• ঢাকা
  • বুধবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২১, ৭ মাঘ ১৪২৭
প্রকাশিত: নভেম্বর ১২, ২০২০, ০৫:৫৯ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ১২, ২০২০, ০৫:৫৯ পিএম

ব্যবসায় সিন্ডিকেট এবং আলুর দোষ

প্রণব মজুমদার
ব্যবসায় সিন্ডিকেট এবং আলুর দোষ
প্রণব মজুমদার

ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কাছে কোনো নিয়মনীতিই টিকছে না। বাজার ব্যবস্থাপনা তো দূরের বিষয়। মুনাফার ক্ষেত্রে দেশের ব্যবসায়ীরা বেশ সংঘবদ্ধ। তাদের দৌরাত্ম্য রোধ করা অসাধ্য। বরং ব্যবসায়ীরা ঢুকে পড়েছে সরকারের নীতিনির্ধারণে। টিআইবির দেয়া এক উপাত্তে দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা জাতীয় সংসদে মোট সদস্যের মধ্যে ৬১ শতাংশই ব্যবসায়ী।

সাম্প্রতিককালে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিশেষ করে সবজি বাজার লাগামহীন। বিগত কয়েক বছরে পেঁয়াজপণ্য ভোক্তাদের ভোগান্তিতে রেখেছে। করোনার ক্রান্তিকালেও এ পণ্যে ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষদের বেশ ভুগিয়েছে।

ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট বাণিজ্যের সর্বশেষ সংযোজন পণ্য হচ্ছে আলু। দেশের প্রথম শ্রেণির এক দৈনিকের খবর আলু সিন্ডিকেটে ব্যবসায়ীরা হাতিয়ে নিয়েছে হাজার কোটি টাকা। আলুর দাম বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাইনি। তার পরও আমরা অসহায় এই সিন্ডিকেটের কাছে।

চলতি মওসুমে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মাঠে আলু চাষ করছেন প্রায় সাড়ে ৭ লাখ চাষি, যা দেশের মোট চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সবজি পণ্যটির উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৮ লাখ টনেরও বেশি। উদ্বৃত্ত উৎপাদন সত্ত্বেও কয়েকদিন ধরে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি চলছে আলুর বাজারে। ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি কেজি আলুর দাম ৫০ টাকা ছাড়িয়েছে। অথচ সেই আলুই উৎপাদন মৌসুমে এক-চতুর্থাংশ দামে কৃষকের কাছ থেকে কিনেছিলেন হিমাগার মালিক ও মজুদদার ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, বাংলাদেশে আলুর বার্ষিক চাহিদা ৬৫ লাখ টন। এ কাজে ৭ লাখ ৫০ হাজার কৃষক সরাসরি জড়িত, যার ৩০ ভাগই নারী। বাংলাদেশ পৃথিবীর সপ্তম বৃহত্তম আলু উৎপাদনকারী দেশ এবং এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলে আলু উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। 

দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা বলেছে, চলতি বছরের উৎপাদন মৌসুমে তারা প্রতি কেজি আলু ১২-১৫ টাকায় বিক্রি করেছেন। সেই আলু কিনে মজুদ করেন হিমাগার মালিক ও ব্যবসায়ীরা, যা এখন হিমাগার গেটে বিক্রি হচ্ছে ৩৫ টাকার বেশি দামে। ৬০ কেজির এক বস্তা আলু হিমাগারে সংরক্ষণে তাদের খরচ পড়ে ১৮০-২২০ টাকা। ক্রয়মূল্য, হিমাগার খরচ ও অন্যান্য খরচ মিলে প্রতি বস্তা আলুতে মোট খরচ হয় ১ হাজার ২০০ থেকে দেড় হাজার টাকা। কিন্তু সেই আলু এখন ২ হাজার ১০০ টাকারও বেশি দামে বিক্রি করছেন হিমাগার মালিক ও ব্যবসায়ীরা।

