• ঢাকা
  • রবিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২১, ৩ মাঘ ১৪২৭
প্রকাশিত: জানুয়ারি ১১, ২০২১, ০৬:০৫ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জানুয়ারি ১১, ২০২১, ০৬:০৫ পিএম

কোন উন্নতির পথে হাঁটছি আমরা

তুষার আবদুল্লাহ
কোন উন্নতির পথে হাঁটছি আমরা

আমরা কয়েকজন সহকর্মী, শহরে কোথাও নতুন কোন চা বা কফির দোকান খুললেই গিয়ে হানা দেই । হোক সেটি ফুটপাথ কিংবা অভিজাত। একদিন অভিজাত এক কফি শপে গেলাম । সেখানে গিয়ে চা খাওয়ার আবদার করলাম । ওরা এক জগ এ্যাল গ্রে এনে দিল । সেদিন ছিলাম দুজন। পুরো রেস্টুরেন্ট তরুণ-তরুণীতে ঠাসা। কিশোর-কিশোরীও দেখা গেল। দলে বা জুটি হয়ে আড্ডা দিতে। রাত তখন মধ্যলগ্নে। এরমধ্যে দেখি একটি দল থেকে এক কিশোরী আমাদের দিকে প্রথমে চোখের ইশারায় পরে হাত নেড়ে কি যেন বলছে। ওখানে আমরা নিজেদের প্রৌঢ় ভেবেই বসে আছি। এরমধ্যে কিশোরী বা উঠতি তরুণীর এমন ইশারায় বুক ধড়ফড় করছিল। চায়ের পেয়ালায় তাকিয়ে রইলাম ওদিকে আর চোখ তুলছি না।

বেশ কিছুক্ষণ পর মেয়েটি সামনে এসে দাঁড়াল। বলল—যাচ্ছি। আমি অপলক। ওকে চিনতে পারছি না। মনে পড়লো না কখনও কোথাও দেখেছি বলে। মেয়েটি দলেবলে চলে গেল। আমরাও বেরিয়ে পড়লাম। মেয়েটি রয়ে গেল উসখুশ মনে । সকালে ফোন দিয়ে পরিচিত একজন অভিযোগের সুরে বললেন, আমি তাঁর মেয়েকে চিনতে পারিনি। মেয়েটি অভিমান করেছে । বুঝলাম রাতে রেস্টুরেন্টের ঐ মেয়েটি কে ছিল। জানতে চাইলাম, এতো রাতে আপনার মেয়ে রেস্টুরেন্টে ছিল, আপনি জানতেন? উনি বললেন, ওতো বাইরে চলে যাবে পড়তে। ওখানে তো এমনই। পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেক। ওখানকার পরিবেশ এমনই আপনাকে কে বলল? আমার প্রশ্ন তাঁর পছন্দ হয়নি । ফোনটি রেখে দিলেন। তিনি যে চাকরি করেন, পারিবারিক যে আয়, তাতে ছেলেমেয়েকে পড়তে বিদেশ পাঠানোর সাধ্য থাকার কথা নয়। তবে তাঁর আয়ের ছিদ্র পথগুলো আমার জানা। এতোটুকুও জানি মেয়েকে ছাড়পত্র দিয়ে রেখেছেন সঙ্গী হিসেবে কোন শিল্প গোষ্ঠীর পুত্রকে বগলদাবা করার। কথাগুলো যখন লিখছিলাম তখন আমি গাড়িতে। মেয়ে আর আমি যাচ্ছি একশ ফুটের দিকে। হঠাৎ একটি মার্সেডিজ জিপ আমাদের মুখোমুখি। জিপটি বেসামাল। আমাদের গাড়িকে টোকা দিয়ে চলে গেল। ঘুরে ওকে ধরলাম। সরু রাস্তায় গিয়ে বেশিদূর এগুতে পারেনি। জিপে দুই তরুণ। বললাম, এভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন যে? ওদের উত্তর—তোদের কি? তারপর ভোঁ করে চলে গেল। মেয়ে বলল, বাদ দাও ।

