• ঢাকা
  • সোমবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২১, ৫ মাঘ ১৪২৭
প্রকাশিত: জানুয়ারি ১২, ২০২১, ০৪:১৫ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জানুয়ারি ১২, ২০২১, ০৪:১৫ পিএম

কলকাতা থেকে

বিশ্বভারতীতে রাজনৈতিক পতাকা কি নজিরবিহীন?

অরুণাভ চ্যাটার্জি
বিশ্বভারতীতে রাজনৈতিক পতাকা কি নজিরবিহীন?

এই লেখাটি যখন প্রকাশ পাবে, তখন ১২ই জানুয়ারি। ১২ই জানুয়ারি স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন। হঠাৎ, স্বামী বিবেকানন্দ কেন? একটু ভেবে দেখলে স্বামীজির অনেক বাণীর মধ্যে রবীন্দ্রনাথের গানের মর্মার্থ পাওয়া যায়। কয়েকটা উদাহরণ দিতেই পারি, কিন্তু এই লেখাটির সাথে তা এই মুহূর্তে তাৎপর্য বহন করে না। রবীন্দ্রনাথ কি আদৌ রাজনৈতিক ছিলেন? রবীন্দ্রনাথের রাজনীতি মনস্কতা নিয়ে বিভিন্ন তাত্ত্বিকদের ভিন্ন ভিন্ন মতামত থাকলেও এটা বলাই যায় যে তাঁর কনস্ট্রাক্টিভ রাজনীতির প্রতি মনোযোগ ছিল।

 

এই যে বর্তমান পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি, সেখানে বিজেপির পতাকা বা পোস্টার লাগানোকে যে নজিরবিহীন ঘটনা বলে মার্ক করা হচ্ছে – তা কিন্তু আদৌ নজিরবিহীন ঘটনা নয়।  আমি বিশ্বভারতীর ছাত্র না হলেও বিশ্বভারতী সংলগ্ন অঞ্চলে বহু বছর থাকা এবং যাতায়াতের সুবাদে এই ‘নজিরবিহীন ঘটনা’ কিন্তু আমি এর আগেও দেখেছি।  দেখা শুধু বললে ভুল বলা হবে, আমার নিজের প্রথম দেখা ২০০৫ সালের ঘটনা উদ্ধৃত করে বলতে পারি – শান্তিনিকেতনের আভ্যন্তরীণ ছাত্র সংসদ ভোটের রেজাল্ট বেরোবার পর তাঁদের রাজনৈতিক উচ্ছ্বাস আমি দেখেছি। ২০০৫ সাল, অর্থাৎ তৎকালীন বাম আমলের কথা বলছি। পালা বদলের পরও এর খুব একটা বদল হয়েছে বলে আমার নজরে অন্তত আসেনি।  তবে বিশ্বভারতীর ভেতরে দলীয় পতাকা বা পোস্টার লাগানো শুরু এই হাল আমলেই। খুব যদি স্মৃতিভ্রম না হয়, তাহলে এর সূচনা হয়েছে কয়েক বছর আগে হঠাৎ করেই বিশ্বভারতীর ভেতরে বিভিন্ন দেওয়ালে বামমনস্ক কিছু ‘র‍্যাডিকাল’ চিন্তাধারার ছাত্রছাত্রীর হঠাৎ করেই দেওয়াল লিখনের মাধ্যমে। ডিসেম্বর ২০১৯ এই এনআরসি’র বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ‘নজিরবিহীন’ভাবে বিশ্বভারতীর ভেতরেই বিভিন্ন দেওয়ালে বিশ্বভারতীর আচার্য পদে আসীন প্রধানমন্ত্রীর ‘মোদি দেশদ্রোহী’ লেখা হয়। এছাড়া, শান্তিনিকেতনের রাস্তার উপরে, দেওয়ালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহকে উদ্দেশ্য করে অশালীন ভাষাও লেখা হয়।

 

