• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২১, ৮ মাঘ ১৪২৭
প্রকাশিত: নভেম্বর ২৬, ২০২০, ০৫:১২ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ২৬, ২০২০, ০৫:২২ পিএম

প্রত্যাশা সবার সুস্থ-সুন্দর জীবনযাপন

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল
প্রত্যাশা সবার সুস্থ-সুন্দর জীবনযাপন
শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল । ফাইল ফটো

বয়স্ক ভাতা যায় কোথায়! অনেকে বলেন, গরিবের বয়স্ক ভাতা হেঁটে হেঁটে চলে যায় প্রভাবশালীদের পেটে। প্রভাবশালীরা দরিদ্র মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিতে সব সময় তৎপর থাকেন। সরকার জনমানবের কল্যাণের জন্য অনেক কল্যাণমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু সরকারের চেলাচামুন্ডারা তাদের নির্লজ্জ কর্মকা- দ্বারা সরকারের জনকল্যাণমুখী কর্মকা-কে দেশের মানুষের সামনে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। আমাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও আছেন, যাদের কোনো অভাব-অনটন নেই; সেইসব ব্যক্তি গরিবের জন্য বরাদ্দকৃত ত্রাণসামগ্রী দরিদ্র লোকদের মাঝে বিলিবণ্টন না করে নিজেরা ভক্ষণে ব্যস্ত থাকেন কিংবা তাদের পালিত হাঁসমুরগিকে খাওয়ান। এসব সংবাদ আমরা সংবাদপত্রেই দেখে থাকি। নিচুস্তরের ব্যক্তিরা আমাদের সমাজ-সংসারে নিজেদের নির্মম আধিপত্য বজায় রাখার জন্য এমন কোনো হীনকাজ নেই, যা তারা করতে দ্বিধাবোধ করেন না। আমরা আজকাল এমন সব সংবাদ পত্রপত্রিকায় দেখে থাকি, যা দেখলে মনে হয় আমাদের মধ্যে একশ্রেণির মানুষ রয়েছেন, যারা হীনকর্মকা-কে স্বাভাবিক কর্মকা- বলে মনে করেন। বিরক্তকর কাজগুলোকে নষ্ট মানুষরা এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যা দেখলে যে কারো মনে হবে আমাদের সমাজের একটা অংশ আজ এতটাই ব্যক্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে যে, তাদের কাছে ন্যায়-অন্যায় সুন্দর-অসুন্দর ইত্যাদির বিচার-বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা নেই।

সমাজের প্রতিটি মানুষই বলে আমরা ভালো থাকতে চাই। আমরা সুন্দর জীবনযাপন করতে চাই। আমরা অসুন্দর আর নষ্টামিকে চিরদিনের জন্য না বলতে চাই। কিন্তু বাস্তবটা হলো তার বিপরীত। আজ আমাদের সমাজে একটা অংশের লোকজন মনে করে, যত পারা যায় লুটপাটের মাধ্যমে নিজের লাভের অংশকে ভারী করে জীবনযাপন করাই হলো সবার পরম কর্তব্য। কিন্তু আমাদের সমাজের বসবাসরত লুটপাটে বিশ্বাসী লোকজন বিশ্বাসই করতে চায় না, নিজে ভালো থাকতে গেলে নিজের চারপাশটাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন নিজেকেই রাখতে হবে। পরিচ্ছন্নতা মানেই হচ্ছে নিজেকে সৎ এবং নিষ্ঠাবান রাখা। নিজের মনের পরিবেশটকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে নিজের মঙ্গলের জন্যই। নিজের চিন্তাচেতনাকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হলে সবসময় সুস্থ ও সুন্দরের পথে চলতে হবে। কেউ যদি সব সময় সুস্থকে ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যায়, তা হলে কারো পক্ষে পাপ কিংবা অন্যায় কিংবা অপরাধ করা কখনও সম্ভব হবে না।

