লু’ বলেন। 

ডব্লুএইচও-র প্রধান তেদেরাস আধানোম গেব্রোয়াসুগে তার সংস্থাকে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়ার হুমকি এবং এসব কথার পরিপ্রেক্ষিতে করোনা ভাইরাস ইস্যুকে রাজনীতিকরণ করতে না বলেন। তিনি বলেন, আরো কফিন দেখতে না চাইলে করোনা ভাইরাস নিয়ে রাজনীতি বন্ধ করুন। 

বস্তুতঃ চীনে করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই চীন, চীনা কর্তৃপক্ষ ও চীনা জনগণকে নানাভাবে হেয় করা, বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের জন্য তাদের দায়ি করে পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রচার শুরু হয়। বলা হয় যে চীনা কর্তৃপক্ষ করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের তথ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে গোপন করেছিল। অথচ ডিসেম্বর ২৮-২৯ তারিখ এই নতুন ভাইরাস সংক্রমণ সম্পর্কে জানতে পারার পর চীনা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ৩১ ডিসেম্বর ডব্লুএইচও-কে অবহিত করে। এবং এই সংক্রমণ যাতে ছড়াতে না পারে তার জন্য প্রথমে হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানকে সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়, পরে সমগ্র হুবেই প্রদেশকেই সমস্ত দেশ ও বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। চীনা বিজ্ঞানীরা অতি দ্রুত তার সাথে নভেল করোনা ভাইরাসের জেনোম সিকোয়েন্স আবিস্কার করে এবং সে তথ্যও বিশ্বকে জানিয়ে দেয়। উহানের সকল অধিবাসীকে গৃহবন্দী করে তাদের ঘরে খাবার পৌঁছানোর দায়িত্ব নেয় চীনা কর্তৃপক্ষ। একই সময় সারা চীন থেকে কয়েক হাজার ডাক্তার ও নার্স নিয়ে আসা হয় উহানে। মাত্র কয়েকদিনে কয়েক হাজার বেডের এক হাসপাতাল তৈরি করে ফেলে তারা। অন্যান্য হাসপাতালগুলোতেও করোনা চিকিৎসার উপযোগী করা হয়। করোনা প্রতিরোধে চীনের এই কর্মযজ্ঞ অবাক বিস্ময়ে দেখেছে বিশ্ব। আর এই সময়টাতে তাদের এই লড়াই ছিল একক। বরং ট্রাম্প সাহেবরা এ নিয়ে চীনকে উপহাস করেছে। করোনা ভাইরাসকে আখ্যা দিয়েছে ‘চীনা ভাইরাস’ বলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতম সহযোগী ইজরায়েলী গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদে’র প্রাক্তণ প্রধান অভিযোগ করেন যে চীনের জীবাণু যুদ্ধের গবেষণাগার থেকে এই ভাইরাসটি অসাবধানতায় বেরিয়ে পড়ে এবং চীনের মাধ্যমে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জীবাণুযুদ্ধ নিয়ে কাজ করা এক বিজ্ঞানি মিঃ ফয়েলও একই দাবি করেন। তবে ঐ দাবি করতে গিয়ে তিনি নিজেই তার সংশয়ের কথাও ব্যক্ত করেন। ইতিমধ্যে পৃথিবীর জীবাণু বিজ্ঞানীরা তাদের নিজ নিজ দেশে গবেষণা করে বলেছেন যে এই ভাইরাস কোনভাবেই মনুষ্যসৃষ্ট নয়। কোন গবেষণাগারে সৃষ্ট না তো বটেই। তারা বলেন যে সার্স ভাইরাসে আরেকটি প্রজাতি এই ভাইরাস এবং কোন দেশ থেকে উৎপন্ন হয়েছে বলে বলা ঠিক হবে না। 

কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ও তার অনুগত গণমাধ্যমগুলো এই প্রচার থেকে পেছোচ্ছো না। ফক্স নিউজ তো বটেই, ট্রাম্পবিরোধী বলে পরিচিত ওয়াশিংটন পোস্টসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে মাঝে মাঝেই করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবকে কেন্দ্র করে তাদের চীনবিরোধী প্রচার করে যাচ্ছে। তাদের এই প্রচারের বিষয়বস্তু হল চীন তার দেশে ঐ ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা যেখানে চল্লিশ হাজারের ওপর তা গোপন করছে। অথবা চীন বিভিন্ন দেশে করোনা প্রাদুর্ভাব রুখতে প্রয়োজনীয় মাস্ক, পিপিই ইত্যাদি নিয়ে ব্যবসা করছে। কোথাও কোথাও দুই নম্বরী সামগ্রী সরবরাহ করছে। এই প্রচারে বিশেষভাবে এগিয়ে ভারতও। ভারতের কিছু টেলিভিশনকে মনে হয় এ ধরনের প্রচারণার জন্য ডেডিকেট করা হয়েছে। করোনা ভাইরাস নিয়ে চীনাবিরোধী গান বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়ে দিচ্ছে। এমনকি ভারতের সাউথ ব্লক থেকে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস, রাজনীতিক, সংবাদপত্রের ক্লিপ, ভিডিও প্রভৃতি পাঠানো হচ্ছে।

