• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০২ মার্চ, ২০২১, ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭
প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৭, ২০২১, ০৬:৫৯ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জানুয়ারি ১৭, ২০২১, ০৬:৫৯ পিএম

আলকাপ লোকনাট্যের দিন কি শেষ?

আলকাপ লোকনাট্যের দিন কি শেষ?

বাংলার লোকসংস্কৃতির বিরাট ভাণ্ডারে আলকাপ লোকনাট্য অন্যতম হলেও ভূমিঘনিষ্ঠ এই লোকজ সংস্কৃতির অস্তিত্ব এখন বিলীন হতে চলেছে। পূজোতে, ঈদ পরবর্তী মিলন আয়োজনে, ফসল ঘরে তোলার আনন্দে কিম্বা বৈশাখী উৎসবে আজকাল আলকাপের আর প্রচলন নেই। ফলে দিন দিন আলকাপের কলাকূশলীরা কর্মবিমূখ হয়ে পড়ছেন। অনেকেই রিকশা বা অটোভ্যান চালিয়ে জীবিকার সন্ধান করে নিয়েছেন।

আলকাপ পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, মালদহ এবং বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয় একটি লোকনাট্য বা পালাগান। তবে বিহার, ঝাড়খণ্ডের কোনো কোনো এলাকায় আলকাপের প্রচলন আছে। সাধারণত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা এই লোকনাট্যটির চর্চা করে থাকলেও অসাম্প্রদায়িক এবং সেক্যুলার ভাবনা নিয়ে আলকাপ যুগ যুগ ধরে আমাদের মধ্যে সম্প্রীতির সাঁকো নির্মাণ করে গেছে। আলকাপ সৃষ্টির ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য তেমন তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি যে—আলকাপ সৃষ্টির পেছনে কে বা কারা ছিলেন। তবে ফোকলোর গবেষকের মনে করেন, অনুর্ধ্ব দেড়শো বছর আগে বর্তমান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ থানার সীমান্তবর্তী মোনাকষা গ্রামের বনমালী প্রমাণিক আলকাপের প্রবর্তক। পেশায় নাপিত বনমালী প্রমাণিকের জন্ম ১২৭১ বঙ্গাব্দে। এক চোখ অন্ধ বলে ‘বোনাকানা’ নামে তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন। বোনাকানা গানের জীবন শুরু করেন চন্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল, বোলবাই দলের শিল্পী হিসেবে। পশ্চিম বাংলার গবেষকরাও বোনাকানাকেই আলকাপ গানের জনক হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছেন। ২০০৯ সালের দিকে ‘আকাশবাণী’-র এক আলোচনায় বোনাকানাকে আলকাপের প্রবর্তক হিসেবে বর্ণনা করা হয়। বোনাকানার শিষ্যদের মাধ্যমে একসময় আলকাপ ছড়িয়ে পড়ে মালদহ, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম প্রভৃতি জেলায়। এরপর ধীরে ধীরে আলকাপ জনপ্রিয়তা লাভ করে।

অনেকে বলেন আলকাপ এসেছে আরবি শব্দ থেকে। এর বাংলা অর্থ মসকরা, ঢং বা কৌতুক। তবে এটা নিয়ে ভিন্নমতও আছে। এ প্রসঙ্গে সাহিত্যিক তথা এক সময়ের আলকাপের ‘ওস্তাদ’ সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের বিবরণটি ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি লিখেছেন, “আলকাপ-এর আল্ শব্দটি আহ্লাদের অপভ্রংশ। আহ্লাদ>আল্লাদ>আল্। এটি পুরনো বাংলা শব্দ। অধুনা অসংখ্য বাংলা প্রাচীন শব্দ লুপ্ত। ‘আল’ শব্দ বেঁচে আছে ‘কাপ’ অর্থাৎ নাটিকার সঙ্গে জোড় বেঁধে। ‘আলকাপ’ কথাটির প্রকৃত অর্থ আমোদ-প্রমোদমূলক নাটিকা। তবে কথাটির অর্থব্যঞ্জনা বিস্তারে এই অর্থও ব্যক্ত ‘ব্যঙ্গ রসাত্মক নাটিকা’ বা ‘রঙ্গব্যঙ্গাত্মক নাটিকা।” (আলকাপ, নাট্যরীতি এবং আর্ট থিয়েটার, ১৯৮২ দেশ পত্রিকা)। কেউ বলেন, কাপট্য বা ছলনা, ছদ্মবেশ এবং কপটতা থেকে ‘কাপ’ শব্দের জন্ম। আলকাপের খ্যাতিমান শিল্পী মেহবুব ইলিয়াসের মতে, ‘আল’ মানে আধুনিক। আর ‘কাপ’ মানে ঠাট্টা। এই দু’য়ে মিলে ‘আধুনিক ঠাট্টা’।

