• ঢাকা
  • শনিবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২১, ৩ মাঘ ১৪২৭
প্রকাশিত: নভেম্বর ২২, ২০২০, ০৫:০৬ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ২২, ২০২০, ০৫:০৬ পিএম

ঘুরে দাঁড়ানোর সময়ও শেষ হয়ে আসছে

অজয় দাশগুপ্ত
ঘুরে দাঁড়ানোর সময়ও শেষ হয়ে আসছে

কোনো কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। করোনা কোভিড মানুষের কষ্ট দুঃখ মৃত্যু সবকিছুর পর এখন সত্য বাঙালির উদ্বেগ। দেশ কেমন আছে মানুষের কষ্ট কতটা তারা খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারছে কি পারছে নাÑ এসব নিয়ে কারো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। শুরুতে বলব আওয়ামী লীগকের নেতাদের বিষয়ে। গদি শাসন আর সরকারে থাকতে থাকতে তারা হয়তো ধরে নিয়েছেন এটা গ্যারান্টেড। আমরা কিন্তু সময়ের বিস্মিত দর্শক। তারুণ্য থকে পুরো যৌবন কেটেছিল এরশাদ, বিএনপি আর জামায়াতের শাসন আমলে। বহু ঘটনা বহু কাহিনী আর অঘটন মিলে আমাদের সময় ছিল টান টান। ভালো কিছু আশা করাও ছিল পাপ। সে সময়কার আওয়ামী লীগ ও তার নেতারা ছিলেন সাহসী। তারা ছিলেন সামনের সারির যোদ্ধা। একেকটা মিছিল ছিল মানুষ আর মানুষে সয়লাব। বঙ্গবন্ধু তখন নিষিদ্ধ। কোথাও নাই তিনি। রেডিও টিভি প্রচারযন্ত্রে নাই আমাদের নেতা আমাদের চার নেতাদের কেউ। সে সময়কালে মানুষ বুক দিয়ে ঠেকিয়েছে যাবতীয় আগ্রাসন। তখন রাজনীতি করা ছিল সম্মানের বিষয় । এখনকার মতো খাই খাই মনোভাব দেখিনি।

হঠাৎ করে বছরের পর বছরের দেশ শাসনে থাকা আর শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে আসন পোক্ত হওয়ার পর নেতারা ভুলে গিয়েছেন তাদের অতীত। কোনো কিছুতেই রুখে দাঁড়ানো বা ঠেকানোর কোনো দায় নাই তাদের। এমন না যে তাদের কেউ লাঠি নিয়ে মাঠে নামতে বলছে। মানুষ চায় তারা তাদের দায়িত্ব পালন করুক। কি সে দায়িত্ব? মানুষের জীবন সম্পদ আর মৌলিক চাওয়ার নিরাপত্তা। সে কি আজ আসলে আছে? আমি এমন কোনো কথা বলব না বা লিখব না যা আমার কিংবা এই লেখা ছাপার ফলে মিডিয়ার বিপদ টেনে আনে। কিন্তু এটা কে না জানে, আজ যারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙতে চেয়েছে অচিরেই তারা মাঠে নামলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

কি হবে কি হবে না তার বিচারক সময়। সময় বলবে কোনটা হবে কোনটা হবে না। কিন্তু এটা বলা অন্যায় হবে না যে, এই বিপদ আর হুমকি মূলত আওয়ামী লীগই টেনে এনেছে। এ দেশের মানুষ সব সময় ধার্মিক ছিলেন, আজও আছেন। ধর্ম এ দেশের সম্পদ। প্রায়ই তা পথ দেখিয়েছে অন্ধকারে। আজ হঠাৎ তবে কেন এমন পরিস্থিতি? সুশাসন কাকে বলে? মানুষের মন কি সব সময় নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকে? না তা সম্ভব? দেশের মানুষ এটা যেমন মানেন শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই, তেমনি তারা এটাও বলেন শাসন মাঝে মাঝেই পথ হারিয়ে হয়ে ওঠে দুঃশাসন। এই যে প্রধানমন্ত্রী ও শীর্ষ নেতাদের অগোচরে বেড়ে ওঠা দানব তারাই আজ হুঙ্কার দিচ্ছে। সব দেশে সব সমাজে কিছু মানুষ থাকে যারা নিয়মশৃঙ্খলা মানে না। তারা অকারণে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ দিতে পছন্দ করে। ব্যক্তি জীবনের হতাশা মগজ ধোলাইসহ নানা কারণে তাদের অসংলগ্ন আচরণের দায় গিয়ে পড়ে ব্যাপক জনগোষ্ঠী কিংবা সম্প্রদায়ের কাঁধে। এতে দুটো বিষয় হুমকির মুখে পড়ে। প্রথমত এর কারণে সমাজ হয়ে পড়ে দ্বিধা-বিভক্ত। তারপর যেটা হয় আতংক আর টেনশানে মানুষ থাকে ভয়ে।