আলুর দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেয়ায় ব্যবসায়ীদের সমালোচনা করেছেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক। মন্ত্রীর মতে, এক কেজি আলুতে ২০ টাকা লাভ করছেন তারা। বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি এবং নানা কারসাজির কারণে দাম নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন একটা কাজ। এ বছর আলুর বাড়তি চাহিদার সুযোগ নিচ্ছেন ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকরা। তিনি বলেন, এখন তো প্রান্তিক কৃষকের হাতে আলু নেই। আলুর দাম বাড়ায় নিম্নআয়ের মানুষ, শ্রমিক তাদের অনেক কষ্ট হয়েছে বলে জানান তিনি।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মৌসুমে কেনা দাম, হিমাগার ভাড়া ও অন্যান্য খরচ মিলে প্রতি কেজি আলুর পেছনে খরচ পড়ে ১৮ টাকা ৯৯ পয়সা। সে হিসেবে প্রতি কেজি আলু ২০ টাকা দামে বিক্রি করলেও লাভবান হতে পারেন হিমাগার মালিকরা। ফলে হিমাগার পর্যায়ে ২ থেকে ৫ শতাংশ মুনাফা যোগ করে ২৩ টাকা, পাইকারি পর্যায়ে ৪-৫ শতাংশ মুনাফা যোগ করে ২৫ টাকা এবং খুচরা পর্যায়ে ১০-১৫ শতাংশ মুনাফা যোগ করে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা বেঁধে দেয়া হয়েছে প্রতি কেজি আলুর দাম। সরকার আলুর দর পুনঃনির্ধারণ করে দেয়ার পরও রাজধানীসহ দেশের কোথাও সেই নির্ধারিত দরে আলু বিক্রি হয়নি। খুচরা ক্রেতাকে কেজি প্রতি এর দাম দিতে হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। খোদ সরকারেরই সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) দৈনন্দিন বাজারদরের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এখনো প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়। শুধু তাই নয়, অভিযোগ রয়েছে হিমাগারগুলোতেও সরকার নির্ধারিত দরে আলু বিক্রি হচ্ছে না। তা হলে কাদের স্বার্থে আবার আলু দর পুনঃনির্ধারণ করে দেয়া হলো? আগের নির্ধারিত দর থেকেই বা কেন সরে আসা হলো? তার মানে হলো মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের আলুর দোষ রয়েছে।

পাইকারি পর্যায়ে নতুন নির্ধারিত দাম অনুযায়ী অতিরিক্ত ৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একশ্রেণির ব্যবসায়ী। একইভাবে খুচরা ব্যবসায়ীরাও অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। সব মিলিয়ে এই সিন্ডিকেট আলু থেকেই কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

আলুর এই বাড়তি দরের কতটুকু সুবিধা পাচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকরা। কিংবা হিমাগারে আদৌ তাদের কোনো আলু আছে কি? সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হিমাগারে প্রান্তিক কৃষকের খাদ্য হিসেবে বিক্রি করার মতো কোনো আলু নেই। যা আছে তা বীজ আলু। কারণ, প্রান্তিক কৃষকরা এতই গরিব যে, তারা ঋণ করে চাষাবাদ করেন। ফলে নতুন আলু ওঠার পরপরই তা বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। হিমাগার মালিক ও ব্যবসায়ীরা এই আলু কিনে হিমাগারে মজুদ রাখেন। দেশে সবচেয়ে বেশি আলু উৎপাদন হয় মুন্সীগঞ্জ জেলায়। জানা গেছে, এ জেলায় এবার প্রায় সাড়ে ৩৭ হাজার হেক্টর জমিতে ১৩ লাখ ২৭ হাজার ২৭ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হয়েছে। মুন্সীগঞ্জে সচল ৬৬টি হিমাগারে সংরক্ষিত এসব আলুর বেশির ভাগেরই মালিক ব্যবসায়ীরা।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, প্রতি কেজি আলুর উৎপাদনে খরচ হয় ৮ টাকা ৩২ পয়সা। মৌসুমের সময় ক্রয়মূল্য, হিমাগার ভাড়া ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে হিমাগার গেটে প্রতি কেজি আলুর দাম পড়ে ১৮ টাকা ৯৯ পয়সা। প্রথমে গত ৭ অক্টোবর হিমাগার পর্যায়ে প্রতি কেজিতে ৪ টাকা মুনাফা ধরে আলুর দাম নির্ধারণ করা হয় ২৩ টাকা। শতাংশের হিসাবে প্রায় ২১ শতাংশ মুনাফা। কিন্তু হিমাগার মালিক ও মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীরা এই মুনাফায় খুশি নন। তারা আবার গত ২০ অক্টোবর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সঙ্গে বৈঠক করে হিমাগার পর্যায়ে আলুর দর পুনঃনির্ধারণ করে। এবার হিমাগার পর্যায়ে প্রতি কেজি আলুর দর নির্ধারণ করা হয় ২৭ টাকায়। অর্থাৎ আগের নির্ধারিত দরের চেয়ে কেজিতে আরো চার টাকা বেশি। এ হিসেবে তাদের মোট মুনাফা দাঁড়ায় কেজিতে আট টাকা। শতাংশের হিসেবে যা ৪২ শতাংশ। যদি শুধু পরের নির্ধারিত অতিরিক্ত মুনাফার হিসাব ধরা হয় তা হলেও শুধু হিমাগার পর্যায়েই ব্যবসায়ীরা ৪০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এই হিসাব শুধু দাম নির্ধারণের পর ১০ লাখ টন আলুর মুনাফার হিসাব করে দেয়া হয়েছে।

মৌসুমে ১ কোটি ৯ লাখ টন আলু উৎপাদন হলেও হিমাগার মালিকরা বলেছেন, উৎপাদিত আলুর ৪০ লাখ টন হিমাগারগুলোতে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে দাম নির্ধারণের আগ পর্যন্ত ৫৫ শতাংশ আলু হিমাগারগুলো থেকে বের করা হয়েছে। অর্থাৎ তখনো ১৮ লাখ টন আলু হিমাগারে ছিল। এর মধ্যে বীজ আলু হিসেবে আট লাখ টন বাদ দিলেও আরো ১০ লাখ টন আলু থাকে।


এই হিসাবে পাইকারি পর্যায়ে নতুন নির্ধারিত দাম অনুযায়ী অতিরিক্ত ৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একশ্রেণির ব্যবসায়ী। একইভাবে খুচরা ব্যবসায়ীরাও অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। সব মিলিয়ে এই সিন্ডিকেট আলু থেকেই কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। শীত মৌসমে বর্তমান বিপণন ব্যবস্থায় রাজধানীতে মুন্সীগঞ্জের এক কেজি আলুর দাম পড়ে ৬-৮ টাকা। কিন্তু তা আমরা দেখি না।

প্রতি বছর সরকারকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাজার নিয়ে হিমশিম খেতে হয়। নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতির পিছনে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মহামারী থাকতেই পারে। তা ব্যবসায়ীদের একমাত্র অজুহাত হতে পারে না। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঘোড়ার জন্য সাধারণ মানুষের নাভিশ^াস ও দীর্ঘশ্বাস আর কতকাল? মুক্ত বাজার প্রক্রিয়ায় বেসরকারিকরণ সব সময় ইতিবাচক ফল দেয় না সে উদাহরণ হলো আমাদের পণ্য বাজার। সকল শ্রেণির মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাজার নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য খাদ্যে রেশনিং প্রথা পুনরায় চালু করা এখন সময়ের দাবি। সামান্য ভর্তুকি দিয়ে সরকার দেশে বিধিবদ্ধ রেশনিং ব্যবস্থা আবার চালু করা উচিত। খাদ্যপণ্য নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর বিধিবদ্ধ রেশনিং ব্যবস্থা ১৯৪৩ সাল থেকে এ দেশে চালু ছিল। মুক্ত বাজার অর্থনীতির দোহাই দিয়ে খালেদা জিয়ার সরকার ১৯৯২ সালের ২৮ এপ্রিল খাদ্যে রেশনিং ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। এরশাদ সরকারকে অনুসরণ করে তিনি ১৯৯১ সালের ১৭ ডিসেম্বর পল্লী রেশনিং ব্যবস্থা পুরোপরি বাতিল করেন। সাধারণ মানুষের জীবনযাপনকে অসহনীয় করে তোলার লক্ষে জনগণের সরকার বলে দাবিদার খালেদা সরকার এ দেশে মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য এ সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেছিল।
বাজার দর নিয়ন্ত্রণে আসুক, তা নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকুক সেটা আমাদের সবার প্রত্যাশা।

লেখক : গল্পকার, কবি, কলাম লেখক এবং অর্থকাগজ সম্পাদক