লেখার শুরুতেই বলেছিলাম, বয়স্ক ভাতা কোথায় যায়। এখন প্রশ্ন হলো, বয়স্ক ভাতা যাদের পাওয়ার কথা তারা কি সঠিকভাবে পায়। আমরা পত্রপত্রিকায় প্রায়ই দেখে থাকি বয়স্ক গরিব মানুষরা সরকার প্রদত্ত বয়স্ক ভাতা থেকে বঞ্চিত হয় কতগুলো লোভী হিংস্র দুর্নীতিবাজ মানুষের জন্য। তার নমুনা আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে পেয়ে থাকি। সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয় যে, ২৬ জন মৃত ব্যক্তির নামে বয়স্ক ভাতা উত্তোলন করা হচ্ছে। এই অনৈতিক কাজটা করা হচ্ছে কর্তাব্যক্তিদের নাকের ডগা দিয়ে। আমরা সাধারণ মানুষ যতটুকু জানি, বয়স্ক ভাতা পেয়ে থাকেন এমন কেউ মৃত্যুবরণ করলে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিরা কোনো না কোনোভাবে মৃত ব্যক্তির বয়স্ক ভাতার কার্ড সংগ্রহ করে, তা সংশ্লিষ্ট জায়গায় অবহিত করেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবহিত হয়ে মৃত ব্যক্তির নামের দেয়া বরাদ্দ কার্ড বাতিল করেন। কিন্তু স্থাানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিরা যদি তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বটুকু সঠিকভাবে পালন না করেন কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে যদি দায়িত্ব পালন না করে মৃত ব্যক্তির নামে বয়স্ক ভাতার টাকা উত্তোলনে পরোক্ষভাবে সাহায্য করেন কিংবা নিজেরাই উত্তোলন করেন, তাহলে কি তাদের আর নৈতিক অধিকার থাকে স্বপদে বহাল থাকার!

আমাদের সমাজ-সংসারের নৈতিক-অনৈতিক ব্যাপারটা অন্য রকম। আমাদের সমাজব্যবস্থায় একশ্রেণির ক্ষমতাবান মানুষের কাছে নৈতিকতা কিংবা অনৈতিকতার সংজ্ঞাটাও অন্য রকম। আমাদের সমাজের একশ্রেণির মানুষ নৈতিকতার সংজ্ঞা তারা নিজেরাই নির্ধারণ করে থাকে। আমাদের সমাজের কিছু মানুষ নৈতিকতা বলতে এটাকেই বুঝে থাকেন যে, যেহেতু ক্ষমতার কাছাকাছি বাস করছি, তাই নৈতিকতার সংজ্ঞা আমরা যেমন বলব তেমনই হবে। নৈতিকতার সংজ্ঞা তারাই ব্যাখ্যা করবেন কিংবা তারাই নিরূপণ করবেন তাদের চিন্তাচেতনা অনুযায়ী। তাতে সমাজের মানুষের যদি ক্ষতিও হয়, নির্লজ্জ মানুষদের কিছু আসে-যায় না। আমাদের সমাজের একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্তব্যক্তিরা যেহেতু সবকিছুতে আধিপত্য বিস্তার করেন, তাই দেশের মানুষকে বিভিন্ন সময় বিভিন্নরকম জ্বালা-যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। যেহেতু আমাদের সমাজের নৈতিকতার সংজ্ঞা নিরূপণ করেন একশ্রেণির অসৎ ব্যক্তিরা, তাই আজ আমাদের চোখের সামনে দিয়ে মৃত ব্যক্তির নামে বয়স্কভাতা উত্তোলন করতে দুর্নীতিবাজরা দ্বিধাবোধ করেন না।

এখন কথা হচ্ছে, এই অন্যায় কি চলতেই থাকবে? সৎ-নিষ্ঠাবান ব্যক্তিরা বলবেন, সকল অন্যায়ের মূলোৎপাটন হওয়া উচিত। সকল অন্যায়ের বিনাশ করে সুস্থকে সবার সামনে তুলে ধরাই আমাদের কর্তাব্যক্তিদের কর্তব্য। অন্যয়ের বিনাশ ঘটাতে হলে, আমাদের অবশ্যই সামাজিক সব কর্মকাণ্ড সৎ নিষ্ঠাবান ব্যক্তিদের যথাযথ জায়গায় বসাতে হবে। কোনো রাষ্ট্র কিংবা সমাজ যদি সৎ মানুষের মূল্যায়ন করতে না পারে, তা হলে আমাদের রাষ্ট্র এবং সমাজের জন্য তা ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করবে। আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হলো, আমরা খারাপ মানুষের জন্য ভালো মানুষকে যথাযথ জায়গায় বসাতে পারি না কিংবা বসাবার সাহস করতে পারি না। আজ আমাদের চারদিকে এতটা অসঙ্গতি বিরাজ করছে আমাদের ভীরুতার জন্য।