গম্ভীরা থেকে আলকাপের জন্ম-এমন মতামতও প্রচলিত আছে। তবে গঙ্গা, পদ্মা, মহানন্দা, ভগীরথী ঘেঁষা অঞ্চলের লোকগানের সুর নিয়ে আলকাপের সবিস্তার ঘটে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বিশেষ করে হোলী, বোলবাই, গীতগোবিন্দ এবং চণ্ডীমঙ্গল থেকে কথা ও সুর নিয়ে আলকাপ সমৃদ্ধ হয়েছে। লৌকিক জীবনের প্রেম-ভালোবাসা, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না এমন নানান বিষয় নিয়েই আলকাপ পরিবেশন করা হয়। তবে রাধা ও কৃষ্ণের প্রেমলীলা নিয়ে আলকাপ সবচেয়ে জমে। এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে  আলকাপে স্থান করে নিয়েছে। আলকাপ সেন্সরবিহীন একটি লোকজ অনুষজ্ঞ। তাই সব সময় এটি যে শালীন বা শ্লীল হবে এমনটি নয়। আলকাপে রস নির্ভর কথা ও গানে কিছু অশ্লীল শব্দ ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

আলকাপ লোকনাট্যের দলকে ঘিরে দর্শক গোল হয়ে বসে থাকেন। আলকাপের দলনেতাকে ‘সরকার’ বলে ডাকা হয়। সরকার অত্যন্ত বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান হন। ১৫/২০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত এই দলকে মূলত তিনি পরিচালনা করেন। আলকাপের সরকারকে অনেক শিক্ষিত ও বিজ্ঞ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সরকার যিনি হন তিনি আসলেই একজন স্বশিক্ষিত মানুষ। উপস্থিত বুদ্ধিতে তাকে সিদ্ধহস্ত হতে হয়। তার জন্য সমাজ, রাজনীতি ও ধর্ম বিষয়ক সাম্যক জ্ঞান থাকা জরুরি। সরকারকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে সবদিক বিবেচনা করে কথা ও সুরের যাদু দিয়ে দর্শক হৃদয় জয় করতে হয়। সরকারের সাথে তার একজন ছোট ভাই থাকেন। সেই ভাইটি ভাঁড় চরিত্র নিয়ে দর্শক মনকে রসময় করে তোলেন। আঞ্চলিক ভাষায় ‘ক্যাঁপ্যা’ নামে তিনি পরিচিত। এই ক্যাঁপ্যাই হাস্যরসের মধ্য দিয়ে দর্শককে মাতিয়ে রাখেন। হাসির ছলে সমাজের বিভিন্ন অসংগতিকে তুলে নিয়ে আসেন তিনি। আলকাপ গানের ভাষা মূলত আঞ্চলিক। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আঞ্চলিক ভাষা সাধারণত আলকাপে  ব্যবহৃত হয়। তবে সরকার শুদ্ধ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। আলকাপের অন্য একটি চরিত্র ছোকরা বা ছুকরী। একজন ছেলে মেয়ে সেজে এমন চরিত্রটি করেন।

মূলত আলকাপের আয়োজন হতো হিন্দু ধর্মালম্বীদের পূজাতে। গ্রামের মানুষজন নতুন ধান মাঠ থেকে ঘরে তোলার সময়ও আলকাপের আসর বসাতেন। গ্রাম্য জীবন ব্যবস্থায় বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে এটি খুবই নন্দিত ছিলো তখন। পারিবারিক কোন কোন অনুষ্ঠান উপলক্ষেও আলকাপ দলের বায়না করা হতো। আলকাপ সাধারণত শুরু হয় রাতে। একটা পালা অন্তত ৪ ঘন্টা সময় নিয়ে চলে। একাধিক পালা থাকলে এটি শেষ হতে হতে একেবারে সকাল হয়ে যায়। অনেকে একক পালা নিয়েও সারারাত ধরে আলকাপ করেন। শুরুর দিকে সাধারণ গ্রামীণ খেটে-খাওয়া মানুষরা আলকাপ দলে বিভিন্ন ভূমিকা পালন করতেন। কিন্তু সময়ের অগ্রগতির ফলে এক সময় আলকাপের আঙ্গিক ও প্রয়োগ-প্রকরণ রীতিতে উন্নতি ঘটেছিল,  তৈরি হয়েছিল পেশাদার শিল্পী।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের হেসামউদ্দীন সরকার, ঝড়– পাল, মেহবুব ইলিহাস একসময়ে আলকাপের বিখ্যাত সরকার বা দলনেতা ছিলেন। পঞ্চাশের দশকে মুর্শিদাবাদ জেলার প্রখ্যাত ওস্তাদ ঝাঁকসা ওরফে ধনঞ্জয় সরকারও খ্যাতি অর্জন করেন। আলকাপকে কিছুটা শ্লীল ও রুচিসম্পন্ন করে তোলার জন্য তিনি বিশেষভাবে অবদান রেখেছিলেন। আধুনিক সময়ে কেরামত সরকার বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও এখন শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে এক রকমের শয্যাগত আছেন। তার আর সেই শক্তি ও সামর্থ নেই। অসুস্থ কেরামত সরকার বিনা চিকিৎসায় অর্থাভাবে দিন কাটাচ্ছেন বলে জেনেছি। আলকাপ লোকনাট্যে এক সময় ওস্তাদ/সরকার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ। তিনি যখন ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘে যুক্ত ছিলেন তখন মুর্শিদাবাদ জেলা গণনাট্য সঙ্ঘের নেতৃত্বের পরামর্শে আলকাপের সঙ্গে জড়িত হন। সাধারণ মানুষের কাছে ‘ওস্তাদ সিরাজ’ এবং ‘সিরাজ মাস্টার’ নামে তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন।

আলকাপের মতোন একটি অসাম্প্রদায়িক লোকনাট্যের অস্তিত্ব এখন ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে অবলুপ্ত হতে চলেছে। সভ্যসমাজে এর মূল্য নেই আজ। অবহেলা কিম্বা অনাদরে এই লোকসংস্কৃতিটি এখন বিলুপ্তের পথে। ফলে কোনো যোগ্য উত্তরসূরি তৈরি হচ্ছে না আলকাপের। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকেও গম্ভীরা ও আলকাপ নিয়ে কোনো রকমের পৃথক কর্মসূচী আজ পর্যন্ত নেয়া হয়নি। সম্প্রতি একটি পরিসংখ্যান থেকে জেনেছি যে, দেশ বিভাগের আগ পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় আলকাপ শিল্পীর সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৪১৯ জন। বর্তমানে এর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে নিয়মিত অনিয়মিত শিল্পী মিলে মাত্র ১৫২ জনে। এই হতাশাব্যাঞ্জক তথ্য থেকে ধরে নেয়া যেতে পারে আলকাপ সম্ভবত গত ১৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বৈরী সময় অতিক্রম করছে।

লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে না রাখলে বাঙালি মনন ও চিন্তায় মুক্ত ভাবনা একসময় বিলীন হয়ে যাবে। জাতিগতভাবে উদার হিসেবে আমাদের পরিচয় দেয়ার কিছুই থাকবে না তখন। জঙ্গীবাদ, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, বিনষ্ট সময়ের আগ্রাসনে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিও নষ্ট হবে। তাই বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য এবং সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতিকে যথাযথভাবে বিকশিত করা অত্যন্ত জরুরি এখন।

 

লেখক : সংস্কৃতিকর্মী ও গবেষক