যেটা বলছিলাম নিষ্ক্রিয় রাজনীতি আর একতরফা খেলাধুলায় লীগ ভুলে গেছে অনেক জরুরি বিষয়। সমাজ যে আজ কি বিপদে, সেটা সাধারণ মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। সবার আগে চাই নিরাপদ দেশ। কি ভাবে সম্ভব প্রকাশ্যে এমন করে বলা? এই সেদিনও যা ভাবা যায়নি, আজ তা সত্য। কোনো রাষ্ট্র যদি সামনে যেতে চায়, তার চাই সুষম বণ্টন। তার দরকার সামাজিক সাম্য। তার জন্য লাগবে সহমর্মিতা ও সহঅবস্থান। এই জায়গাগুলো আজ বিপদের মুখে। কে কাকে দোষারোপ করবে আর কে কাকে আসামি ঠাউড়াবে তাতে জনগণের কোনো লাভ নাই। তারা চায় সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন। সরকারি দল যদি তা বুঝতে না পারে বা না চায় এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কিছু হতেই পারে না। তাদের জবাবদিহিতা সময়ের চাহিদা।

নেতৃত্বের অভাব কথাটা কি মিথ্যা? আওয়ামী লীগ যে বঙ্গবন্ধু ও তাদের যোগ্য নেতাদের দল এটা তাজউদ্দীন আহমেদ সৈয়দ নজরুল মনসুর আলী বা কামারুজ্জামানের দলÑ তা বোঝার কি কোনো উপায় আছে আজ? এটা মানি বিশ্বজুড়ে রাজনীতি আজ পরিবর্তিত। আগের জায়গায় নাই রাজনীতি। কিন্তু যে সব দেশ যে সব সমাজ এখনো চলমান বা নানাভাবে উদার ও সহনশীল, তাদের আছে যোগ্য নেতৃত্ব। আমরা কি দেখছি? সবকিছু একা শেখ হাসিনার কাঁধে চাপিয়ে আনন্দে আছেন দলের যত নেতা । তাদের এক একজন মাঝে মাঝে টিভি ক্যামেরার সামনে আসেন কথা বলেন তারপর হাওয়া। দলের সেক্রেটারি ছাড়া আর কারো ভেতর কোনো আন্তরিকতাও দেখি না। তা হলে সমাজের এই অসঙ্গতি এই অন্যায় রুখবেন কী ভাবে তারা?

বাংলাদেশের সমাজ এখন যে জায়গায়, তাতে দেশের মঙ্গলকামী উদারচেতা মানুষজন ভয়ার্ত। এই ভয় অমূলক নয়। আজ যখন এই লেখা লিখছি তখন দৈনিক জনকণ্ঠ যা কিনা সরকারি দলের সমর্থক নামে পরিচিত তারা শিরোনাম করেছে, দেশে জঙ্গিবাদ বেড়েছে। আসলে শুধু বাড়েনি, তারা আজ এমন এক পর্যায়ে চলে এসেছেÑ যেখানে হাজার হাজার মানুষ সামাজিক মিডিয়ায় লিখছেন, তারা কি এই দেশে থেকে গিয়ে বা বিদেশের সুযোগ হারিয়ে ভুল করেছেন? এই আফসোস এখনো শুধুই হতাশা কয় বছর পর এর রূপ কি হবে তা আফগানিস্তান পাকিস্তানের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। হলি অটির্জানের ঘটনা নিশ্চয়ই ভুলিনি আমরা। সে ঘটনা বলে দিয়েছে কাদের মগজ ধোলাই হয়ে গেছে। সমাজের কোন শ্রেণি আজ পচে গলে একাকার। এ জায়গাটা ভয়ের এই কারণে মধ্যবিত্তের ঘরে পচন ধরা মানে সমাজ নষ্ট হওয়ার শেষ প্রান্তে চলে গেছে দেশ।

আজ সাকিবের মতো তারকা খেলোয়াড় আক্রান্ত। কাল হবেন আর এক জন। শীর্ষ থেকে নিচে কোথাও ছাড় পাবে না কেউ। এটাই তাদের নিয়ম। তারা তাদের উদ্দেশ্য আর নিশানা ভুল করে না। কিন্তু আমাদের সমস্যা আমরা না পারি একত্রিত থাকতে, না পারি পথ চিনে উপায় বের করতে। যে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ আর একাত্তরের চেতনার ধারক নামে পরিচিত, যার শক্তি এ দেশের প্রগতি তারাই শাহবাগের পায়ে কুড়াল মেরেছিল। আজ তাকে বাইরে থেকে দেখে আওয়ামী মুসলিম লীগ মনে করলেও কি অন্যায় কিছু হবে? অথচ বঙ্গবন্ধু ছিলেন আমাদের মুক্ততার দিশারী। তার দেশে তার সমাজে তার রক্তের মাটিতে দাঁড়িয়ে এরা তার ভাস্কর্য ভাঙার হুমকি দেয়!! এরপরও আমরা কি মনে করব দেশ উন্নয়ন বা সমাজ শান্তিতে থাকতে পারবে?

ঘুরে দাঁড়ানোর শেষ চেষ্টা এখন জরুরি। বুঝতে দেরি হলে ঘুরে দাঁড়ানোরও সময় পাওয়া যাবে না।

লেখক : সিডনি প্রবাসী কলামিস্ট
জাগরণ/এমইউ