আজকাল মনে হয় যে ব্যবস্থায় অসঙ্গতি বেশি থকবে, সেই ব্যবস্থায় ভালো মানুষ কিংবা ভালো জিনিসের কোনোরকম অবস্থানই থাকবে না। তাই আজ আমাদের উচিত হবে সকল অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সমাজের দুর্নীতিবাজদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সাহস নিয়ে রুখে দাঁড়ানো। অন্যায়কে অন্যায় বলতে না পারলে দুর্নীতিবাজদের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হবেই। যদিও আমরা আজ অন্যাকে অন্যায় বলি না নিজেদের স্বার্থে। অনেক সময় সকল অন্যায়কে আমরা দ্বীধাহীনচিত্তে মেনে নেই। যখন নিজের ওপর অন্যায় হয় তখনই আমরা চিৎকার করি। অথচ এই চিৎকার তখন আর আমাদের কাছের মানুষের কাছে পৌঁছে না। কেননা আমরা অন্যায়ের চর্চা করতে করতে অভ্যস্থ হয়ে গেছি। আমাদের বুঝতে হবে আজ আমরা এমন এক অবস্থার মধ্যে আছি, যে অবস্থায় সকল ক্ষেত্রে শুধু অনিয়মেরই প্রতিধ্বনি শোনা যায়।

অনিয়ম এমন একটি বিষয়, যা একবার কোনো ব্যবস্থায় শুরু হলে তাকে আর থামানো যায় না। তার চলমান ধারা খরস্রোতা নদীর মতো চলতেই থাকে। অনিয়মই সামাজিক দুর্নীতির ক্ষেত্রকে উর্বর করে থাকে। দুর্নীতির ক্ষেত্র যখন ধানী জমির মতো উর্বর হয়ে ওঠে, তখনই দুর্নীতিবাজরা তাদের সকল প্রকার নষ্টামির চারা রোপণ করে থাকে। আমরা যখন দেখি সমাজের এক ধরনের শিক্ষিত ব্যক্তিরা তাদের সকল প্রকারের নৈতিকতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে চরম অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন, তখন বুঝে নিতে পারি আমাদের সচেতন শিক্ষিত সমাজের একটি অংশ ন্যায়-নৈতিকতাকে না বলে সচেতনভাবে অন্যায়, অবিচার, অনাচার ও অনৈতিকতাকে পরম বন্ধুর মতো কাছে ডাকছেন।

প্রায় সময় পত্রপত্রিকা খুললেই দেখা যায় বয়স্কভাতা যাদের পাওয়ার কথা, তারা তা পায় না। গরিব বয়স্কদের ভাতার টাকা রাঘববোয়ালদের পেটে চলে যাচ্ছে। যারা এসব অন্যায় করে তারা তা জেনেশুনেই করে থাকে। এমন চৌর্যবৃত্তিকে রাঘববোয়লরা অন্যায়-অনাচার বলে মনেই করে না। এই শ্রেণির দুর্নীতিবাজ তাদের নিজেদের করিডোরে বড় বড় কথা কিংবা বক্তৃতা দিয়ে বেড়ায়। মূলকথা হচ্ছে, আমাদের চারদিকে একশ্রেণির নির্লজ্জ মানুষের দল সৃষ্টি হয়েছে। এই নির্লজ্জ মানুষেরা এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তাদের অনৈতিক কর্মকা- দেখে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের দলকে ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়। ভাবি, আমাদের মতো সাধারণ মানুষের অবস্থান এখন কোথায়? আমাদের ভবিষ্যৎ আজ কোন অন্ধকারে গিয়ে তার নৌকা ভিড়াবে। আর আমাদের আগামী প্রজন্ম নীতিহীনদের কর্মকা- দেখে এই সমাজ-সংসারের কাছ থেকে কি শিখবে? আগামী প্রজন্ম যদি আমাদের কাছ থেকে ভালো কিছু না শিখে তাহলে আমাদের সন্তানদের কোন ভবিষ্যতের কাছে নিশ্চিন্তে সমর্পণ করে যাব। উত্তর হলো- অবশ্যই আমরা প্রতিবাদ করব এবং আমরা আমাদের ভয়ের গভীরে সমর্পণ করে নিজেদের গুটিয়ে ফেলব না। সমাজের সচেতন মানুষকে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হতে হবে। আমরা যদি সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে আজ প্রতিবাদমুখর না হই, তা হলে দেখা যাবে, দুর্নীতিবাজরা গরিব মানুষের জন্য সরকার প্রদত্ত বয়স্কভাতার টাকা-পয়সাসহ সবকিছু নিজেদের পেটে ঢুকিয়ে সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-কে জনগণের সামনে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।

তাই বলছিলাম, আমাদের সমাজে কর্তাব্যক্তি থেকে শুরু করে এখনো যারা মানুষের কথা ভাবেন, তাদের উচিত হবে দুর্নীতিবাজদের সকল প্রকার অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে নিজেদের দায়িত্ব পালন করা। আমরা যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারি, তাহলেই দেখা যাবে দুর্নীতিবাজরা মাঠ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে।

লেখক : আইনজীবী, কবি ও গল্পকার