মূলত বিশ্বভারতীর ফার্স্ট গেটের বাইরে এসবিআইয়ের সামনের চত্ত্বরেই এর আগে কোনো প্রতিবাদ বা কোনো সভার জায়গা থাকত। প্রতিবাদ দেখা যেত, গান বা কনস্ট্রাক্টিভ মত বিনিময় সভার মাধ্যমে, যা কিনা সাম্প্রতিককালে বদলে যেতে শুরু করে ২০১৯-এর ডিসেম্বরের ঘটনার মাধ্যমেই। তার আগেও কিন্তু সোনাঝুরির রাস্তা তৈরির ঘটনায় বড় বড় অনেক পুরনো গাছ কেটে ফেলার জন্য তেমন কোনো প্রতিবাদ বা দেওয়াল লিখন চোখে পড়েনি বিশ্বভারতীর ভেতরে। এমনকি সঙ্গীত ভবনের পেছনে অরশ্রী মার্কেট – যেখানে ছোট্ট একটা মার্কেটের ভেতরেও খুব যে বেশি রাজনীতির প্রভাব পড়েছিল, তা বলা চলে না। ক্যাম্পাসের মধ্যে বিভিন্ন অনাচার, ভর্তি প্রক্রিয়ায় সাহায্যের নামে এসএফআইয়ের বিভিন্ন পোস্ট কিন্তু ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে এই কিছুদিন আগেও দেখা গেছে। তাহলে কী এই ‘নজিরবিহীন’ ঘটনাটি একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি? প্রশ্ন ওঠে। প্রশ্ন এসেই যায়, প্রাক্তন শান্তিনিকেতনীরা কী আদৌ এই সমস্ত ঘটনায় খুশি? সেসবের প্রতিফলনও এই ফেসবুকেই খুঁজলে যে কেউ পেয়ে যাবেন। তাই আর পুরনো কথায় না গিয়ে নতুন কিছু বলি।

 

রবীন্দ্রনাথই তো বলেছিলেন – ‘মুক্ত করো ভয়, আপন মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে করো জয়।’ স্বদেশ পর্যায়ের এই গান সঙ্কোচের বিহ্বলতা। অর্থাৎ বিশ্বভারতীর কেন, যে কোনও মনিষীই তাঁদের কাজে, তাঁদের লেখায় প্রতিবাদ করে গেছেন অনবরত। কিন্তু আজ পরিবেশ, পরিস্থিতি বদলেছে। তখন লড়াইটা ইংরেজের বিরুদ্ধে ছিল। আজ যে বিশ্বভারতীর ছাত্রছাত্রীরা এনআরসির মতো খুবই জরুরী বিষয় নিয়ে বিশ্বভারতীর ভেতরে দেওয়াল লিখন করেছিলেন, তারা কী বলবেন? তারাই তো বকলমে পথ দেখিয়ে দিলেন এই রাজনৈতিক নেতাদের – এসো আমাদের ক্যাম্পাসকে তোমরা ব্যবহার করো। ক্যাম্পাসের ভেতরে সক্রিয় রাজনীতি ছিলই, সেটা আরও তরান্বিত করো। রবীন্দ্রনাথের ভাবধারায় তৈরি বিশ্বভারতীর মূল উদ্দেশ্যটা কি এটাই ছিল? নাকি ছিল মানুষের মনের চেতনা বা মননকে জাগ্রত করা ছিল? আজ তাহলে অন্যান্য দল যদি এই স্থানের ব্যবহার রাজনৈতিক কারণে করেন, তাহলে তারা কিভাবে প্রতিরোধ করবেন? একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি তো হতে পারেনা। এটা হতোই না, যদি সেদিনের সেই শুরুটা না হতো।

 

অবশ্যই বিশ্বভারতীর মতো একটা ক্যাম্পাসে দলীয় পতাকা বা পোস্টার লাগানো, অথবা অনুব্রত মণ্ডলের বাইক র‍্যালি নিন্দনীয়। বড় বড় সাউন্ড বক্স বাজিয়ে নিজেদের দলীয় শক্তি প্রদর্শন নিন্দনীয়। এখানে আরও একটা প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাতে চাই পাঠকদের। কলকাতা জুড়ে বিভিন্ন সিগনালে যখন মুখ্যমন্ত্রী মাননীয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মাইকে হাল্কা আওয়াজে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজানোর ব্যবস্থা করেছিলেন, একই রাজনৈতিক দলের নেতা অনুব্রত মণ্ডল কি নিজেই তাঁর নেত্রীর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বসলেন না এই ঘটনায়? একই রাস্তা রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের জন্য বারবার শিলান্যাস বা বারবার উদ্বোধন করাটা কতটা যুক্তিসঙ্গত? যে টাকাটা এর পিছনে খরচ হচ্ছে – তা তো আমার, আপনার মতো সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা। কতটা যুক্তিসঙ্গত আজকের দিনে সাধারণ মানুষের অসুবিধা সৃষ্টি করে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের নামে রাস্তা আটকে বারবার উদ্বোধনের রঙ্গ রসিকতা?