বাংলাদেশেও এই প্রচার কম হয়নি। চীনে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হলে সংবাদপত্রে বিজিএমএ ও বিকিএমই-এর নেতারা এমন বক্তব্য দেয়া শুরু করেন যে চীন থেকে গার্মেন্টস-এর ফেব্রিক্স ও অন্যান্য এক্সেসরিজ আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংস হতে বসেছে। অবশ্য তারা এখন অন্য কথা বলছেন। বলছেন যে আমেরিকা ও ইউরোপের ক্রেতারা ক্রয়াদেশ বাতিল করায় গার্মেন্টস শিল্প সংকটে পড়ে গেছে। সরকার তাদের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণার পরও বিজেএমইএ-র সভাপতি রুবানা হকের বক্তব্য অনুসারে প্রায় বাইশ শতাংশ গার্মেন্টস এখনও মার্চের বেতন শোধ করেননি। যতনা ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে তার চেয়ে বেশি ছাঁটাই হয়েছে। ‘সঙ্গনিরোধ’কে উপেক্ষা করে গার্মেন্টস শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করতে বাধ্য হচ্ছে। 

চীন যখন উহানের সংক্রমণের বিস্তৃতিতে জেরবার তখনও পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার ও তার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চীনের প্রতি সহনাভূতিসূচক কোনো বক্তব্য রাখেনি। পরে প্রধানমন্ত্রী নিজে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিন পিং-কে চিঠি দেন এবং কিছু প্রতিকী সাহায্য পাঠান যা চীন গভীর কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করে বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ পিপিই, মাস্ক ও কীট পাঠিয়েছে। বাংলাদেশের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বিবেক না টললেও চীনের আলিবাবা-র প্রতিষ্ঠিত জ্যাক মা বিপুল পরিমাণ স্বাস্থ্য সামগ্রী পাঠান বাংলাদেশে। পশ্চিমা গণমাধ্যমে উদ্ধৃত করে বাংলাদেশের গণমাধ্যমেও চীনবিরোধী প্রছন্ন প্রচার এখনও অব্যাহত আছে। একটি দৈনিকের সিনিয়র সাংবাদিক তো লিখেই বসেন যে, ইটালী ও ইরান চীনের ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোডে’ সংযুক্ত হওয়াতেই ঐ দুই দেশে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ এত মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এখন বাংলাদেশে যখন এর প্রসার ঘটছে তখন তারা কি বলবেন জানি না। 

তবে চীন খুব মাথা ঠান্ডা করে এসব প্রচারের জবাব দিয়েছেন এই বলে যে, এখন কাউকে ‘কলঙ্ক আরোপ’ (Stigmatization)  দেবার সময় নয়। বিশ্বের সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ করতে হবে। এর জন্য ইতিমধ্যে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগ ৩০০ সদস্যের এশিয়ান পলিটিক্যাল পার্টিস এসোসিয়েশনে স্টান্ডিং কমিটির সাথে যৌথ উদ্যোগে অন লাইন কনফারেন্স করেছে। এসব রাজনৈতিক দল যৌথ চিঠিতেও স্বাক্ষর করেছে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে পরস্পরের সহযোগিতা ও ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের ব্যাপারে। কেবল তাই নয় চীন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ডাক্তার ও তাদের স্বাস্থ্য কর্মীও পাঠাচ্ছে। সবচাইতে বড় বিষয় চীন উহানে সংক্রমণ কার্যকরভাবে সীমিত রাখতে পারলেও করোনা ভাইরাস সংক্রমণ থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। সেখানে আবার নতুন করে সংক্রমণের ঘটনা ঘটছে। সেখানে কেউ যদি একথা বলে চীন বিশ্ব আধিপত্য কায়েম করার করনোভাইরাস জীবাণু পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিচ্ছে তা’হলে সেটা কতখানি বিশ্বাসযোগ্য হবে। তবে চীনকেও এগিয়ে আসতে হবে। উহানে সংক্রমণ ও মৃত্যু সীমিতকরণ করার মধ্য দিয়ে চীন যে তার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে তার অভিজ্ঞতা বিশ্বের সাথে ভাগাভাগি করে নিতে হবে। তা’হলেই চীন তার আন্তর্জাতিক দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারবে। 

লেখক ● সংসদ সদস্য, সভাপতি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ও সাবেক মন্ত্রী 

আরও পড়ুন