আমরা গন্তব্যের দিকে ফিরি । মেয়েকে বললাম, বাদ দিতে বললি যে। মেয়ে বলে, দেখ হঠাৎ করে ওদের বদলে দিতে পারবে না। তুমি হয়তো প্রতিবাদ করছো। ভুল ধরিয়ে দিচ্ছো, কিন্তু ওদের বাড়িতে বলা হচ্ছে না এগুলো ভুল। ওরা যেখানে পড়ছে, আমি যেখানে পড়ছি তাকে সুপার শপ বলতে পারো। টাকা দিয়ে একটা ‘কালো স্কলার্স টুপি’ কিনে নিয়ে আসছি। বললাম এতো কিছু মানুষের ফ্যাশন এখন। মেয়ে হাসে, বাবা গুলশান-বারিধারার ফ্যাশনপল্লীতে পৌঁছাতে কতো দেরি হয় বলো?

পথ চলছি আর মেয়ে বলেই চলেছে, বাবা তুমি নিজে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্ম। আমরা মুক্তিযুদ্ধের পরের দ্বিতীয় প্রজন্ম। আমরা স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী পালন করতে যাচ্ছি। কিন্তু এখনও দেশটাকে ভালোবাসতে পারলাম না। স্বপ্নে সবুজ গ্রাম দেখি না। দেখি বড় বড় দালান। চুম্বক ট্রেন। উড়াল সেতু। কিন্তু  স্বচ্ছলতা আসমানে গিয়ে ঠেকলেও, আমাদের উন্নতি কতো ঠুনকো তাতো কভিড-১৯ দেখিয়ে দিলো। আমাদের দস্যুতার তীব্রতা আমরা দেখতে পেলাম কভিডকালেই । সবাই দৌঁড়াচ্ছি । কেউ কোন প্রাপ্তিতে সন্তুষ্ট নয়। এটা কেন হয়েছে জানো বাবা?  রাষ্ট্র এখনও ঠিক করতে পারেনি, আমরা কি শিখবো। তাই শিক্ষিত তৈরি হচ্ছে না। চারদিকে শুধু টাকা কুড়োনো আর সামলানোর ম্যানেজার তৈরি হচ্ছে। মেয়ের প্রিয় বিষয় অর্থনীতি ও মনোবিজ্ঞান। ও বলে, মানবিকতা শূণ্য উন্নয়নে কোন সুখ নেই বাবা। এতে কেবল অসুখই বাড়ে। দেখো বাবা, তুমি বলেছো তোমরা ভাই বোনরা এক ঘরে বড় হয়েছো। অনেকের কাছেই এমন কথা শুনি। হৈ হট্টগোল ছিল। ঝগড়াঝাটিও হতো । কিন্তু সবই ঢাকা পড়ে যেতো ভালোবাসার চাদরে । কিন্তু এখন দেখ আমাদের সবার আলাদা আলাদা ঘর। ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুযোগ আছে। সেই সুযোগে রাজ্যের শূন্যতা ঢুকে পড়েছে বাড়িতে। কভিড-১৯ আসার অনেক আগেই আমরা সঙ্গনিরোধ সূত্রে চলে গেছি। বাবা, অর্থনীতি পড়তে গিয়ে দেখলাম মুক্তিযাদ্ধারা যে সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, বঙ্গবন্ধু যে অসাম্য সমাজে চেয়েছিলেন, সেই সমাজ আমাদের আর কেউ দিতে চাইলো না। কারণ আমরা ‘বড় লোক’ হতে চেয়েছি। বাবা জানো, মানসিক উচ্চতা ছাড়া চাঁদ ছোঁয়া যায় না। কিন্তু আমরা সেই যোগ্যতায় বামন হয়েও আকাশ ছুঁতে চাইছি।

পথের ধারে চায়ের দোকানে নেমে মেয়ে বলল, বাবা, তোমরা বলছো আমরা প্রেম ভুলে গেছি, ভালোবাসা ভুলে গেছি । সত্যিই তাই, তোমরা এখন লক্ষ্য স্থির করে দিচ্ছো ভালো বাসা বানাতে। ভালোবাসা গড়তে নয়। কি করি বলো দৌঁড়ে তো জিততে হবেই তাই না?

 

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট