• ঢাকা
  • রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৩, ২০২১, ০৪:২৩ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জানুয়ারি ২৩, ২০২১, ০৪:২৩ পিএম

সুভাষ বসু ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক যোগসূত্রতা

সুভাষ বসু ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক যোগসূত্রতা

বিপ্লবী সুভাষচন্দ্র বসুর ১২৪তম জন্মজয়ন্তী আজ। সুভাষ বসু একটা গ্রন্থ লিখেছিলেন এবং সেই বইয়ের মধ্যে ব্যাখা করেছিলেন তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকে। বইটার নাম ‘ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল’। সেখানে তিনি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার পটভূমির ইতিহাস এবং মানবজাতির সঙ্গে এর যোগসূত্রের বিষয়টি। ভারতবর্ষের যে ইতিহাস সেই ইতিহাসকে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন চোখে দেখেছিলেন এবং এর বহুজাতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরেছিলেন একজন ইতিহাসবিদের চোখ নিয়ে। যেখানে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে…।’   

এই ঐতিহাসিক দর্শন প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছিল সুভাষ বসুর রাষ্ট্র ভাবনায়। তিনি কখনোই উপমহাদেশের বিভাজনকে ধর্মীয় বিভাজন কিংবা রাজনৈতিক বিরোধিতা হিসেবে চিহ্নিত করেননি। তিনি ভেবেছিলেন এই উপমহাদেশ ঔপনিবেশিক চক্রান্তের পরিণতিতে ধর্মীয়ভাবে বিভাজিত হয়েছে।

তাঁর এই যে দর্শন, এই দর্শনকে তিনি কেবল তাঁর লেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, এটাকে সমাজজীবনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে লড়াই করেছেন। তিনি ভারতের মুক্তিসংগ্রামের ধারাবাহিক ইতিহাসকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন কর্মের ভেতর দিয়ে। সুভাষচন্দ্র বসু মনে করতেন ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটাতে গেলে বিভিন্ন সম্প্রদায় কিংবা গোষ্ঠীর সংঘবদ্ধ সংগ্রামকে সমন্বিত করতে হবে। এই যে উপমহাদেশের হিন্দু-মুসলমানকে পরস্পরের প্রতি শত্রু ভাবাপন্ন করা হচ্ছে, সেটার লক্ষ্যই ছিল ভারতে ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রোথিত করা। তিনি প্রাচীন ভারতের যে গৌরবময় পর্ব, সেই পর্বকে বিশ্লেষণ করেছিলেন তাঁর লেখায়। শুধু লেখা নয়, তাঁর সমগ্র জীবনের কর্মকাণ্ডে তারই প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। তিনি পরিষ্কারভাবে বিভিন্ন সময় বলেছেন ভবিষ্যৎ ভারতের আদর্শ চেহারা কেমন হওয়া উচিত। ধর্মীয় হানাহানি নয়, জাতিগত সমন্বয় সাধনের ভেতর দিয়ে ভারতের সামাজিক সমস্যাকে দূর করতে হবে। তিনি এ কথাও ভেবেছেন, রাষ্ট্রের প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার গোষ্ঠীগত সাংস্কৃতিক আচরণের পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হবে। সে সময় হিন্দু-মুসলমান সমস্যা যে কৃত্রিমভাবে ব্রিটিশ শাসকরা তৈরি করেছিলেন, এটাকে তিনি তুলে ধরার জন্য বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হননি।

আজ যে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের বিভাজন, এটাকে তিনি সব সময়ই মানবজাতির জন্য আত্মবিনাশী হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তিনি যে কথাটি বলেছেন সে সময় তার নির্গলিতার্থ নির্যাস ছিল ধর্মের রাজনীতি মানবতার ধর্মকেই হত্যা করে। শুধু মুখের কথাই নয়, তিনি তাঁর কার্যক্ষেত্রে কিংবা সেনাবাহিনী গঠনেও এই সত্যটাকে ধারণ ও বহন করেছেন। আমরা যদি নেতাজি সুভাষ বসুর জীবন দর্শন ও তাঁর কর্মধারাকে বিশ্লেষণ করি, তাহলে বুঝতে পারব আমাদের মানুষের জন্য, আমাদের বাংলাদেশের মানুষের জন্য, আমাদের গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নির্মাণের জন্য এবং আমাদের চেতনা বিকাশের জন্য তাঁর ভূমিকা কতখানি প্রাসঙ্গিক।

উপমহাদেশের অনেক নেতা এসেছেন, যারা নানাভাবে মানুষকে সংগঠিত করার চেষ্টা করে গেছেন। রাজনৈতিক আদর্শও প্রচার করেছেন। কিন্তু সুভাষ বসুর মতো এত পরিছন্নভাবে উপমহাদেশের ইতিহাসকে, রাজনৈতিক ধারাকে কিংবা এই উপমহাদেশের মানবভাবনাকে এমনভাবে কেউ কি ধরতে পেরেছেন? সেই বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নের বিপ্লবী সুভাষচন্দ্র বসুকে আমরা খুঁজে পাই তাঁর উত্তরাধিকার হিসেবে বিবেচিত হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন সংগ্রাম ও রাষ্ট্র ভাবনার মধ্যে। সুভাষ বসু ইংরেজদের বিরুদ্ধে ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ গঠন করে সরাসরি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন আর বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একই দর্শনের প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। এ দেশের কোটি কোটি বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং মুক্তিসংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে। তাঁরও আজীবন সাধনা ছিল মানব মুক্তির জন্য লড়াই আর তার জন্য তিনি সমগ্র প্রকার নিগ্রহ গ্রহণ করতেও দ্বিধান্বিত হননি। দুজনের মধ্যেই যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা আমরা দেখতে পাই, মানুষের শোষণমুক্তির যে লড়াইকে আমরা প্রত্যক্ষ করি, রাষ্ট্র গঠনে যে শোষণমুক্তির চিত্র প্রতিভাত হয়, তার ভেতর দিয়ে আমরা এক অসাধারণ মহান বিপ্লবী যোগসূত্রকে আবিষ্কার করতে পারি।

আমরা সুভাষ বসুর বিরুদ্ধে সুদীর্ঘকালের ষড়যন্ত্রের কাহিনি বারবার লক্ষ করি। তাঁর ভাবনাকে বিকৃতরূপে ব্যাখ্যা এবং মানুষকে তাঁর সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশনের যে ষড়যন্ত্র আমরা দশকের পর দশক লক্ষ করেছি। এই একই ষড়যন্ত্র আমরা দেখি বঙ্গবন্ধুর বেলায়ও। দুজনের সংগ্রামের ইতিহাসকে মুছে ফেলার চক্রান্ত চলেছে দীর্ঘকাল। কিন্তু প্রকৃত ইতিহাসের কণ্ঠ রোধ কখনোই করা যায় না। অন্ধকার যতই বিশাল এবং সর্বব্যাপী হোক না কেন, সত্যের দীপ শিখার কাছে সেই বিশাল অন্ধকারও পরাভূত হয়। এই সত্যটিকে আমরা অনুধাবন করতে পারি। বঙ্গবন্ধু বিশ্ব ইতিহাসের পুনর্বাসনের ভেতর দিয়ে এবং একইভাবে সুভাষ বসুও সমস্ত কুহেলিকার জাল ছিন্ন করে ক্রমান্বয়ে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠছেন। এই উপমহাদেশের মানুষের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধের পুনর্বাসনে ইতিহাসের এই দুই মহানায়কের মধ্যে কর্মযজ্ঞের যোগসূত্র স্থাপন করা প্রচণ্ডভাবে আবশ্যিক।