 

যে ছাত্রছাত্রীরা পড়ার জন্য বিশ্বভারতীতে সুযোগ পান, তাঁদের কী এই দায়িত্বটা বর্তায় না যে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতাদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার? ক্যাম্পাসকে কলুষিত না করার? নজরুলের সর্বহারা থেকে উদ্ধৃত করলে – ‘আমরা শক্তি আমরা বল আমরা ছাত্রদল’। এই ছাত্রদলের হাতেই তো পরিবর্তন, এই ছাত্রদলের হাতেই তো প্রতিরোধ। তারা যদি ক্যাম্পাসকে সুস্থ রাখতে চান তাহলে এখনো কিছু স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব। এটা কিন্তু এই ক্যাম্পাসের প্রতিষ্ঠাতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আগেই দেখিয়েছেন, তার জন্য কিন্তু তাঁকে কোনো রাজনৈতিক রঙের সাপোর্টার হতে হয়নি, স্লোগান লিখে দেওয়াল ভরিয়ে তুলতে হয়নি। তিনি একের পর এক গ্রামোন্নয়নের কাজে হাত দিয়েছিলেন, তিনিই প্রথম কৃষি সমবায় ব্যাঙ্ক তৈরি করে দিয়েছিলেন, তিনিই রামকিঙ্করসহ আরও অনেকের পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছেন রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে।  তাছাড়া ধর্মের রাজনীতিও রবীন্দ্রনাথের আদর্শের বাইরেই থেকে গেছে সবসময়। তাই তিনিই প্রথম রাখিবন্ধন উৎসব শুরু করেন বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতায় একাত্মতার জন্যই। তাহলে আজ সেখানে ধর্মীয় রাজনীতির স্থান কেন? কেন ক্যাম্পাসের পরিবেশ সুস্থ করার দায়িত্ব ছাত্রছাত্রী তথা অধ্যাপক এবং অন্যান্য শিক্ষাকর্মীদের উপরে বর্তায় না? আচার্য যেখানে প্রধানমন্ত্রী, সেখানে তাঁরও দায়িত্ব বর্তায় যে এক মনিষীর মননকে যোগ্য মর্যাদা দেওয়া। বর্তমান আচার্য কি জানেন না, ‘আশ্রমিক সংঘে’র প্রকৃত অর্থ কী? তার প্রকৃত মনন কী? তিনিও তো এক সংঘেরই অন্তর্গত!

 

যে জায়গাটার নাম বাংলা ভাষার মননের জন্য সবার প্রথমে উচ্চারিত হয়, সেখানে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সাইন বোর্ডের উপরে বাংলা ভাষার উপরে উঠে যায় হিন্দি। কেন? শান্তিনিকেতনের আরেক ঐতিহ্যমণ্ডিত সংস্থা– আলাপনী মহিলা সমিতি, যার জন্ম ১৯১৬ তে এই রবীন্দ্রনাথেরই উৎসাহে, তা কেন আজ হঠাৎ বিপন্ন? ১০৫ বছরের এই সুমহান ঐতিহ্যমণ্ডিত প্রতিষ্ঠান কেন আজ বন্ধ করতে তৎপর বর্তমান আচার্য বা তাঁর নির্দেশে চলা কর্মীবৃন্দ? আদতে ওদের কাছে এটা শুধু একটা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি – যেখানে রবীন্দ্রনাথের স্থান নেই, তাঁর প্রতিষ্ঠিত মননকে মর্যাদা দেওয়া নেই।  তাই এই প্রতিষ্ঠানকে আজ যে কেউ, তাঁদের মতন করেই ব্যবহার করতে পারেন।

 

বহু দোলাচলের মধ্যে দিয়েই বিশ্বভারতীর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে চলেছে আগামী দিনে, যার উত্তর হয়তো ছাত্রছাত্রীদের হাতেই, তাঁদের নীতির হাতে, তাঁদের অ্যাপ্রোচের হাতে।  যে কোনো কিছুরই কনস্ট্রাকটিভ আর ডেস্ট্রাক্টিভ দুটো নির্দিষ্ট পক্ষ হয়, আর বার্ড আই ভিউ’র মতো একটা তৃতীয় পক্ষের মত হয়।  রাজনীতির ক্ষেত্রেও এর কোনও বদল নেই। ভাববেন না, এখানে তৃতীয় পক্ষ বলতে আমি থার্ড ফ্রন্টের কথা বলছি, আমি বলছি সাধারণ মানুষের পক্ষের কথা। সাধারণ বা আশ্রমের মানুষ অথবা প্রাক্তনীদের কাছে শান্তিনিকেতন বা বিশ্বভারতী এমন একটা নাম, যা বাংলা ভাষার মননের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।  সেখানে এই আশ্রমিক শিক্ষাব্যবস্থায় বর্তমান আচার্যের অবদান কতটুকু? বর্তমান আচার্য কেন এতো উদাসীন, এই প্রশ্ন কিন্তু শান্তিনিকেতনের আনাচে কানাচে চলছেই। এমনই আরও বহু প্রশ্ন জমছে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে।  আমরা উত্তরের আশায় রইলাম।

 

লেখক: কবি ও অনুবাদক